বিমানের ভ্যাট মওকুফের সিদ্ধান্ত হয়নি

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ২০:২৫, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১২, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৬

বাংলাদেশ বিমানআন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ও বিমানকে লাভজনক করতে উড়োজাহাজের জ্বালানি জেট ফুয়েলের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) মওকুফ চেয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। এ জন্য মন্ত্রণালয়ের বিমান শাখা থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে, বিষয়টি সম্পর্কে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি এনবিআর। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত এয়ারলাইনস সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে লাভজনক করতে এ সুবিধা চাওয়া হয়েছে বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বিমান মন্ত্রণালয়।
চিঠিতে বলা হয়, জ্বালানি তেলের ওপর ভ্যাট আরোপের ফলে জ্বালানি তেলের দাম বেশি হওয়ার কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই উড়োজাহাজের তেলের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে দাম কিছুটা কমবে। এতে দেশের বাইরের স্টেশনগুলোর জ্বালানি মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকবে। এটি করা হলে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান আরও বেশি ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ পাবে। উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য জ্বালানি তেল জেট এ-১-এর অধিকাংশ বিপিসির আওতাধীন পদ্মা অয়েল কোম্পানি এবং বাকি তেল বৈদেশিক বিভিন্ন স্টেশন থেকে সংগ্রহ করা হয়।
বর্তমানে পদ্মা অয়েল থেকে ভ্যাটসহ প্রতি লিটার জ্বালানি তেল জেট ফুয়েল ১ দশমিক শূন্য ৭ ডলারে কিনতে হয়। কিন্তু অন্যান্য বৈদেশিক স্টেশন থেকে ৩০ শতাংশ কম দামে অর্থাৎ দশমিক ৮২ ডলারে কেনা সম্ভব। দামের এ পার্থক্যের কারণে বছরে ২৭০ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। ফলে বিমানকে লাভজনক করা সম্ভব হচ্ছে না।

বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে জানিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান জানিয়েছেন, বিমান সরকারি সংস্থা। এ ধরনের সংস্থা যদি ভ্যাট মওকুফের আবেদন করে তাহলে সেটির সমাধান দিতে ওপর মহলের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হবে।  

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাশ্রয়ীমূল্যে জ্বালানি তেল সরবরাহের সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। কারণ বিমানকে জেট ফুয়েল কেনার জন্য ১৫ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) দিতে হয়। আর প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪৯ শতাংশ অর্থই এখন ব্যয় হচ্ছে জেট ফুয়েলের জন্য। তাই জেট ফুয়েলের ওপর বিদ্যমান ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে বিমানকে লাভজনক করা সহজ হতো।

একই সঙ্গে রাশেদ খান মেনন বলেন, ব্যয় সংকোচন ও যাত্রী পরিষেবার মান বাড়িয়ে বিমানকে লাভজনক করা সম্ভব। এয়ারলাইনসটিকে আধুনিকায়ন করতে নেওয়া হয়েছে এই নতুন কর্মপরিকল্পনা। দুর্নীতি-অনিয়ম বন্ধ করার পাশাপাশি লোকসান কমিয়ে আনার জন্য নেওয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। লোকসানি রুটগুলো স্থগিত করে নতুন করে রুট বিন্যাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অত্যাধুনিক একটি এয়ারলাইনস হিসেবে বিমানকে ঢেলে সাজানো হবে বলেও জানান বিমানমন্ত্রী। 

ভ্যাট মওকুফ চেয়ে এনবিআরের কাছে পাঠানো চিঠিতে আরও বলা হয়, জ্বালানি তেলের ওপর ভ্যাট আরোপের ফলে বছরে ২৭০ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। এ কারণেই বিমানকে লাভজনক করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী স্টেশন ব্যাংকক, দুবাই, হংকং এবং কলকাতায় জ্বালানি তেলের দাম সস্তা হওয়ায় বিদেশি বিভিন্ন এয়ারলাইন্সগুলো ওইসব জায়গা থেকে ফ্লাইট পরিচালনা করতে উৎসাহিত হচ্ছে। এ জন্য বিমানবন্দরগুলো ব্যস্ত বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

জানা গেছে, কলকাতায় প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের মূল্য দশমিক ৮২৮৭ ডলার। এ কারণে বিদেশি অধিকাংশ এয়ারলাইন্সগুলো কলকাতা স্টেশন থেকে তেল সংগ্রহ ও ফ্লাইট পরিচালনা করছে। অথচ সব ধরনের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি তেলের দাম বেশি হওয়ার কারণে এয়ারলাইন্সগুলো ফ্লাইট পরিচালনাসহ ফ্রিকোয়েন্সি বাড়াতে উৎসাহিত হচ্ছে না। বিমানের সর্বমোট ব্যয়ের ৪২ শতাংশ উড়োজাহাজের জ্বালানি তেল কিনতে খরচ হয়। তাই বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য প্রতি লিটারে দশমিক ০১ ডলার পরিবর্তন হলে বার্ষিক প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ের হ্রাস বা বৃদ্ধি ঘটে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ৭৪ টাকা। আর চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৭৩ টাকা। বিপিসির নির্ধারিত দর অনুযায়ী, চট্টগ্রামের তুলনায় ঢাকার বিমানবন্দরে জেট ফুয়েলের দাম লিটারে ১ টাকা বেশি থাকে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জেট ফুয়েলের দাম প্রতি লিটার ৬৫ সেন্ট। আর চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৬৪ সেন্ট।

এদিকে, এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করেন, ভ্যাট কমিয়ে অথবা জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে বিমানকে লাভজনক করা যাবে না। বিমানকে গতিশীল করতে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কমিটিতে আনতে হবে আমূল পরিবর্তন। তার মতে, বিদেশি এয়ারলাইনসের সহায়তা নিয়েও বিমানকে লাভজনক করার চেষ্টা করা যায়। তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগে অনেক লোকসানি এয়ারলাইনস লাভজনক হয়েছে। প্রতিবেশী ভারতেই জেট এয়ারের ৪০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয় আবুধাবির রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইনস ইত্তেহাদ। এখন এই বিদেশি বিনিয়োগে জেট এয়ার লাভের দিকে এগোচ্ছে। তবে এ জন্য দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সদিচ্ছা।

বিমান সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ নাগরিক জন কেভিন স্টিল ২০১২ সালে বিমানে এমডি এবং সিইও হিসেবে যোগ দিয়ে একই কর্মপরিকল্পনা নিয়েছিলেন। সময়সূচি-ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) নিয়ে বিমানের বহর থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ডিসি-১০ বাদ দিয়ে যোগ করা হয় ছয়টি বোয়িং উড়োজাহাজ। ফলে অনেক বছর পর বিমানে ফ্লাইট শিডিউলে ফিরে আসে শৃঙ্খলা। ফ্লাইটের সময়ানুবর্তিতা ফিরে আসার পাশাপাশি লোকসানও কমতে থাকে। যাত্রী পরিষেবার মানও কিছুটা বাড়ে। কিন্তু স্থাস্থ্যগত কারণে বছরখানেক পর কেভিন পদত্যাগ করলে আবারও হোঁচট খায় এয়ারলাইনসটি। বিমান কর্তৃপক্ষ কেভিনের পথই অনুসরণ করতেই লোকসানি দিল্লি, হংকং ও মাসকাট ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দারিদ্র্যের দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রায়ই আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। সে দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ২৯০ ডলার। তেমন সম্পদও নেই দেশটির। তবে তাদের অহঙ্কারের জন্য রয়েছে অন্তত একটি সংস্থা-ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস। আফ্রিকার আকাশ ছাড়িয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোয় সগৌরবে ওঠা-নামা করছে ইথিওপিয়ার পতাকাবাহী এই এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ। বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় এক হাজার ১৩১৪ ডলার। গর্ব করার মতো এ দেশেরও অনেক কিছু আছে। তবে যে নামটি হতে পারত আকাশে মর্যাদার প্রতীক, সেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস নিয়ে বরং বিব্রত হতে হয় দেশের মানুষকে। সেবার মান নিয়ে বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ বাংলাদেশ বিমান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ রকম অবস্থায় ঘুরে দাঁড়াতে হলে দরকার সার্বিক সংস্কার। শুধু ভ্যাট কমিয়ে বিমানকে লাভজনক ও মযাদার আসনে বসানো যাবে না।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ৪ মার্চ সহকারী সচিব আব্দুর রশিদ স্বাক্ষরিত চিঠি পাঠানোর পর সম্প্রতি আবারও একই বিষয়ে এনবিআরে চিঠি পাঠিয়েছে বিমান মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, বিমানের জ্বালানি তেলের ওপর ভ্যাট মওকুফ চেয়ে বিমান মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ
X