এলএনজি’র আমদানি ঠিক রেখে কমানো হয়েছে দেশীয় উৎপাদন

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ২১:২৮, এপ্রিল ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৫৯, এপ্রিল ২৬, ২০২০

করোনা পরিস্থিতিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি’র আমদানি ঠিক রেখে দেশীয় উৎপাদন কমানো হয়েছে। খনিগুলোর গত এক মাসের উৎপাদন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ৩ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সাধারণ সময়ে সরবরাহ করা হয় ৩ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। করোনা পরিস্থিতিতে গ্যাসের চাহিদা কমে যাওয়ায় এখন সরবরাহ হচ্ছে ২ হাজার ৭৪ মিলিয়ন ঘনফুট।

দেখা গেছে, সব চেয়ে বেশি উৎপাদন কমানো হয়েছে শেভরন বাংলাদেশের বিবিয়ানা গ্যাস ক্ষেত্রের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চুক্তির কারণে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে, তা না হলে বর্তমান অবস্থায় দেশে উৎপাদিত গ্যাস দিয়েই চাহিদা মেটানো সম্ভব হতো।

জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, এলএনজি আমদানি করতে ডলারের প্রয়োজন হয়। এখন বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেও ডলারের সংস্থান করা যাচ্ছে না। গত সপ্তাহে এলএনজির একটি এলসি খোলার সময় তাদের বেগ পাওয়ার কথাও জানান তিনি। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী এলএনজি আমদানি না করেও উপায় নেই, বললেন এই কর্মকর্তা।

কাতার ও ওমান থেকে জি-টু-জি ভিত্তিতে এলএনজি আমদানির চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। কোনও কারণে এলএনজি আমদানি করতে ব্যর্থ হলে যেমন জরিমানা গুনতে হবে, একইভাবে এলএনজি সরবরাহ না করতে পারলেও তারা জরিমানা গুনবে। এছাড়া সাগরে যে এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে, সেগুলোও এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করুক বা না করুক, তাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট হিসেবে দিতে হবে। ফলে করোনার এই সংকটকালে দেশে এলএনজির চাহিদা না থাকলেও বাংলাদেশ তা আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, গত ২৫ এপ্রিল দেশে উত্তোলন এবং এলএনজি মিলিয়ে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৭৪ মিলিয়ন ঘনফুট। গত ২৫ মার্চ সারা দেশে সাধারণ ছুটি শুরুর আগের দিন যা ছিল তিন হাজার ১৫১ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ এই দুই দিনের সরবরাহের ব্যবধান হচ্ছে এক হাজার ৭৭ মিলিয়ন ঘনফুট। এই হিসাবে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা কমেছে ৩৪ শতাংশ।

প্রসঙ্গত, গত এক মাস ধরে দেশের বেশিরভাগ শিল্প কারখানা এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গৃহস্থালিতেই কেবল গ্যাসের চাহিদা রয়েছে।

জানা যায়, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি (বিজিএফসিএল)-এর দৈনিক গ্যাস উৎপাদনের ক্ষমতা ৮৫১ মিলিয়ন ঘনফুট। গত ২৫ মার্চ কোম্পানির উৎপাদন ছিল ৬৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট, আর ২৫ এপ্রিল যা কমিয়ে ৪৭৩ মিলিয়ন ঘনফুট করা হয়েছে। সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির (এসজিএফসিএল) দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১৪৯ মিলিয়ন ঘনফুটের স্থলে গত ২৫ মার্চ উৎপাদন ছিল ১১২ মিলিয়ন ঘনফুট, ২৫ এপ্রিল যা কমিয়ে ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট করা হয়েছে। বাপেক্সের দৈনিক ১৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদন ক্ষমতার স্থলে গত ২৫ মার্চ উৎপাদন ছিল ৮৯ মিলিয়ন ঘনফুট, আর ২৫ এপ্রিল যা কমিয়ে ৬৫ মিলিয়ন ঘনফুট করা হয়েছে।

বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন এবং তাল্লোর সম্মিলিত দৈনিক ১৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে গত ২৫ মার্চ উৎপাদন ছিল ১৪৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট, ২৫ এপ্রিল যা কমিয়ে ৮৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট করা হয়েছে।

এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন কমানো হয়েছে বিবিয়ানাতে। বিবিয়ানায় ২৫ মার্চ উৎপাদন ছিল ১১৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট, এখন যা কমিয়ে করা হয়েছে ৭৫১ মিলিয়ন ঘনফুট। উৎপাদন কমানো হয়েছে জালালাবাদ এবং বাঙ্গুরা গ্যাস ক্ষেত্রেও।

তবে এই সময়ে এলএনজি আমদানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমানো হয়নি। দেখা গেছে, ২৫ মার্চ এলএনজি সরবরাহ করা হয়েছে ৬০১ মিলিয়ন ঘনফুট। আর ২৫ এপ্রিল এসে সরবরাহ করা হয়েছে ৫৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ম. তামিম বলেন, ‘যেহেতু এলএনজি আমদানির জন্য আমরা চুক্তি করেছি, গ্যাস আমাদের নিতেই হবে। আর না নিলে জরিমানা দিতে আমরা বাধ্য। একদিকে দেশের গ্যাসের উৎপাদন কমাতে হচ্ছে, অন্যদিকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বহু দেশে বহু পণ্যের ক্ষেত্রে আমরা দেখি— বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ঘটনায় অনেক সময় আলোচনার মাধ্যমে পেনাল্টি মাফ করে দেওয়া হয়। করোনাভাইরাসের এই সময়ে আমাদের নিজেদের কোনও সমস্যা নয়। সেক্ষেত্রে পেনাল্টি কমানো বা না দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হতেই পারে।’

তিনি জানান, ‘ফোর্স মেজর অ্যাক্ট’ নামে একটি বিষয় আছে, সেখানে এই বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। আমরা সেই বিষয়টি বুঝে নিয়ে আলোচনায় যেতে পারি।

/এসএনএস /এপিএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ