সেকশনস

লকডাউন

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২০, ০৮:১২

সকাল থেকে ওসি সাহেবের রুমে বসে আছেন ইদ্রিস তালুকদার। ওসি সাহেব মহা ব্যস্ত মানুষ। কিছুক্ষণ পরপর ফোন আসে। 

ফোন আসলেই বলে ওঠেন, ‘জ্বি স্যার, জ্বি স্যার, জ্বি স্যার।’ ঠিক গুণে গুণে তিনবার। কী অদ্ভুত!

ওনাকে দেখলে মনে হবে উর্ধ্বতন ব্যক্তিটি ওনাকে সরাসরি দেখছেন। যদি ঠিকঠাক সম্মান না করেন তবে চাকরিটা বুঝি চলে যাবে। যেমন, সকালে থানায় এসেই তিনি একটা সিগারেট ধরালেন। এমন সময়েই ফোন আসলো। উনি ফোনটা ধরেই সিগারেট পেছনে লুকিয়ে বলছেন ‘জ্বি স্যার, জ্বি স্যার, জ্বি স্যার’।

তবে শুধু যে জ্বি স্যার, জ্বি স্যার করেন তা কিন্তু নয়। মাঝে মাঝে গালাগালিও করেন। সেটা ফোনের ওপ্রান্তের মানুষটার শ্রেণি বুঝে।

একবার ফোন ধরে উনি কিছুক্ষণ শুনলেন। তারপর চিৎকার করে বলে উঠলেন, শুয়োরের ছেলের পিছন দিয়ে গুলি করে দেবো। 

আবার কাকে যেন ফোনে বললেন, মাল কামাও? মিছা কথা কও? মুখের মধ্যে মুতে দিব হারামজাদা।

গালিগুলো বেশ ভদ্রচিত মনে হলো ইদ্রিসের। তার ধারণা ছিল এর চাইতেও জঘন্য গালি তারা দিয়ে থাকে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে—নাহ গালিরও একটা লেভেল নিশ্চয়ই মেইনটেইন করা হয়।

ইদ্রিস সকাল থেকে ওসির কাণ্ড-কারখানা দেখে বেশ মজা পাচ্ছে। অদ্ভুত সব কাণ্ড-কারখানা বেশ বিনোদনের।

ইদ্রিস তালুকদারের বয়স ৫১। ওসির চেয়ে বয়সে বড় হবে। তবুও ইদ্রিসকে তুমি তুমি করে সম্বোধন করে কথা বলছে ওসি।

ওসির নামটাই তো বলা হলো না। ওসির নাম হলো—মো. আকবর আলী।

ইদ্রিসকে থানায় আনা হয়েছে ভোরবেলা। এক এসআই গিয়ে বাড়ির দরজা ভেঙে ইদ্রিসকে থানায় নিয়ে এসেছে। এসআইয়ের নাম মো. ইকবাল হোসেন।

এসআই যখন ইদ্রিসকে থানায় নিয়ে আসে তখন এক নারী থানায় বসা ছিলো। নারীটিকে দেখে এসআই ইকবাল ঢুকেই জিজ্ঞেস করলো, এই ভোর বেলা একটা মেয়ে মানুষ থানায় কী করেন?

মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, স্বামী মারছে। মামলা করতে আইছি।

ইকবাল ভ্রু কঁচকে বলল, মারলে মারছে। মারাই উচিত। যেই বউ ভোর বেলা বাইর হইয়া থানায় আসে তারে মারা উচিত মানে কী, কান ধইরা উঠ-বস করানো উচিত।

এটা শুনে ইদ্রিসের খুব খারাপ লাগলো। এটা মোটেও একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকের বলা ঠিক হয়নি।

ইদ্রিস বলেও ফেললেন।  

—বাবা ইকবাল আপনি কথাটা ঠিক বলেননি। স্বামী মেরেছে। নিশ্চয়ই স্বামী তাকে অনেকদিন ধরেই নির্যাতন করছে। এজন্যই তো এসেছে।

—তাই নাকি? আপনি মনে হয় সব জানেন?

ইদ্রিস একটু হেসে বললেন, জানতে হয়। শিক্ষক ছিলাম তো। মানুষের মন বুঝতে পারাই তো আমাদের কাজ। যে মেয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস রাখে, তার জন্য গভীর রাত কী আর দিন কী? সে তো সাহসী। তার জন্য থানায় পৌঁছানোটাই আসল। তার মামলাটা নিন দয়া করে।

এসআই ইকবাল কেন যেন বিরক্ত হলো না। তবে একটা রাগ রাগ চোখ করে মেয়েটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল। তারপর মেয়েটাকে নিয়ে পাশের রুমে চলে গেলো।

এরপর এসে ইদ্রিসকে বললো, আপনি থাকেন। সকালে স্যার আসবেন। উনি ভাববেন আপনাকে নিয়ে কী করবে।

তো, ভোর থেকে একটা চেয়ারে হেলান দিয়েই পার করে দিয়েছেন ইদ্রিস সাহেব। সকালে এসআই বের হওয়ার সময় বলে গেলো নাস্তার ব্যবস্থা করে দিতে।

ইদ্রিসের একটু শীতশীত লাগছে। মনে হচ্ছে জ্বরও আসবে। কিন্তু এই থানায় বসে থাকতে তার অবশ্য খারাপও লাগছে না। মনে হচ্ছে জীবনের এই পর্যায়ে একটা এডভেঞ্চার হলো। মন্দ কী!

তো, সকাল ঠিক নয়টায় ওসি আকবর আলী এসে ঢুকলেন। ঢুকেই জিজ্ঞেস করলেন, কী সমস্যা?

ইদ্রিস কিছু বলতে যাবে এমন সময় ওসি সাহেব ডুব দিলেন পত্রিকায়।

বোঝা গেলো খুব একটা মনোযোগ নেই। তাই আর কথা আগায়নি।  এভাবেই কেটে গেলো অনেক সময়।

ভোর আনুমানিক ৪.৫৪ মিনিটে তাকে থানায় ওসির রুমে বসানো হয় ইদ্রিসকে। এখন বাজে বিকেল ৫.২০। এখনও কেউ তার সঙ্গে কোনো আলাপ আলোচনা করেনি। মাঝে একবার শুধু ওসি সাহেব জিজ্ঞেস করেছিলেন, নাম কী তোমার?

—জ্বি ইদ্রিস তালুকদার।

একটা ফাইলে চোখ বোলাতে বোলাতে ওসি আকবর আলী বললেন, আত্মহত্যা করতে চাও? খারাও ভরে দেব আত্মহত্যা। জীবনে আর মরতে চাইবা না।

ইদ্রিস তালুকদার পেশায় শিক্ষক, গ্রামে সবাই ডাকে ইদ্রিস মাস্টার নামে। বয়সে কম একজন ব্যক্তি যখন বাজে ভাষায় কথা বলে উনি সেটা নিতে পারেন না। এটাও পারেননি। কিন্তু পোশাক যার শরীরে সে তো সবচাইতে ক্ষমতাধর। এমন ক্ষমতাধরদের সামনে বলার ক্ষমতা আবার ইদ্রিসের নেই। সে একটা ইঁদুরের মতো। ইঁদুর যেমন গর্তে লুকিয়ে থাকে। ইদ্রিসও তাই।  গর্তে লুকিয়ে থাকা এক মানুষ। খুব সহজে মনে ব্যথা পান, খুব সহজে খুশি হন।  

তবে এটাও কিন্তু সত্য ইদ্রিস আত্মহত্যা করতে চেয়েছেন। আত্মহত্যার সব আয়োজন সম্পন্নও করে ফেলেছিলেন। এই আয়োজন তিনি করেছেন গত এক সপ্তাহ ধরে।

কী কী আয়োজন করেছেন তা বলার আগে বলা উচিত কেন তিনি আত্মহত্যা করবেন এই প্রশ্নের উত্তর আপনাদের সামনে হাজির করা।  

ইদ্রিস তালুকদার গ্রামের স্কুলের শিক্ষক, পড়ান গণিত ও বিজ্ঞান।

সম্প্রতি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। স্কুলের মান নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেন না। ছাত্ররা বেয়াদব হয়ে গেছে। তার চাইতেও বেয়াদব হয়ে গেছে নতুন জয়েন করা শিক্ষকরা। মুখের ওপর যা তা বলে ফেলে। মুখ খারাপ করে কথা বলে। এছাড়াও আগে স্কুলে স্থানীয় রাজনীতিবিদদের হস্তক্ষেপ ছিলো। কিন্তু তবুও শিক্ষকদের সম্মান দিয়ে কথা বলতো। এখন রাজনীতিবিদরা এক একজন শিক্ষকের চাইতেও মহা শিক্ষক। মনে করেন জগতের সবকিছুই তিনি জানেন। সকল শিক্ষকই তার ছাত্র।

তো, শিক্ষক হয়েও স্থানীয় চেয়ারম্যানের ছাত্র হয়ে থাকাটা ইদ্রিস মেনে নিতে পারছিলেন না। চেয়ারম্যানের বয়স ২৬-২৭ হবে। নতুন চেয়ারম্যান।  তার নাম আরাফাত হোসেন। সে আবার এই আসনের সংসদ সদস্যের ছেলে। সুতরাং দুইয়ের সঙ্গে দুই যোগ করে তার ক্ষমতা হলো চার। ইদ্রিসের সেখানেও সমস্যা নেই। সমস্যা হলো আরাফাত ছিল তারই ছাত্র।

মাস্টারি জীবনে তার অনেক ছাত্রই দুষ্টু ছিল। পড়ালেখায় দুর্বল ছিল। তাদের সবার প্রতিই ইদ্রিসের অসীম ভালোবাসা, স্নেহ। সবসময় ভালো ছাত্র-খারাপ ছাত্র বলে কাউকেই তিনি আলাদা করেননি। তিনি মনে করতেন, কেউ কেউ দ্রুত পড়াটা দখলে নিতে পারে, কেউ কেউ ধীরে ধীরে। এই ধীরে আয়ত্বে নেওয়া ছাত্রদের তিনি বিশেষ খেয়াল রাখতেন। কাউকে তিনি দূরে ঠেলে দেননি। বিনা শ্রমে ক্লাসের বাইরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তিনি তার দুর্বল ছাত্রদের পড়িয়ে আসতেন।

কিন্তু ক্লাসে কিছু ক্ষমতাবানদের ছেলে থাকে, যারা ক্ষমতার চর্চা করতে পছন্দ করে। তেমনই ছিল আরাফাত। তার বাবা তখন স্থানীয় চেয়ারম্যান। আরাফাত ফেল করতো। কিন্তু কীসের শক্তিতে যেন পাস করে যেত! বলা মুশকিল। জানে সবাই। কিন্তু বলা তো মুশকিল। ক্ষমতাবানদের নিয়ে কিছু বলাই তো মুশকিলের কথা।

তো, ক্লাস টেনের পর পাস-ফেল তো আর স্কুলের হাতে নেই। ওটা চলে গেলো বোর্ডের হাতে। সেখানে একজন স্থানীয় চেয়ারম্যানের কি ক্ষমতার শক্তি কাজে দেবে?

যদিও স্কুলের প্রধান শিক্ষক ভেবেছিলেন কাজে দেবে। আসলে সত্য হলো ক্ষমতা সব জায়গায় কাজে দেয় না। স্বাভাবিকভাবেই তৎকালীন চেয়ারম্যান পুত্র এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করে বসলো।

এখন সব দোষ কার?

সব দোষ স্কুলের প্রধান শিক্ষকের। এই স্কুলে পড়াশোনা হয় না, শিক্ষকরা ঠিক মতো পড়ায় না, পড়ার মান খারাপ—এই জন্যই নাকি চেয়ারম্যান সাহেবের ছেলে ফেল করেছে।

যাহোক, তারপর আরাফাত চলে গেলো ঢাকায়। মাঝে মাঝে এলাকায় দেখা হতো। দেখা হলে ইদ্রিসকে দেখে জিজ্ঞেস করতো, ভালো আছেন নাকি?  

ইদ্রিস মাথা নেড়ে জবাব দিত।

ঢাকায় আরাফাত হোসেন কী করতো তা কারো জানা নেই। তবে সবাই জানতো আরাফাত নাকি ঢাকায় গিয়ে পড়াশোনাই করতো।

সময়ের তালে চেয়ারম্যান আরও উপরে উঠে গেলেন। পেলেন আরও বড় পদে। অর্থাৎ হয়ে গেলেন সংসদ সদস্য। তো, বাবা যদি বড় হয় ছেলেকেও তো বড় বানাতে হবে।

তাই এক দেড় বছরের মাথায় চেয়ারম্যান নির্বাচনে ছেলেকে দাঁড় করিয়ে দিলেন। আর জিতেও গেলেন। 

যেহেতু চেয়ারম্যান হলেন সেহেতু তো স্কুলের অভিভাবকও হলেন। এটাই তো স্বাভাবিক।

এরপর থেকেই যত গণ্ডগোল শুরু হয়ে গেলো। আরাফাত হয়ে গেলো শিক্ষকদের মহাশিক্ষক। নিয়মিত স্কুলে জ্ঞান দান করেন। শিক্ষকদের কীভাবে পড়ানো উচিত, কী করা উচিত, কীভাবে শিক্ষক নিয়োগ হওয়া উচিত, কাদের শিক্ষক হিসেবে নেয়া উচিত, ছাত্রদের কীভাবে রাজনীতি শেখাতে হবে—এসব বিষয়ে বিপুল জ্ঞানভাণ্ডার উজাড় করে দিতে শুরু করলেন চেয়ারম্যান আরাফাত।

এমনকি স্কুলের সব অনুষ্ঠানে তিনিই প্রধান অতিথি। সেখানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে নীতিবাক্য বলেন। এসব দেখে দেখে অস্থির হয়ে পড়ছিলেন ইদ্রিস সাহেব।

ইদ্রিস সাহেব খেয়াল করলেন আরাফাত তার ছাত্র হয়েও তাকে আর স্যার ডাকে না। তাকে সম্বোধন করে ‘ইদ্রিস সাহেব’ হিসেবে।

ভাগ্যিস অন্তত ‘সাহেব’ বলে। নাম ধরে তো ডাকে না। এ-ই বা কম কী?

তবুও তার মনে হচ্ছিল স্কুলটা দিনকে দিন মেরুদণ্ডহীন একটা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়ে পড়ছে। কেউ কোনো কথা বলতে পারে না, কেউ কোনো উদ্যোগ নিতে পারে না। সব কিছুর জন্য চেয়ে থাকা লাগে চেয়ারম্যানের দিকে। চেয়ারম্যান যদি হ্যাঁ বলে তাহলে সবাই বলবে হ্যাঁ। চেয়ারম্যান যখন না বলবে তখন সবাই বলবে ‘না’।

প্রধান শিক্ষককে উঠতে বসতে ধমকান চেয়ারম্যান। সিনিয়র শিক্ষকদের পাত্তা দেন না। অনেককে মুখের উপর বলে বসেন, ‘কী বাল পড়ান?’

স্কুলের উন্নয়নের টাকা আসে, সেটা কোথায় যায় কী হয়—প্রধান শিক্ষকও জানেন না। ঘোড়ার মতো মাথা ঝাঁকায় স্কুলের সবাই। যেন আশেপাশে কী হচ্ছে কেউ কিছু দেখছে না, কেউ কিছু শুনছে না। সবার চোখ দুটি কীসে নিমগ্ন ভেবে পায় না ইদ্রিস।

ইদ্রিস ঘোড়া নয়। সে তো মানুষ। তাই স্কুলের চাকরি ছেড়ে দেয়াই নিরাপদ ভেবেছিল। আর সে বিয়েও করেনি। একা নিঃসঙ্গ জীবন। চাকরি ছেড়েও বাপ-দাদার ভিটায় আরামে থাকতে পারবে। এসব ভেবেই চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে বসে।

কিন্তু এটাতেও ক্ষুব্ধ হয় চেয়ারম্যান। তাকে ডেকে পাঠিয়ে কারণ জানতে চায়। ইদ্রিস কিছু বলে না। শুধু বলে, আমার অস্থির লাগে তাই ছেড়ে দিচ্ছি।

আরাফাত সেদিন মুখের ওপর বলে দিল, শিক্ষকতা করতে আইছেন, আবার অস্থির লাগে কেন? বালের শিক্ষক হইছেন?

ছাত্রের মুখে এই কথা কেন যেন ইদ্রিস সহ্যই করতে পারেনি। তার শুধু মনে হচ্ছিল, তার জীবনের সব শ্রম বৃথা। সব শিক্ষা বৃথা। সব ছাত্ররা যেন সম্বরে বলে ফেলল, ‘বালের শিক্ষক হইছেন?’

দিনের পর দিন, রাতের পর রাত ঘুমাতে পারেনি। আর তখনই সিদ্ধান্ত নেয় তিনি আত্মহত্যা করবেন। এই জীবন তার কাছে সেদিন থেকে হুট করে তুচ্ছ মনে হচ্ছে। সারাক্ষণ তার কানে বাজতে থাকে ‘বালের শিক্ষক হইছেন?’। 

তিনি সিদ্ধান্ত নেন আত্মহত্যা করার আগে একটা চিঠি লিখে যাবেন। চিঠিটা অবশ্য লিখেও রেখেছেন। এখনও বুক পকেটে আছে।

আর তাই গত এক সপ্তাহ ধরে তিনি তার পছন্দের খাবার খান। ফল খান। পুরো গ্রামে ঘুরে ঘুরে বেড়ান মনের আনন্দে। তার কাছে মনে হওয়া শুরু হলো এই সুন্দর গ্রামটা পুনরায় আবিষ্কার করে বেড়াতে। মানুষ দেখেন, প্রকৃতি দেখেন, পুকুর পাড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন, গুনগুন করে গান গান, পাখিদের কিচিমিচির শব্দে চোখ বন্ধ করে মগ্ন হয়ে পড়েন।    

এর মধ্যেই তিনি একদিন বাজারে গেলেন খাশির মাথা কিনতে। বুটের ডাল দিয়ে খাশির মাথা খাবেন। তার বড্ড প্রিয় খাবার। নিজে রাঁধবেন। বাজারে কশাইকে বললেন, খাশির মাথা বানাও। বাড়িত নিমু। কয়দিন আর বাঁচমু। খাইয়া নেই।

ঠাট্টায় বললেও কশাইয়ের কানে বাজে। সে তখন হিসেব মেলানো শুরু করে। বাজারে অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারে ইদ্রিস গত কয়েকদিন বাজারে আসছেন নিয়মিত। ইলিশ মাছ কেনেন, রুই কেনেন, ফল কেনেন। মাঝে একদিন নাকি রশিও কিনেছেন। টাইট কিনা সেটার জন্য টেনে টুনে পরীক্ষাও করেছেন।

বাজারের থেকেই খবরটা পৌঁছায় থানায়। কীভাবে পৌঁছায় তা আমরা অবশ্য জানি না। আমরা শুধু জানি সেদিন ভোরে হঠাৎ দরজায় নক না করে ধাক্কা দিয়ে ভেঙে এসআই ভেতরে ঢুকে ইদ্রিসকে প্রশ্ন করেন, আপনি নাকি আত্মহত্যার চেষ্টা করতেছেন?

ইদ্রিস হুট করে ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন। কিছু বুঝতে না পেরেও কাঁপতে কাঁপতে বললেন, কে বললো?

এসআই জিজ্ঞেস করলেন, যা জিজ্ঞেস করেছি, সেটা বলেন। হ্যাঁ নাকি না?

ইদ্রিস বললেন, হ্যাঁ।

তড়িৎ তখন এসআই নিয়ে আসলেন থানায়।

এই হলো মূল গল্প।  

তো, থানায় ভোর থেকে আছে। ওসি আকবর আলী তো ঠিক মতো কথাই বলছে না। বেলা পড়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ভোর রাতে আসা সেই মেয়েটা আবার এসেছে।

এবার সে ওসিকে বলছে, স্যার গতরাতে একটা মামলা করতে আইছিলাম। আজকে তো আমার স্বামীরে ধইরা আনছেন। ওনারে ছাইরা দেন।

আকবর আলী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর কাগজ দেখে বলেন, আপনেই তো অভিযোগ দিলেন। আপনারে মারছে। আজকে আবার কী হলো?

—স্যার কালকে রাগের মাথায় মামলা করে দিছি। আজকে রাগ নাই। ছাইড়া দেন।

ওসি বিরক্ত হয়ে বললেন, ছাড়া যাবে না। এটা কোর্টে চালান দেব। ওখান থেকে ছাড়াইয়া নিয়েন।

তবুও মেয়েটা বসে আছে। যায় না।

সন্ধ্যা তখন ৭টা বাজে। মাঝে ওসি সাহেব বেরও হয়েছিলেন। সারাবিশ্বে কী এক ভাইরাস নাকি ছড়িয়েছে। বাংলাদেশেও নাকি ছড়াবে। এলাকায় যত বিদেশ ফেরতরা এসেছেন তাদের খোঁজখবর নিতে বের হয়েছিলেন। তাদের একঘরে থাকতে বলা হয়েছিল। সেটাই মনে হয় খোঁজখবর নিতে গেছেন।

এসব করে এসেই তিনি এবার ইদ্রিসের সঙ্গে বসলেন। বলেন, কেন আত্মহত্যা করবেন?

—জ্বি এটা ব্যক্তিগত বিষয়।

—জন্ম আর মৃত্যু ব্যক্তিগত বিষয় না। বিয়াডা ব্যক্তিগত বিষয়। 

ইদ্রিস দেখলেন এবার ওসি সাহেব তাকে আপনি করে কথা বলছেন। তাই কিছু সম্মানবোধ করলেন।

—আমাকে ছেড়ে দিন। আমি বাসায় যাবো। সারাদিন থেকে এখন শরীরটা ভালো লাগছে না।  

ওসি আরেকটা সিগারেট ধরালেন। তারপর বললেন, আইনের দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারায় বলা আছে, যে ব্যক্তি আত্মহত্যা করার উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং অনুরূপ অপরাধ অনুষ্ঠানের উদ্দেশে কোনো কাজ করে সে ব্যক্তি বিনাশ্রম কারাদণ্ডে, যার মেয়াদ এক বছর হতে পারে বা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। সুতরাং আপনি ৩০৯ ধারায় সাজা পাবেন। আপনাকে কোর্টে নেওয়া হবে।

ইদ্রিসের শরীরটা এখন আসলেই ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে কিছুটা জ্বর এসেছে। তিনি কিছু না ভেবেই ওসিকে বললেন, আপনাদের এখানে কি শোবার কোনো ব্যবস্থা আছে? শরীরটা ভালো লাগছে না। একটু কি শুতে পারি?

আকবর আলীর মেজাজটা এবার একটু খারাপ হয়। তিনি চেঁচিয়ে উঠে বলেন, আজব তো! থানা কি চিৎ কাইৎ হইয়া শোয়ার জায়গা নাকি? আপনি কি ফাইজলামি করেন?

কথা শেষ হয়ে সারেনি। তার আগে কাঁৎ হয়ে পড়ে গেলেন ইদ্রিস তালুকদার।

ভেবাচেকা খেয়ে নিজের চেয়ার ছেড়ে দ্রুত উঠে আলতো করে মাথাটা তুলে ধরলেন ওসি। দেখলেন শ্বাস আছে।

তিনি কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও বলে উঠলেন, ওই গাড়ি বের কর, হাসপাতালে নিতে হবে।

দ্রুত গাড়ি বের করা হলো। প্রথমে গেলেন থানার কাছেই ক্লিনিকে। সেখানে থেকে বলা হলো জেলা হাসপাতালে নিতে।

ওসি তাদের অনুরোধ করেছিলেন প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার বিষয়ে। তারা রাজি হয়নি। তারা জানালো, দেয়া যেত কিন্তু করোনা পেশেন্ট হলে সমস্যা। সুরক্ষার পোশাক নেই, এখনো পৌঁছায়নি। তাই জেলা হাসপাতালেই নিলে ভালো।

ওসি গাড়ি ঘুরিয়ে জেলা হাসপাতালে রওনা দিলেন। ফোন দিলেন প্রথমে সিভিল সার্জনকে।

—স্যার গত রাতে এক ব্যক্তি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তাকে আমরা থানায় নিয়ে আসি। আজকে একটু আগে থানাতেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে গেছেন। এখন মনে হচ্ছে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। জেলা হাসপাতালে একটু বলে দেবেন?  

সিভিল সার্জন এসব শুনেই প্রশ্ন করে বসলেন।

—জ্বর ছিল? দেখেছেন?

—না স্যার, আসামির জ্বর আছে কি নাই তা তো আমরা দেখিনি।

—কাশি ছিল, জানেন?

—না স্যার। তবে এখন শ্বাসকষ্ট আছে।

—বিদেশ ফেরত কারো সংস্পর্শে এসেছেন?

—তাও আমি জানি না স্যার।

—যাইহোক, নিয়ে যান। আমি বলে দিচ্ছি।

জেলা হাসপাতালে নিতে নিতে সাড়াহীন হয়ে পড়লেন ইদ্রিস তালুকদার। সেখানে দীর্ঘ দেড় ঘণ্টা ওসির গাড়িতেই নিথর দেহটা পড়েছিল। কেউ আসেনি।

আকবর আলী কী করবে? ফোন দিয়েছে সিভিল সার্জনকে, ফোন দিয়েছে হাসপাতাল পরিচালককে, উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে। কেউ শোনেনি। সবারই একটা কথা—নিরাপত্তামূলক পোশাক এসে এখনও পৌঁছায়নি।  

আকবর আলী বুঝে পায় না কী করবে।

আরে নিরাপত্তামূলক পোশাক তো ওসিরও নেই। তাই বলে কি তিনি বসে ছিলেন? কী শুরু হলো এই দেশে? রাগ-ক্ষোভ-দুঃখে ভেঙে পড়তে শুরু করেন আকবর আলী। 

এরইমধ্যে স্থানীয় সাংবাদিকদের ফোন আসা শুরু হয়ে গেছে। অনেকে নাকি নিউজও করে দিয়েছে, থানা হেফাজতে আসামির মৃত্যু। কেউ করেছে থানা হেফাজতে করোনা রোগীর মৃত্যু। যেন দ্রুত কোনো আগুন ছড়িয়ে পড়লো। এই দাবানল যেন গ্রাস করে দেবে আকবর আলীকে।  

আকবর আলী নিরুপায় হয়ে কিছুক্ষণ ইদ্রিসের দিকে চেয়ে ছিল। আর বারবার ফোন দিচ্ছিল হট লাইনে। যেখান থেকে একটা সহযোগিতা অন্তত পাবে।

মনে হয় চার ঘণ্টা পর লাইন পেলো। সব শুনে তারা আশ্বস্ত করলো, ইনি করোনা রোগী নন। আপনি স্বাভাবিকভাবেই সব কাজ শেষ করুন।

এই কথা সিভিল সার্জনকে জানানো হলো। হাসপাতালকে জানানো হলো। কিন্তু কে শুনবে কার কথা? কে বিশ্বাস করবে? দাবানলের মতো গ্রামে ছড়িয়ে পড়লো ইদ্রিস মাস্টার করোনায় মরে গেছে। তার বাড়ির আশপাশ দিয়েও লোকচলাচল বন্ধ হয়ে গেলো।

অসহায় আকবর আলী।

কী করবে এই দেহ নিয়ে? যে দেহের কেউ নেই। তাকে তিনি কী করবেন? হাসপাতালে রাখতে চাইলেও কর্তৃপক্ষ রাজি হয়নি।

অসহায় হয়ে নিথর দেহ নিয়ে পুনরায় রওনা দেন থানার দিকে। ফোন দেয় আঞ্জুমান মফিদুলকে। তারা আশ্বাস দেয় লোক পাঠানোর। ঠিক ওই সময় ইদ্রিসের পকেট থেকে বেরিয়ে আসে একটা চিঠি।

চিঠিটি খুলে ওসি পড়েন। সেখানে লেখা, আমি শিক্ষক। আমি স্বেচ্ছায় আত্মহত্যা করিলাম। আমার ছাত্রদের বলে দিয়েন, আত্মহত্যা করলেও তাদের শিক্ষক মেরুদণ্ডহীন প্রাণী ছিল না, তবে ইঁদুর ছিল, গর্তেই যার বসবাস।

চিঠির নিচে ছোট্ট একটা সিগনেচার। চিঠিটা তিনি সাবধানে রাখলেন।

থানায় গিয়ে দেখলেন একটা সরকারি অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। ইদ্রিস তালুকদারকে নিয়ে যাবে।

এসআই ইকবাল আবার নাইট ডিউটিতে যোগ দিয়েছে।

হতবিহ্বল।

নিস্তব্ধ পুরো এলাকা। যেন এ কী হলো, কেন হলো—এক প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে চারদিকে। থানায় স্বামীর মুক্তি চেয়ে ওই নারীটিও অবাক। এ কী হয়ে গেলো?

ঠিক তখনই আকবর আলীর ফোনে বার্তা হলো, আপনার থানার মৃত ব্যক্তি নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় আনা হবে। পরীক্ষার ফলাফল পর্যন্ত আপনার থানা লক ডাউন। সকলে থানায় অবস্থান করুন। 

আকবর আলীর স্মৃতিপটে ইদ্রিসই যেন লকডাউন হয়ে পড়লো। যেন এক গর্তে আকবর আলী ইঁদুরের মতো আটকে গেলো। এক ভ্রম তাকে ঘিরে ধরে যেন ক্রমাগত গহিন এক গর্তে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো।

//জেডএস//

সম্পর্কিত

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

সম্পর্ক; আপন-পর

সম্পর্ক; আপন-পর

সন্ধ্যারাতে কাঁটাবন যাত্রা

সন্ধ্যারাতে কাঁটাবন যাত্রা

স্বর্ণ পাঁপড়ি নাকফুল মেঘজল রেশমি চুড়ি

স্বর্ণ পাঁপড়ি নাকফুল মেঘজল রেশমি চুড়ি

জন্ডিস ও রঙমিস্ত্রীর গল্প

জন্ডিস ও রঙমিস্ত্রীর গল্প

জলরঙে স্থিরচিত্র

জলরঙে স্থিরচিত্র

অ্যালার্ম

অ্যালার্ম

জরু সমাচার

জরু সমাচার

সর্বশেষ

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

থমকে আছি

থমকে আছি

সালেক খোকনের নতুন বই ‘অপরাজেয় একাত্তর’

সালেক খোকনের নতুন বই ‘অপরাজেয় একাত্তর’

আমরা এক ধরনের মানসিক হাসপাতালে বাস করি : মাসরুর আরেফিন

আমরা এক ধরনের মানসিক হাসপাতালে বাস করি : মাসরুর আরেফিন

মুরাকামির লেখক হওয়ার গল্প

মুরাকামির লেখক হওয়ার গল্প

সম্পর্ক; আপন-পর

সম্পর্ক; আপন-পর

সন্ধ্যারাতে কাঁটাবন যাত্রা

সন্ধ্যারাতে কাঁটাবন যাত্রা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.