নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের পরিকল্পনাকে সামনে রেখে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য বড় আকারের বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি হতে পারে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাজেট বৃদ্ধির একটি হতে যাচ্ছে।
তবে ব্যয় বাড়লেও রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি সেই হারে না হওয়ায় বাজেট ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। ফলে আগামী অর্থবছরে সরকারকে দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হতে পারে। অর্থ বিভাগ ও বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন আভাস পাওয়া গেছে।
প্রায় দুই দশক পর সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। নতুন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি করার পরিকল্পনা করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
নতুন বাজেটের কাঠামো নির্ধারণে আর্থিক, মুদ্রা ও বিনিময় হার–সংক্রান্ত সমন্বয় কাউন্সিলের বৈঠক ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব লক্ষ্য, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং বাজেট ঘাটতির সম্ভাব্য সীমা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বড় ঘাটতির দিকে বাজেট
চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য প্রায় এক লাখ কোটি টাকা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। মূলত ভ্যাট আদায় বাড়ানোর মাধ্যমে এই রাজস্ব বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
তবুও রাজস্ব আয় বাড়লেও ব্যয়ের চাপের কারণে বাজেট ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছিল ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
আগামী অর্থবছরে এই ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিমাণের হিসেবে বাজেট ঘাটতি প্রায় পৌনে তিন লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
আট মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই–ফেব্রুয়ারি) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক–কর আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। তবে আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। ফলে এই সময়েই রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।
এনবিআরের হালনাগাদ তথ্য বলছে, অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে রয়েছে সংস্থাটি। প্রতিবছরই শুল্ক ও কর আদায়ের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতির মুখে পড়তে হয় এনবিআরকে, চলতি অর্থবছরেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এতে সরকারের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারি ব্যয় ক্রমেই বাড়তে থাকলেও সেই তুলনায় রাজস্ব আদায়ের গতি বাড়ছে না। অথচ বাজেট বাস্তবায়ন এবং সরকারি ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আয়ের বিকল্প কার্যত নেই। ফলে এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এখন সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে মোট ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রথম আট মাসের আদায়ের চিত্র বিবেচনায় নিলে লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই পরিস্থিতিতে অবশিষ্ট চার মাসে লক্ষ্য পূরণ করতে হলে এনবিআরকে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা বাস্তবতায় অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কার, করের আওতা বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে।
ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়বে
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ব্যাপক ঋণ নিতে হবে। চলতি অর্থবছরে দেশি উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
দেশি ঋণের বড় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে, যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
আগামী অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
অপরদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চলমান ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ গত ডিসেম্বর পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আগামী সপ্তাহে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নেবে। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ আইএমএফের কাছ থেকে প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের অনুমোদন চাইবে। পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রায় ২০০ কোটি ডলার ঋণের আবেদনও করা হতে পারে।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির ব্যয়
নতুন সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের বেশ কয়েকটি বড় কর্মসূচি ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, কৃষক কার্ড, কৃষিঋণের সুদ মওকুফ, খাল পুনঃখনন এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য প্রথম বছরেই প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় অর্থ বিভাগকে জানিয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আংশিক বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। আগামী অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামোর একটি অংশ বাস্তবায়নে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার চিন্তা করছে অর্থ বিভাগ।
ভর্তুকি ও সুদ ব্যয়ের চাপ
সরকারের ব্যয়ের বড় অংশই এখন ভর্তুকি ও ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে সুদ পরিশোধের জন্য প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, যা আগামী অর্থবছরে আরও বাড়তে পারে।
অপরদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপও বাড়ছে। অর্থমন্ত্রী ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অতিরিক্ত প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে।
উন্নয়ন ব্যয়ও বাড়বে
চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ছিল প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এটি বাড়িয়ে আড়াই লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি করা হতে পারে। এতে উন্নয়ন ব্যয়ে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রয়োজন হবে।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নতুন করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বা অকার্যকর প্রকল্প বাতিল করার কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে একটি কঠিন সময়ের মধ্যেই বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে।
গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, আগের সরকারের তৈরি অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে নতুন সরকারকে বাজেট করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অনিশ্চয়তা।
তিনি বলেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান বাস্তবতায় ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে বেসরকারি খাতকে সক্রিয় করতে এবং বিনিয়োগ বাড়াতে বাজেটে সুস্পষ্ট নীতিগত পদক্ষেপ থাকতে হবে।
সামনে কঠিন সমীকরণ
অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী বাজেট হবে এক ধরনের ‘সংকটকালীন বাজেট’। একদিকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—এই তিনটি বিষয়ই বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফলে ব্যয় বাড়ানো ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে সরকারকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, কর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, কর ফাঁকি কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি না করতে পারলে বড় বাজেটের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।









