সেকশনস

অর্থপাচার বনাম বিনিয়োগ

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৯, ১৭:২৬

সালেক উদ্দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে বিনিয়োগের জন্য স্বদেশি পুঁজিপতিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।  পাশাপাশি দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিদেশি বিনিয়োগের খোঁজেও। ঠিক সেই মুহূর্তে দেশীয় পত্রিকাগুলোয় প্রকাশিত হলো– সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসএনবি-এর বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৮ অনুযায়ী দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের হাজার হাজার কোটি অর্থপাচারের তথ্য।
খবরটি গত সপ্তাহে দিন দুয়েক দেশের  গণমাধ্যমগুলোয়  বেশ গুরুত্ব পেয়েছিল। আবার কেন যেন থেমে গেলো। বিভিন্ন ওয়েব সাইটের তথ্যের আলোকে পত্রিকার প্রতিবেদনে যা হাইলাইটেড হচ্ছিল, তা হলো: 
১. ২০১৮ সালে সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা, যা প্রতিবছর হাজার কোটি টাকারও বেশি বাড়ছে।

২. জাতীয় নির্বাচনের বছরগুলোয় সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের এই অর্থ জমার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি বেড়ে চলছে। ধারণা করা যায়, এ সময়ে অর্থপাচার অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি হয়।

৩. সুইস ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশিদের অর্থ জমার পরিমাণ বাড়লেও প্রতিবেশী বৃহৎ রাষ্ট্র ভারতের নাগরিকদের অর্থ জমার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক  কম।

৪. ভারতের মতো বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দেশের নাগরিকদের অর্থপাচারের তুলনায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর বেশি অর্থপাচারের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে–ভারত সরকার একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় সে দেশের নাগরিকদের জমা অর্থের তথ্য সুইস ব্যাংকগুলো থেকে  নেওয়া হয় বলেই এই বৈষম্য।

৫. পত্রিকাগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সুইস ব্যাংকে জমা হাজার হাজার কোটি টাকার মধ্যে অধিকাংশই পাচারের টাকা হলেও এর মধ্যে কিছু অর্থ বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের জমানো বৈধ টাকাও রয়েছে। তবে, তা তুলনামূলকভাবে নগণ্য।

ওপরের পাঁচটি তথ্যের মধ্যে দু’টির সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকালীন একটি বিষয় নিয়ে পরস্পরের কাদা ছোড়াছুড়ির ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ কথাটির সঙ্গে বেশ মিল আছে।

রাজনীতিকদের নির্বাচনকালীন ‘মনোনয়ন বাণিজ্যে’র কথা যদি সত্য হয়, তবে ধরে নিতে পারি এ থেকে অর্জিত টাকা তাদের ‘তেলেসমাতি’ কৌশলে সুইস ব্যাংকে জমা হয়েছে। আর জাতীয় নির্বাচনের বছরগুলোতে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের এই অর্থ জমার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়ে।

দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভুগছে, শিল্পবিপ্লবের জোয়ার অর্থাভাবে স্থবির হয়ে পড়ছে। দেশি বিনিয়োগকারীর অভাবে সরকারকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। ঠিক  এ সময়ে দেশের রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে অলস পড়ে থাকছে। বিষয়টি দেশপ্রেমহীনতার পরিচয় ছাড়া আর কীই বা হতে পারে!

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকের হিসাব খোলার পদ্ধতি আমাদের দেশের ব্যাংকের হিসাব খোলার মতোই।  শুধু তফাৎ এই যে, তাদের গ্রাহকদের বিশেষ করে বিদেশি গ্রাহকদের গোপনীয়তা কঠোরভাবে রক্ষা করা হয়, যা নিয়ন্ত্রণ করে সুইস ফেডারেল ব্যাংকিং কমিশন। ফলে কালো টাকা সেখানে পাচার করলে দেশের দুদকের হাতে ধড়া পড়ার ভয় থাকে না।  

সুইস আইন অনুযায়ী একজন ব্যাংকার কখনোই কোনও গ্রাহকের হিসাবের কোনও তথ্য নির্ধারিত দুই-একটি  পরিস্থিতি ছাড়া প্রকাশ করতে পারবেন না। ব্যত্যয় হলে  ব্যাংকারের  জেল হতে পারে। হতে পারে পঞ্চাশ হাজার  সুইস ফ্রাংক অর্থদণ্ডও।

কঠিন আইনের কারণেই হোক বা অন্য কারণে হোক, সুইস ব্যাংক তার গ্রাহকের গোপনীয়তা রক্ষায় বদ্ধপরিকর। তাদের এই গোপনীয়তার জন্য অপরাধীদের কালো টাকার প্রধান গন্তব্য হচ্ছে সুইস ব্যাংক। 

গোপনীয়তার অধিকার সুইস আইন ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ফেডারেল সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। ফলে কোনো দেশের সরকার থেকে অর্থপাচার রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ না থাকলেই সুইস ব্যাংকে সেই দেশের অর্থ পাচারের পরিমাণ বাড়বে এটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে কীভাবে সুইস ব্যাংকগুলোতে জমা করা সম্ভব হলো? প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে সাদা চোখে যে কারণগুলো দেখা যায়, এর মধ্যে প্রধান হলো এক্সপোর্ট/ ইম্পোর্টে ওভার ইনভয়েসিং বা আন্ডার ইনভয়েসিং ও হুন্ডি। মূলত কর ফাঁকি দেওয়া কিংবা দুর্নীতি বা অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ রাখার জন্য  সুইস ব্যাংকগুলোকে বেছে নেয় বিশ্বের  রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা। আমাদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। সুইস ব্যাংকগুলো ছাড়াও অন্যান্য দেশ যেমন মালয়েশিয়া সরকারের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মালয়েশিয়া সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বিনিয়োগের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী কোনও নাগরিককে বিদেশে টাকা নিতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হয়। এখন পর্যন্ত সেকেন্ড হোমের জন্য কেউ বিদেশে টাকা রাখার অনুমোদন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পেয়েছে বলে জানা নেই।

আমাদের উন্নয়নশীল বাংলাদেশ স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটা পদক্ষেপ হতে পারে সুইস ব্যাংকে টাকাপাচার রোধে ভারতের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। পাশাপাশি সেখানে পড়ে থাকা হাজার হাজার কোটি অলস টাকা ফিরিয়ে এনে আমানতকারীদের দেশে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করা।

সুইস ব্যাংকে টাকা পাচার রোধে ভারত কী পদক্ষেপ নিয়েছিল এখানে সংক্ষেপে তা আলোকপাত করা যেতে পারে।

বিশ্বের রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের পাচারকৃত অর্থের  স্বর্গরাজ্য হিসেবে সুইজারল্যান্ড পরিচিতি লাভ করলে ১৯৯৭ সাল থেকেই দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হয়। তখন থেকে সুইস ব্যাংকগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে আমানত করা অর্থের তথ্য প্রকাশ করা শুরু করে। এরপর বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধান ও স্বদেশে ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ডাকে সাড়া দিয়ে সুইস কর্তৃপক্ষ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। পরিবর্তিত নিয়ম ও সুযোগের শতভাগ ব্যবহার করেছে ভারত।

২০১৬  সালে সুইজারল্যান্ড সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ বিষয়ে জোরালো অবস্থান নেন এবং ওই বছরের নভেম্বরে তথ্য আদান-প্রদান বিষয়ে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি সই হয় ভারতের। আর সেই চুক্তির সুফল হিসাবে ভারতীয় নাগরিকদের সুইস ব্যাংকে অর্থ পাচারে ভাটা পড়ে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর  দেশের উন্নয়নসহ বহুক্ষেত্রে সাফল্য রয়েছে অনেক যা এর আগের যেকোনও সরকারের চেয়ে বহু-বহু গুণ বেশি। তাকে আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার বললে ভুল তো হবেই না বরং তার অবস্থান এর চেয়েও ওপরে। তিনিই পারেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মতো সুইজারল্যান্ডে সঙ্গে একই রকম অথবা তার চেয়েও যুগোপযোগী একটি চুক্তি করতে। যার পরিপ্রেক্ষিতে দেশ থেকে নতুন করে অর্থ পাচার রোধ হয়। তার পক্ষে এটাও সম্ভব যে, সুইস ব্যাংকগুলোতে পাচার হওয়া দেশি আমানতকারীদের যে সাড়ে পাঁচ হাজার বা তারও অধিক টাকা রয়েছে, তাদের মাধ্যমে ওই টাকা ফিরিয়ে এনে দেশি বিনিয়োগকারী হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা। এতে আর একটি কাজ করতে হবে, তা হলো পাচার হওয়া কালো টাকা সাদা করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে কালো টাকা সাদা করার বিষয়টি আগের সরকারগুলোও করেছে এবারের অর্থ বাজেটেও প্রতিফলিত হয়েছে।

একটি দেশের সরকার প্রকৃত অর্থে আন্তরিক হলে কালো টাকা রোধ ও অর্থপাচার বন্ধ করা যে খুব কঠিন নয়, তার প্রমাণ মেলে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সুইজারল্যান্ড সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি ও তা বাস্তবায়নের ঘটনায়। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সেই আন্তরিকতা ও দক্ষতার অভাব নেই বলেই আমরা বিশ্বাস করতে চাই। একইসঙ্গে এর সুফলও পেতে চাই।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

২০২০-এর সঙ্গেই বিদায় হোক করোনার বিষ

২০২০-এর সঙ্গেই বিদায় হোক করোনার বিষ

‘ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই’

‘ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই’

বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস

বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস

তবে কি শুরু হলো করোনার সেকেন্ড ওয়েভ!

তবে কি শুরু হলো করোনার সেকেন্ড ওয়েভ!

‘তবু চোর ধরতে হবে’

‘তবু চোর ধরতে হবে’

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের অলস টাকা

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের অলস টাকা

করোনার পিক-টাইম এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত

করোনার পিক-টাইম এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত

করোনার সঙ্গে ডেঙ্গুর ছোবল!

করোনার সঙ্গে ডেঙ্গুর ছোবল!

সর্বশেষ

হাসপাতালের স্টাফদের অবহেলায় সিঁড়িতেই সন্তান প্রসব

হাসপাতালের স্টাফদের অবহেলায় সিঁড়িতেই সন্তান প্রসব

বিএনপি সমর্থিত মেয়র-কাউন্সিলরদের ভোট বর্জন

বিএনপি সমর্থিত মেয়র-কাউন্সিলরদের ভোট বর্জন

উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট চলছে

উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট চলছে

মেইল সর্টিং সেন্টার: কমবে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য, কৃষক পাবেন পণ্যের ন্যায্য মূল্য

মেইল সর্টিং সেন্টার: কমবে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য, কৃষক পাবেন পণ্যের ন্যায্য মূল্য

যুক্তরাজ্যে সব ধরণের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা

যুক্তরাজ্যে সব ধরণের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা

পুতুলের ভেতরে করে ইয়াবা পাচার

পুতুলের ভেতরে করে ইয়াবা পাচার

দ্বিতীয় দফায় ভোটগ্রহণ চলছে

দ্বিতীয় দফায় ভোটগ্রহণ চলছে

ভিআইপিদের স্বার্থে চার দিনের কোয়ারেন্টিন!

ভিআইপিদের স্বার্থে চার দিনের কোয়ারেন্টিন!

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ৯ কোটি ৪৩ লাখ ছাড়িয়েছে

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ৯ কোটি ৪৩ লাখ ছাড়িয়েছে

সেদিন গণভবনের দরজা ছিল অবারিত

সেদিন গণভবনের দরজা ছিল অবারিত

ব্রিজ ভেঙে নদীতে, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নিহত

ব্রিজ ভেঙে নদীতে, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নিহত

গৃহহীনদের পাশে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক

গৃহহীনদের পাশে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.