কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকার সময় আরও বাড়লো। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি কাতারএনার্জি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঘোষিত ‘ফোর্স মেজর’-এর মেয়াদ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এতে বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদা মেটাতে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি আমদানির একটি বড় অংশ স্পট মার্কেট থেকে আনতে হবে। তুলনামূলক বেশি দামের স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কিনতে হলে আমদানি ব্যয়ের ওপরও চাপ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রসঙ্গত, কাতারএনার্জি এর আগে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফোর্স মেজর ঘোষণা করেছিল। এখন এর মেয়াদ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইতালির এডিসন এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ-পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের কাছে এ-সংক্রান্ত নোটিশ পাঠিয়েছে কাতারএনার্জি। এর আগে গত এপ্রিল মাসে প্রথম ফোর্স মেজর ঘোষণা করে কাতার।
ফোর্স মেজর হলো এমন একটি চুক্তিগত ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি বা অন্য কোনও অনিবার্য ও অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে কোনও পক্ষ সাময়িকভাবে চুক্তির বাধ্যবাধকতা পালন থেকে অব্যাহতি পেতে পারে।
বাংলাদেশ কাতার ও ওমান, দুই দেশ থেকেই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি করে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনে পেট্রোবাংলা। ফলে কাতারের সরবরাহ বন্ধ থাকার সময় দীর্ঘ হলে চাহিদা অনুযায়ী স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত কার্গো কিনতে হতে পারে।
স্পট মার্কেটে বাড়তি দাম
চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে বাড়তি দামে এলএনজি কিনছে সরকার। গত ১৩ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় পাঁচ কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর মধ্যে দুই কার্গো আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
৫২তম কার্গোর জন্য প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ দশমিক ৯৫ ডলার এবং ৫৬তম কার্গোর জন্য ২৯ দশমিক ৭৯৫ ডলার দর নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুই কার্গোর জন্য প্রতি এমএমবিটিইউ ১৭ ডলার এবং আরও দুই কার্গোর জন্য ১৯ ডলার দর প্রস্তাব করা হয়েছে।
অথচ গত বছরের ডিসেম্বরে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি সাড়ে ১০ ডলারের নিচে কেনা হয়েছিল। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে স্পট মার্কেটের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে দাম কম
বাংলাদেশের প্রথম দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহকারী কাতারএনার্জি বছরে ১৮-২৫ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করতো। প্রতি এমএমবিটিইউর দাম ১০ দশমিক ১১৪ ডলার।
অন্যদিকে ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ করছে। ১০ বছরের চুক্তিতে বছরে ১০-১৫ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি এমএমবিটিইউর দাম ৯ দশমিক ৪৪৪ ডলার। চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৮ সালে।
ফলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে পাওয়া এলএনজির তুলনায় স্পট মার্কেটের সাম্প্রতিক দাম অনেক বেশি। কাতারের সরবরাহ বন্ধ থাকায় চাহিদা পূরণে স্পট মার্কেট থেকে বেশি কার্গো কিনতে হলে সরকারের এলএনজি আমদানি ব্যয়ও বাড়বে।
‘বিকল্প চিন্তা করতেই হবে’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক বিইআরসির সদস্য মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমদানি নির্ভরতায়। আমরা অনুসন্ধানে গতি না বাড়িয়ে আমদানিকে উৎসাহিত করেছি। এখন বিকল্প চিন্তা করতেই হবে। কাতারএনার্জির ফোর্স মেজরের ফলে আমাদের যে আমদানি ব্যয় বাড়বে, তার প্রভাব পড়বে অনেক। তাই নিজেদের অনুসন্ধানের দিকেই আমাদের মনোযোগ দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এখন আমদানি নির্ভরতার জায়গা থেকে কাতার এলএনজি না দিলে স্পট থেকে বেশি দামেই কিনতে হবে। এই মুহূর্তে বিকল্প তো নাই। সরকারের হাতে আর করার কিছু নাই।’