করোনার মাঝেও বেড়েছে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ২৩:০২, জুন ০৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪৫, জুন ১০, ২০২০

ব্যাংকমহামারি করোনার কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য তথা অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ হচ্ছে না। আমদানি- রফতানিসহ বেশিরভাগ সূচকেরই এখন নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি। অথচ ব্যাংকগুলো এ সময়েও বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ করছে আগের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে করোনা পরিস্থিতিতে বেশি পরিমাণ ঋণ নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যাংকগুলো গত জানুয়ারি মাসের চেয়ে ফেব্রুয়ারিতে বেশি পরিমাণ ঋণ বিতরণ করেছে। ফেব্রুয়ারির চেয়ে মার্চে ঋণ বিতরণ বেড়েছে আরও বেশি। একইভাবে মার্চের চেয়ে এপ্রিলে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত এপ্রিল মাসে ব্যাংকগুলো থেকে ব্যবসায়ীরা ৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন। অথচ  এপ্রিল মাসজুড়েই অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা যায়। গত মার্চ মাসে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে ৭ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারি মাসে বিতরণ করেছে ৬ হাজার ৪২৬ কোটি টাকার ঋণ। আর ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত (এডিআর) সমন্বয়ের কারণে গত জানুয়ারি মাসে কোনও ঋণই বিতরণ করতে পারেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের শেষ মাস অর্থাৎ ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের  পুঞ্জিভূত পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৫৩ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। ২০২০ সালের প্রথম মাস অর্থাৎ জানুয়ারিতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ১০ লাখ ৫২ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই মাসে কোনও ঋণ বিতরণ করেনি ব্যাংকগুলো। বরং, ঋণ আদায় হয়ে সমন্বয় হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। মার্চে এই সংখ্যা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১০ লাখ ৬৬ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা এবং এপ্রিল মাসে বিতরণ করা ঋণের পুঞ্জিভূত পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৭৫ হাজার ১১০ কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিনটি কারণে বেসরকারি খাতে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বেড়েছে। প্রথমত, শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্য সরকারের প্যাকেজ থেকে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়ীরা যাতে দ্রুত ঋণ পেতে পারেন, সে ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। ফলে এর একটা প্রভাব পড়েছে। এছাড়া, এডিআর সংক্রান্ত সমস্যা থাকায় যেসব ব্যাংক জানুয়ারিতে ঋণ বিতরণ করতে পারেনি, তারা এখন করছে।’   

তবে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি এপ্রিলে ৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এই প্রবৃদ্ধি গত ১০  বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।

বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, এপ্রিল মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ গত এপ্রিলের শেষে বেসরকারি খাতে একবছর আগের চেয়ে ঋণ বেড়েছে ৮ দশমিক ৮২ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ২০ শতাংশ। আর ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।

আগামী ৩০ জুন শেষ হতে যাওয়া ২০১৯-২০ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে এই ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। আর সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয় ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। জানুয়ারিতে অবশ্য তা বাড়িয়ে ৫৬ শতাংশ করা হয়। কিন্তু এপ্রিলের শেষে সেটাও ছাড়িয়ে ৭৪ দশমিক ৫৫ শতাংশে উঠেছে।

অর্থাৎ সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই ব্যাংক ঋণ দেদার বাড়ছে।

এ প্রসঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘প্যাকেজ থেকে ঋণ নেওয়ার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ বাড়ছে।’ তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারকে ঋণ দেওয়াই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম রাজস্ব আদায় এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই সরকারকে ব্যাংক থেকে প্রচুর ঋণ নিতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে ব্যাংক থেকে সরকার ৬৪ হাজার ২৯৬ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। গত অর্থবছরের তুলনায় যা ৩৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি।

 

/এপিএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ