সেকশনস

ক্যাপ্টেন। বঙ্গবন্ধু

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২০, ১৮:৫৬

দাউদ হায়দার দিনক্ষণ, মাস মনে নেই। মনে আছে বছর। ১৯৬২ সাল।
পাবনার নগরবাড়ি থেকে ঢাকায়, ফেরিতে। একদল লোক, ফেরিতে যাত্রী, স্লোগান দিচ্ছেন,‘শেখ মুজিব, শেখ মুজিব।’
কে শেখ মুজিব, কিচ্ছু জানিনে, বয়স তখন দশ।
লক্ষ করলুম, একজন মানুষ বেশ সুঠাম, গোঁফ নজর কাড়ার, কেবিন থেকে বেড়িয়ে, স্লোগানিদের উদ্দেশে হাত নাড়ছেন।
মানুষটি কে? অচেনা।
কেবিনের সামনে ঘুর ঘুর করছিলুম। কেউ একজন ধমক দেন। ধমকে, ফেরির কেবিনে ঢুকে পড়ি। মেজ আপা জোৎস্না জিজ্ঞেস করেন কারণ কী? বলি। তিনি দেখতে যান (তাঁর সঙ্গেই ঢাকায় যাত্রা)। ফিরে এসে বলেন,‘চল। কেবিনে চাচা আছেন (চাচা মানে মনসুর আলি। শেখ মুজিবের অন্যতম লেফটেন্যান্ট, পাড়াতুতো চাচা। আব্বার ঘনিষ্ঠ। স্বাধীনতার পরে মনসুর আলি বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)।’ গেলুম। চাচা নাকি বলেছিলেন, মেজ আপার মুখে শোনা, ‘আয়, নেতাকে সালাম কর।’ আপা সালাম করেছিলেন কিনা বলেননি, বলেন,‘তোকে সালাম করতে বলেছিলাম। তুই সালাম দিয়েছিলি। ক্যাবিনের বাইরে থেকে দেখেছি। শেখ মুজিব তোর মাথায় হাত রেখে কি সব বলছিলেন।’

- কি বলছিলেন, এত বছর পরে মনে নেই, একটি কথা তথা বাক্য কানে বাজে, ‘বাবা, মানুষ হও, ঠিকমতো লেখাপড়া করবে।’

- শেখ মুজিবের নির্দেশ মানিনি, মানুষ হইনি, লেখাপড়াও শিখিনি।

আমাদের আরেক আত্মীয়া, বেগমবু, ৩২ ধানমন্ডির পয়লা নম্বরের বাসিন্দা, শেখ মুজিবের কয়েকটা বাড়ির পরে, দেখেছি, শেখ মুজিবের বড় কন্যা শেখ হাসিনা (এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী) প্রায়ই আসেন, বেগমবুর বড় কন্যা শিরিনের বান্ধবী, সহপাঠিনী।

লুলু আপাও (সুলতানা কামাল। কবি সুফিয়া কামালের মেয়ে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা)। ওঁরা বন্ধু।

শেখ হাসিনাকে তখন থেকে চিনি। জানি, শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা।

-এই জানার চেয়ে বেশি, শিরিন খালার বান্ধবী।

গণআন্দোলনে (১৯৬৯) শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে মুক্ত, ঘরে ফিরেছেন, শিরিন খালা বললেন, ‘চলো।’ আমরা ফুল নিয়ে গেলুম। শেখ মুজিব খুশি হলেন, শিরিন খালাকে কি বললেন, শুনেছি ঠিকই, স্মরণ নেই পঞ্চাশ বছর পরে।

ম্যাট্রিক পরীক্ষার মাস কয়েক আগে, মস্কোর প্রগতি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত মার্ক্স-এঙ্গেলস-লেলিনের বই (বাংলায় অনুবাদ) পড়ে মগজে ভিন্ন স্রোত, মার্ক্সবাদে ঝুঁকলুম। ছাত্র ইউনিয়নে (রুশপন্থী। লোকে কয় মস্কোপন্থী ) উদ্দীপ্ত। মনি সিং, অধ্যাপক, মতিয়া চৌধুরী আদর্শ। কিন্তু, শেখ মুজিবের (আওয়ামী লীগের। তখন বলতুম ‘আ.লী’র বিক্ষোভ, মিছিল। আ.লী, সংক্ষিপ্ত আওয়ামী লীগ) মিছিল, বিক্ষোভ হলেই হাজির। ছাত্র ইউনিয়নের মিছিল হয় বটে, বেশি নয়, মাঝে মাঝে। কমিউনিস্ট পার্টির মিছিল, মিটিং কালেভদ্রে।

লক্ষ করি, ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টির নেতানেত্রীর মুখে কেবল কচকচানি, তত্ত্ব, থিয়োরি, পরিকল্পনা। আ.লী-র ওসব নেই, বিক্ষোভ, মিছিল, ডিরেক্ট অ্যাকশন।

ছাত্র ইউনিয়নকে অনেকেই বলতে শুরু করেন, নাচুনে পার্টি, গানের পার্টি। কালচারাল পার্টি। কারণও আছে বলার। অন্য কোনও ছাত্রদল নয়, রাজনৈতিক দল নয়, ছাত্র ইউনিয়ন প্রায়-প্রতিমাসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে। বলা হয়, প্রগতিশীল কালচারাল অনুষ্ঠান।

ঠিক যে, বাংলাদেশে এখনও সুস্থ কালচারাল ধারা, ছাত্র ইউনিয়নই মূলে।

আমরা জানি, প্রত্যেকে জানে, পেটে ভাত না থাকলে, স্বাধীনতা না থাকলে, প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হলে, দুঃস্বপ্নে জীবন কাটালে কালচার বড় কোনও ভূমিকার দায় নেয় না। পেট যদি ভর্তি, অর্থে যদি বলীয়ান, নান রঙের কালচারে আপত্তি নেই।

আপনারা যারা ঊনসত্তরের (১৯৬৯) গণঅভ্যুত্থান দেখেননি, বর্ণনা করা মুশকিল, গণজোয়ার কাকে বলে। সবকিছু অচল। রাস্তাঘাটে মানুষের ঢল। নাওয়া-খাওয়া সব বাদ। পাকিস্তানের ভিত্তিভূমি টলটলায়মান।

মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে তখনই প্রস্তুত। অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি আর কারোর আস্থা নেই। আওয়ামী লীগই ভরসা। আওয়ামী লীগও জেনে গিয়েছে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘ভূমিধস জয়’। শেখ মুজিবুর রহমানকেই বাংলাদেশের ক্যাপ্টেন মেনে নিয়েছেন। হয়ে গেলেন আমারও ক্যাপ্টেন। শেখ মুজিব নন আর, ক্যাপ্টেন ‘বঙ্গবন্ধু।’

১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেসকোর্সে, দুপুরের পরে আসবেন, জনমুখে প্রচারিত, সংবাদপত্রেও (মিডিয়া বলতে তখন ‘পূর্ব পাকিস্তানি রেডিও’,‘পূর্ব পাকিস্তান টিভি’)।

সকাল ন’টার আগেই রেসকোর্সে পৌঁছে গেলুম। সকালে দু’টি রুটি খেয়েছিলুম ভাজি দিয়ে, দুটি রুটি পকেটে নিয়ে গিয়েছিলুম। ভাষণের মঞ্চ থেকে পনের/কুড়ি ফুট দূরে বসি, সঙ্গে আরো দু’তিনজন বন্ধু। ওঁরাও ‘রুশপন্থী’ (ছাত্র ইউনিয়ন)।

একটা/দেড়টার আগে লোকেলোকারণ্য হয়নি। আমরা জায়গা ছাড়ি না। বঙ্গবন্ধুকে চোখের সামনে দেখবো।

বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি (১৯৭২) বাংলাদেশে, তেজগাঁও বিমানবন্দরে, মানুষ আর মানুষ। ফুল নিয়ে গিয়েছিলুম। দেওয়া হয়নি। বঙ্গবন্ধুর কনভয়ে ছুড়ে মারি। গাড়িতে নয়, মাটিতে পড়ে। গাড়ির চাকায় পিষ্ট।

দিন কয়েক পরে বঙ্গবন্ধু কলকাতায়। জানতুম না আসবেন। আমরা চার বন্ধু ভ্রামণিক। নেহাল বললো চল। গেলুম। গড়ের মাঠ। তিল ধারণেই জায়গা নেই। বঙ্গবন্ধুকে দেখতে আবালবৃদ্ধবনিতা। বাবুল ভাই বললেন, ‘মঞ্চের সামনে যাবো।’ ‘কী করে?’ প্রশ্ন। বাবুল ভাই: ‘আমাকে সামনে রেখে বলবি মুক্তিযোদ্ধা’ (তিনি খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা। কুস্টিয়া-পাবনা সেকটরের দায়িত্বে ছিলেন।), আমরা বলি। জায়গাও পাই।

বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ যাদের পাঠ, জানেন শেখ মুজিবুর রহমান কী করে আমার/আপনার ক্যাপ্টেন, বঙ্গবন্ধু।

জন্ম ২০ জানুয়ারি ১৯২০, ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়ায়। ইনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটেনিকায় উল্লেখ, শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম ভারতে। সঠিক। তখন অখণ্ড ভারত। পাকিস্তানের নামগন্ধ নেই।

এও ঠিক, ভারত ভাগ না হলে পাকিস্তান (পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান) হয় না। পূর্ব পাকিস্তানের শোষক, নির্যাতক পশ্চিম পাকিস্তান, বঙ্গবন্ধু হাড়েমজ্জায় টের পান, পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতায় নিবেদিত, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, জনক। একেই বলে ক্যাপ্টেন। আমাদের পরিচয় আজ বাংলাদেশি। বঙ্গবন্ধু, শেখ মুজিবুর রহমানই সর্বাত্মক নেতা ও ক্যাপ্টেন।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

মুনীরুজ্জামান: কমরেড, বিদায়

মুনীরুজ্জামান: কমরেড, বিদায়

পুলুদার ‘শালা’

পুলুদার ‘শালা’

জার্মানির একত্রীকরণ, ৩০ বছর

জার্মানির একত্রীকরণ, ৩০ বছর

শাহাবুদ্দিন ৭০, জন্মদিনে শুভেচ্ছা

শাহাবুদ্দিন ৭০, জন্মদিনে শুভেচ্ছা

এ কে আব্দুল মোমেনের ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’

এ কে আব্দুল মোমেনের ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’

১৫ আগস্টের স্মৃতি

১৫ আগস্টের স্মৃতি

আমরা কোন তিমিরে

আমরা কোন তিমিরে

আই কান্ট ব্রিদ

আই কান্ট ব্রিদ

গির্জার ধর্মীয় বোধ, বাঙালির ঈদ

গির্জার ধর্মীয় বোধ, বাঙালির ঈদ

আনিসুজ্জামান, দেবেশ রায়। একে একে নিবিছে দেউটি

আনিসুজ্জামান, দেবেশ রায়। একে একে নিবিছে দেউটি

করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর ব্যাধি ধেয়ে আসছে ইউরোপে

করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর ব্যাধি ধেয়ে আসছে ইউরোপে

জনসংখ্যা বেড়ে যাবে?

জনসংখ্যা বেড়ে যাবে?

সর্বশেষ

দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান সূর্য আমরা

একনজরে অর্থনীতির ৫০দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান সূর্য আমরা

শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চলছে তারাবো পৌরসভা নির্বাচনে 

শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চলছে তারাবো পৌরসভা নির্বাচনে 

বাইডেনের অভিষেকের আগেই হোয়াইট হাউজ ছাড়বেন ট্রাম্প

বাইডেনের অভিষেকের আগেই হোয়াইট হাউজ ছাড়বেন ট্রাম্প

চান্দিনায় ইভিএমে ভোগান্তি

চান্দিনায় ইভিএমে ভোগান্তি

হাসপাতালের স্টাফদের অবহেলায় সিঁড়িতেই সন্তান প্রসব

হাসপাতালের স্টাফদের অবহেলায় সিঁড়িতেই সন্তান প্রসব

বিএনপি সমর্থিত মেয়র-কাউন্সিলরদের ভোট বর্জন

বিএনপি সমর্থিত মেয়র-কাউন্সিলরদের ভোট বর্জন

উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট চলছে

উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট চলছে

মেইল সর্টিং সেন্টার: কমবে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য, কৃষক পাবেন পণ্যের ন্যায্য মূল্য

মেইল সর্টিং সেন্টার: কমবে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য, কৃষক পাবেন পণ্যের ন্যায্য মূল্য

যুক্তরাজ্যে সব ধরণের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা

যুক্তরাজ্যে সব ধরণের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা

পুতুলের ভেতরে করে ইয়াবা পাচার

পুতুলের ভেতরে করে ইয়াবা পাচার

দ্বিতীয় দফায় ভোটগ্রহণ চলছে

দ্বিতীয় দফায় ভোটগ্রহণ চলছে

ভিআইপিদের স্বার্থে চার দিনের কোয়ারেন্টিন!

ভিআইপিদের স্বার্থে চার দিনের কোয়ারেন্টিন!

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.