সেকশনস

সমরেন্দ্র নাথ, বুড়ি মা ও শেখ মুজিব

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২০, ১৪:০০

হাতের ব্যাগটা টেবিলের উপর রেখে শেখ মুজিব বসলেন চেয়ারে। আড়মোড়া ভাঙ্গলেন। সামনে এসে দাঁড়িয়েছে অনুদা, হাতে এক গ্লাস পানি। অনুদা’র প্রকৃত নাম অমরেন্দ্র নাথ। মুজিবের সঙ্গে স্কুলে এক ক্লাস নিচে পড়েছেন। পড়াশুনা বাদ দিয়ে বাবার মৃত্যুর পর পাটগাতী বন্দরে মিষ্টির দোকানের হাল ধরেছেন।

শেখ মুজিব হাসি মুখে হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা নিয়ে একটানে পানি খেয়ে খালি গ্লাসটা টেবিলের উপর রাখলেন। সঙ্গে সঙ্গে অনুদা একটা পিরিচে করে চারটে সাদা মিষ্টি এনে রাখেন মুজিবের সামনে টেবিলের উপর। মুজিবের কিছু বলার থাকে না। মৃদু হাসেন। দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতায় জানেন,  যখন  যেদিনই স্টিমার থেকে নেমে অনুদা’র দোকানে আসেন, অনুদা নিজের হাতে প্রথমেই এক গ্লাস পানি দেবেন। পানি খাওয়া শেষ হলে দেবেন চারটে মিষ্টি। মিষ্টি খেতে পছন্দ করেন মুজিব। কিন্তু চারটা খেতে পারেন না। দুটি মিষ্টি খান ধীরে ধীরে। মিষ্টি খাওয়ার সময়ে অনুদা সামনের চেয়ারে বসে খুটিয়ে খুটিয়ে ঢাকার রাজনীতির পরিস্থিতি জেনে নেন।

এইবার তো ছয় মাস জেলে খাইট্যা বের হইলেন দাদা?

মুখের মিষ্টি চিবুতে চিবুতে জবাব দেন মুজিব, হ দাদা। মাত্র ছয় মাস। কইতে গেলে জেলখানাই আমার ঘরবাড়ি, সংসার...

দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করেন অনুদা, বড় কষ্ট লাগে আপনের লাইগা...

চামুচে করে মিষ্টির অংশ মুখের কাছে নিয়েও থেমে যান মুজিব, কেন দাদা?

পাকিস্তান পাকিস্তান কইরা মুহে ফেনা তুললেন, সব মানুষরে রাস্তায় নামাইলেন, এহন হেই সাধের পাকিস্তানে আপনারে মাসের পর মার জেল খাটতে হয়? গলা ভারী হয়ে আসে অনুদা’র।

শেখ মুজিব একটু সময় নিয়ে মিষ্টিটুকু খেয়ে পিরিচ টেবিলের উপর রাখেন। গ্লাসে থাকা বাকি পানিটুকুও খেলেন, একটু সময় নিয়ে মুখ খুললেন মুজিব, দাদা কষ্ট পাইয়েন না। আমি তো আমার জন্য রাজনীতি করছি না। আমি রাজনীতি করছি এই দ্যাশের দুঃখী মানুষের লাইগা। আর রাজনীতিতো সুখের কোনো পাটিগণিত না। জাইনা শুইনা আমি রাজনীতি করি। পাকিস্তান হওয়ার পর কলিকাতা থেকে আমি ঢাকায় আইসাই বুঝতে পারছি, আমরা যে পাকিস্তানের জন্য জান বাজি রাইখা লড়াই করছি, কলিকাতার রাস্তায় রাস্তায় মিছিল পিকেটিং করছি, এই পাকিস্তান সেই পাকিস্তান না। আমাগো আরও লড়াই করতে অইবে দাদা...

কোত্থেকে খবর পেয়ে ছুটে আসেন মোল্লা জালাল, জাহানেরা দুই ভাই—সরদার রহমত জাহান আর সরদার সরোয়ার জাহান।

তোরা ক্যামন আছোস? দোকানের মধ্যে শেখ মুজিবের গলা গম গম করে ওঠে।

ভালো, আপনে তো কিছু জানাইলেন না—

কী জানামু? পায়ের উপর পা তুলে আয়েশ করে বসলেন মুজিব, জেল থেকে ছাড়া পাবার সঙ্গে সঙ্গে মনে হইলো হাচুরে দেখি না অনেক দিন। আমার প্রথম সন্তান। বয়স দেড় বছর হইলো মেয়েটার। আওয়ামী লীগ অফিসে গেলাম। পাইলাম শওকতরে। কইলাম, বাড়ি যামু। ও-ই ব্যাগ গুছাইয়া দিলো, একটা রিকশা লইয়া সদরঘাট, সদরঘাট থেকে লঞ্চে। তোগো জানানোর সময় পাই নাই। আর জানিতো, পাটগাতি নামলেই তোগো কারোরে না কারোরে পাইয়াই যামু।

মোল্লা জালাল, দুই জাহান ভাইয়ের মুখে স্মিত হাসি ঝুলে থাকে। মুখ বাড়ায় বড় জাহান, হয় আপনে ঠিকই কইছেন।

আপনে টুঙ্গিপাড়া এহনই যাইবেন? জাহান ভাইয়ের ছোট ভাই সরদার সারোয়ার জাহানের প্রশ্ন।

সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়ালেন শেখ মুজিব, এখনই যামু। বিকাল তো হইয়া গেছে। কোনো টাপুরিয়া পাওয়া যাইবে?

আপনে বসেন, আমি আইতেছি… মোল্লা জালাল কোনো সুযোগ না দিয়ে নৌকার খোঁজে বের হয়ে গেলেন। অনুদা উঠে দুটি পিরিচে মিষ্টি এনে দিলেন দুই ভাইয়ের সামনে। দুই ভাই শেখ মুজিবের দিকে তাকালেন। শেখ মুজিব চোখ মটকে ইশারা করলে, দুজনে মিষ্টি খেতে লাগলেন।

পাটগাতি আসলে আমি আপনার দোকানে কম আসি দাদা।

মুজিবের প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে দুঃখ মিশ্রিত হাসিতে উত্তর দিলেন অনুদা, জানি।

বলেন তো, ক্যান কম আসি?

আপনার কাছ থেকে মিষ্টির দাম নিই না, সেই কারণে আমার দোকানে আসেন কম। আপনে অন্য দোকানে বসেন বেশী। কিন্তু আমি আপনাকে কই, আপনে যদি পেরতেক দিন আমার দোকানে আসেন, আমি আপনারে মিষ্টি খাওয়ামু কিন্ত দাম লইতে পারমু না।

কিন্তু এটাতো আপনের দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। দোকানের আয়ে আপনার সংসার চলে…

তা চলে কিন্তু আমি আমার বাবার আদেশ অমান্য করতে পারমু না।

শেখ মুজিবের শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে যায়, কী বলছেন আপনে?

হ দাদা, আমার বাবা বলে গেছেন আপনি যতদিন এই দোকানে আসবেন, আপনার কাছ থেকে দাম নিতে নিষেধ কইরা গেছে। আর আপনে দোকানে আসলে ভালো মিষ্টি দিয়া আপ্যায়ন করতে বইল্যা গেছে। বাবা আপনারে খুব স্নেহ করতো। বলতো, এই দেশে রাজনীতি তো অনেকেই করে, রাজনীতির লাইগা বা নিজের লাইগা, কেবল মজিবর মানুষের লাইগা রাজনীতি করে।

শেখ মুজিব নিচের দিকে তাকিয়ে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা নামিয়ে পাঞ্জাবির খোট দিয়ে মুছতে থাকেন। চোখে জল এসেছে। সামলানোর চেষ্টা করছেন। নিজের সঙ্গে কথা বলেন, কিইবা করতে পারলাম এই দেশের সাধারণ দুঃখী মানুষের লাইগা! তবুও আমারে মানুষ এতো ভালোবাসে!

দেখতে দেখতে বিকেলের আলোয় মিষ্টির দোকানের চারপাশে লোকের ভিড় জমে যায়। বাজারে আসা সাধারণ মানুষ খবর পেয়ে এসেছে শেখ মুজিবকে দেখতে ও কুশল জানতে। চশমা মুছে ভেজা চোখে চশমা পরে তিনি দাঁড়ালেন। প্রত্যেকের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন শেখ মুজিব দরদী গলায়, হাত মেলাচ্ছেন, বাড়ির বাবা-মা ভাইবোনের খবর নেয়া যখন শেষ, মোল্লা জালাল এসে দাঁড়ায়, মিয়া ভাই নৌকা পাইচি, চলেন।

চল, শেখ মুজিব টেবিলের উপর থেকে হাতে ব্যাগটা নিয়ে তাকান অনুদা’র দিকে, দাদা যাই। ভালো থাইকেন।

এগিয়ে আসেন অনু, দু’হাতে জড়িয়ে ধরেন শেখ মুজিবকে, আপনিও ভালো থাইকেন। শেখ মুজিবও গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরেন স্বর্গীয় সমরেন্দ্র নাথের পুত্র অমরেন্দ্র নাথ অনুকে। আলিঙ্গন শেষে শেখ মুজিব দোকান থেকে বের হলে এলে পিছনে জনতার ছোট একটা জটলার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি এখনও ভারাক্রান্ত! ভেতরে ভেতরে প্রশ্ন উথলে উঠছে, কী-ই আমি করতে পেরেছি পাকিস্তানী শাসকদের জগদ্দল দুঃশাসনের মধ্যে এই ভুখা ক্ষুধার্থ মানুষদের জন্য? শুধু নিজের মতো প্রতিবাদ আর জেল খাটা ছাড়া? তবুও আমাকে এতো ভালোবাসে?

বিকেল নেমে এসেছে মধুমতি নদীর পেটে, ছড়িয়ে পড়ছে হলুদ আভার আলো পাতলা জলের স্রোতের উপর। শেখ মুজিব এসে দাঁড়ালেন নদীর ঘাটে। ঘাটে কর্মব্যস্ত লোকজন শেখ মুজিবকে দেখে হাসিমুখে হাত তুলে সালাম জানায়। মানুষের সালাম নিতে নিতে নদীর তীরে এসে নৌকার সামনে দাঁড়ালেন। গহর মাঝি হাত বাড়িয়ে শেখ মুজিবের হাতটা ধরলে, সাবধানে নৌকায় পা রাখলেন তিনি। ব্যাগটা পাটাতনের উপর রেখে ঘুরে দাঁড়ালেন।

তোরা কেউ যাবি না আমার লগে? মুজিবের গলায় দরদ।

না লিডার। আপনে অনেক দিন পর আইচেন, আপনার পত চাইয়া রইচে ভাবী আর মাইয়া। আপনে যান, আমরা কাইল আপনার বাড়ি আইতেছি, একটানে বলে সরদার রহমত জাহান।

না, তোগো আসার দরকার নাই। পাটগাতি বিকালে আমিই চইলা আসুম।

তাইলেতো কতা নাই... মোল্লা জালালের মুখে হাসি।

নৌকার ছৈয়ের ভেতরে ঢোকার আগে মুজিব ঘুরে দাঁড়ালেন, শোন খোকা মিয়া—আমার মিতা, সাত্তার মিয়া, আবুল কাসেম সমাদ্দার সবাইরে খবর দিস...

আপনে চিন্তা কইরেন না। ধরেন সবাইরে খবর দেওয়া হইচে…গলা বাড়িয়ে দুই ভাইয়ের ছোট ভাই সরদার সরোয়ার জাহান আশস্ত করেন শেখ মুজিবকে।

শেখ মুজিব মৃদু হেসে ছৈয়ের ভেতরে প্রবেশ করে হোগলা পাতার বিছনার উপর বসেন। হর মাঝি নৌকা ছেড়ে দিয়ে বৈঠা নিয়ে বসে নৌকার পাছায়। মধুমতি ধরে টুঙ্গিাপড়ার দিকে বাইতে শুরু করলেন নৌকা। বৈঠার আর পানির সঙ্গমে ছলাৎ ছলাৎ শব্দের ব্যঞ্জনে শেখ মুজিব শুয়ে পড়লেন হোগলার উপর। মাথার নিচে দু’হাতের পাঞ্চায় তৈরী করলেন বালিশ। বৈঠা বাওয়ার তালে তালে নৌকা মৃদু দুলছে। অনেক দিন পরে তিনি এই পথে বাড়ি ফিরছেন। কিন্তু মিষ্টির দোকানের অনুদা’র বাক্যটা ভুলতে পারছেন না।

হ, আমার বাবা বলে গেছেন, আপনে যতদিন এই দোকানে আসবেন, আপনার কাছ থেকে দাম নিতে নিষেধ করছে। আর আপনে আসলে ভালো মিষ্টি দিয়া আপ্যায়ন করতে। বাবা আপনারে খুব স্নেহ করতো। বলতো, এই দেশে রাজনীতি তো অনেকেই করে, রাজনীতির লাইগা বা নিজের লাইগা, কেবল মজিবর মানুষের জন্য রাজনীতি করে...। আবার আক্রান্ত হচ্ছেন মুজিব—প্রবল আবেগে।

অনুদা’র বাবা সমরেন্দ্র নাথ শেখ লুৎফর রহমানের বন্ধু। কোর্টে অনেকবার গেছেন জমিজমার কাজে, শেখ মুজিব দেখেছেন, পিতা লুৎফর রহমান খুব যত্ন করে কাজ করে দিতেন সমরেন্দ্র নাথের। কাকা ডাকতেন মুজিবর। তিনি সময়-কাল পার হয়ে চুয়ান্নো সালে নির্বাচনে শেখ মুজিব প্রার্থী হলেন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মুসলীম লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী হেভিওয়েট প্রার্থীওয়াহিদুজ্জমান ঠান্ডা মিয়ার বিরুদ্ধে। ঠান্ডা মিয়ার বেসুমার টাকা। সঙ্গে ক্ষমতা, সরকার, যানবাহন…। আর শেখ মুজিবের সঙ্গী সাইকেল আর সাধারণ মানুষ। ঠান্ডা মিয়ার টাকা আর ক্ষমতার তোড়ে শেখকে কোণঠাসা করার সময়ে সাধারণ মানুষ কেবল ভোট দিয়ে নয়, অর্থ দিয়েও এগিয়ে এসেছে। বিস্ময়কর ঘটনা, মানুষ ভোট দিচ্ছে আবার ভোটের খরচের টাকাও দিচ্ছে। ঠিক সেই দুঃসময়ে সমরেন্দ্র নাথ বাড়িতে এসে তিন হাজার টাকা হাতে দিয়ে শেখ মুজিবকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলন, আমার আর সাধ্যে নাই। থাকলে তোমারে দিতাম বাবা!

সারাদিন নির্বাচনের ক্যানভাস করে বাড়িতে সন্ধ্যার আগে এসে দুটো মুখে দিয়ে শুয়েছিলেন ক্লান্ত মুজিব। বাবা লুৎফর রহমান ডেকে বললেন, তোমার কাছে সমর এসেছে। যাও দেখা করে আসো।

ক্লান্ত মুজিব উঠানে এসে দাঁড়ালে, দেখতে পেলেন চাঁদের আলোয় একজন দাঁড়িয়ে আছে ঝাঁকড়া বেল গাছের নিচে। শেখ মুজিব এগিয়ে গেলে বেলগাছের নিচে থেকেও ছায়া মানুষটি এগিয়ে এসে হাত ধরেন মুজিবের, বাবা ক্যামন আছো?

কাকা ভালো আছি। তবে ইলেকশনের চাপে একদম কাহিল হয়ে গেছি। আর যুদ্ধ করতেছি কাদের বিরুদ্ধে সবই জানেন। রাইতে আইলেন ক্যান আপনে? আমারে খবর দিলেই তো…

বাবা, তুমি কত ব্যস্ত মানুষ। এহন তোমার সময়ের অনেক দাম। তোমার সময় নষ্ট করতে চাই না। তিনি হাত ছেড়ে দিয়ে ধুতির কোচড় থেকে এক মুঠো টাকা বের করে আবার মুজিবের হাত ধরে মুঠোয় ভরে দিলেন, আমার কষ্টের টাকা তোমারে দিতে পাইরা আমার আনন্দ লাগছে, খুব আনন্দ লাগছে। গলার স্বরে দরদ মায়া উপচে পড়ছে। বেল গাছের পাতারা হালকা বাতাসে দুলছে। সঙ্গে দুলছে মাটির উপর ছায়াও।

কাকা? টাকা আমার দরকার নাই…

বাবা, সাধ্যে...। তিনি জড়িয়ে ধরলেন শেখ মুজিবকে। শেখ মুজিবও জড়িয়ে ধরলেন সমরেন্দ্র নাথকে। মানুষের ভালোবাসায় শেখ মুজিব আবেগ বিহ্বল হয়ে পড়েন। কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না। শরীরের ক্লান্তি মুছে গেছে। মনে হচ্ছে, এক অজানা শক্তি ভর করেছে শরীরে।

কাকা, এক কাপ চা খেয়ে যান? আলিঙ্গন মুক্ত হয়ে বললেন শেখ মুজিব।

না, তোমার আর সময় নষ্ট করনের কাম নাই। এহন একটা ঘুম দাও। সকালে আবার ছুটতে অইবে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে...। আমি যাই বাবা... কোনো শব্দ উচ্চারণের সুযোগ না দিয়ে সমরেন্দ্র নাথ চাঁদের আলোর মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে গেলেন। মুজিব দাঁড়িয়ে উঠোনে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। উঠোনে ছড়িয়ে পড়া চাঁদের আলো দেখতে পাচ্ছেন না। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবার জন্য উঠোনে পায়চারি করতে শুরু করলেন।

ঘরের কোণায় ঘোমটা মাথায় একটা ছায়া এসে দাঁড়ায়, একলা তুমি কী করছো উঠোনে?

শেখ মুজিব এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন সামনে, একটু হাঁটছিলাম।

রাতে আর হাঁটতে হবে না, হাত বাড়ান রেণু, শেখ মুজিবের স্ত্রী। আসো, এখন একটু ঘুমাও। সকালে তো আবার ছুটবা...

এইটা রাখো, মুজিব হাত বাড়িয়ে দিলেন রেণুর দিকে।

এতো রাতে কে তোমাকে টাকা দিতে এলো? টাকাটা হাতে নিয়ে মৃদু কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন রেণু।

পাটগাতীর সমর কাকা, রেণুকে অতিক্রম করে শোবার ঘরের দিকে গেলেন। পিছনে পিছনে রেণু। রাতটা ক্রমশ ঘন হয়ে আসছে। 

শেখ মুজিব নৌকায় শুয়ে শুয়ে দেখতে পাচ্ছেন, চুয়ান্নোর নির্বাচনের নকশা। নির্বাচন না, সত্যের সঙ্গে পাশবিক ক্ষমতার নগ্ন লড়াই ছিল চুয়ান্নোর নির্বাচন। একদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের দাপুটে মন্ত্রী ওয়াহিদুজ্জামান লঞ্চ, স্পিডবোড, সাইকেল, মাইক্রোফোন নিয়ে নেমে পড়েছে। অন্যদিকে শেখ মুজিবের একটি মাইক্রোফোন, একটি সাইকেল। কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী থাকার সময়ে প্রচুর টাকা কামিয়েছে ঠান্ডা মিয়া। সেই টাকা নির্বাচনে ব্যয় করছে দু’হাতে। নির্বাচনের প্রচারে নেমে শেখ মুজিব বুঝতে পারলেন, ঠান্ডা মিয়া শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবে, টাকায় কুলাবে না। নির্বাচনের ক্যানভাস করতে যে বাড়িতে যেতেন শেখ, সেই বাড়িতে বসিয়ে নির্বাচনের বা ভোটের প্রসঙ্গ তুলতেই হতো না। উল্টো জনসাধারণ বাড়িতে বসিয়ে পানদানের পান ও কিছু টাকা সামনে নজরানা হিসেবে দিতেন। টাকাটা না নিলে বাড়ির মানুষেরা রাগ করতো। বলতো, আপনার তো টাকা নাই। নির্বাচনে খরচ আছে না? এই টাকা নির্বাচনের খরচ হিসেবে দিচ্ছি।

মানুষের ভালোবাসার প্রগাঢ় প্রকাশে শেখ মুজিব মনে মনে নুয়ে যেতেন, মানুষের এতো ভালোবাসা আমি কোথায় রাখবো? আমি কি সাধারণের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে পারবো?

টাকা পয়সা ক্ষমতা ব্যবহার করেই ঠান্ডা মিয়া বুঝতে পারলো, শেখ মুজিবের কাছে ভোটে শোচনীয়ভাবে হেরে আম-ছালা সব হারাবে, তখন সর্বশেষ অস্ত্র প্রযোগ করলো। ধর্মের ব্যবহার করলো কুৎসিতভাবে। গোপালগঞ্জে শেখ মুজিবের ইউনিয়নে মাওলানা শামসুল হক, যাকে মুজিব ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন, সেই আলেমও মুসলিম লীগে যোগ দেয় এবং মুসলিম লীগের স্পীডবোডে ঘুরে ঘুরে ফতোয়া দিতে শুরু করে যে, ‘শেখ মুজিবকে ভোট দিলে ইসলাম থাকবে না, ধর্ম শেষ হয়ে যাবে’।

বিশিষ্ট আলেম শামসুল হকের সঙ্গে যোগ দেয়, শর্ষিনার পীর, বরগুনার পীর, শিবপুরের পীর, রহমতপুরের শাহ সাহেব সহ সকল মৌলভী ও তালবেলেমরা। নির্বাচনী এলাকায় এইসব আলেমরা জাগির তুলে ফেললো, শেখ মুজিবকে ভোট দেয়া যাবে না। শেখ ইসলামের বিরুদ্ধে...। একদিকে টাকা, অন্যদিকে পীর সাহবেরা, পীর সাহেবদের সমর্থকেরা টাকার লোভে রাতের আরাম হারাম ও দিনের বিশ্রাম ত্যাগ করে ঝাঁপিয়ে পড়লো শেখ মুজিবকে পরাজিত করবার জন্য।

নিজের দেশের মানুষের এই নৃশংস মনোভাবে শেখ মুজিব মাঝে মধ্যে ভেঙ্গে পড়েন, কাদের জন্য এই লড়াই? আমি হেরে যাবো হাজার হাজার মাইল দূরের রাজপ্রসাদে বসে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত একদল ক্রিমিনাল বিকৃত রুচির নিম্ন শ্রেণির রাজনীতিবিদদের কাছে? জেগে উঠবে না, কাল বৈশাখের ঝড়ে এই অঞ্চলের মানুষ? চিরকাল কেবলই পরাজিত হবে?

শেখ মুজিবের বিপন্ন চিন্তার রেখাচিত্রে দাঁড়ায় সমরেন্দ্র নাথ, দাঁড়ায় জীর্ণ কুটিরের এক বুভুক্ষ নারী। শেখ মুজিব নির্বাচনী প্রচারণায় যাবেন, জেনে পথের উপর অপেক্ষা করছেন এক বয়স্ক নারী। মুজিবের হাত ধরে বললেন, ‘বাবা আমার এই গরীব কুঁড়েঘরে তোমায় একটু বসতে হবে’।

বৃদ্ধার হাত ধরে তিনি বাড়ির ভেতরে গেলে, তিনি পাটি বিছিয়ে বসতে দিয়ে এক বাটি দুধ, একটা পান ও চার আনা পয়সা এনে সামনে ধরলো, ‘বাবা খাও, আর পয়সা কয়টা তুমি নেও, আমারতো কিছুই নাই।’

শেখ মুজিব সামলে পারলেন না, চোখে পানি এলো। তিনি সামলে নিয়ে দুধ একটু মুখে নিলেন আর বৃদ্ধার চার আনার সঙ্গে আরও কিছু টাকা যুক্ত করে হাতে দিয়ে বললেন, তোমার দোয়া আমার জন্য যথেষ্ট, তোমার দোয়ার মূল্য টাকা দিয়ে শোধ করা যায় না।

বৃদ্ধা টাকাটা না নিয়ে শেখ মুজিবের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘গবীরের দোয়া তোমার জন্য আছে বাবা।’

প্রগাঢ় আবেগে আক্রান্ত শেখ মুজিব অশ্রুসজল চোখে বৃদ্ধার বাড়ি থেকে বের হয়ে এলেন। প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন, ‘এইসব দরিদ্র অসহায় সরল মানুষদের সঙ্গে কখনো ধোঁকা দিতে পারবো না’।

অনেক দিন পর সেই বৃদ্ধা আর সমররেন্দ্র নাথকে মনে পড়ে শেখ মুজিবের। তিনি ছৈয়ের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। সন্ধ্যার নিষিক্ত লালিমায় ঢেকে গেছে পশ্চিমের আকাশ। মধুমতী নদী পার হয়ে বাইগার নদীতে পরেছে নৌকা। আর কিছুক্ষণের মধ্যে নৌকা ঘটে ভিড়বে। অনেক দূর থেকে মুয়াজ্জিনের গলায় ভেসে আসছে  মাগরিবের  আজানের সুর...। বাইগারের দুইপাড়ের গাছেরা কেমন নিঃশব্দ তন্ময়তার সঙ্গে দেখছে শেখ মুজিবকে। মাঝির হাতে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ ইন্দ্রজালের মোহ ছড়িয়ে দিচ্ছে সন্ধ্যার মন্দ্র মন্থনে। জেলের চারদেয়ালের মধ্যে কাটানো মুজিব অনেক দিন পরে দেখছেন বাংলার নদী জল ও গোধূলি বেলার অপরূপ রূপ।

তিনি আপন মনে বলছেন, বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর...

মুজিব ভাই, নৌকা ঘাটে লাগছে।

মাঝির উচ্চারণে ভাবনার চিত্রকল্প থেকে মুজিব বাস্তবে ফিরে আসেন। নুয়ে ছৈয়ের ভেতর থেকে ব্যাগটা হাতে নেন। পকেটে হাত দিয়ে টাকা বের করে মাঝিকে ভাড়া দিয়ে মাটিতে পা রাখতেই মুজিব দেখতে পেলেন, ঘাটের গাছপালার মধ্যে ছায়া-তিমিরে দু’জন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন। একজন সাদা ধুতি পরা অন্যজন সাদা শাড়িতে ঢাকা। হাত বাড়িয়ে ধরলেন মুজিবের বাড়ানো হাত সাদা ধুতির মানুষ, ক্যামন আছো বাবা?

বিস্মিত মুজিব, কাকা আপনে? পিছনে দাঁড়ানো বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে আরও বিস্মিত মুজিব বললেন, জানেন বুড়ি মা নৌকায় আসার সময়ে ছৈয়ের ভেতরে শুয়ে শুয়ে আপনাদের খুব মনে করছিলাম। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আপনাদের দেখতে যাবো। কতোদিন আপনাদের খবর নিতে পারি না...।

নৌকা থেকে মুজিব মাটিতে পা রাখলেন। সামানা খাড়া তীর বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে বৃদ্ধা বললেন, আমরা জানি তুমি আমাদের নিয়ে ভাবো। তাই তোমার সঙ্গে দেখা করতে এলাম। কেবল আমাদের নিয়ে ভাবলে তোমার চলে? পুরো দেশ তোমার ভাবনায়।

সমরেন্দ্র নাথ, বুড়ি মা আর শেখ মুজিব একটি স্বপ্নের অভিযাত্রায় যাবার জন্য এক সঙ্গে হাঁটছেন...। ক্রমাগত হাঁটছেন, এখনও হাঁটছেন...।

//জেডএস//

সম্পর্কিত

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

সম্পর্ক; আপন-পর

সম্পর্ক; আপন-পর

সন্ধ্যারাতে কাঁটাবন যাত্রা

সন্ধ্যারাতে কাঁটাবন যাত্রা

স্বর্ণ পাঁপড়ি নাকফুল মেঘজল রেশমি চুড়ি

স্বর্ণ পাঁপড়ি নাকফুল মেঘজল রেশমি চুড়ি

জন্ডিস ও রঙমিস্ত্রীর গল্প

জন্ডিস ও রঙমিস্ত্রীর গল্প

জলরঙে স্থিরচিত্র

জলরঙে স্থিরচিত্র

অ্যালার্ম

অ্যালার্ম

জরু সমাচার

জরু সমাচার

সর্বশেষ

পাপড়ি ও পরাগের ঝলক

পাপড়ি ও পরাগের ঝলক

আমার হৃদয়ে তার সোনালি স্বাক্ষর

আমার হৃদয়ে তার সোনালি স্বাক্ষর

মায়া তো মায়াই, যত দূরে যায়...

মায়া তো মায়াই, যত দূরে যায়...

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

থমকে আছি

থমকে আছি

সালেক খোকনের নতুন বই ‘অপরাজেয় একাত্তর’

সালেক খোকনের নতুন বই ‘অপরাজেয় একাত্তর’

আমরা এক ধরনের মানসিক হাসপাতালে বাস করি : মাসরুর আরেফিন

আমরা এক ধরনের মানসিক হাসপাতালে বাস করি : মাসরুর আরেফিন

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.