সেকশনস

নির্ভয়ে সাংবাদিকতার নিশ্চয়তা চাই

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০১৮, ১৮:০২

সাইফুল হাসান গত ১৯ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমের জন্য আনন্দের দিন, আবার বেদনার দিনও। প্রধানমন্ত্রী এদিন সকালে সাংবাদিক কল্যাণে ২০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন। আর বিকেলে, সংসদে পাস হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮। সময় বলবে, এই আইনে ডিজিটাল নিরাপত্তা কতখানি নিশ্চিত হয়েছে। তবে, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকরা যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে, এটুকু নিশ্চিত বলা যায়। গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আইনটির প্রধান শিকার হবে গণমাধ্যম। এই আইনের কারণে বিরুদ্ধ মত, দুর্নীতির খবর প্রকাশ, রাজনৈতিক বিরোধ, এমনকি ভিন্নমত প্রকাশও কঠিন হয়ে পড়বে।
এই আইন, খবরের কাগজ, অনলাইন ও টেলিভিশনগুলোর জন্য নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। যার মুখোমুখি আগে কখনও হয়নি এদেশের গণমাধ্যম। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিধি এতটাই ব্যাপক যে, গণমাধ্যমের সীমানার মধ্যে ঢুকে এর স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। কিন্তু গণমাধ্যম প্রতিনিয়ত তথ্য প্রচার ও প্রকাশের স্বাধীনতা দাবি করে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে, বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি, গ্রেফতার, জব্দ, অজামিনযোগ্য মামলার সুযোগ থাকায় সাংবাদিকদের কাজ করাই কঠিন হবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সুনির্দিষ্ট ৮টি ধারা পুনর্বিবেচনা ও বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে সম্পাদক পরিষদ, সাংবাদিক ইউনিয়নসহ দেশি-বিদেশি নানা সংগঠন। কিন্তু সরকার কোনও উদ্বেগ বা আপত্তি শোনেনি। সরকারের ভাষ্য, আইনটি করা হয়েছে–ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অপরাধ বা এর প্রবণতা কমাতে। কিন্তু এর বিভিন্ন ধারা-উপধারা যে মুক্তচিন্তা, বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতাকে চোখ রাঙাচ্ছে, সেটা স্বীকার করতে চাইছে না সরকার। আইনটি সাংবাদিকতায় পথে বাধা হবে না–সরকারের এই আশ্বাসে আস্থা রাখলেও, এর অপপ্রয়োগ হবে না এটা বিশ্বাস করা কঠিন। কেননা, সেই সুযোগ আইনের মধ্যেই আছে।

‘ঘরপোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়’– এই হচ্ছে গণমাধ্যমের বর্তমান বাস্তবতা। ৫৭ ধারার আতঙ্ক সারাদেশের সাংবাদিকদের তাড়া করে ফিরছে। এর প্রয়োগ ও উপযোগিতা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন গণমাধ্যমকর্মী, শিক্ষক, ফেসবুক ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিককর্মী। তুলনা করলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন হচ্ছে ৫৭ ধারার গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার। এই আইনে যেসব বিধি বিধান রাখা হয়েছে, তাতে সংবাদকর্মীদের মধ্যে ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক। সম্ভবত এ কারণেই, আইনটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরাই।  

তথ্য পাওয়া জনগণের অধিকার। সরকার বা রাষ্ট্রীয় (নিরাপত্তা সংক্রান্ত বাদে) তথ্য পাওয়া মহা অধিকার। এটা মেনেই তথ্য অধিকার আইন এবং তথ্য কমিশন হয়েছে। অন্যদিকে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় ‘অফিসিয়াল সেক্রেটস অ্যাক্টস ১৯২৩’ যুক্ত করা হয়েছে। দুটি আইন পরস্পর বিরোধী। ব্রিটিশ আমলের এ আইনটি পুনর্বহালের মাধ্যমে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারকে অস্বীকার করা হয়েছে। যা বাংলাদেশের মৌলিক চেতনা, সংবিধান, স্বীকৃত আইন-কানুন ও মানবাধিকারের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আবার আইনি ও নৈতিক স্ব-বিরোধিতাও বটে।

অফিসিয়াল সেক্রেটস অ্যাক্টের কারণে সাংবাদিকদের তথ্য পাওয়া ও তা প্রকাশ কঠিন হবে। জেল জুলুমের ভয়তো আছেই। তবে, তথ্য গোপন করার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় দুর্নীতিবাজরা খুশি হবে। আর আশঙ্কা হচ্ছে, আইনটি কার্যকর হলে গণমাধ্যম আরও সংকুচিত হবে। স্বতঃপ্রণোদিত সেন্সরশিপ বাড়বে। গণমাধ্যমের ওপর সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ বাড়বে। স্বতন্ত্র চিন্তা ও মত প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। জনস্বার্থবিরোধী ও দুর্নীতির খবর প্রকাশ কমবে। গণমাধ্যমগুলো পরিণত হবে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানে।  

এই আইনে পুলিশকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার, জব্দ ও যেকোনও স্থানে তল্লাশি চালানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এমন ক্ষমতা বিশ্বের আর কোনও দেশের পুলিশের আছে কিনা, জানা নেই। একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিবেচনাবোধের ওপর নির্ভর আইনটি লঙ্ঘিত হয়েছে কিনা? প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশের বিবেচনাবোধের ওপর দেশের কত শতাংশ মানুষের আস্থা রাখে? তা বিবেচনা করা হয়নি। বাহিনীটি সম্পর্কে এমনিতেই সমাজে প্রবল নেতিবাচক ও ভীতিকর ধারণা বিদ্যমান। এ অবস্থায় তাদের এমন ক্ষমতা দেওয়া শুধুই ভয়ের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। আইনটির অপব্যবহার বা অপপ্রয়োগের ঝুঁকি বাড়াবে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা চর্চার কথা বললেও রাজনৈতিক দলগুলো এতে কতটা বিশ্বাস করে, সেটি একটি বিরাট প্রশ্ন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে ক্ষমতায় থাকলে একরকম, না থাকলে অন্যরকম। যে কারণে, সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব থাকার পরও প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করাতে আগ্রহ দেখায় না কোনও সরকার। তাদের যত আগ্রহ আইন ও পুলিশে। কিন্তু সমস্যা সমাধানে, এ দুটিই সবচেয়ে ভালো বিকল্প নয়, তা সবাই জানে।   

শক্তিশালী ও মুক্ত গণমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র বিকশিত হয় না। এটা বুঝলেও মানতে চায় না ক্ষমতাসীনরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যেসব অপরাধ সংঘঠিত হয়, তা রোধে অবশ্যই একটি আধুনিক আইনের প্রয়োজন। সে দাবি কেউ অস্বীকারও করে না। তবে তা কোনোভাবেই বাকস্বাধীনতা, মুক্তচিন্তা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে নয়।

যে আপনার পক্ষে সেই সবচেয়ে নিরপেক্ষ। এই হচ্ছে বর্তমান বাস্তবতা। ফেসবুকের কল্যাণে বিগত বেশকিছু বছরধরে এ প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। ফলে আইনটি পাস হওয়ার পর, হতাশ হলেও অবাক হইনি। কেননা, বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম এখন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যবস্থার অংশ হিসেবে বাংলাদেশই বা এর বাইরে থাকে কীভাবে?

টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় জরুরি আইন। যা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।’ কিন্তু আইনের কোথাও তা স্পষ্ট উল্লেখ নেই। অন্যদিকে, নতুন আইনে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে, ভবিষ্যতেও ৫৭ ধারার ভূত সবাইকে তাড়া করে ফিরবে। পাশাপাশি, আইনে অনেক অস্পষ্টতা আছে। যেগুলো দূর না হলে এর অপপ্রয়োগ বাড়বে।

এই আইনের ১৪টি ধারা অজামিনযোগ্য। ৩২ ধারায় ডিজিটাল গুপ্তচর বৃত্তির জায়গায় অফিসিয়াল সেক্রেটস অ্যাক্টস ১৯২৩ বলবত করায় সাংবাদিকদের এই ধারায় যুক্ত করা সহজ হবে। এই ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে ১৪ বছরের কারাদণ্ড। এর মাধ্যমে জবাবদিহিতার দায়মুক্তি ছাড়া আর কী প্রতিষ্ঠিত হবে?

আইনটি সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইনের ওপর সরকারের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও বিরোধী মত দমনে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, মানবাধিকার, মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাও লঙ্ঘিত হবে। ফলে দলমত নির্বিশেষে সবারই উচিত বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিলের দাবি জানানো। যতক্ষণ পর্যন্ত সেগুলো সংশোধন না হয়।

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া দেশের সংবিধান গণমাধ্যমকে যে স্বাধীনতা ও স্বীকৃতি দিয়েছে, তা রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। সরকার সেটা করবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আমরা শুধু নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে, নিরাপদে সাংবাদিকতা করার নিশ্চয়তা চাই।

নাগরিক হিসেবে, সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ, আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো বাদ দিন। অনুগ্রহ করে সাংবাদিকতাকে ঝুঁকিতে ফেলবেন না।

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]  

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

রেললাইনে কাজের সময় নিজ ট্রলিতে চালক নিহত

রেললাইনে কাজের সময় নিজ ট্রলিতে চালক নিহত

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থায়ী শান্তির পথ প্রশস্ত হবে: বঙ্গবন্ধু

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থায়ী শান্তির পথ প্রশস্ত হবে: বঙ্গবন্ধু

বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে ৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি

বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে ৪ জনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটি

করোনাকালে এক কোটি কেজির বেশি চা উৎপাদনের রেকর্ড

করোনাকালে এক কোটি কেজির বেশি চা উৎপাদনের রেকর্ড

৬ মেছোবাঘের ছানা উদ্ধার

৬ মেছোবাঘের ছানা উদ্ধার

ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দিবস আজ: রাজনীতিকদের শ্রদ্ধা ও কর্মসূচি

ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দিবস আজ: রাজনীতিকদের শ্রদ্ধা ও কর্মসূচি

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় ফেরি চলাচল বন্ধ

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় ফেরি চলাচল বন্ধ

যশোরে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পুলিশের জিডিতে নিন্দার ঝড়

যশোরে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পুলিশের জিডিতে নিন্দার ঝড়

ব্রাজিলে ব্যাপকভাবে কমেছে বলসোনারোর সমর্থন: জরিপ

ব্রাজিলে ব্যাপকভাবে কমেছে বলসোনারোর সমর্থন: জরিপ

শাহবাগে ছুরিকাঘাতে একজন নিহত

শাহবাগে ছুরিকাঘাতে একজন নিহত

পিকে হালদার কাণ্ডে যে ৮৩ জনকে নিয়ে তদন্ত করছে দুদক

পিকে হালদার কাণ্ডে যে ৮৩ জনকে নিয়ে তদন্ত করছে দুদক

সেনাবাহিনীতে চাকরির নামে অর্থ আত্মসাৎ, আটক ৩

সেনাবাহিনীতে চাকরির নামে অর্থ আত্মসাৎ, আটক ৩

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.