জনসংখ্যার বয়স কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের সামনে অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আগামী ২০৪৫ সাল পর্যন্ত দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত বাড়বে। এরপর এই হার কমতে শুরু করবে। অর্থাৎ জনসংখ্যার এই সুবিধা কাজে লাগাতে বাংলাদেশের হাতে সময় রয়েছে আর মাত্র দুই দশক। এই সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণদের দক্ষতা বাড়ানো এবং নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলে সম্ভাব্য জনমিতিক সুফল হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের এক নতুন প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) প্রকাশিত ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বর্তমানে ১১৭ কোটি। তবে আগামী এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে এ অঞ্চলের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে কমতে শুরু করবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৪৯ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া বয়স্ক জনসংখ্যাপ্রধান অঞ্চলে পরিণত হবে। তখন এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি। বাংলাদেশে এই অবস্থায় পৌঁছানোর সম্ভাব্য সময় ২০৫১ সাল। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের হাতে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য কিছুটা বেশি সময় থাকলেও কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে কাঠামোগত দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সাল থেকে কর্মক্ষম বয়সী মানুষের অনুপাত বৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ এশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বার্ষিক ০.৪ শতাংশ এবং শ্রম উৎপাদনশীলতায় ১.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এসেছে। তবে জনসংখ্যার বয়স কাঠামোর এই ইতিবাচক প্রভাব ক্রমেই কমে আসবে। ২০৫০ সাল নাগাদ জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে জনমিতিক পরিবর্তনের বার্ষিক অবদান কমে মাত্র ০.১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তুলনামূলকভাবে কম মাথাপিছু আয় এবং উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়েই দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যার চাপে পড়ছে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু জনসংখ্যার বয়স কাঠামোর সুবিধার ওপর নির্ভর করার সুযোগ আর থাকছে না।
কর্মসংস্থানে বড় ঘাটতি, অনানুষ্ঠানিক খাতে ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর পথে অন্যতম বড় বাধা কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী উৎপাদনশীল ও আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বিশেষ করে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ কম এবং তরুণদের মধ্যে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট কর্মজীবী মানুষের প্রায় ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। সংখ্যার হিসাবে এই শ্রমজীবীর পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করেও অনেকে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না। দেশে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের ৪৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি ধীর। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোতে গড়ে কর্মীর সংখ্যা কমেছে। ফলে বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো উন্নয়নের তুলনামূলক প্রাথমিক পর্যায়েই দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। তাই এখনই বেশি ও উন্নত মানের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর নীতি ও অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্যও প্রস্তুতি নিতে হবে।
তিনি বলেন, এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুবিধা কাজে লাগাতে পারবে। পাশাপাশি সুস্বাস্থ্য ও উপযুক্ত সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে বয়স্ক মানুষেরাও অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন। এর মধ্য দিয়ে জনমিতিক সুবিধার দ্বিতীয় পর্যায়ের সুফল পাওয়া সম্ভব।
নারীর কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে জোর
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, বাংলাদেশের জনমিতিক সম্ভাবনা কতটা কাজে লাগবে, তা নির্ভর করছে এখন দেশটি কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় তার ওপর। এ জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা, তরুণদের বাজারের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ এবং নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের বাধা দূর করতে হবে।
তিনি বলেন, একই সঙ্গে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও বার্ধক্যকালীন আয়-নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কাজ এখনই শুরু করতে হবে। এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য বাড়তি অর্থায়নের প্রয়োজন হবে। সে কারণে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য নেই প্রস্তুতি
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মানুষের গড় আয়ু বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবা, বয়স্কদের পরিচর্যা এবং পেনশন ব্যবস্থার প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। ফলে ভবিষ্যতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ১৭ শতাংশ কোনও পেনশন ব্যবস্থায় অবদান রাখেন। আর ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের মাত্র ১০ শতাংশ কোনো ধরনের পেনশন সুবিধা পান। বয়স্ক জনগোষ্ঠীর পেনশন সুবিধার এই হার বিশ্বে সর্বনিম্ন।
এ অবস্থায় শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেই জনমিতিক সুবিধার পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, পেনশন এবং বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
করণীয় কী, দেখিয়েছে বিশ্বব্যাংক
প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য জনমিতিক পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রথম পর্যায়ে তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এমএসএমই) অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ, ব্যবসা পরিচালনার নিয়মকানুন সহজ করা এবং শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে নারীদের কর্মসংস্থানে বাধা দূর করে শ্রমবাজারে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মান উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মক্ষম মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।
অন্যদিকে জনসংখ্যার বার্ধক্য মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও পেনশন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। মানুষের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সামনে এখন দুটি কাজ সমান গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বিপুল তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানের জনমিতিক সুবিধা থেকে সর্বোচ্চ সুফল আদায় করতে হবে। অন্যদিকে ভবিষ্যতের বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার ভিত্তি তৈরি করতে হবে। এই দুই ক্ষেত্রে সময়মতো পদক্ষেপ নিতে পারলেই জনসংখ্যার বয়স কাঠামোর পরিবর্তন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বাধা না হয়ে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।