কর্মসংস্থান রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল আনলো বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
০৪ জুন ২০২৬, ২২:৫১ আপডেট : ০৪ জুন ২০২৬, ২২:৫১

কার্যকরী মূলধনের সংকটে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, দেশের বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র কার্যকরী মূলধনের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বা সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে স্বল্পসুদে অর্থায়ন দিয়ে পুনরুজ্জীবিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত ‘ক্লোজড ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সার্ভিস সেক্টর ফ্যাসিলিটেশন রিফাইন্যান্স স্কিম’-এর আওতায় তিন বছর মেয়াদি একটি ঘূর্ণায়মান (রিভলভিং) তহবিল গঠন করা হবে। তহবিলের আকার হবে ২০ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ ব্যবহার করে বন্ধ বা অর্ধ-সচল শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকরী মূলধন সরবরাহ করা হবে, যাতে তারা আবার উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে পারে।

কেন এই তহবিল?

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কার্যকরী মূলধনের সংকট বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নগদ অর্থের ঘাটতির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো শ্রমিকদের বেতন দিতে পারে না, কাঁচামাল কিনতে পারে না এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় বিল পরিশোধে ব্যর্থ হয়। এর ফলে উৎপাদন কমে যায়, কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়ে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, অনেক ক্ষেত্রে কারখানার যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন সক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকলেও শুধুমাত্র অর্থের অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে আছে। ফলে একটি সাময়িক তারল্য সংকট দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও কর্মসংস্থান সংকটে পরিণত হচ্ছে। নতুন এই তহবিল সেই সংকট নিরসনের একটি লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ।

কারা পাবেন এই সুবিধা?

এই স্কিমের আওতায় সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কার্যকরী মূলধনের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারা প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় শিল্পনীতির আওতাভুক্ত সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ সুবিধা পাবে।

তবে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ডিমড এক্সপোর্টার এবং বন্ধ কারখানা অধিগ্রহণ বা লিজ নিয়ে পুনরায় চালু করতে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথও শক্তিশালী করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

ঋণের শর্ত কী?

এই তহবিল থেকে দেওয়া ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে ৪ শতাংশ হারে সুদ পরিশোধ করবে।

একজন ঋণগ্রহীতা বা একটি গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে। ঋণের মেয়াদ হবে এক বছর। তবে ব্যবসার অগ্রগতি সন্তোষজনক হলে তা নবায়নের সুযোগ থাকবে। এছাড়া ছয় মাসের গ্রেস পিরিয়ড রাখা হয়েছে, ফলে ঋণ নেওয়ার পরপরই কিস্তি পরিশোধের চাপ তৈরি হবে না।

কোথায় ব্যয় করা যাবে ঋণের অর্থ?

বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, এই অর্থ শুধুমাত্র উৎপাদন ও ব্যবসা পুনরুদ্ধারের কাজে ব্যবহার করা যাবে।

ঋণের অর্থ দিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের সর্বোচ্চ চার মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ, কাঁচামাল ক্রয়, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও অন্যান্য ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন এবং উৎপাদনসংক্রান্ত অন্যান্য ব্যয় মেটানো যাবে।

তবে এই অর্থ কোনো বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ, পুনঃতফসিল বা সমন্বয়ের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। একই সঙ্গে ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান বা সিআইবি তালিকাভুক্ত গ্রাহকরা এই সুবিধার বাইরে থাকবে।

কর্মসংস্থান রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব

স্কিমটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শ্রমিকদের বেতন প্রদানে অগ্রাধিকার। ঋণের অর্থ থেকে সর্বোচ্চ চার মাসের বেতন সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে। নগদ অর্থ প্রদানের সুযোগ থাকবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারণা, এর ফলে বন্ধ বা সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা তাৎক্ষণিকভাবে উপকৃত হবে এবং কর্মসংস্থান রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

অপব্যবহার ঠেকাতে কঠোর নজরদারি

অতীতের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই স্কিমে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

ঋণ অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা, বন্ধ হওয়ার কারণ এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। এ ছাড়া এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ বা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতার প্রত্যয়ন নিতে হবে।

ঋণের অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এসক্রো বা বিশেষ রাজস্ব হিসাবের মাধ্যমে অর্থ প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করা হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত বিক্রয় প্রতিবেদন জমা দিতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজন হলে সরাসরি পরিদর্শন করতে পারবে। অর্থের অপব্যবহার প্রমাণিত হলে জরিমানাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের শিল্প খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন বিনিয়োগের অভাব নয়, বরং বিদ্যমান সক্ষমতার অপূর্ণ ব্যবহার। অনেক কারখানা বন্ধ বা সীমিত উৎপাদনে রয়েছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপনের চেয়ে বিদ্যমান শিল্পকে সচল করা দ্রুত ফল দিতে পারে।

সফল বাস্তবায়ন হলে এই তহবিলের মাধ্যমে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু হবে, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, রফতানি আয় বাড়বে এবং হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হবে। একই সঙ্গে সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে সক্ষম কিন্তু সাময়িক তারল্য সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিকভাবে নির্বাচন করতে না পারলে এই উদ্যোগের সুফল সীমিত হতে পারে। তাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করাই হবে এই কর্মসূচির সাফল্যের প্রধান শর্ত।

সব মিলিয়ে, ২০ হাজার কোটি টাকার এই পুনঃঅর্থায়ন তহবিলকে শিল্প পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান রক্ষা এবং রপ্তানি খাতকে চাঙা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে।

/জিএম/এম/
সম্পর্কিত
রিজার্ভ চুরি: ৯৯ বারের মতো পেছালো তদন্ত প্রতিবেদন
বন্ধ কারখানা চালুতে ১৮ দিনে ঋণ ছাড় ৪৫০ কোটি টাকা
‘উদ্যোগ’ কর্মসূচি থেকে ঋণ পেতে ৮ জেলায় ১৮ হাজারের বেশি আবেদন
সর্বশেষ খবর
ঘুষ দাবির অভিযোগে থানা থেকে এএসআই প্রত্যাহার
ঘুষ দাবির অভিযোগে থানা থেকে এএসআই প্রত্যাহার
আওয়ামী লীগকে ‘পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চোরের দল’ বললেন স্পিকার
আওয়ামী লীগকে ‘পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চোরের দল’ বললেন স্পিকার
সু চিকে যে দুটি বই পাঠালেন রাজা তৃতীয় চার্লস
সু চিকে যে দুটি বই পাঠালেন রাজা তৃতীয় চার্লস
দিলীপ আগরওয়ালা ১ দিনের রিমান্ডে
দিলীপ আগরওয়ালা ১ দিনের রিমান্ডে
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ