বড় ব্যবসায়ী হলেই সিআইপি নয়, কোন যোগ্যতায়  মাপা হবে এবার? 

গোলাম মওলা
৩০ আগস্ট ২০২৬, ২২:০০আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ২২:০০

দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও শুধু বড় ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি পরিচয় দিয়ে আর বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা সিআইপি মর্যাদা পাওয়া যাবে না। এখন থেকে সিআইপি (শিল্প) হতে হলে একজন উদ্যোক্তাকে তার ব্যবসার প্রকৃত উৎপাদন, বিনিয়োগ, মুনাফা, কর ও ভ্যাট পরিশোধ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার, পরিবেশ সুরক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনসহ অর্থনীতিতে তার বাস্তব অবদানের প্রমাণ দিতে হবে।

এ জন্য সিআইপি নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ১০০ নম্বরের স্কোরভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার। পাশাপাশি শিল্প খাতে সিআইপির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে বছরে সর্বোচ্চ ৫৫ জনে নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে এবার সিআইপির মর্যাদা পাওয়া আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক হবে।

শিল্প মন্ত্রণালয় গত ২৩ আগস্ট ‘বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (শিল্প) নির্বাচন নীতিমালা, ২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। এর মাধ্যমে ২০০৮ সালের নীতিমালা বাতিল করে নতুন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

নতুন নীতিমালার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো— ব্যবসার আকার বা প্রতিষ্ঠানের পরিচিতির পরিবর্তে এখন পরিমাপযোগ্য ও যাচাইযোগ্য অর্থনৈতিক অবদানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। অর্থাৎ কার কত বড় প্রতিষ্ঠান, কত বেশি সম্পদ বা কত বড় ব্যবসায়িক পরিচিতি রয়েছে— তার চেয়ে তিনি বাস্তবে কত উৎপাদন করছেন, কত বিনিয়োগ করছেন, কত কর দিচ্ছেন এবং কত মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করছেন, সেটিই হবে সিআইপি হওয়ার মূল বিবেচনা।

২০২৪ সালের সিআইপি কার্যক্রম বাতিল

এরই মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা সিআইপি প্রদান কার্যক্রম বাতিল করেছে। গত ৫ মে এ-সংক্রান্ত গেজেট জারি করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ২০২৩ সালের জন্য প্রস্তাবিত বা ইস্যু করা সিআইপি কার্ড প্রদান-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম বাতিল করেছিল সরকার। ফলে ২০২৩ সালের পর থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নতুন করে সিআইপি মর্যাদা দেওয়ার কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে।

সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২৫ জুন ২০২১ সালে অর্থনীতিতে অবদানের জন্য ১৮০ জন ব্যবসায়ীকে সিআইপি মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে রফতানি খাতে ১৪০ জন এবং বাণিজ্য খাতে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) পরিচালকদের পদাধিকারবলে ৪০ জনকে সিআইপি করা হয়।

অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ধরে সিআইপি নির্বাচনের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনও কার্যকর কাঠামো ছিল না। একদিকে দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসার পরিধি বড় হয়েছে, উদ্যোক্তার সংখ্যা বেড়েছে, নতুন নতুন শিল্প ও সেবা খাত তৈরি হয়েছে; অন্যদিকে সিআইপি নির্বাচন চলছিল পুরোনো কাঠামোর ওপর নির্ভর করে।

ব্যবসায়ী মহলের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, অর্থনীতিতে প্রকৃত অবদান রাখা উদ্যোক্তাদের মূল্যায়নের জন্য একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও পরিমাপযোগ্য ব্যবস্থা দরকার। নতুন শিল্প সিআইপি নীতিমালায় সেই দাবির একটি বড় অংশ প্রতিফলিত হয়েছে।

ব্যবসার আকার নয়, এবার গুরুত্ব বাস্তব অবদানে

নতুন নীতিমালায় সিআইপি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় ও মাঝারি শিল্পের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রকৃত উৎপাদনকে। এ খাতে উৎপাদনের জন্য রয়েছে ২০ নম্বর।

পরিশোধিত মূলধন ও দীর্ঘমেয়াদি মোট বিনিয়োগে ১০, কর ও ভ্যাট পরিশোধে ১৫, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ১০, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে ১০ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ১০ নম্বর রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা, রফতানি আয়, স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং অন্যান্য অবদানের জন্যও নম্বর থাকবে।

অর্থাৎ, একজন উদ্যোক্তা শুধু বড় কারখানার মালিক হলেই সুবিধা পাবেন না। কারখানায় কত উৎপাদন হচ্ছে, কত বিনিয়োগ হয়েছে, সরকারকে কত কর ও ভ্যাট দেওয়া হয়েছে এবং কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে তার অবস্থান নির্ধারিত হবে।

এতে সিআইপি মর্যাদা পাওয়ার ক্ষেত্রে ‘পরিচিতি’ বা ‘ব্যবসার আকারের’ চেয়ে কাজের ফলাফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ছোট উদ্যোক্তাদের জন্যও খুলছে সুযোগ

নতুন নীতিমালার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা মূল্যায়ন কাঠামো রাখা হয়েছে।

ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রে প্রকৃত উৎপাদনের জন্য ২০ নম্বরের পাশাপাশি স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহারের জন্যও ২০ নম্বর রাখা হয়েছে। কর ও ভ্যাট পরিশোধে ১০, কর্মসংস্থানে ১০, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ১০ এবং পরিশোধিত মূলধন ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ৫ নম্বর রয়েছে।

ফলে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক আকারে প্রতিযোগিতা করতে না পারলেও ছোট উদ্যোক্তারা স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কর প্রদান ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে সিআইপি হওয়ার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আসার সুযোগ পাবেন।

বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ এত দিন বড় ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় ছোট উদ্যোক্তাদের জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।

সেবা খাতেও বদলাচ্ছে মূল্যায়ন

সেবা খাতের জন্যও আলাদা স্কোরিং ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ খাতে মোট বিনিয়োগে সর্বোচ্চ ২৫ নম্বর, কর ও ভ্যাট পরিশোধে ১৫, টার্নওভারে ১০ এবং আয়কর-পূর্ববর্তী মুনাফায় ১০ নম্বর রয়েছে।

এ ছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মেধাস্বত্ব গ্রহণ ও সংরক্ষণ, প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহার, কর্মসংস্থান, রফতানি আয় এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ওপরও নম্বর দেওয়া হবে। এর ফলে শিল্প বলতে শুধু কারখানা বা পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নয়, অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও মূল্যায়নের আওতায় আনা হচ্ছে।

বছরে সিআইপি হবেন মাত্র ৫৫ জন

নতুন নীতিমালায় শিল্প খাতে সিআইপির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে। আগে শিল্প খাতে সিআইপির সংখ্যা ১৮৪ জন পর্যন্ত হয়েছিল। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৪০। নতুন নীতিমালায় বছরে সর্বোচ্চ ৫৫ জনকে সিআইপি (শিল্প) নির্বাচনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

এর মধ্যে বৃহৎ শিল্পে উৎপাদন খাতে ১৫ ও সেবা খাতে ৫ জন, মাঝারি শিল্পে উৎপাদনে ১০ ও সেবায় ৩ জন এবং ক্ষুদ্র শিল্পে উৎপাদনে ৪ ও সেবায় ২ জন সিআইপি হবেন। এ ছাড়া উদীয়মান প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে ৫, হাইটেক শিল্পে ৩, লজিস্টিকস খাতে ২, পর্যটন শিল্পে ২, অতিক্ষুদ্র শিল্পে ২ এবং কুটির শিল্পে ২ জনকে সিআইপি করা হবে। ফলে এবার সিআইপি নির্বাচনে যোগ্যতার পাশাপাশি কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে সর্বোচ্চ স্কোর অর্জন করতে হবে।

কর না দিলে সিআইপি নয়

নতুন ব্যবস্থায় কর ও রাজস্ব পরিশোধকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবেদনের আগের অর্থবছরে যথাযথভাবে শুল্ক, ভ্যাট বা আয়কর পরিশোধ না করলে কোনো উদ্যোক্তা সিআইপি হওয়ার যোগ্য হবেন না। ঋণখেলাপিরাও এই মর্যাদার জন্য আবেদন করতে পারবেন না।

এ ছাড়া বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের শিল্প বিরোধ, নির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধে সাজা, শেয়ার-সংক্রান্ত অনিয়মসহ বিভিন্ন কারণে আবেদন অযোগ্য হতে পারে।

কোনও প্রতিষ্ঠান নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা করতে ব্যর্থ হলে বা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হলেও সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা সিআইপির জন্য অযোগ্য হবেন। আবেদনপত্রে মিথ্যা বা অসত্য তথ্য দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পরবর্তী তিন বছর সিআইপি হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন না।

একবার সিআইপি নির্বাচিত হওয়ার পর পরবর্তী দুই বছর একই ব্যক্তি আবার সিআইপি হতে পারবেন না।

এ ছাড়া আবেদনের আগের পাঁচ বছরের মধ্যে কোনও শিল্পপ্রতিষ্ঠান রাজস্ব ফাঁকির কারণে সরকারের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ধরনের জরিমানা পেয়ে থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানের মালিক, উদ্যোক্তা পরিচালক বা চেয়ারম্যানও সিআইপি নির্বাচনের জন্য অযোগ্য হবেন।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  স্কোরভিত্তিক এবং বিভিন্ন সূচকের সমন্বয়ে সিআইপি নির্বাচন করা হচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।

তিনি বলেন, ‘শুধু একটি সূচক, বিশেষ করে রফতানির পরিমাণ দিয়ে একজন উদ্যোক্তার অবদান মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। কারণ একজন উদ্যোক্তা বেশি রফতানি করলেই যে তিনি বেশি ভালো করছেন, বিষয়টি সব সময় এমন নয়। কেউ লোকসান দিয়েও বেশি রফতানি করতে পারেন। আবার বিভিন্ন কারণেও কোনও প্রতিষ্ঠানের রফতানি সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। তাই একজন উদ্যোক্তার সামগ্রিক অবদান বিবেচনা করা জরুরি।’

নতুন নীতিমালায় শুধু উদ্যোক্তার দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

আবেদন জমা দেওয়ার পর প্রাথমিক বাছাই কমিটি একটি খসড়া তালিকা তৈরি করবে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা হবে।

অর্থাৎ একজন উদ্যোক্তা আবেদনে যে উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর পরিশোধ বা ঋণ পরিস্থিতির তথ্য দেবেন, সেগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।

এতে সিআইপি নির্বাচনে স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি তথ্য গোপন বা ভুল তথ্য দিয়ে সুবিধা নেওয়ার সুযোগও কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বছরে একবার আবেদন

নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি বছর ১৫ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিআইপি (শিল্প) হওয়ার আবেদন গ্রহণ করা হবে। এরপর শুরু হবে যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া।

প্রাথমিক বাছাই কমিটির পর চূড়ান্ত মূল্যায়ন কমিটি স্কোরের ভিত্তিতে যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচন করবে।

এখানে মূল বিষয় হবে—কে কত বেশি নম্বর পাচ্ছেন। ফলে শুধু নীতিমালার যোগ্যতা পূরণ করলেই সিআইপি হওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে না।

সিআইপি মর্যাদার সুবিধা কম নয়

সিআইপি মর্যাদা শুধু একটি সম্মাননা নয়, এর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সরকারি সুবিধাও যুক্ত রয়েছে। সিআইপি নির্বাচিত ব্যক্তি এক বছরের জন্য পরিচয়পত্র পান, যা সচিবালয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রবেশপত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। জাতীয় অনুষ্ঠান এবং সিটি করপোরেশনের নাগরিক সংবর্ধনায় আমন্ত্রণ পাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক কাজে আকাশ, রেল, সড়ক ও নৌপথে সরকারি পরিবহনে আসন সংরক্ষণে অগ্রাধিকার পাওয়া যায়।

বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে ভিসা পাওয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে চিঠি দেওয়ার সুবিধাও রয়েছে। সিআইপি এবং তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ক্ষেত্রে কেবিন পাওয়ার অগ্রাধিকার রয়েছে। বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ-২ ব্যবহারের সুবিধাও পাওয়া যায়। এ ছাড়া সরকার চাইলে শিল্পসংক্রান্ত নীতি নির্ধারণী কোনো কমিটিতেও সিআইপিকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।

তবে এসব সুবিধা স্থায়ী নয়। কোনও সিআইপি পরবর্তীতে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন বা নির্দিষ্ট ধরনের আর্থিক, আইনগত বা নিয়ন্ত্রক অনিয়মে জড়িয়েছেন বলে প্রমাণিত হলে তার মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাহার করা যেতে পারে।

বাণিজ্য ও রফতানি খাতের সিআইপি আলাদা

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিআইপি (শিল্প) ছাড়াও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দুটি শ্রেণিতে সিআইপি মর্যাদা দিয়ে থাকে। এগুলো হলো সিআইপি (রফতানি) ও সিআইপি (বাণিজ্য)। রফতানি ও বাণিজ্যসংক্রান্ত ২০২৩ সালের নীতিমালা অনুযায়ী ৩৫টি রফতানি খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকে সিআইপি (রফতানি) নির্বাচন করা হয়। সাধারণত রফতানি কর্মক্ষমতা, কর পরিশোধ এবং পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণের মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর বাইরে এফবিসিসিআইয়ের পদাধিকারী পরিচালকদের মধ্য থেকেও সিআইপি (বাণিজ্য) দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে শিল্প, রফতানি ও বাণিজ্য— এই তিন ধরনের সিআইপি ব্যবস্থাকে আলাদা কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালনা করা হচ্ছে।

দীর্ঘদিনের পুরোনো কাঠামো বদলের উদ্যোগ

দেশে উদ্যোক্তার সংখ্যা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। শিল্পকারখানা, রপ্তানি, সেবা, প্রযুক্তি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প—সব ক্ষেত্রেই নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। লাখ লাখ উদ্যোক্তা সরাসরি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, কর প্রদান এবং জাতীয় আয় বাড়াতে ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু এত দিন তাদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সময়োপযোগী ও সমন্বিত কাঠামোর ঘাটতি ছিল।

সর্বশেষ ২০২৩ সালে যে সিআইপি মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, সেটিও মূলত ২০১৩ সালের পুরোনো নির্দেশনার ভিত্তিতে। অথচ গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি, ব্যবসার ধরন, প্রযুক্তি, রফতানি বাজার এবং উদ্যোক্তা কাঠামোতে বড় পরিবর্তন এসেছে।

স্মার্ট বাংলাদেশ ও স্মার্ট অর্থনীতির কথা বলা হলেও অর্থনীতির চালিকাশক্তি উদ্যোক্তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়নের পদ্ধতি যদি পুরোনো থাকে, তাহলে সেখানে এক ধরনের অসামঞ্জস্য থেকেই যায়। নতুন নীতিমালায় সেই জায়গায় পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে কতটা মিল?

ব্যবসায়ী মহলের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই সিআইপি নির্বাচনে আধুনিক ও স্বচ্ছ নীতিমালার দাবি জানানো হচ্ছিল। বিশেষ করে যারা নিয়মিত বড় অঙ্কের কর দেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়নের দাবি ছিল। অনেক ব্যবসায়ীর মতে, শুধু একটি বছরের কর্মকাণ্ড দেখে সিআইপি নির্বাচন না করে ধারাবাহিক অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিশেষ করে টানা কয়েক বছর সরকারকে সর্বোচ্চ কর দেওয়া ব্যক্তি, নিয়মিত কর্মসংস্থান তৈরি করা উদ্যোক্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হলে সিআইপি মর্যাদা আরও অর্থবহ হবে।

তাদের প্রস্তাব ছিল, অন্তত তিন বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ভালো কর্মদক্ষতা দেখানো উদ্যোক্তাদের মূল্যায়নে রাখা এবং টানা তিন বছর সর্বোচ্চ করদাতাদেরও সিআইপি মর্যাদা দেওয়ার মতো ব্যবস্থা করা। নতুন নীতিমালায় কর, উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অন্যান্য সূচককে নম্বরের আওতায় আনা হলেও ধারাবাহিক কয়েক বছরের অবদানকে কীভাবে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া যায়, সেটি ভবিষ্যতে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

সিআইপি মর্যাদা এবার কতটা অর্থবহ হবে?

সিআইপি একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। ফলে এই স্বীকৃতি যত বেশি তথ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক হবে, এর মর্যাদাও তত বাড়বে। নতুন নীতিমালার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো—ব্যবসার আকারের পরিবর্তে অর্থনীতিতে বাস্তব অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া। এতে কর ফাঁকি দিয়ে বড় ব্যবসা দেখানো বা শুধু ব্যবসায়িক পরিচিতির কারণে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ কমবে।

একইসঙ্গে ছোট ও কুটির শিল্পকে আলাদা মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে। স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার, নতুন পণ্য তৈরি, গবেষণা ও পরিবেশ সুরক্ষার মতো বিষয় যুক্ত হওয়ায় সিআইপি নির্বাচনের ধারণাটিও শুধু ব্যবসা ও মুনাফার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।

তবে নতুন ব্যবস্থার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে তথ্য যাচাই ও মূল্যায়ন কতটা নিরপেক্ষভাবে করা হচ্ছে তার ওপর। ১০০ নম্বরের কাঠামো থাকলেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় না; নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

বিশেষ করে কর, উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মুনাফার তথ্য যাচাইয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের প্রভাবের বাইরে থেকে চূড়ান্ত নির্বাচন করা গেলে সিআইপি মর্যাদা আরও গ্রহণযোগ্যতা পাবে।

সব মিলিয়ে নতুন নীতিমালা সিআইপি নির্বাচনে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এখন আর শুধু বড় ব্যবসায়ী হওয়া যথেষ্ট নয়। কে কত উৎপাদন করছেন, কত বিনিয়োগ করছেন, কত কর দিচ্ছেন, কত মানুষের কর্মসংস্থান করছেন এবং দেশের অর্থনীতিতে কতটা বাস্তব অবদান রাখছেন—সিআইপি হওয়ার দৌড়ে শেষ পর্যন্ত সেটিই নির্ধারণ করবে কে এগিয়ে থাকবেন।

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড.  ফাহমিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নতুন সিআইপি (শিল্প) নির্বাচন নীতিমালা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। আগে বড় ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের আকার বেশি গুরুত্ব পেতো। এখন উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর ও ভ্যাট প্রদান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রফতানি, স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার, পরিবেশ রক্ষা এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনের মতো বিষয়ও বিবেচনা করা হবে। এতে অর্থনীতিতে যেসব উদ্যোক্তা বাস্তব অবদান রাখছেন, তাঁদের স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।’’

তিনি বলেন, ‘‘বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি মাঝারি, ক্ষুদ্র, মাইক্রো ও কুটিরশিল্প এবং প্রযুক্তি, লজিস্টিকস ও পর্যটন খাতকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এটি ভালো সিদ্ধান্ত। তবে দেখতে হবে, ছোট প্রতিষ্ঠান, নারী উদ্যোক্তা এবং ঢাকার বাইরের উদ্যোক্তারা যেন বাস্তবে পিছিয়ে না পড়েন।’’

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গেন্ডারিয়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নারীসহ তিনজন আহত
গেন্ডারিয়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নারীসহ তিনজন আহত
রংপুরে চার খুন: ‘মবের’ শঙ্কায় কারাগারেই আসামিদের ডোপ টেস্ট
রংপুরে চার খুন: ‘মবের’ শঙ্কায় কারাগারেই আসামিদের ডোপ টেস্ট
সংসদে চার স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন
সংসদে চার স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন
‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা’ জারি: কারা পাবেন, কারা পাবেন না
‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা’ জারি: কারা পাবেন, কারা পাবেন না
সর্বাধিক পঠিত
আজ স্বর্ণের দাম কত
আজ স্বর্ণের দাম কত
‘ছয় মাস চলে গেলো, আর কয় মাস লাগবে?’
‘ছয় মাস চলে গেলো, আর কয় মাস লাগবে?’
দেশে ফিরছেন মির্জা আব্বাস
দেশে ফিরছেন মির্জা আব্বাস
‘রাগে-অভিমানে’ ইনস্টাগ্রাম থেকে বাংলাদেশের সব ছবি মুছে ফেললেন কিউবা মিচেল
‘রাগে-অভিমানে’ ইনস্টাগ্রাম থেকে বাংলাদেশের সব ছবি মুছে ফেললেন কিউবা মিচেল
রান্নার সময় গরুর মাংস সবুজ হওয়ার কারণ জানা গেলো ল্যাব পরীক্ষায়
রান্নার সময় গরুর মাংস সবুজ হওয়ার কারণ জানা গেলো ল্যাব পরীক্ষায়