সেকশনস

জয় পাওয়া মানেই জিতে যাওয়া নয়

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:৪১

 

লীনা পারভীন ১৯৭০ সালের নির্বাচন দেখার সৌভাগ্য হয়নি, তবে শুনেছিলাম সেই নির্বাচনই ছিল একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দেওয়ার পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক জনস্বীকৃতি। সেই নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পেয়েছিল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। যদিও তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি জনপ্রতিনিধিদের হাতে। তবে থামাতে পারেনি বাংলাদেশের জন্মকে। পরবর্তী ইতিহাস আমাদের সবার জানা এবং সেই ইতিহাস আজকের বাস্তবতার বাংলাদেশ।
অনেকেই ভাবছেন কেন এই ইতিহাস? ইতিহাস এজন্যই যে এবারের নির্বাচনের সঙ্গে চারিত্রিক ও ঐতিহাসিক কারণের মিল পাওয়া গিয়েছিল। ৭০ সালে ছিল সরাসরি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আর ২০১৮ সালে ছিল পাকিস্তানের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। দুই যুদ্ধেই জিতে গেছে মুক্তিযুদ্ধ ও তার উত্তরসূরী।
এরমধ্যেই জেনে গেছি এবারের নির্বাচনেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ৭০-এর নির্বাচনে ১৬৯ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৬৭ আর বিরোধী দল পেয়েছিল মাত্র দুই আসন। আর এবারের নির্বাচনে মোট ২৯৮টি ঘোষিত আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ২৫৭টি আসন আর শরিক দলসহ এই সংখ্যাটি হচ্ছে ২৮৮টি। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট পেয়েছে মোট ৭টি আসন (বিএনপি ৫ ও ঐক্যফ্রন্ট ২)।

অবশ্যই এই জয় আওয়ামী লীগের প্রাপ্য ছিল। এই রায়ের মাধ্যমে একটি বিষয় একদম পরিষ্কার, আর সেটি হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতাবিরোধী, সন্ত্রাসী ও দেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র করা কোনও দল বা জোটের হাতে দেশকে নিরাপদ মনে করে না। প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে বলতেই হয়, বিএনপি নিঃসন্দেহে একটি বড় দল ছিল এবং এদেশে ভোটের রাজনীতিতে একটি ভালো প্রভাব ছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য হচ্ছে এই দলটি বরাবর দেশের মানুষের হৃদয়ের কথাটি বুঝতে পারেনি কখনোই। রাজনীতি করবেন মানুষ নিয়ে এবং ভোটের হিসাব এই দেশের জনগণ নিয়েই। রাজনীতিবিদ হিসেবে যদি আপনি মানুষের ভেতরের কথাটি ধরতে ব্যর্থ হন তাহলে একদিন এই মাটি থেকে আপনাদের নামটি মুছে যাবে, এটাই বাস্তবতা। বিএনপি যদিও দুইবারের ক্ষমতাসীন দল তারপরও ২০০৮-এর পর থেকে তারা সাধারণ মানুষের আবেগ অনুভূতিকে ধারণ করেনি। এজন্যই বলা যাচ্ছে যে তারা গত দশ বছরে একটি দিনের জন্যও জনগণের কোনও ইস্যু নিয়ে মাঠে নামেনি বা সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারেনি। ছিল না কোনও কর্মকাণ্ড বা কর্মীদের সম্পৃক্ত করার মতো কোনও কার্যক্রম। রাজনৈতিক দলের কর্মীদের নিয়ে কোনও পরিকল্পনা থাকবে না সেটি মেনে নেওয়া আসলেই কতটা যৌক্তিক? বিএনপির সকল নেতা ব্যস্ত ছিলেন কেবল কেমন করে সরকারকে দেশে ও বিদেশে হেনস্তা করা যায় সেই কূটকৌশল নিয়ে। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র সঙ্গে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা ছিল আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত। তাদের নেতা তারেক রহমান একজন ফেরারি আসামি এবং ষড়যন্ত্রকারী। এমন নেতা নিয়ে যে দল ক্ষমতায় আসতে চায় তাদের অন্তত এই লড়াকু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত বাংলাদেশের জনগণ কখনোই দেশের দায়িত্ব দেবে না সে হিসাব পরিষ্কার।

আর আমি মনে করি এই একটি বার্তা থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়া আওয়ামী লীগেরও শেখার আছে অনেক কিছু। প্রায় দেড় কোটি নতুন ভোটার ও মোট আড়াই কোটি তরুণ ভোটারের এই রায়কে আশা করছি আপনারা মাথায় রাখবেন। কেন তারা বিএনপিকে বর্জন করেছে আর কেনইবা আপনাদের আবারও সুযোগ দিয়েছে সে বিশ্লেষণটুকুও রাখাটা জরুরি। আমরা আশা করি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি যে আস্থা ও বিশ্বাস দেশের মানুষ জানিয়েছে তার যথার্থ মর্যাদা রক্ষায় ক্ষমতাসীন দলের প্রতিটি নেতাকর্মী ও ভবিষ্যৎ মন্ত্রীরাও সচেষ্ট থাকবেন।

দেশের বর্তমানে একটি বড় সমস্যা হচ্ছে আইনের শাসনের যথার্থ ব্যবহার। এই সমস্যা একদিনের নয় তাই একদিনেই দূর হয়ে যাবে এমনটা কেউ আশা করে না, কিন্তু এই যে তৃতীয়বারের মতো সুযোগ পেলেন, এবার অন্তত কিছু বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করবেন বলেই আমরা ভোটাররা মনে করি। আশা করছি তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব ভালোভাবেই জানেন এবার তার সরকারের তালিকায় কোন কোন বিষয়কে প্রাধান্য দিতে হবে। উন্নয়নের চাকাকে যেমন চালু রাখতে হবে তেমনি আগের উন্নয়নগুলোকে যেন কেউ কালিমালিপ্ত না করতে পারে সেদিকটাও মেরামতের কাজ করা দরকার।

বাংলাদেশের যে কয়টি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলোকে রাখতে হবে যেকোনও প্রকারের বিতর্কের ঊর্ধ্বে। সরকারের বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগের মধ্যে সুসম্পর্কই পারে একটি দেশের আইনের শাসনকে সুপ্রিতিষ্ঠিত করতে। নতুন সরকারের কাছে তাই অন্যতম চাওয়া হচ্ছে দেশের মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে যেখানে যেখানে কাজ করা দরকার সেই কাজটি তারা করবেন। আমরা সাধারণ জনগণ কেবল একটি সুন্দর ও শান্তির দেশ চাই। এর চাইতে বেশি চাওয়া আর কী হতে পারে। তরুণ সমাজের চাওয়াকে প্রাধান্য দেওয়াটাই হবে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের তরুণরা এখন যথেষ্ট আধুনিক মানসিকতা ধারণ করেন। তারা অনেক বেশি গ্লোবালাইজড এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা আমাদের চালকদের চেয়েও অনেক এগিয়ে থাকা গোষ্ঠী। তাই এদের খুব হালকাভাবে নেওয়ার কোনও সুযোগ নাই। নতুন কর্মসংস্থান তৈরির একটি বড় চাহিদা রয়েছে আমাদের দেশে। যদিও এই সরকার তার অতীত সময়ে কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ করেছেন অনেক, তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তার মানসিকতাকে জাগ্রত করতে সক্ষম হয়েছে এবং সরকারি চাকরিকে যথেষ্ট প্রেস্টিজিয়াস হিসাবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে এখনও আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। আর এই কাজটি করতে হলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের হিসাবটিকে মাথায় রাখাটাও জরুরি। বয়সভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন করে চাহিদাভিত্তিক গ্যাপ অ্যানালাইসিস করা যেতে পারে। চাহিদার সঠিক জায়গাটি যদি জানা থাকে তাহলে কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা করার কাজটি অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে বলে মনে করি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে এ কাজে শক্ত হাতে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে কাজটি সহজেই হয়ে যাবে।

শেখ হাসিনার সরকারের সামনে আশু যে চ্যালেঞ্জটি আছে সেটি হচ্ছে মন্ত্রণালয়গুলোকে ঢেলে সাজানো। অন্তত কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দিতে হবে অত্যন্ত যোগ্য ও সর্বজনগৃহীত ব্যক্তিদের হাতে। গত দশ বছরের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে খুঁজে নিতে হবে কোন জায়গাগুলো নিয়ে সরকারকে বিব্রত হতে হয়েছিল। দুর্নীতির বিপক্ষে যে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হয়েছে এই একটি জায়গায় কোনোভাবেই ছাড় দেওয়ার কোনও সুযোগ আছে বলে মনে করছি না। দেশ থেকে সকল প্রকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে চালাতে হবে আগ্রাসী অভিযান। মাদক, দুর্নীতি, সন্ত্রাসীদের দেখাতে হবে লাল কার্ড। তাই নির্বাচনে জয় পাওয়া মানেই জিতে যাওয়া হবে না। জিততে হলে জনগণ যে আস্থা দেখিয়েছে, কাজের মাধ্যমে সে জায়গাগুলোকে জয় করাই হবে প্রকৃত বিজয়।

লেখক: কলামিস্ট

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

শতবর্ষে আমার প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়কে যেমন দেখতে চাই

শতবর্ষে আমার প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়কে যেমন দেখতে চাই

বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা কেন বাড়ছে?

বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা কেন বাড়ছে?

নতুন বছরের প্রত্যাশা

নতুন বছরের প্রত্যাশা

বুদ্ধিজীবী দিবসের চেতনা

বুদ্ধিজীবী দিবসের চেতনা

মানসিক স্বাস্থ্যকে আর অবহেলা নয়

মানসিক স্বাস্থ্যকে আর অবহেলা নয়

বঙ্গবন্ধু ছড়িয়ে যাক গোটা বাংলায়

বঙ্গবন্ধু ছড়িয়ে যাক গোটা বাংলায়

অর্থনৈতিক উন্নয়ন বনাম আগামীর বাংলাদেশ

অর্থনৈতিক উন্নয়ন বনাম আগামীর বাংলাদেশ

করোনার অর্থনীতি ও শেখ হাসিনা

করোনার অর্থনীতি ও শেখ হাসিনা

কতটা প্রতিবাদ হলে বিচার পাওয়া যায়?

কতটা প্রতিবাদ হলে বিচার পাওয়া যায়?

করোনাও থামাতে পারেনি নারী নির্যাতন

করোনাও থামাতে পারেনি নারী নির্যাতন

সর্বশেষ

করোনায় জাবি শিক্ষার্থীর মৃত্যু

করোনায় জাবি শিক্ষার্থীর মৃত্যু

আপাতত সপ্তাহে একদিন ক্লাসের পরিকল্পনা : শিক্ষামন্ত্রী

আপাতত সপ্তাহে একদিন ক্লাসের পরিকল্পনা : শিক্ষামন্ত্রী

এফএ কাপ থেকে চ্যাম্পিয়নদেরই বিদায়!

এফএ কাপ থেকে চ্যাম্পিয়নদেরই বিদায়!

বাইডেন-শি বৈঠক আয়োজনের চেষ্টার খবর অস্বীকার চীনের

বাইডেন-শি বৈঠক আয়োজনের চেষ্টার খবর অস্বীকার চীনের

কক্সবাজার ভূমি অফিসের ‘শীর্ষ দালাল’ মুহিব উল্লাহসহ গ্রেফতার ২

কক্সবাজার ভূমি অফিসের ‘শীর্ষ দালাল’ মুহিব উল্লাহসহ গ্রেফতার ২

জ‌মি নিয়ে বিরোধে সাংবাদিকের ওপর হামলা

জ‌মি নিয়ে বিরোধে সাংবাদিকের ওপর হামলা

বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলীর মোহনায় হানিফ সংকেত!

এবারের ‘ইত্যাদি’ পতেঙ্গায়বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলীর মোহনায় হানিফ সংকেত!

সাড়ে ১১ ঘণ্টা পর ফেরি চলাচল স্বাভাবিক

সাড়ে ১১ ঘণ্টা পর ফেরি চলাচল স্বাভাবিক

তিন ম্যাচ পর রিয়ালের জয়

তিন ম্যাচ পর রিয়ালের জয়

তাইওয়ানের ওপর চাপ প্রয়োগ থামান: চীনকে যুক্তরাষ্ট্র

তাইওয়ানের ওপর চাপ প্রয়োগ থামান: চীনকে যুক্তরাষ্ট্র

বাবার যৌন হয়রানি থেকে বাঁচতে আদালতে দুই মেয়ে, মিলছে না বিচার

বাবার যৌন হয়রানি থেকে বাঁচতে আদালতে দুই মেয়ে, মিলছে না বিচার

আলীকদমে বন্য হাতির আক্রমণে ২ জনের মৃত্যু

আলীকদমে বন্য হাতির আক্রমণে ২ জনের মৃত্যু

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.