কোরবানির চামড়া নিয়ে শঙ্কা

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৩:০০, জুলাই ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:০০, জুলাই ১৫, ২০২০

কাঁচা চামড়া (ফাইল ছবি)করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ইতালিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে ফ্যাশনেবল আইটেমের চাহিদা ব্যাপকহারে কমেছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া ওইসব দেশের মানুষ এখন কেনাকাটা করছেন না। ইতালিতে গড়ে উঠা এসব পণ্যের ফ্যাক্টরিও প্রায় বন্ধ। ফলে বাংলাদেশ থেকে এবছর চামড়া কেনার আগ্রহ তেমন নেই বলে জানিয়েছেন ইতালি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। দেশীয় ব্যবসায়ীদের কাছে গত বছরের কেনা চামড়াও রয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে এবছর কোরবানির পশুর চামড়া কেনা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ব্যবসায়ীরা। তাহলে এবছরের চামড়ার ভবিষ্যৎ কী? এমন প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের। একাধিক চামড়া ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মোসলেম পাটোয়ারী বলেন, এ বছর চামড়া নিয়ে উৎসাহী হওয়ার কোনও সুযোগ নেই। গত বছরের চামড়া এখনও গোডাউনে পড়ে আছে। এগুলো ব্যবহারের উপায় দেখছি না। কারণ অর্ডার নাই। অর্ডার না থাকলে পণ্য উৎপাদন করে বিক্রি করবো কোথায়? এর ওপর আবার কোরবানি আসছে। চামড়া কেনা যেমন ব্যবসা, তেমন একটি দায়িত্বও বটে। কারণ এই চামড়াগুলো আমরা না কিনলে নষ্ট হবে বা পাচার হবে। যা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর নয়। তাই কী করবো ভেবে পাচ্ছি না। চামড়া নিয়ে এক প্রকার শঙ্কার মধ্যে রয়েছি। 

মেসার্স সোনার বাংলা ট্যানারির ব্যবস্থাপক আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইতালিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বায়াররা জানিয়ে দিয়েছে তারা এ বছর কোনও অর্ডার দেবে না। করোনার কারণে গত বছরের কিছু অর্ডারের পণ্য সরবরাহ দিতে পারিনি। এগুলো এখন অনেকটাই রফতানির অযোগ্য হয়ে গেছে। এ অবস্থায় নতুন চামড়া কিনে কী করবো? গতবছরের চামড়াও রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ব্যাংক ঋণ রয়েছে জানিয়ে আরিফুল ইসলাম জানান,  করোনার মধ্যে এবছর চামড়া নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় আছি। নতুন চামড়া যদি কিনতে হয়, তাহলে এর জন্য টাকা লাগবে। সে টাকা আমাদের কাছে নাই। অপরদিকে অর্ডার না থাকলে চামড়া কিনে করবো কী?

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে চামড়া খাতে মোট রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০৯ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে আয় হয়েছে মাত্র ৭৯ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ আয় কমেছে ২৯ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। ইপিবি সূত্র আরও জানায়, ২০১৯-২০ অর্থবছর চামড়ায় প্রবৃদ্ধি কমেছে ৪০ দশমিক ২৮ শতাংশ, চামড়াজাত পণ্যে রফতানির প্রবৃদ্ধি কমেছে ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং ফুটওয়্যার রফতানিতে প্রবৃদ্ধি কমেছে ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ।

২০১৯ সালে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঈদুল আজহা পালিত হয়েছিল। গতবছর ন্যায্য দাম না পেয়ে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া মাটিতে পুতে ফেলার মতো ঘটনা ঘটেছে। ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সংকট নিরসনে গতবছরই প্রথম কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। এরপরও সমস্যার সুরাহা হয়নি। মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছিলেন।

এদিকে শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চামড়া এবং চামড়া ব্যবসায়ীদের সমস্যা নিয়ে শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গত ২২ জুনের সভায় আসন্ন কোরবানির ঈদে চামড়া ব্যবসায়ীদের ঋণসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন ও তাদের নতুনভাবে ঋণ সুবিধা, বকেয়া ঋণ বিশেষ বিবেচনায় তফসিলিকরণ, নমনীয় পরিশোধ সূচি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ওই বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, এখন চামড়া শিল্প কারখানায় অবিক্রিত রয়ে গেছে ৩২শ’ কোটি টাকার চামড়া। এ বছর চামড়া ব্যবসায়ীদের চামড়া কেনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে ৩ শতাংশ সুদে ৬শ’ কোটি টাকার ‘ক্যাশ ক্রেডিট’ দিতে চিঠি পাঠিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই বৈঠকে আগের ঋণ ব্লক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর ও ৩ বছরের সুদ মওকুফসহ অন্যান্য সুবিধা চেয়েছেন চামড়া শিল্প মালিকরা। চামড়ার শিল্পের বর্তমান অবস্থা আঁচ করতে পেরে ৮ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে কোরবানির চামড়া কিনতে ট্যানারি মালিকদের সহজ শর্তে ৩ শতাংশ সুদে ৫-৬শ’ কোটি টাকা ক্যাশ ক্রেডিট দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চামড়া শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ জানিয়েছেন, ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ট্যানারি শিল্প কোনও ব্যবসা করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের বাজার ছোট হয়ে গেছে। গত বছর কেনা চামড়াও আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। তিনি বলেন, এখনও চামড়া শিল্পগুলোকে পুরোপুরি কমপ্লায়েন্স করা যায়নি। সাভারের চামড়া শিল্প নগরীর কেন্দ্রিয় বর্জ্য শোধনাগারটিকে শতভাগ কার্যকর করা যায়নি। এগুলো ঠিক করা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

এ শিল্পের অনুকূলে ২ হাজার ৬শ’ কোটি টাকার বকেয়া ঋণ রয়েছে। আর এ ঋণের বিপরীতে সুদ দাঁড়িয়েছে ৭শ’ কোটি টাকা। ফলে ব্যবসা না থাকলেও ঋণের সুদে এ খাতের ব্যবসায়ীরা অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানিয়েছেন, চামড়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় রফতানি খাত। এ খাতের উন্নয়নে সরকার সব কিছু করবে। চামড়া দেশের সম্পদ। এ সম্পদ রক্ষায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সম্পদ নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। তিনি জানান, করোনাসহ বিভিন্ন কারণেই এবছর মানুষ কম পশু কোরবানি দেবে। বিষয়টি মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

 

/এমআর/

লাইভ

টপ