বিশ্ববাজারে কমলেও দেশে চালের দাম বাড়ছে কেন 

শফিকুল ইসলাম  
২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০০আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০০

বিশ্ববাজারে চালের দাম গত এক বছরে প্রায় ১৯ থেকে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত কমলেও দেশের বাজারে চিত্র উল্টো। বাংলাদেশে এই প্রধান খাদ্যপণ্যের দাম উল্টো ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। আমদানিতে শুল্কছাড় এবং বিশ্ববাজারে দরপতনের সুফল সাধারণ ভোক্তারা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীরা শুরুতে জ্বালানি তেলের সংকটকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করালেও এখন বৃষ্টির দোহাই দিচ্ছেন। তবে সাধারণ ক্রেতা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এবং বাজার তদারকির অভাবেই চালের দাম চড়া। 

বিশ্ববাজার বনাম দেশীয় বাজার: এক বছরের ব্যবধান 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা বিষয়ক টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ৫ শতাংশ ভাঙা সেদ্ধ চালের প্রতি টনের দাম ছিল ৫২৯ ডলার, যা গত ১৯ এপ্রিল কমে দাঁড়িয়েছে ৪৩৩ ডলারে। অর্থাৎ দাম কমেছে ১৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। একইভাবে ১৫ শতাংশ আধাসিদ্ধ চালের দাম ৫২০ ডলার থেকে নেমে ৪২৩ ডলারে এসেছে। এক্ষেত্রে দাম কমেছে ১৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। 

অপরদিকে দেশীয় বাজারে এক বছর আগে প্রতি কেজি স্বর্ণা চালের দাম ছিল ৫২-৫৭ টাকা, যা বর্তমানে ৫৫-৬০ টাকা। অর্থাৎ দেশে দাম বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। মাঝারি মানের পাইজাম চালের দামও এক বছরে প্রায় ১ শতাংশ বেড়েছে। 

দাম বৃদ্ধির ৪ মূল কারণ  

সংশ্লিষ্টরা চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে মূলত চারটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন— 

১. দুর্বল বাজার মনিটরিং: বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) মতে, সঠিক তদারকির অভাবে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ পাচ্ছেন। 

২. সিন্ডিকেটের প্রভাব: উৎপাদন ও আমদানিতে ঘাটতি না থাকলেও শক্তিশালী সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে বলে সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ। 

৩. উচ্চ উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়: কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, সার ও উপকরণের চড়া দাম এবং জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। 

৪. ডলারের বিনিময় হার: আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও স্থানীয় মুদ্রায় ডলারের উচ্চ বিনিময় হারের কারণে আমদানির সুফল মিলছে না। 

বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা সংস্থার অভিমত 

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে দেশে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে চালের মতো নিত্যপণ্যের দামের ওপর চাপ বাড়ছে। সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সেই গতি খুব ধীর। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমলেও খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশে রয়ে গেছে। 

সিপিডি মনে করে, বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে না পারলে এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে আন্তর্জাতিক বাজারের সুফল স্থানীয় ভোক্তারা পাবেন না। এই কারণে চালসহ নিত্যপণ্যের বাজারে নজরদারি জোরদার করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছে সংগঠনটি। 

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি এক সভায় জানিয়েছেন, সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যদিও তিনি দাবি করেছেন বাজারে কোনও পণ্যের সংকট নেই, তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা চাপ তৈরি হতে পারে। 

ব্যবসায়ীদের দাবি ও পাল্টা দাবি 

বাংলাদেশ অটো রাইস অ্যান্ড হাসকিং মিল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী বলেন, “মিলার পর্যায়ে সিন্ডিকেট হয় না; চালের দাম বাড়ে পাইকারি ও খুচরা বাজার পর্যায়ে। সেখানে সরকারের কঠোর নজরদারি দরকার।” 

একই সুরে কথা বলেছেন বাবুবাজার-বাদামতলী চাল আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নিজাম উদ্দিন। তিনি জানান, আড়তদাররা মূলত কমিশন ভিত্তিতে চাল বিক্রি করেন, তাই কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোয় তাদের কোনও স্বার্থ নেই। ফলে সিন্ডিকেট বা মনোপলির সঙ্গে এই বাজার সম্পৃক্ত নয় বলেও দাবি করেন তিনি। 

সরকারের কঠোর অবস্থানের হুঁশিয়ারি 

চালের বাজার সম্পর্কে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আমদানিনির্ভর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশের বাজারে পড়ে। তবে দাম কমলে দেশের বাজারে তেমনভাবে প্রতিফলিত হয় না। স্থানীয় উৎপাদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের চাহিদা অনুযায়ী চালের উৎপাদন স্বাভাবিক। 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অসাধু ব্যবসায়ীদের রুখতে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। মজুতদারির মাধ্যমে যারা বাজার অস্থিতিশীল করছে, তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা নিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। 

উল্লেখ্য, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৪ কোটি ১৫ লাখ টনের বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে, যেখানে বার্ষিক চাহিদা ৩ কোটি ৮০ লাখ থেকে ৪ কোটি ২৪ লাখ টনের মধ্যে। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৪ কোটি ৬ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চাল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষকে চড়া দামে চাল কিনতে হচ্ছে।  

/এসটি/ 
সম্পর্কিত
বোরোর ভরা মৌসুমেও হিলিতে চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী
নওগাঁর ‘জিরা ধান’ ঢাকায় গিয়ে যেভাবে হচ্ছে ‘মিনিকেট’ 
ঈদ ঘিরে মসলার দামে অস্থিরতা, বেড়েছে নিত্যপণ্যেরও 
সর্বশেষ খবর
নকআউট মিশনে অপরিবর্তিত একাদশ নিয়েই নামছে ব্রাজিল
নকআউট মিশনে অপরিবর্তিত একাদশ নিয়েই নামছে ব্রাজিল
ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতভেদ, চীন সফরে যাচ্ছেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতভেদ, চীন সফরে যাচ্ছেন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী
চট্টগ্রাম-৪ আসনে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা নিয়ে আপিলের রায় মঙ্গলবার
চট্টগ্রাম-৪ আসনে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা নিয়ে আপিলের রায় মঙ্গলবার
কালকের ঘটনায় আবার রণক্ষেত্র ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পুলিশসহ আহত ২০
কালকের ঘটনায় আবার রণক্ষেত্র ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পুলিশসহ আহত ২০
সর্বাধিক পঠিত
একসঙ্গে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ শিক্ষক চাকরিচ্যুত
একসঙ্গে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ শিক্ষক চাকরিচ্যুত
দেশে ভূমিকম্প অনুভূত
দেশে ভূমিকম্প অনুভূত
পে স্কেল কার্যকরের কাউন্টডাউন, অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে কাদের
পে স্কেল কার্যকরের কাউন্টডাউন, অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে কাদের
ভারতীয় ভিসা আবেদন জমার শুরুর দিনে দীর্ঘ লাইন
ভারতীয় ভিসা আবেদন জমার শুরুর দিনে দীর্ঘ লাইন
যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি হারালেন সহকারী অধ্যাপক ফাতেমা
যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি হারালেন সহকারী অধ্যাপক ফাতেমা