করজাল সম্প্রসারণ এবং আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যাংক হিসাব খোলা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শুধু নতুন হিসাব খোলাই নয়, বিদ্যমান ব্যাংক হিসাব সচল রাখতেও টিআইএন থাকা বাধ্যতামূলক করা হতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষার্থী, সরকারি ভাতাভোগী এবং গেজেটের মাধ্যমে কর অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য এ বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ সংক্রান্ত প্রস্তাব উপস্থাপন করতে পারেন।
বর্তমানে দেশে বিপুলসংখ্যক ব্যাংক হিসাবধারীর টিআইএন নেই। যদিও টিআইএন না থাকলে ব্যাংক আমানতের সুদের ওপর তুলনামূলক বেশি হারে উৎসে কর কাটা হয়, তবে এতদিন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক ছিল না।
কর প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে টিআইএন যুক্ত করা গেলে আর্থিক লেনদেনের ওপর নজরদারি বাড়বে এবং কর ফাঁকির সুযোগ কমবে। একই সঙ্গে করদাতার সংখ্যা বাড়ানোও সহজ হবে।
এই লক্ষ্যে এনবিআর ব্যাংক খাতের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত (ইন্টিগ্রেটেড) হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ইউটিলিটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার তথ্যভান্ডারের সঙ্গে অনলাইনভিত্তিক সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
করজাল সম্প্রসারণে আরও কয়েকটি পদক্ষেপও বিবেচনা করছে এনবিআর। এর মধ্যে রয়েছে ১৫০ সিসি বা তার বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা, উৎসে কর কর্তনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উইথহোল্ডার্স রেজিস্ট্রেশন নম্বর (উইন) চালু করা এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ কর আরোপ।
তবে ব্যাংকার ও কর বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এই উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “অতীতে ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার পর গ্রাহকসংখ্যা কমে গিয়েছিল। একই ধরনের বাধ্যবাধকতা ব্যাংক হিসাবের ক্ষেত্রেও আরোপ করা হলে ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন কমে যেতে পারে। তার মতে, মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং খাত নিয়ে যে আস্থাহীনতা ও উদ্বেগ রয়েছে, তা দূর না করে নতুন বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।”
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৭ কোটি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। তবে একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একাধিক হিসাব থাকায় প্রকৃত হিসাবধারীর সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন।
কর বিশেষজ্ঞ এবং এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, নগদনির্ভর অর্থনীতিতে ই-টিআইএন বাধ্যতামূলক করা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে যেতে পারেন, নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে এবং ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি ও তারল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, “কঠোর বাধ্যবাধকতা আরোপের পরিবর্তে সরকারকে ধাপে ধাপে নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, কর রিটার্নে ডিজিটালভাবে ব্যাংক হিসাবের তথ্য প্রদর্শনের সুযোগ সৃষ্টি এবং কর ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদারের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।”
স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, জাতীয় সম্পদসংক্রান্ত তথ্যভান্ডারকে কর রিটার্ন ব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি একীভূত করা গেলে কর ফাঁকি রোধ এবং করদাতার পরিধি সম্প্রসারণ আরও সহজ হবে।








