X

সেকশনস

অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৫:৪৪

দাউদ হায়দার বন্ধুর মুখে শুনলাম, একুশের বইমেলায় দেড় হাজারের বেশি বুক স্টল। প্রত্যেকেই প্রকাশক। আঁতকে ওঠি। আতঙ্কে আনন্দও।
কয়েক বছর আগেও ডজন চারেক প্রকাশক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল বাংলাদেশে। পাকিস্তান আমলে আঙুলে গোনা কয়েকজন। স্বাধীনতার পরে সাকুল্যে ডজনখানেক। বেছে বেছে লেখকের বই প্রকাশ, তাও আবার প্রকাশকের মর্জি। হুমায়ূন আহমেদকে দেখেছি পাণ্ডুলিপি হাতে নিয়ে প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে। মুক্তধারার প্রত্যাখ্যান। আহমদ ছফার দৌলতে খান ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত।
তখন এলিট পাবলিশার হিসেবে নামডাক সন্ধানী এবং মওলা ব্রাদার্স-এর। শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, বদরুদ্দীন উমর, ফজল শাহাবুদ্দীন প্রমুখের বই-ই প্রকাশে উন্মুখ। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আল মাহমুদ, শওকত আলি, হাসান আজিজুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত গণ্য নয়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লাইমলাইটেই আসেননি তখন। নওরোজ কিতাবিস্তানের তালিকায় প্রথম সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহসহ চার-পাঁচজন। আহমেদ পাবলিশিং হাউজ, স্টুডেন্ট ওয়েজের কাছে জসীমউদদীনই সর্বেসর্বা। কারণ আছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় জসীমউদদীনের কাব্যগ্রন্থ। সারা বছর। হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের চেয়ে। জসীমউদদীনের বই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। ছাত্রছাত্রীকে কিনতেই হয়।

প্রকাশকরা নাকি টাকা কড়ি লেনদেনে জসীমউদদীনকে ফাঁকি দেন, এই ক্ষোভে নিজেই ‘পলাশ’ নামে প্রকাশনা খোলেন। প্রতি সপ্তাহে বই পৌঁছে দেন বাংলাবাজারে, সদরঘাটে। এবং সপ্তাহে একদিন বাংলাবাজারে যান নিজস্ব রিকশায় (ওর নিজস্ব একটি রিকশা ছিল বাড়িতে। ভাড়া খাটার জন্যে নয়।), টাকা আদায় করতে।

এখনকার কবি সাহিত্যক বোধ হয় টাকা সংগ্রহে প্রকাশকের তথা বই বিক্রেতার চৌকাঠ মাড়ান না। দুই-চারজন ছাড়া। বাকিরা যান। অধিকাংশের কাব্যগ্রন্থ বিক্রি হয় না। কাব্যের বাজার গেছে। রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দ-জসীমউদদীন বাদে। এই তথ্য বাংলাদেশের এক নামি প্রকাশকের কাছে পাওয়া।

গল্প-উপন্যাসের ক্ষেত্রেও চিত্র হেরফের নয়। দুই-চারজন ঔপন্যাসিকের বই আমজনতা পাঠকের প্রিয়, বিক্রি হয় বৈকি।

বিক্রি হোক বা না হোক, দেড় হাজারের বেশি প্রকাশক, বই প্রকাশিত করেন। লেখার মান বা গুণাগুণ বিচার করেন কিনা অজানা। করলে, একুশের বই মেলায় তিন হাজার বই বেরোয় না। ইউরোপ-আমেরিকা বা বিদেশি প্রকাশকের মতো এডিটর নেই, প্রকাশ যোগ্য কী অযোগ্য বলা হয় না। গাঁটের কড়ি খরচ করে বই প্রকাশ করলে অন্য কথা।

শুনেছি, বাংলাদেশে বই-প্রকাশ এখন বড় ব্যবসা। প্রকাশক এক বছরেই কোটিপতি। কী করে? হাজার হাজার অনামি লেখক গজিয়েছে। গদ্যপদ্য লেখেন। তাদের প্রকাশক নেই (অধিকাংশ প্রকাশকই ঢাকায়)। না থাকুক। একটু নাম হয়েছে অমুক প্রকাশকের। ‘সদ্য লেখক’ ধরেন তাকে। প্রকাশক জানেন, বই প্রকাশ করলে একটি কপিও বিক্রি হবে না। প্রকাশকের শর্ত, ‘আমার প্রকাশন থেকে বই বেরুবে, এত হাজার টাকা দিতে হবে। ছাপা-কাগজ-বাঁধাইয়ের দামও। বই প্রকাশের পরে সব বই নিয়ে যাবেন। স্টলে যদি কয়েক কপি রাখেন, বিক্রি হলে পার্সেন্টেজ দিতে বাধ্য থাকবেন।’ টাকা কড়ি যাদের বেশি, ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে, ঘুষ খেয়ে, সেই সব লেখক মুহূর্তেই রাজি।

–আমরা ভাবছি, যে দেশে ৩০ ভাগ লোকও শিক্ষিত নয়, শতকরা একজনও বই কেনে না, পাঠক নেই, এত বইয়ের ক্রেতা কারা।

থাক বা না থাক, বই প্রকাশিত হচ্ছে, বইমেলায় পাঠক যাচ্ছে, বই নেড়েচেড়ে দেখছে, বইয়ে আগ্রহী হচ্ছে, এটাইবা কম কী। ভবিষ্যতে পাঠক, ক্রেতা বাড়বে, ভালো বই বেছে নেবে, জ্ঞানযোগী, বুদ্ধিযোগী হবে, প্রত্যাশায় ঘাটতি নেই।

বইমেলাও এখন বাংলাদেশে কালচারে পরিণত। ব্যবসাও। কুড়ি বছর আগেও বইয়ের প্রচ্ছদ শিল্পী দুই-তিনজন, এখন বিস্তর। তাদের এতই ডিমান্ড, কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা দিয়েও সময় মতো বইয়ের প্রচ্ছদ পাওয়া যায় না। একুশের বইমেলায় বইয়ের প্রচ্ছদ শিল্পীদেরও ব্যবসা, ইনকাম। যেমন ছাপাখানার, কাগজ ব্যবসায়ীর, বাঁধাই দফতরির। অন্যদিকে স্টল নির্মাতাদের। তার মানে, ফেব্রুয়ারি ‘কালচারাল ব্যবসার’ মাস।

বলছিলাম, বইমেলা বাংলাদেশের নব্য কালচার। এই কালচার ধর্মীয় মৌলবাদকে চটকানি। গা গতরে চপট। থাপ্পর। বছর পনের আগে মৌলবাদীরা বইমেলা বন্ধের দাবি তুলেছিল। মানুষ শিক্ষত হলে মৌলবাদিতার ব্যবসা ভেস্তে যাবে। বই পড়ে মানুষ জ্ঞানী হলে সাঈদীদের আখের নস্যাৎ।

একে ভাষার মাস, তাই বইমেলা, বাংলা-ভাষার প্রেম, মৌলবাদীর গা জ্বলুনি কতটা, গত শতকের আশি দশকের শেষে আমেরিকার ডালাসে বঙ্গীয় সমাবেশে বক্তৃতা দিয়ে মঞ্চ থেকে নামছি, এক শ্রোতা, গালে ছাগলের দাড়ি, মাথায় টুপি, উচ্চকণ্ঠে বলেন, ‘বাংলাদেশে বইমেলা হিন্দু সংস্কৃতি। কলকাতার দেখাদেখি ঢাকায় বইমেলা।’

মঞ্চে ফিরে মাইকে বলি, হাসিমুখে, ‘ফ্রাংকফুট বইমেলার বয়স আপনার চেয়ে বেশি। খ্রিস্টান সংস্কৃতি কিনা, জানি না। আরবদেশে মিসরের (কায়রো) বইমেলা, বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার জার্কাতার বইমেলা বোধ হয় হিন্দু সংস্কৃতির নয়।’

বইমেলার দর্শক, ক্রেতা ধর্মাধর্মের ঊর্ধ্বে। ধর্মীয় পরিচয়ে কেউ বইমেলায় যায় না। সুপাঠ্য বইয়ে নজরদারি।

বইমেলা মৌলবাদীদের মাথাব্যথা, কিন্তু এই সংস্কৃতি (বইমেলা সংস্কৃতি) ‘রুখিবে কে? জলতরঙ্গ-রোধে কে উদ্দালক?’ বাংলা নববর্ষ-রোধে মৌলবাদীর ফতোয়া শুনেছি। রোধ সম্ভব? ‘বাধা দিলে বাঁধবে লড়াই।’ বাংলার সেক্যুলার মানুষ এই কামে উসতাদ।

মৌলবাদিতা ব্যতিরেকে বাংলাদেশে বইমেলা এখন সংস্কৃতি। দেশে নাম মৌলবাদীর হুজ্জতি নিষেধ সত্ত্বেও পয়লা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি, রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলন, নাটক-সঙ্গীত উৎসব জাতীয়জীবনের অঙ্গ। সংস্কৃতি। রবীন্দ্র-ছাড়া বাংলার, বাঙালির মুক্তি নেই। ভাষায় নেই। দৈনন্দিনেও নেই। প্রেমেও নেই। এই নিয়ে তর্ক করবেন না। করার ‘ক্ষ্যামতা’ও নেই।

একুশের বইমেলায় সবচেয়ে বড় পাওনা শিশু পাঠকের অংশগ্রহণে। বই দেখছে, কিনছে, স্টলে-স্টলে ঘুরছে, জানছে সাহিত্যের জগত। এই জগতই একদিন বৈশ্বিক করবে মন মানসিক-ভাবনায়।

বাংলাদেশের বইমেলার আত্মিকতা এখানেই, হাজার অপাঠ্য লেখকের বই প্রকাশ সত্ত্বেও। সব লেখকই লেখক নয়। কেউ কেউ। শিশুরাও বেছে নেবে কে লেখক, কে নয়।

বইমেলার আত্মিকতাই উজ্জ্বল উদ্ধার, ঘরে-ঘরে, দেশব্যাপী।

বইছাড়া পরিবার, সমাজ, দেশ অন্ধকার। বই-ই আলো, মুক্তি।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 

/এসএএস/ওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

মুনীরুজ্জামান: কমরেড, বিদায়

মুনীরুজ্জামান: কমরেড, বিদায়

পুলুদার ‘শালা’

পুলুদার ‘শালা’

জার্মানির একত্রীকরণ, ৩০ বছর

জার্মানির একত্রীকরণ, ৩০ বছর

শাহাবুদ্দিন ৭০, জন্মদিনে শুভেচ্ছা

শাহাবুদ্দিন ৭০, জন্মদিনে শুভেচ্ছা

এ কে আব্দুল মোমেনের ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’

এ কে আব্দুল মোমেনের ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’

১৫ আগস্টের স্মৃতি

১৫ আগস্টের স্মৃতি

আমরা কোন তিমিরে

আমরা কোন তিমিরে

আই কান্ট ব্রিদ

আই কান্ট ব্রিদ

গির্জার ধর্মীয় বোধ, বাঙালির ঈদ

গির্জার ধর্মীয় বোধ, বাঙালির ঈদ

আনিসুজ্জামান, দেবেশ রায়। একে একে নিবিছে দেউটি

আনিসুজ্জামান, দেবেশ রায়। একে একে নিবিছে দেউটি

করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর ব্যাধি ধেয়ে আসছে ইউরোপে

করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর ব্যাধি ধেয়ে আসছে ইউরোপে

জনসংখ্যা বেড়ে যাবে?

জনসংখ্যা বেড়ে যাবে?

সর্বশেষ

করোনায় মৃতের সংখ্যা ২১ লাখ ছাড়িয়েছে

করোনায় মৃতের সংখ্যা ২১ লাখ ছাড়িয়েছে

সচিবের সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষকদের বৈঠকে যা হলো

সচিবের সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষকদের বৈঠকে যা হলো

অর্থনীতির প্রধান ছয় সূচক এখনও ঊর্ধ্বমুখী

অর্থনীতির প্রধান ছয় সূচক এখনও ঊর্ধ্বমুখী

ভোটে সেনা মোতায়েন হবে: বঙ্গবন্ধু

ভোটে সেনা মোতায়েন হবে: বঙ্গবন্ধু

মুজিববর্ষ উপলক্ষে জেলায় জেলায় ঘর পাচ্ছেন গৃহহীনরা

মুজিববর্ষ উপলক্ষে জেলায় জেলায় ঘর পাচ্ছেন গৃহহীনরা

বাংলাদেশে নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে চায় তুরস্ক

বাংলাদেশে নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে চায় তুরস্ক

হাতে কেন রক্তাক্ত হাতুড়ি!

হাতে কেন রক্তাক্ত হাতুড়ি!

মুজিববর্ষের উপহার: হাসি ফুটছে শরণখোলার বাঁকে

মুজিববর্ষের উপহার: হাসি ফুটছে শরণখোলার বাঁকে

স্বামীর মোটরসাইকেলে যাওয়ার পথে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কা, স্ত্রী নিহত

স্বামীর মোটরসাইকেলে যাওয়ার পথে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কা, স্ত্রী নিহত

জেএমসেন ভবন রক্ষায় সম্ভাব্য সব সহযোগিতা করবো: হানিফ

জেএমসেন ভবন রক্ষায় সম্ভাব্য সব সহযোগিতা করবো: হানিফ

জোর করে বিয়ে, তালাক নিয়েছে সাহসী কিশোরী

জোর করে বিয়ে, তালাক নিয়েছে সাহসী কিশোরী

চট্টগ্রামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে বিশেষ...

চট্টগ্রামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে বিশেষ...

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.