X

সেকশনস

কলকাতার লিজেন্ড বেলাল চৌধুরী | কায়সার হক

আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২০, ১২:০৩

কবি বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে আমার প্রথম দেখার ছবিটি এখনো স্পষ্ট হয়ে আছে আমার স্মৃতিতে। তিনি সম্পাদক, কলাম লেখক, ভ্রমণবিষয়ক লেখক; এক কথায় সব রকমের লেখার সাহিত্যিক। তাঁর পরিচয় আরো আছে; সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সাম্প্রতিক স্মৃতিকথা যারা পড়েছেন তারা আরো ভালো জানেন তাঁর সম্পর্কে।

১৯৭৩ সালের কথা। কবি শহীদ কাদরীর বড় ভাই শাহেদ কাদরী ভাইয়ের বাসায় প্রায়ই বিকেলের দিকে বেড়াতে যেতাম। সেদিনও গিয়েছিলাম। তখনই শহীদ কাদরী বেলাল ভাইকে নিয়ে ঢুকলেন। বেলাল ভাই দশ বছর কোলকাতায় কাটিয়ে অপরিচিত হয়ে দেশে ফিরেছেন। চলচ্চিত্র তারকার মতো সুদর্শন, মৃদুভাষী, পঁয়ত্রিশ বছরের পরিপাটি চেহারা তাঁর। লেখকদের দলে শহীদ ভাই সম্প্রতি কোলকাতা গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি কোলকাতায় বেলাল ভাইয়ের খ্যাতির কথা বেশ জোর গলায়ই বললেন; শুনে বেলাল ভাই লাজুক হাসি হাসলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এক সাহিত্যের পাতায় বেশ অহংকারের সঙ্গেই বলেছেন, কোলকাতা নগরের অধিরাজত্ব তিন যুবকের অধীনে—তিনি নিজে, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং বেলাল চৌধুরী। তাঁরা তিনজন মিলে সাহিত্য পত্রিকা ‘কৃত্তিবাস’ বের করেন। কৃত্তিবাস ষাটের দশকের লেখকদের মুখপত্র। তাঁদের অন্যখানের সমসাময়িকদের মতো তাঁরাও প্রথাবিরোধী কাজ করতে পছন্দ করতেন। তাঁদের জীবন যাপন ছিল বেপরোয়া রকমের বোহেমিয়ান। তাঁদের আগের প্রজন্মের উচ্চ আধুনিকতাবাদের বলিষ্ঠ সমর্থকদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে এবং অমিয় চক্রবর্তী তখনো সক্রিয় ছিলেন। তাঁদের তুলনায় তিন নবীন অনেকটা শিথিল শৈলী নিয়ে এসেছেন। উভয় প্রজন্মের সঙ্গেই মেলামেশার সর্বজনবিদিত সুনামের অধিকারী বেলাল ভাই। তিনি কিভাবে এরকম একটা অবস্থানে পৌঁছে গেলেন সে কথা পুরোপুরি বলতে গেলে আকর্ষণীয় অভিযানমূলক কাহিনি দাঁড়িয়ে যাবে। আশা করি সে কাহিনিটা বেলাল ভাইয়ের নিজের কলম থেকেই তৈরি হবে একদিন। আমি মাত্র আংশিক সারাংশ তুলে ধরতে পারি।

বেলাল ভাইয়ের জন্ম ১৯৩৮ সালে জমিজমার মালিক শ্রেণির এক পরিবারে। তাঁর পূর্বপুরুষরা নবীনগর থেকে কুমিল্লায় আসেন (কুমিল্লার দারোগা বাড়ি)। সেখান থেকে কয়েক প্রজন্ম পরে আসেন ফেনীতে। বেলাল ভাইয়ের মা ছিলেন স্বশিক্ষিত। প্রচুর পড়াশোনা করেন এবং বেশ কিছু গল্প ও প্রবন্ধ লেখেন। ‘চিরসুমধুর’ নামে তাঁর লেখার সংকলন বের হয় তাঁর মৃত্যুর পর।

তাঁর বাবা ছিলেন রেলওয়ের কর্মকর্তা। প্রচণ্ড রকমের বইপ্রিয় মানুষ ছিলেন বাবা। তিনি বাংলা ইংরেজি ভাষার অনেক বইপত্র ও সাময়িকী সংগ্রহে রাখেন। ‘প্রবাসী’, ‘শনিবারের চিঠি’ ও ‘পরিচয়-এর মতো সাহিত্য পত্রিকা যেগুলো আমাদের সাহিত্যের বর্ষপঞ্জিতে পবিত্র বলে গণ্য হয়ে থাকে সেগুলো ছিল তাঁর সংগ্রহে। সাম্রাজ্যবাদের দুর্দিনে হুইলার অ্যান্ড কম্পানির শাখাগুলো সাম্রাজ্য-কালে যা যা প্রকাশ করা হয়েছিল শুধু ছোটখাটো রেলওয়ে স্টেশনের কাগজপত্র ছাড়া সব খুচরা দামে বিক্রি করে দেয়।

খুব ছোটবেলা থেকে বেলাল ভাই সর্বভূক পাঠক ছিলেন। অপ্রচলিত বাইরের বইপত্রের প্রতি তাঁর টান দেখে বড়রা খানিক হতাশও হয়েছিলেন। বাড়ি থেকে চৌধুরী বাবার দীর্ঘ অনুপস্থিতির সুযোগে (বাবার চাকরিতে ঘনঘন বদলি ছিল; তিনি যখন তখন পুরো পরিবার অন্য কোথাও স্থানান্তর করতে পারতেন না;) বেলাল ভাই হাক ফিনের মতো জীবনযাপন করেন। শেষে একদিন বিড়ি টানতে গিয়ে ধরা পড়ে যান। তখন সাত বছরের চটপটে বালক তিনি। তাঁর পরিবার তখন বেলাল ভাইকে সন্দীপ তাঁর ফুপার কাছে পাঠিয়ে দেয়। পরিবারের ধারণা ছিল, ফুপা তাঁকে কঠিন নিয়ন্ত্রণে রাখবেন। ঘটনাক্রমে তিনি বরং নতুন পরিবেশ বেশ উপভোগ করেন। দ্বীপের হাওয়া সমুদ্র ভ্রমণের স্বপ্ন জাগিয়ে দিতে থাকে। পরবর্তীতে সে স্বপ্নও বাস্তবায়িত হয়। উল্লেখ্য, সন্দীপের মানুষেরা যুগ যুগ ধরে অকুতোভয় সাংযাত্রিক এবং তারা দূর দূরান্তে অভিবাসও গড়েছে। সৌভাগ্যের কথা হলো, বেলাল ভাইয়ের সাব-ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ফুপা ছিলেন চমৎকার একজন আলোকিত মনের মানুষ এবং তিনি বেলাল ভাইকে ব্যাপক পড়াশোনার উৎসাহ দেন।

তাঁর সন্দীপ বাসের স্থায়িত্ব ছিল কয়েক বছর মাত্র। তারপর বেলাল ভাই বাড়িতে ফিরে আসেন। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য জোর প্রস্তুতি শুরু করেন। তারপরে ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় কমিউনিস্টদের সঙ্গে তাঁর সখ্য হয় এবং ৯২-ক ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগে রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে তাঁকে জেলে যেতে হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের এক অংশে বেলাল ভাই এবং অন্যান্য বামপন্থী নেতারা ছিলেন। অন্য পাশে ছিলেন বঙ্গবন্ধৃ শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। তবে নামাজের সময় দুপাশের বন্দিদের একত্রিত হওয়ার সুযোগ হয়। বেলাল ভাইয়ের মতো অল্পবয়সী রাজনৈতিক বন্দিদের দেখে বঙ্গবন্ধু খুশি হন। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ওদের এখানে কে এনেছে!

জেল থেকে বের হয়ে আসার পর বেলাল ভাই বুঝতে পারেন, রাজনীতি তাঁর জন্য উপযুক্ত পথ নয়। রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সুযোগ আসে যখন তিনি বঙ্গোপসাগরের মৎস-সম্পদ নিয়ে জরিপে নামা এফএও-র মালিকানার এক ট্রলারে নাবিকের ঘুমানোর জায়গায় ওঠার সুযোগ পান। বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন স্থানে মাছ ধরার মাধ্যমে কেবল জরিপ কাজ করা সম্ভব ছিল। জাপানের ওই ট্রলারটির অধিনায়ক সংগৃহীত মাছ নিকটতম বন্দরে বিক্রি করে দিয়ে নাবিকদের সঙ্গে টাকা ভাগ করে নিতেন। কয়েক বছরের সমুদ্র ভ্রমণ থেকে ভালো সঞ্চয় করেন এবং ফলাফল হিসেবে ১৯৬১ সালে তাঁদের ট্রলার যখন কোলকাতা বন্দরে নোঙর করে বেলাল ভাই প্রথম দর্শনে প্রেমে পড়ার মতো টান অনুভব করেন কোলকাতার প্রতি। যথারীতি নেমে পড়ার সিদ্ধান্তই নেন তিনি।

কোলকাতায় তিনি নতুন হলেও সেখানে তাঁর পরিবারের পুরোনো আত্মীয়তা ছিল। খান বাহাদুর আব্দুর রশীদ খানের পরিবার তখনো কোলকাতাতেই বসবাস করছিল। বেলাল ভাইয়ের পরিবারের উভয় দিকের আত্মীয়তা খান বাহাদুর পরিবারের সঙ্গে। খান বাহাদুর ছিলেন কোলকাতা কর্পোরেশনের প্রথম মুসলিম প্রশাসক। তিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বন্ধু ছিলেন। পরিবারের ওই অংশ ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পরও ভারতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বেলাল ভাইয়ের কোলকাতার আত্মীয়দের মধ্যে আরেকজন প্রথিতযশা পূর্বপুরুষ ছিলেন কোলকাতা ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নবাব ফারুকী।

অপরিচিত তবে আকষর্ণীয় শহরে যদিও তাঁর আত্মীয় স্বজনদের উপস্থিতি তাঁর কাছে ভরসার মতোই ছিল তবু বেলাল ভাই কারো ওপরে নির্ভরশীল হয়ে থাকার মতো মানুষই ছিলেন না। খুব শীঘ্রই তিনি লেখক-শিল্পীদের মধ্যে থাকার উপযুক্ত আশ্রয় পেয়ে গেলেন। তাঁর ব্যতিক্রমী অতীতের কারণে লোকমুখে আজগুবি সব কাহিনির ডালপাল ছড়াতে লাগল। শীঘ্রই তিনি স্থানীয় পর্যায়ের একজন কিংবদন্তী হয়ে উঠলেন। লোকজন তাঁর একই ব্যক্তিত্বের মধ্যে লেখক, নাবিক এবং কুমির শিকারী—এই তিনের সমাহার দেখতে পায়। শেষের পরিচয়টা হওয়ার কারণ হলো, তিনি কুমির শিকারেও কিছুদিন ব্যয় করেন। তাঁকে নিয়ে তৈরি কাহিনির শেষ অংশের শিকড় ছিল ট্রলারে করে ঘুরে বেড়ানোর সময়কার একটা ঘটনা। তাদের নৌকা মংলা বন্দরে নোঙর করার সময় বেলাল ভাইয়ের দেখা হয় এক জাপানি ব্যবসায়ীর সঙ্গে। ওই লোকটা কুমির চাষের লোভনীয় দিক সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেন। বেলাল ভাইয়েরও পছন্দ হয় এবং প্রাথমিক পরিকল্পনাও করেন তিনি। তবে বাস্তবায়ন করেননি সে পরিকল্পনা। এক সময় তিনি লোহার পেরেক তৈরির কারখানা চালু করার চিন্তাভাবনাও করেন। তবে এই পরিকল্পনা থেকে বেলাল চৌধুরী-কাহিনিতে কিছু যুক্ত হয়নি।

দেশত্যাগ করার আগে বেলাল ভাই বিক্ষিপ্ত লেখালেখি করতেন। তখন পর্যন্ত একটি বই প্রকাশ করেছিলেন, পাবর্ত্য এলাকা ভ্রমণের ওপর লেখা স্মৃতিকথা। চলমান পাক-ভারত সম্পর্কের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে পরিচয় সঙ্কটে পড়ে তিনি কোলকাতায় পূর্ণাঙ্গ লেখক হয়ে ওঠেন। ১৯৬৩ সালের দিকের কথা, তখন দুই প্রতিবেশি রাষ্ট্র ঠান্ডা লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। যারা বেলাল ভাইকে চিনত না তারা গুজব ছড়ায়, তিনি পাকিস্তানি চর। কমলকুমার মজুমদার শক্ত হাতে গুজবের জবাব দেন এবং কর্তৃপক্ষের পরিচিতজনদের ধরেন বেলাল ভাইকে ঝামেলামুক্ত রাখার জন্য। তবে গুজবের বিষয়টি বেলাল ভাইয়ের অস্তিত্বের গোড়ায় নাড়া দিয়ে যায়। তাঁর লেখক পরিচয়কে আরো শক্তপোক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন যাতে দুদেশের জাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন। শীঘ্রই তিনি ‘মৃত বাজার পত্রিকা’ ও ‘দেশ’-এর মতো পত্রিকা এবং সাময়িকীতে লেখা প্রকাশ করতে থাকেন। প্রভাবশালী সমালোচকদের প্রশংসাও পেতে থাকেন। পরের দশকে তাঁর চার খণ্ড কবিতার বই বের হয় এবং পাঠক সমালোচকদের কাছে আদৃতও হয়।

বেলাল ভাইয়ের কোলকাতা বাসের ওপর আকর্ষণীয় আলোকপাত করেছে দুটো সাম্প্রতিক স্মৃতিকথা। একটা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘ভালোবাসার সাম্পান’। এখানে লেখক বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে কোলকাতায় তাঁর সাক্ষাতের কথা তুলে ধরেছেন। আরেকটা হলো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘অর্ধেক জীবন’। সেটা ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হয়। এখানে বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে লেখকের সাক্ষাতের ঘটনাটা একটা বিচিত্র অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয় পর্ব শেষ করে সবে দেশে ফিরেছেন। এরকম সময়ে একদিন কোলকাতার উঠতি সাহিত্যিকদের আড্ডায় কফি হাউসে তাঁর প্রথম দেখা হয় বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তাঁরা কমলকুমার মজুমদারের খালাসিটোলার এক ডেরায় হাজির হন। কমলকুমার মজুমদার তাঁদের চেয়ে দু দশকের বড় ছিলেন। তবে তাঁদের মতোই বোহেমিয়ান ছিলেন তিনিও। তিনি রোল্যান্ড ফারব্যাঙ্কের মতো খুঁতখুতে গদ্য কথাসাহিত্যের প্রচলনকারী। দেশের বাইরে অবস্থানকালে পাশ্চাত্যের সুরার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার কারণে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেদিন দেশীয় পানীয়ের কড়া প্রতিক্রিয়া সহ্য করতে পারেননি। তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

পরদিন সকালে জেগে ওঠার পর বুঝতে পারেন, তিনি বাঁশের তৈরি একটা ছোট কুটিরে শুয়ে আছেন। অসমান বিছানায় হাত পা ছড়ানোর চেষ্টা করলেন। গায়ে কী যেন বিঁধে পড়ছে টের পেয়ে দেখেন, একটা বইয়ের কোণা। আসলে বিছানার চাদরের নিচে ম্যাট্রেস জাতীয় কিছু ছিল না; টাইলসের মতো করে বই বিছিয়ে রাখা হয়েছে। ঘরটার মধ্যে আর কোনো আসবাবের বালাই নেই। তিনি ওখান থেকে বের হতে চাইলেন। কিন্তু হতাশার সঙ্গে দেখতে পেলেন, ভাঙা বাঁশের চাটাইয়ের তৈরি দরজাটা বাইরে থেকে তালা দেওয়া আছে। জোর করে খোলার চেষ্টা করলে একটু ফাঁক হলো দরজা। বাইরের দিকে খানিকটা দেখার মতো হলে তিনি বুঝতে পারলেন, একটা কবরখানার এলাকার মধ্যে আছেন তিনি। খুব কাছেই কয়েকজন মহিলা ঝগড়া বিবাদে মত্ত। পুরুষ মানুষ বিবাদের সময় শত্রুপক্ষের কারো মা বোনকে নিয়ে যেসব অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করে—তারা সেরকম ভাষা ব্যবহার করছে একে অন্যের দিকে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাহায্য চেয়ে ডাক ছাড়লেন তাদের দিকে। তাঁর ডাক শুনে তারা কয়েকজন এগিয়ে এলো। একজনের ওপরের ঠোঁট লোমশ; আরেকজনের মুখ বনবিড়ালের মতো; আরেকজনের হাতে একতাল গোবর। তাকে দেখে তাদের মধ্যে সামান্যতম বিস্ময় জাগল না। সবাই তাঁকে একনজর দেখেই আবার তাদের ঝগড়ায় ফিরে গেল। তিনি কোনোরকমে পলকা দরজাটা ওপরের দিকে ঠেলে তুলে নিচ দিয়ে শরীর মোচড়াতে মোচড়াতে বের হতে পারলেন। এভাবে বের হতে গিয়ে আমেরিকা থেকে আনা তাঁর দামি প্যান্টটা খানিক ছিঁড়ে গেল।

ওই ছোট ঘরটাই ছিল বেলাল ভাইয়ের নিভৃতবাস। একদম সস্তা দামে ভাড়া নিয়েছিলেন। যখন নিরিবিলি নিজের মতো থাকার দরকার হতো ওখানে থাকতেন। নিরিবিলি পড়াশোনা এবং লেখার কাজ করার জন্য ওই ঘরটা ব্যবহার করতেন। লোকচক্ষুর আড়ালে একটা কবরস্থানের পাশে থাকলেও জায়গাটা পার্ক সার্কাসের ঠিক বিপরীতে এবং শহরের কেন্দ্রের খুব কাছেই ছিল।

অবশ্য তাঁর এই গোপন জায়গাটার পরিচয় আর গোপন থাকেনি বেশি দিন। তাঁর দু-চারজন বন্ধুও ঘরটা ব্যবহার করা শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন চিত্রকর চিন্ময় চৌধুরী। তাঁর বিমূর্ত শৈলীর ছবিগুলো ঘরের স্বল্প জায়গা ভরে ফেলতে থাকে। বেলাল ভাই দুষ্টুমির সঙ্গে নিজেও মাঝে মধ্যে তুলির আঁচড় দিয়েছেন। তারপর তিনি সত্যিই ছবি আঁকেন এবং তাঁর ছবিগুলো দর্শকমনে চিন্ময়ের ছবির চেয়ে বেশি আগ্রহ জাগায়।

ইউরোপিয়ান কোয়ার্টার্সের কামাক স্ট্রিটে কিছুদিনের জন্য বেলাল ভাইয়ের একটা রুম ছিল। সেটা সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিকথায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কিছুটা বাঁকা ইঙ্গিতে আমাদের জানান, সেখানে কতিপয় গোপন অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। তিনি বলেন, সেখানকার অভিজ্ঞতার বর্ণনা বেলাল ভাইয়ের কলম থেকেই আসা উচিত।

সেখানকার গোপন অভিজ্ঞতাগুলো কী ছিল? সেগুলো সম্পর্কে বেলাল ভাই কিছুটা অনীহা। তবে বিস্তারিত না বললেও তিনি স্বীকার করেন, ওখানকার অভিজ্ঞতার কোনো কোনোটার সঙ্গে ষাটের দশকের মোহ জড়িত : মাদকদ্রব্য, হ্যালুসিনোজেনস—যেমন আফিম, গাঁজা এবং মন চাঙ্গা করার মতো পশ্চিমা রসায়নের লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথিলামাইড কিংবা এলএসডি ইত্যাদি।

কামাক স্ট্রিটের রুমটা আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু ছিল : সে আড্ডায় একত্রিত হতেন সাহিত্য এবং শোবিজের অনেকেই। দ্বিতীয় জগতের যাঁরা আসতেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন মোহনীয় তনুজা এবং প্রাণবন্ত হ্যারি এস (পূর্বে হরি সাধন দাস)। যারা ভারতীয় চলচ্চিত্র সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন তারা জানেন, হলিউড থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হ্যারি এস এ উপমহাদেশের ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকারদের অগ্রদূত। বেভারলি হিলস থেকে ফিরে আসার পর তিনি স্ত্রী সোনালিকে নিয়ে বোম্বেতে বসতি শুরু করেন। সোনালির চেহারা ছিল একেবারে খুজারাহোর মূর্তির মতো। তারপর সেখানে আসেন রোজলিনি। ইংগ্রিদ বার্গম্যানের সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক ছাড়াছাড়ির কারণে ভেঙে পড়েন বলেই নিজেকে পুনরুদ্ধারের উদ্দেশে পাড়ি জমান এখানে। রোজলিন সোনালির প্রেমে পাগল হয়ে যান। অন্য দিকে সোনালির পেটে হ্যারির সন্তান ধারণ করলেও রোজলিনির ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারেন না।

হ্যারি এস সোনালিকে কোনো রকমে টেনেটুনে নিয়ে গেলেন তাঁর তড়িৎ আয়োজিত এক শুটিং ভ্রমণে। জায়গাটা পুনের কাছে একটা জঙ্গলা এলাকা। এক সন্ধ্যায় ফিল্মের লোকজন সবাই একটা ক্যাম্পে বসে বিশ্রাম করছিলেন এমন সময় গাছপালার ভেতর দিয়ে মোটরগাড়ির মিটমিটে আলো দেখা গেল। হ্যারি এস ভেতরে ভেতরে বুঝে ফেললেন, যে আসছে সে রোজলিনি ছাড়া আর কেউ নয়। সত্যিই তাই, কয়েক মিনিটের মাথায় একটা জিপ এসে ঘড়ঘড় করে থেমে গেল ক্যাম্পের সামনে। ভেতর থেকে নেমে এলেন রোজলিনি। সোনালিও দৌড়ে গেলেন তার কাছে। দুজনে আলিঙ্গনবদ্ধ হলেন। ওই মুহূর্তেই হ্যারি এস বুঝে গেলেন, তিনি সোনালিকে হারিয়ে ফেলেছেন। রোজলিনি সোনালিকে সঙ্গে নিয়ে ইতালিতে ফিরে গেলেন। মুখরোচক কলাম লেখকরা একটা মোক্ষম সুযোগ পেয়ে গেলেন। দুঃখজনক হলো, তারা হ্যারি এসকে ব্যভিচারী স্ত্রীর ভাঁড়সুলভ স্বামী বানিয়ে ফেললেন।

বেলাল ভাইকে অতীতের কোনো স্মৃতি রোমন্থন করতে দেখা ঠিক একেবারে খুব কাছ থেকে পেশাদার বক্সারদের লড়াই দেখার মতো। তাঁর স্মৃতিকথা খুব পরিষ্কার হয়ে ওঠে। চরিত্ররাও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। শ্রোতার স্মৃতির স্থায়ী গ্যলারিতে যোগ হয়ে যায় তাঁর কাছ থেকে শোনা মজার কাহিনি। উদাহরণ হিসেবে ইন্দ্রনাথ মজুমদারের কথা বলা যায়: এই তো কদিন আগে টেলিফোনে কথা বলার সময় বেলাল ভাই তাঁর সম্পর্কে বললেন। তার আগে তাঁর সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। এখন আমার মনে, তিনি আমার অনেক দিনের চেনা। লম্বা ফিটফাট সহজেই চোখে পড়ার মতো চেহারা। শান্তিনিকেতনে সবার পরিচিত বইয়ের দোকান সুবর্ণ রেখার মালিক তিনি। তাঁর পেশাগত জীবনের সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী কাজটা হলো পুরোনো এবং বিরল বইপত্র, ম্যাগাজিন, পাণ্ডুলিপি এবং শিল্পগুণসম্পন্ন বস্তু কেনাবেচা। তাঁর বন্ধুদের বিরাট বহর, পরিচিতজন এবং তাঁর গুণগ্রাহীরা এরকম মূল্যবান সম্পদের খোঁজ পেলেই তাঁকে জানিয়ে দিতেন, হয়তো ওই বস্তুর মালিকের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তিনি তখন মৃত্যুপথযাত্রীর উত্তরাধিকারদের মানসিকতা বোঝার চেষ্টা করতেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যেত, তারা নামমাত্র দামে ওইসব বইপত্র ছেড়ে দিতে পারলেই যেন বাঁচে। মরণাপন্ন ব্যক্তির সময় একেবারে ঘনিয়ে এলে তাঁর দুজন জুনিয়র বন্ধুকে পাঠিয়ে দিতেন লুটের মাল নিয়ে আসার জন্য। একাধিকবার বেলাল ভাই এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাগ্রহে দৌড়ে চলে গেছেন বড় বড় চটের বস্তা হাতে। একবার তাঁরা এই কাজে এক বাড়িতে একটু আগে আগেই গিয়ে হাজির হন। তাঁদেরকে চুপিচুপি লাইব্রেরির পাশের এক রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। মরণাপন্ন ব্যক্তির আসন্ন প্রয়াণের মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁদেরকে ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করতে বলা হয়। খানিক পরেই তারা বিলাপের বিস্ফোরণ শুনতে পান। বুঝতে পারেন, যম এবার শেষ আঘাতটা করে ফেলেছে। তারা দ্রুত তাক থেকে বস্তায় স্থানান্তর করতে থাকেন ভারী ভারী বইপত্র, এক জীবনে সঞ্চিত করা, কিংবা হতে পারে কয়েক প্রজন্ম ধরে গোছানো পুস্তক সম্পদ। শোক প্রকাশ করতে আসা লোকজন দলে দলে আসা শুরু করেছে; তখন উঠতি বয়সী লেখক দুজন তাঁদের বই-ভারী বস্তা নিয়ে টলমল পায়ে ফিরতি পথ ধরেছেন।

ইন্দ্রনাথ বি সি রায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে গড়ে তোলা মেধাবী ছাত্রদের হোস্টেলের ওয়ার্ডেনের দায়িত্বও পালন করেন কিছুদিন। ছাত্রদের একজন ছিল প্রেসিডেন্সি কলেজের অসীম চট্টোপাধ্যায়; পড়ুয়া ছেলে, স্বভাবে বেশ নরম কোমল। পড়াশোনার বাইরে তার শখের কাজ ছিল বিখ্যাতদের অটোগ্রাফ সংগ্রহ করা। একদিন সে বেলাল ভাইকে ধরল কবি সুভাস মুখোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্রের অটোগ্রাফ এনে দিতে। খুব শীঘ্রই প্রেসিডেন্সি কলেজে নকশালবাদী ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে এবং অসীম মারাত্মক আহত হয়। একদিন অসীম এবং তার কয়েকজন কমরেড এসে বেলাল ভাইয়ের কাছে আশ্রয় চায়। কয়েকজনের চেহারা খুব ভাঙাচোরা, ইসকোখুসকো। আরো কয়েকজনের শরীরে ছোটখাটো আঘাতের চিহ্ন। তারা শ্রেণিশত্রু খতমের নামে অভিযানে নেমেছিল। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে তারা অস্ত্র ধরেছিল তারা ছিল ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ এবং অসীম ও তার কমরেডদের প্রাণ নিয়ে পালাতে হয়। সৌভাগ্যের কথা হলো, বিপ্লব রোমান্সকে আটকে রাখতে পারে না : অসীম একজনের স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে এসে বিয়ে করে। সে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয় বেলাল ভাইয়ের আশ্রয়ে।

রোমান্স ইন্দ্রনাথের জীবনেও আসে। তার পেশার মতো তার রোমান্সও ব্যতিক্রমী ছিল। ছুটির দিনে মফস্বলে এক আদিবাসী মেয়ের সঙ্গে দেখা হয় তার। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটার প্রেমে ধরাশায়ী তিনি। মেয়েটাও তার আবেদনে সাড়া দেয়। তারা দুজন তাদের সম্পর্ককে বিয়ের চুক্তিতে পাকাপোক্ত করে ফেলেন। আদিবাসী সম্প্রদায় তো তাদের ঐতিহ্য মেনে বাইরের কারো সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক তৈরি করে না। তারা এমন উত্তেজনা তৈরি করে, শেষমেষ প্রেমিক যুগলকে পুলিশের হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশের কাছ থেকে শেষে তাদের উদ্ধার করেন কোলকাতার লেখকরা এবং অন্যান্য গণমান্যরা। তারপর নতুন দম্পতি সুখে শান্তিতে জীবন কাটাতে থাকেন। সাবলীলভাবে বয়স পার করতে থাকেন ইন্দ্রনাথ। বন্ধুদের কাছে বাড়িতে মদ চোলাইয়ে তার স্ত্রীর হাতের দক্ষতার প্রশংসা করেন তিনি। স্ত্রীর দক্ষতাই তাকে আজীবন সুরাপানে অভ্যস্ত রেখেছে। ১৯৭৫ সালে কৃত্তিবাসের বিশেষ সংখ্যা সাজানো হয় ইন্দ্রনাথকে নিবেদিত প্রবন্ধমালায়। সে সংখ্যাটির শিরোনামটিও ছিল চমৎকার : ‘স্বপ্নের ফেরিঅলা’।

ষাটের দশকের কোলকাতার কবিদের মধ্যে সম্ভবত বিনয় মুজমদারই উদ্ধত তাড়না এবং বাসনার ক্রীড়ানক হিসেবে মানুষের সবচেয়ে রূঢ় বাস্তব চিত্র খাড়া করেন। তাঁর লেখার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় জোতির্ময় দত্তের চমৎকার অনুবাদে হাডসন রিভিউতে প্রকাশিত কয়েকটি কবিতা পড়ে। কবিতগুলোর একটাতে অনিস্তার্য আবেগের একটা চিত্রকল্প (একটা চিতাবাঘ কি শূন্যে তার লম্ফনের পাক খুলতে পারে?) দেখতে পাই; আমার কল্পনায় বার বার হানা দিয়ে যায় সেটা। বুদ্ধদেব বসু তাঁর প্রজন্মের অন্যান্য নবীন কবিদের মধ্যে বিনয় মজুমদারকে সবার ওপরে স্থান দিয়েছেন।

খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু না হলেও বেলাল ভাই বিনয় মজুমদারকে ভালো করেই চিনতেন। তাঁকে নিয়ে বেলাল ভাইয়ের ভান্ডারে অনেক গল্প আছে। বিনয় মজুমদারের ব্যক্তিত্বের মধ্যে ছিল বিশেষ কোনো ধারণায় বুঁদ হয়ে থাকার প্রবাণতা। মাঝে মধ্যে ক্ষেপে উঠতেন। প্রায়ই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতেন এবং তাঁর এরকম অবস্থাকে প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার দরকার হতো। তাঁর মানসিক বিশৃঙ্খলার গন্তব্য ছিল তাঁর লেখা। সে জন্য তাঁকে বাংলা কবিতার রবার্ট লোয়েল বলা হয়। (তবে অবশ্যই লোয়েলের চেয়ে তাঁর গণ্ডি অনেক ছোট। তিনি মূলত যৌন আবেগের মতো একটা বিষয়ের মধ্যে ডুবে থাকেন।) তিনি নোবেল পুরস্কার পাবেনই—এরকম একটা ধারণায়ও আচ্ছন্ন হয়ে থাকতেন। মনে রাখার কথা হলো, বেলাল ভাই আমাকে বলেছেন, বাঙালি লেখকদের মধ্যে যারা নিজেদের লেখা অনুবাদ করানোর মতো সুযোগ পেয়েছেন এবং অনূদিত লেখার কপি সুইডিস একাডেমির কাছে পাঠিয়েছেন তাদের সবার মধ্যেই এরকম একটা প্রত্যাশা সতত ক্রিয়াশীল। বিনয় মজুমদারের আরেকটা আচ্ছন্নতা ছিল গণিত নিয়ে। কবিদের মধ্যে এরকম আচ্ছন্নতা সাধারণত বিরল। (অবশ্য বিস্মিত হওয়ার মতো বিষয় নয় এটা; কারণ গণিত এবং কবিতা দুটোই মাত্রা বা পরিমাপের ওপর নির্ভরশীল।)

এই গাণিতিক-কবি যখন প্রেমে পড়েন তাঁর প্রেমও একটা আচ্ছন্নতারই ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর প্রেমের উদ্দিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। তাঁর দুর্ভেদ্য বিভাষার জন্য হাল ফ্যাশনের সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছেন তিনি। বিনয় মজুমদার যখন তাঁর প্রেমে পড়েন তখন তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। কবির অনুভূতির প্রতি তিনি সাড়া দেননি। কবি মর্মযাতনার গোপন কান্নার মতো তাঁর প্রথম কবিতা সংকলনের নাম রাখেন ‘ফিরে এস চাকা’। সংকলনের শিরোনামের মধ্যেই পরোক্ষ ইঙ্গিত পাওয়া যায় সাড়াহীন উঠতি বয়সী নারীর বংশনামের দিকে। বিনয় মজুমদারের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের নাম ‘গায়ত্রী’। এখানে আর রাখঢাক করার কিছু নেই। সব পরিষ্কার।

বিনয় মজুমদারের ক্ষেপাটে স্বভাবের আক্রমণ আবির্ভূত হতো একেবারে অপ্রত্যাশিত আকস্মিকতায়। একদিন বেলাল ভাই এবং তাঁর বন্ধু মহলের কাছে খবর এলো : বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে বিনয় মজুমদার তাঁর হোস্টেলের ব্রাহ্মণ বাবুর্চির মাথায় মুগুর দিয়ে সজোরে আঘাত করেছেন; বেচারার মাথা ফেটে গেছে। এরকম একটা কাণ্ড ঘটানোর পর বিনয় মজুমদার কফি হাউসে হাজির হন এবং এমন আচরণ করেন যেন কিছুই ঘটেনি। সেখানে যথারীতি পুলিশ চলে আসে। তখন বেলাল ভাই এবং অন্যান্য লেখকদের দায়িত্ব পড়ে পুলিশকে বোঝানো, তারা যাকে ধরেছেন তিনি অস্বাভাবিক তবে মেধাবী একজন উঠতি কবি। শাস্তির চেয়ে বরং মানসিক সেবাই দরকার বেশি তাঁর।

বিনয় মজুমদারের গণিত-প্রীতি এক সময় বেলাল ভাইয়ের জীবনের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট হয়ে যায় যখন বিনয় মজুমদার গণিত বিষয়টি সাধারণ পাঠকদের জন্য বোধগম্য করে তোলার মহান ও তড়িৎ উদ্দেশ্য নিয়ে জার্নাল প্রকাশনা শুরু করেন। তাঁদের জার্নাল চারটি সংখ্যা পর্যন্ত প্রকাশ করা হয় এবং সেজন্য গস এবং গোডেলের মতো গণিতের বিশাল দিকপালদের ওপর লিখিত প্রবন্ধের অনুবাদ করতে বাধ্য হন বেলাল ভাই।

কোলকাতা জীবনের আনন্দ উত্তেজনায় মগ্ন থাকার কারণে বেলাল ভাই আসলে তাঁর বাংলাদেশি বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পঞ্চাশের দশকে উঠতি যারা লেখক পরিচয় পাওয়া শুরু করেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং বাংলাদেশের বোহেমিয়ার সক্রেটিস খালেদ চৌধুরী। ফেনীতে থাকাকালে একটা সাপ্তাহিকীতে কাজ করার সময় বেলাল ভাই প্রায়ই ঢাকায় আসতেন। তখন ঢাকার বিউটি বোর্ডিং এবং আরো কয়েকটি ক্যাফে ছিল সাহিত্যের প্রাণবন্ত আড্ডাস্থল। কিছু দিনের জন্য বেলাল ভাই চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা চষে বেড়ান। পরে কোলকাতায় থাকাকালে ওই এলাকার ভবঘুরে সময়ের স্মৃতি জড়ো করেই স্মৃতিকথা লেখেন যেটার কথা আগেই উল্লেখ করেছি।

বেলাল ভাই হঠাৎ করেই একদিন চট্টগ্রামের বইঘরে চমৎকার ফরম্যাটে শহীদ কাদরীর প্রথম কবিতা সংকলন ‘উত্তরাধিকার’, আল মাহমুদের ‘কালের কলস’ এবং শামসুর রাহমানের ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’ পেয়ে যান। বুদ্ধদেব বসুর বাড়িতে একবার বেড়াতে গিয়ে কবির লাইব্রেরিতে বইগুলো দেখেছিলেন বেলাল ভাই। ক্লিনটন সিলি জীবনানন্দ দাশের জীবনী নিয়ে গবেষণার কাজে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে বেলাল ভাইয়ের দেখা হলে তাঁর কাছ থেকে ঢাকার সাহিত্যাঙ্গনের খোঁজ খবর পান। বেলাল ভাই তাঁকে শহীদ কাদরীর সঙ্গেও দেখা করার পরামর্শ দেন। সিলি শহীদ কাদরীর ঠিকানা জানতে চান বেলাল ভাইয়ের কাছে। বেলাল ভাই বলেন, শহীদ কাদরী এমন এক বোহেমিয়ান যাকে কোনো ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাঁকে বরং কোনো ক্যাফেতে খুঁজলে পাওয়া যেতে পারে। শহীদ কাদরীকে এভাবে খুঁজে নিতে সিলিকে আর তেমন বেগ পেতে হয়নি। বুদ্ধদেব বসুর বাড়িতে এক আড্ডায় তাঁর ঢাকার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে সিলি উল্লেখ করেন, শহীদ কাদরী একটা শব্দ খুব বেশি ব্যবহার করেন। সিলির বাংলা জ্ঞান নিয়ে সন্দেহের কিছু নেই, নিশ্চয়ই চমৎকার; কিন্তু নিরাবেগ ভঙ্গিতে ‘আমি’ বলতে গিয়ে তিনি যেন আটকে গেলেন; ইংরেজি ‘ফ্যালাস’-এর প্রতিশব্দ পূর্ব বঙ্গের ওই অপশব্দটি আর বলতে পারলেন না। পূর্ববঙ্গের মানুষ হিসেবে বুদ্ধদেব বসুও নিশ্চয় জানতেন শব্দটা। কিন্তু তিনি স্ফিংসের মতো নীরব হয়ে রইলেন। এই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বেলাল ভাই হাসিতে ফেটে পড়ার ইচ্ছেটাকে দমন করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরই বিচিত্র রকম নির্বাসিত বাঙালিদের আতিথ্যকর্তার ভূমিকা পালন করে কোলকাতা। রাজনীতিবিদ, লেখক, গণমাধ্যমকর্মী, ছাত্রসহ নানা রকম মানুষ সেখানে আশ্রয় নেন। তাদের মধ্যে পরিচিতজন ও বন্ধুবান্ধবও ছিলেন; যেমন কবি আল মাহমুদ, সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরী এবং এম আর আখতার মুকুল ছিলেন। ইসরাত ফেরদৌসির অকপট স্মৃতিকথা ‘দ্য ইয়ার দ্যাট ওয়াজ’ (১৯৯৬) -এ ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতার চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন বেলাল ভাই। এরকম একটা বইয়ের ব্যাপক পরিচিতি থাকা দরকার।

বেলাল ভাই শুনতে পান, আল মাহমুদ গর্ব করে বলে বেড়াচ্ছেন, তিনি আটজন পাক সৈনিককে হত্যা করেছেন। বেলাল ভাই ভাবতে থাকেন, তিনি নিজে বাংলাদেশের পক্ষে কিভাবে কাজ করতে পারেন। একদিন বেলাল ভাই, সুভাস মুখোপাধ্যায় (মার্ক্সবাদী কবি) এবং আল মাহমুদ বাংলাদেশের পক্ষের কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই)-র একটা মিছিলের সামনে পড়ে যান। সুভাস মুখোপাধ্যায় তো সিপিআইয়ের সমর্থক। তিনি মিছিলে যোগ দিয়ে দিলেন। আল মাহমুদও তাঁকে অনুসরণ করলেন। বেলাল ভাইয়ের সামনেও যোগ দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প রইল না।

তবে মিছিলে তিনি স্বস্তি বোধ করতে পারছিলেন না। তিনি বলেন, ‘আমার মনে পড়ে গেল, সামনেই খালাসিটোলা, আমাদের নিয়মিত আড্ডাখানা। সত্যিই ওখানে বেশ কয়েকজন পরিচিতকে দেখতে পেলাম। আমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ওরা হাসাহাসি করতে লাগল, নানা রকম অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল। ওদের মধ্যে কয়েকজন খুব জোসের সাথে ইশারায় আমাকে ডাকতে লাগল ওদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য। অন্যদিকে সিপিআইয়ের লোকেরাও আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাতে লাগল। সুতরাং টিপু সুলতান রোডের কাছে আসতেই যতটা ভদ্রভাবে সম্ভব মিছিল থেকে আমি আস্তে করে কেটে পড়লাম। খালাসিটোলার ওরা কয়েকজন হয়তো ভেবেছে আমি বোধহয় অতিরিক্ত মদ্যপানজনিত মাথা ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে সিপিআইয়ের মিছিলে যোগ দিয়েছি।’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বেলাল ভাই কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন গীতা মেহতা, বর্তমানের নামকরা লেখক। ইতোমধ্যে ‘আল মাহমুদ প্রবাসী সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে চাকরি পেয়েছেন। প্রসঙ্গটা গোপন; আর তিনি যেহেতু বানিয়ে বলায় অভ্যস্ত ছিলেন আমরা তার কোনো কোনো গোপনকথা জেনে ফেলি। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, তিনি ওই গোপনকথাগুলো আরো অসংখ্য লোকের কাছে আলাদাভাবে বলেছেন এবং সবগুলোই আসলে হাস্যকর গালগপ্পো।’

এরকম হাস্যকর গালগপ্পো ছাড়াও অর্থলোলুপতার উদাহরণও ছিল। বাংলাদেশের কথা বলে মুম্বাইয়ের মুসলমানদের কাছ থেকে টাকা তোলা হয়েছিল। সংগৃহীত টাকার আপাত জিম্মাদার ছিলেন একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক। পরে বোঝা গেল, ওই টাকার প্রসঙ্গই আর শোনা যাচ্ছে না।’ বেলাল ভাই উল্লেখ করেন, পশ্চিম বাংলার মুসলমানরা বাংলাদেশের স্বাধীন পরিচয়ের বিপক্ষে ছিল।

অবক্ষয়ী নির্বাসিতদের সম্পর্কে বেলাল ভাইয়ের কিছু সারগর্ভ খবর আছে : ‘পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত আমাদের কয়েকজন বন্ধু জানান, ‘জয় বাংলার’ শাঁসালো চেহারার, শক্ত যোগাযোগ এবং ভালো অবস্থানে আছে—এমন দু-চারজন লোক প্রায়ই কোলকাতার নিষিদ্ধ এলাকায় কোনো না কোনো হট্টগোল পাকিয়ে বটতলা স্টেশনের পুলিশের হাতে ধরা পড়ছে। কোনো নির্বাসিত ব্যক্তির সব সুযোগ সুবিধা আছে তাদের; এরকম ফূর্তি করার সময়ও আছে।’ বেলাল ভাই একবার রসালো মন্তব্য করে বললেন, বটতলা থানার দলিলপত্র ভালো করে পরীক্ষা করে না দেখলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিাস অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।

অনেকটা বিচক্ষণতার সঙ্গেই বেলাল ভাই বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের কদাচিৎ দেখা যেত কোলকাতায়। এটা ঠিক, আমরা যারা পাকিস্তানিদের সঙ্গে বিনিময়ের হিসাব নিকাশের কাজে মগ্ন ছিলাম তারা কোলকাতার উত্তেজনা সম্পর্কে অবশ্যই শুনেছি। তবে খোঁজ নিয়ে দেখার মতো আগ্রহ বোধ করিনি।

যুদ্ধ যেমন হঠাৎ করে শুরু হয়েছিল তেমন হঠাৎ করেই শেষ হয়ে যায়। বেলাল ভাই আরো বছর দেড়েক কোলকাতায় থেকে যান । তারপর মায়ের আবেদনে ফিরে আসেন ঢাকায়। বিয়ে করেন, পরিবার যাপন করা শুরু করেন এবং বিপত্নীক হওয়ার দুঃখও পান। আমাদের সৌভাগ্য যে, তিনি আমাদের সবার জন্য বহুলপ্রজ লেখক হয়েই থাকেন। তাঁর বর্ণিল জীবন সম্পর্কে অসংখ্য প্রবন্ধ, নিবন্ধে, স্মৃতিচারণ করেছেন। তবে তাঁর এখনই উচিত সব স্মৃতিকে বইয়ের দুই মলাটের মাঝে সংরক্ষণ করা। [আর্কাইভ থেকে]

//জেডএস//

সম্পর্কিত

আমার হৃদয়ে তার সোনালি স্বাক্ষর

আমার হৃদয়ে তার সোনালি স্বাক্ষর

মায়া তো মায়াই, যত দূরে যায়...

মায়া তো মায়াই, যত দূরে যায়...

মুরাকামির লেখক হওয়ার গল্প

মুরাকামির লেখক হওয়ার গল্প

বিদায় নক্ষত্রের আলো রাবেয়া খাতুন

বিদায় নক্ষত্রের আলো রাবেয়া খাতুন

২০২১ আরও দিশাহীন করে তুলতে পারে

২০২১ আরও দিশাহীন করে তুলতে পারে

কিম কি দুক : কোরিয়ান নিউ ওয়েভের যাযাবর

কিম কি দুক : কোরিয়ান নিউ ওয়েভের যাযাবর

সময় ও জীবনের সংবেদী রূপকার

সময় ও জীবনের সংবেদী রূপকার

প্রসঙ্গ সৈয়দ হকের কাব্যনাট্য

প্রসঙ্গ সৈয়দ হকের কাব্যনাট্য

সর্বশেষ

আমার হৃদয়ে তার সোনালি স্বাক্ষর

আমার হৃদয়ে তার সোনালি স্বাক্ষর

মায়া তো মায়াই, যত দূরে যায়...

মায়া তো মায়াই, যত দূরে যায়...

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

দুটো চড়ুই পাখির গল্প

থমকে আছি

থমকে আছি

সালেক খোকনের নতুন বই ‘অপরাজেয় একাত্তর’

সালেক খোকনের নতুন বই ‘অপরাজেয় একাত্তর’

আমরা এক ধরনের মানসিক হাসপাতালে বাস করি : মাসরুর আরেফিন

আমরা এক ধরনের মানসিক হাসপাতালে বাস করি : মাসরুর আরেফিন

মুরাকামির লেখক হওয়ার গল্প

মুরাকামির লেখক হওয়ার গল্প

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.