বিদেশি পণ্যে বাজার দখলের ভয় কেটে যাচ্ছে

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ০৯:০০, অক্টোবর ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৩, অক্টোবর ১৪, ২০২০

পণ্যবাহী জাহাজ (প্রতীকী ছবি)ভেতর থেকে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের উদ্যোক্তারা আগের মতো বিদেশি কোম্পানির উৎপাদিত পণ্য নিয়ে ভয় পান না। নিজেরাই বড় বড় কোম্পানি গড়ে তুলছেন। এরই মধ্যে বাংলাদেশের শিল্প উদ্যোক্তাদের তৈরি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্য এখন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু তাই নয়, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতাও অর্জন করতে শুরু করেছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। এখন বিদেশি পণ্য যাতে সহজে দেশের বাজারে আসতে পারে, সেজন্য তারা আমদানি শুল্ক কমানোর কথা বলছেন।

সরকারের তথ্য বলছে, অর্থনৈতিক বিবেচনায় সারা পৃথিবীকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের এগিয়ে চলার সঙ্গে দেশের মানুষের রুচিরও পরিবর্তন এসেছে। ধনী শ্রেণির মানুষের পাশাপাশি মধ্য আয়ের অনেকে বিভিন্ন দেশের উন্নত ব্র্যান্ডের নানা ধরনের পণ্য ব্যবহার করছেন। অবশ্য আমদানিতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করায় বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্য আসছে কম। এ কারণে বিদেশি পণ্য কিনতে অনেকেই বিদেশে যাচ্ছেন বাজার করতে। এতে একদিকে দেশের টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশে, অন্যদিকে  সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য নিজেদের সামর্থ্য বাড়ানোর কথা ভাবছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। শুধু তাই নয়, তারা মনে করছেন, বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য দেশীয় পণ্যগুলোকে আলাদাভাবে কোনও প্রটেকশন দেওয়া বা সুরক্ষা দেওয়ার দরকার নেই।

দেশের শিল্প উদ্যোক্তাদের সক্ষমতার কথা উঠে আসে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি) আয়োজিত এক সেমিনারে। গত ৭ অক্টোবরের ওই  সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা গত এক দশকে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে।’ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে বিদেশি পণ্য আমদানিতে শুল্ক নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের সামর্থ্য বাড়ানোর কথা বলেন তিনি। তিনি উল্লেখ করেন, আগামীতে বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে ব্যবসায়ীদের আরও সামর্থ্য বাড়াতে হবে। সেই লক্ষ্যে মনোনিবেশ করতে বাংলাদেশকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে হবে।

জানা গেছে, বিদেশি পণ্য আমদানিতে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শুল্কারোপ করে রেখেছে বাংলাদেশ। যা চীন ও ভারতের চেয়ে তিন গুণ বেশি। যার ফলে বিশ্বের  নামি-দামি ও বড় বড় ব্র্যান্ড ঢাকায় আসতে পারছে না। যে কারণে অনেকে অবৈধ পথে ব্র্যান্ডের পণ্য আনছেন।

এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সহ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগের চেয়ে ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা বেড়েছে। আরও বাড়বে। ফলে বিদেশি পণ্য আমদানিতে শুল্কারোপ কমানো উচিত।’ তিনি মনে করেন, একদিকে বিদেশি পণ্য আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে দেওয়া দরকার। অন্যদিকে  ব্যবসায়ীরা যে ভ্যাট সরকারকে দেয়, তা যেন পুরোটা সরকার পায়, তারও নিশ্চয়তা বিধান করা। এজন্য ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।

ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, বিদেশি পণ্য আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে দেওয়া দরকার। এতে দেশের নিত্যব্যবহার্য পণ্যের বাজারে দেশি ব্র্যান্ডের পাশাপাশি বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্য আমদানি বেড়ে যাবে। আর আমদানি হওয়া এসব পণ্যের বিক্রি বেড়ে গেলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে।

এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বিদেশি পণ্য আমদানিতে কোনও শুল্ক থাকা উচিত নয়। যদিও পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি শুল্কারোপ করে থাকে। ট্যারিফ বেশি হওয়ার কারণে বাংলাদেশে সরাসরি স্যামসাং, অ্যাপলসহ বড় বড় ব্র্যান্ড আসতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে আমাদের বের হতে হবে। সেক্ষেত্রে এমনিতেই অতিরিক্ত শুল্কারোপ থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। তার চেয়ে আগে থেকেই আমাদের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।’ তার মতে, দেশের মানুষের রুচি বদলেছে। এখন অনেকে বাজার করতে যায় বিদেশে। শুল্ক তুলে দেওয়া হলে পৃথিবীর সব বড় বড় ব্র্যান্ড চলে আসবে। দেশের নিত্যব্যবহার্য পণ্যের বাজারে দেশি ব্র্যান্ডের পাশাপাশি বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্য আমদানি বেড়ে যাবে। আর আমদানি হওয়া এসব পণ্যের বিক্রি বেড়ে গেলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘শুল্ক বেশি থাকায় সরকার এখন কোনও রাজস্বই পায় না। এটা কমানো হলে বৈধ পথে পণ্য আসা শুরু করবে। সরকারের রাজস্বও বাড়বে। বিশ্বের শীর্ষ ব্র্যান্ড ঢাকায় আসবে। এতে দেশের  হাজার হাজার ছেলেমেয়ে বিশ্বের দামি ব্র্যান্ডের কোম্পানিতে চাকরি পাবে।’ তবে সিগারেট ও মদের ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক কমানো ঠিক হবে না বলে মত দেন তিনি।

প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি, মাস্ক, সুরক্ষা পোশাকসহ ১২ ধরনের পণ্য আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক-কর অব্যাহতি দেওয়া আছে। এসব পণ্য আমদানিতে আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট, আগাম ভ্যাট ও অগ্রিম কর দিতে হয় না। এছাড়া পেঁয়াজের ঊর্ধ্বমুখী দরে লাগাম টানতে  আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করেছে সরকার।

 

/এপিএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ