আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নতুন ঋণ পেতে সংস্থাটির সঙ্গে প্রস্তাব চূড়ান্ত করার আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী সপ্তাহ থেকে এ বিষয়ে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদল আলোচনা করবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঋণের বিষয়ে নীতিগতভাবে সমঝোতা হয়েছে— এখন বাকি বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করে চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
বাংলাদেশের জন্য এই ঋণ যেমন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সামলানো, বাজেটের অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা ধরে রাখার সুযোগ তৈরি করতে পারে, তেমনই ঋণের শর্ত বাস্তবায়নের ধরন নিয়ে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক খাতের সংস্কার অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে প্রয়োজনীয়। কিন্তু এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ব্যয় যদি শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে, তাহলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু আইএমএফের ঋণ পাওয়া নয়; বরং ঋণের অর্থ কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা এবং সংস্কারের বোঝা যাতে সাধারণ মানুষ ও উৎপাদন খাতের ওপর অসমভাবে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা।
দেশের অর্থনীতি এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতের সংকট, সীমিত রাজস্ব আয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বাড়ার ঝুঁকিও যুক্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আইএমএফের কর্মসূচি সচল রাখা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও শর্ত বাস্তবায়নে সরকারের দর-কষাকষি, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং বিকল্প অর্থায়নের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আগামী সপ্তাহেঋণ চূড়ান্ত করতে আলোচনা
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ব্যাংককে আইএমএফের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, ঋণ প্রস্তাবের বাকি বিষয়গুলো চূড়ান্ত করতে আগামী সপ্তাহ থেকে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদল আলোচনা করবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘‘নীতিগতভাবে সবকিছু ঠিক আছে। এখন কীভাবে চুক্তিটি চূড়ান্ত করা যায়, তা নিয়ে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদল বসবে।’’
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভার ফাঁকে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বাংলাদেশের ঋণ প্রস্তাবের চূড়ান্ত পর্যালোচনা নিয়ে আলোচনা হয়। অর্থমন্ত্রী জানান, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। আগামী বছরকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘উন্নয়ন সহযোগীরাও বিষয়টিকে একইভাবে দেখছে।’’
এদিকে, আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন অগ্রাধিকার নির্ধারণে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) সইয়ের প্রস্তাবও দিয়েছে বাংলাদেশ।
এই পরিস্থিতিতে আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি শুধু অর্থের সংস্থান নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও সংস্কার কার্যক্রমের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
ঋণ পেলে লাভ কী
আইএমএফের ঋণের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সুবিধা হলো বৈদেশিক অর্থায়নের নতুন উৎস পাওয়া। ঋণের অর্থ ছাড় হলে বৈদেশিক লেনদেনের চাপ সামলানো, জরুরি অর্থায়নের প্রয়োজন মেটানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে ঋণের পরিমাণ, অর্থ ছাড়ের সময়সূচি, ব্যবহারের শর্ত এবং দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতির ওপর।
দ্বিতীয়ত, আইএমএফের সঙ্গে কর্মসূচি সচল থাকলে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা যেতে পারে। এর ফলে অন্যান্য উৎস থেকে অর্থায়ন পাওয়ার পরিবেশ সহায়ক হতে পারে। যদিও শুধু আইএমএফের কর্মসূচি সচল থাকলেই অন্য সংস্থার অর্থায়ন নিশ্চিত হবে না।
তৃতীয়ত, ঋণের সঙ্গে যুক্ত সংস্কারগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়তে পারে। রাজস্ব আদায় বাড়লে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালনার নিজস্ব সক্ষমতা শক্তিশালী হবে। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে আমানতকারীদের আস্থা ফিরতে পারে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থাৎ, ঋণ বাংলাদেশের জন্য সাময়িক আর্থিক স্বস্তির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগও তৈরি করতে পারে। তবে ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হবে এবং সংস্কার বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তার ওপরই সুফল নির্ভর করবে।
ঋণের শর্ত নিয়ে কেন উদ্বেগ
আইএমএফের কর্মসূচির সঙ্গে সাধারণত রাজস্ব সংস্কার, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা, মুদ্রানীতি, বিনিময় হার এবং আর্থিক খাতের শৃঙ্খলার মতো বিষয় যুক্ত থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বাস্তবায়নের ধরন ও সময় নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
করছাড় কমানো, করের আওতা বাড়ানো কিংবা জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের ফলে সরকারের আর্থিক চাপ কমতে পারে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের প্রভাব যদি উৎপাদন ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে পারে।
একইভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়তে পারে। এতে নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ এ ধরনের সংস্কারের কারণে শিল্পের ব্যয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন।
ব্যবসায়ীদের এই উদ্বেগের তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানোও জরুরি। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি, অন্যদিকে শিল্পের জন্য অর্থায়নের ব্যয় বৃদ্ধি—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, ঋণের অর্থ ব্যবহারে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দরকার।
তিনি মনে করেন, নতুন ঋণের অর্থ কোন খাতে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। একইসঙ্গে রাজস্ব ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাত কীভাবে বাড়ানো হবে, তারও কার্যকর রূপরেখা থাকতে হবে।
তাঁর ভাষ্যমতে, সরকার আইএমএফের কিছু শর্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেও বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে সংস্থাটির ঋণ ছাড়া চলা কঠিন হবে। তাই শর্ত নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও কর্মসূচি সচল রাখা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ঋণের অর্থ পাওয়া বা কিস্তি ছাড় নিশ্চিত করাই সরকারের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। রাজস্ব আদায় বাড়ানো, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, ভর্তুকির কার্যকারিতা পর্যালোচনা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করার মতো সংস্কার এমনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়ে।
জাহিদ হোসেনের বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো— ঋণের অর্থের পাশাপাশি সরকারের নিজস্ব রাজস্ব আয় ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও জরুরি। তা না হলে নতুন ঋণ সাময়িক স্বস্তি দিলেও ভবিষ্যতে আবার একই ধরনের অর্থায়নসংকট দেখা দিতে পারে।
ব্যাংক খাতের সংস্কার ছাড়া ঋণের সুফল সীমিত
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা ব্যাংক খাতের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সুশাসনের ঘাটতি। এসব সমস্যা দূর করা না গেলে নতুন ঋণের অর্থ বৈদেশিক লেনদেনের চাপ কমাতে সহায়তা করলেও বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল নাও আসতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল তিতুমীর ব্যাংক খাতের অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠাকে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগের সরকারের আমলে তৈরি হওয়া আর্থিক খাতের দুর্বলতার বোঝা বর্তমান সরকারকে সামলাতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘‘ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ভবিষ্যতে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ বন্ধ করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। একইসঙ্গে রাজস্ব খাতে সংস্কার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’’
ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যকর হলে ঋণ বিতরণে জবাবদিহি বাড়ানো, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশের সুযোগ তৈরি হবে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হতে পারে।
তবে এ ধরনের সংস্কারে সময় লাগবে। দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন, খেলাপি ঋণ আদায় এবং অনিয়মের দায় নির্ধারণে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে শুধু নীতিগত প্রতিশ্রুতি দিয়ে আস্থা ফেরানো কঠিন হবে। রাজস্ব বাড়াতে হবে, তবে বোঝা যেন সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে।
বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই কম। সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা ও জনসেবার চাহিদার তুলনায় রাজস্ব আয় সীমিত থাকায় ঋণনির্ভরতা বাড়ছে। এ কারণে করের আওতা বাড়ানো ও রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার জরুরি।
কিন্তু রাজস্ব বাড়ানোর অর্থ শুধু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করা নয়। কর ফাঁকি বন্ধ, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় করছাড় পর্যালোচনা এবং কর দেওয়ার সক্ষমতা থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনা বেশি কার্যকর হতে পারে।
ড. রাশেদ আল তিতুমীরের ভাষ্যমতে, অতীতে কর ফাঁকি, কর অব্যাহতি ও পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতির কারণে রাজস্ব আহরণ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সরকার এসব ক্ষেত্রে সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
তবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি কর ব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য ও কার্যকর করতে হবে। ব্যবসার উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত করে বা সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির চেষ্টা করলে তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য দিতে হতে পারে।
একইভাবে ভর্তুকি সংস্কারের ক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজনীয় সহায়তা ছাড়া জ্বালানি বা অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। ফলে সরকারের সাশ্রয় হলেও তার বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাড়াচ্ছে অর্থনৈতিক চাপ
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অভিঘাত। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন খরচে। শেষ পর্যন্ত তা পণ্য ও সেবার দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি করতে পারে।
ড. রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, ‘‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং আগের সরকারের আমলে তৈরি হওয়া দুর্নীতি ও ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলার ক্ষতি কাটিয়ে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে সরকার। তাঁর মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন। এ অবস্থায় সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা এবং নতুন করে মানুষকে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা জরুরি।’’
তিনি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে প্রকৃত উপকারভোগীদের সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে এসব কর্মসূচির কার্যকারিতা নির্ভর করবে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, স্বচ্ছতা এবং যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর।
আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের সময় এ বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের নামে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে, যার ফলে দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় বা কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে, তাহলে পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যই বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
কর্মসূচি আটকে গেলে কী ঝুঁকি
আইএমএফের সঙ্গে ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করতে ব্যর্থ হলে বা কর্মসূচির শর্ত নিয়ে সমঝোতা না হলে বাংলাদেশের প্রত্যাশিত অর্থায়ন বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। এর প্রভাব বৈদেশিক লেনদেনের চাপ সামলানো এবং বাজেটের অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় পড়তে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে বাংলাদেশের সংস্কার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে আইএমএফের কর্মসূচি ব্যাহত হলেই অন্য সব উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। অন্য সংস্থাগুলোর অর্থায়ন তাদের নিজস্ব নীতি, প্রকল্প ও সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভর করে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুনের বিশ্লেষণে আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের সামনে নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসূচি চালু রেখে শর্ত পূরণ করা, নাকি কোনও কোনো শর্ত নিয়ে দর-কষাকষি করে বিকল্প পথ খোঁজা—এ ধরনের সিদ্ধান্তে অর্থনৈতিক প্রয়োজন, সরকারের অগ্রাধিকার ও বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ বিবেচনায় নিতে হবে।
তবে কর্মসূচি সচল রাখার জন্যই সব শর্ত বিনা আলোচনায় মেনে নিতে হবে, এমন নয়। যেসব শর্তের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বেশি, সেগুলোর বাস্তবায়নপদ্ধতি, সময়সীমা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিয়ে সরকারের আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সংস্কারের বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য অগ্রগতি দেখানোও জরুরি।
ঋণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব সংস্কার
বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জনের চ্যালেঞ্জ—তাৎক্ষণিক অর্থায়নের প্রয়োজন মেটানো এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা দূর করা। আইএমএফের ঋণ বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামলাতে ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু ব্যাংক খাতের অনিয়ম, দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থা, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা দূর করতে না পারলে সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
অন্যদিকে, সংস্কারের নামে যদি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ে, তাহলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের প্রক্রিয়ায় নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
তাই আইএমএফের সঙ্গে ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করার সময় সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে কোন শর্ত কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, ঋণের অর্থ কোন কাজে ব্যবহার করা হবে এবং সংস্কারের ব্যয় কীভাবে বণ্টিত হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করা।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু কত ডলারের ঋণ পাওয়া গেল, তা দিয়ে নয়; বরং ঋণের অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হলো, রাজস্ব ও ব্যাংক খাতে কতটা জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হলো, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কতটা বাড়ল এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলো, তার ভিত্তিতে।