‘সম্মানজনক’ বিদায়ের সুযোগ পাচ্ছেন অগ্রণী ব্যাংকের এমডি!

Send
গোলাম মওলা
প্রকাশিত : ১৪:৪৯, মার্চ ০২, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫৩, মার্চ ০২, ২০১৬

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবদুল হামিদরাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ আবদুল হামিদকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অপসারণের উদ্যোগ নিলেও তার সম্মানজনক বিদায়ের ব্যবস্থা করতে চাইছে সরকার। এরই অংশ হিসাবে এমডির বিরুদ্ধে ‘অনিয়ম’ এর অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ফাংশনাল অডিট ও অডিটের নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দিতে আগামী দুই মাস সময় বেঁধে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩ মার্চের মধ্যে সৈয়দ আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর চিঠি দিয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পাঠানো চিঠিতে তার বিরুদ্ধে ঋণ অনিয়মসহ ১০ ধরনের অপরাধের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিবিধান ও অগ্রণী ব্যাংকের পর্ষদের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে আমানতকারীদের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়ার জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ এর ৪৬ ধারার আওতায় আপনার বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়েছে চিঠিতে।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারায় আইন লঙ্ঘন ও আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক সৈয়দ আবদুল হামিদকে অপসারণ করতে পারে। তবে সরকার চাইলে তার ‘সম্মানজনক’ বিদায় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশ অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ব বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে অপসারণ না করে বরং তাকে সম্মানজনক বিদায়ের সুযোগ করে দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই সময় শেখ আবদুল হাই বাচ্চু বেসিক ব্যাংক থেকে পদত্যাগ করেন। তবে ঋণ অনিয়ম ও আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার কথা বলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বেসিক ব্যাংকের এমডি কাজী ফখরুলকে অপসারণ করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলমের কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাঠানো এক চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, সৈয়দ আবদুল হামিদের জ্ঞাতসারে ও তার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে ব্যাংকের আমানতকারীদের ৩০০ কোটি টাকা ঝুঁকিগ্রস্ত। এর দায়ভার এমডির ওপর বর্তায়।

প্রসঙ্গত, আগামী ১১ জুলাই অগ্রণী ব্যাংকের এমডি হিসেবে সৈয়দ আবদুল হামিদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।

এর আগে ১১ ফেব্রুারি অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবদুল হামিদ ও উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান খানের বিরুদ্ধে ৪০০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। চিঠিতে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে ফাংশনাল অডিট ফার্ম নিয়োগ এবং এ-সংক্রান্ত দুটি ফার্মেরও নাম সুপারিশ করা হয়েছে। ফার্ম দুটি হচ্ছে ‘এসএফ আহমেদ’ ও ‘এমএবিএএস অ্যান্ড জে পার্টনার্স’।

এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, ফাংশনাল যে কোনও অডিট ফার্ম দিয়ে অডিট করানো যায়। রেগুলেটর হিসাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও অডিট করতে পারে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্যই অডিট জরুরি।’

এর আগে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মিজানুর রহমান খানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রাজধানীর মতিঝিলে মুন বাংলাদেশের ভবন নির্মাণের নামে ১১৫ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতিতে সহযোগিতার অভিযোগে এই নির্দেশ দেওয়া হয়। ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা থেকে দেওয়া এ ঋণের পুরোটাই এখন খেলাপি। বঙ্গভবনের পাশে গড়ে উঠা ২৯তলার সানমুন টাওয়ার নির্মাণে নিয়ম না মানার অভিযোগে ইতোমধ্যে ওপর থেকে সাতটি তলা ভেঙে ফেলেছে রাজউক।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি ছাড়াই গত বছর অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ আবদুল হামিদের চাকরির মেয়াদ এক বছর বাড়ায় অর্থ মন্ত্রণালয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের বাণিজ্যিক অডিট শাখার উপ-সচিব নিয়াজ রহমান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, অগ্রণী ব্যাংকে ৫ জুন ২০১০ থেকে ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এই সময়ে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ সংযুক্ত কার্যপরিধি অনুযায়ী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অডিট কমিটির তত্ত্বাবধানে একটি ফাংশন্যাল অডিট চালানো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ফাংশনাল অডিট কার্যক্রমে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টস ফার্মকে সার্বিক সহযোগিতা এবং এর ব্যয়ভার অগ্রণী ব্যাংকে বহনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো।

চিঠিতে ফাংশনাল অডিট কার্যক্রমের বিষয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও ব্যাংকের আইনের বিধানসমূহকে পাশ কাটিয়ে পরিচালনা পর্ষদের কাছে অসত্য তথ্য দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৫ জুন ২০১০ থেকে ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ পর্যন্ত সময়ে অনিয়মিতভাবে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন বিতরণের অনুসন্ধান এবং এর জন্য প্রকৃতভাবে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখবে অডিট ফার্ম।

এ ছাড়া বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ৪টি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তানাকা গ্রুপ, মেসার্স জজ ভুঁঞা গ্রুপ, মেসার্স বিটিএল ও মুন গ্রুপ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৪০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন এবং বিতরণের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধান এবং এর জন্য ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখবে।

এছাড়া ঋণের বিপরীতে অর্থায়নকৃত প্রকল্পের বাস্তব প্রজেক্ট ভ্যালুয়েশন, ঋণ-ইক্যুইটি অনুপাত এবং প্রকল্পের অবস্থান ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঋণসমূহের বিপরীতে বন্ধকীকৃত সহায়ক জামানত ও সম্পত্তির মূল্যায়নের সঠিকতা ও বন্ধকী সম্পত্তির দলিলপত্র যাচাই করবে।

/এফএস/টিএন/

লাইভ

টপ