সেকশনস

‘দায়িত্ব নিতে না পারলে সন্তান জন্ম দিয়েছেন কেন?’

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২১, ১৯:০০

প্রভাষ আমিন গল্পটা আপনাদের সবার জানা। শহরের এক শিক্ষিত ভদ্রলোক গ্রামে গেছেন। নৌকা দিয়ে নদী পারাপারের সময় মাঝির সঙ্গে গল্প করছিলেন। জাতীয়-আন্তর্জাতিক নানা বিষয় নিয়ে মাঝির সঙ্গে আলাপ করছিলেন। কিন্তু ‘মূর্খ’ মাঝি কিছুই জানে না। ভদ্রলোকের খুব আফসোস হচ্ছিল মাঝির জন্য, আহারে তুই তো দেখি কিছুই জানিস না। তোর জীবনের তো আট আনাই মিছে। লজ্জিত মাঝি মাথা নিচু করে নৌকা বাইতে লাগলো। নৌকা যখন মাঝ নদীতে, তখন ঝড় উঠলো। নির্বিকার মাঝি জানতে চাইলো, স্যার সাঁতার জানেন তো? ভদ্রলোকের কণ্ঠে আতঙ্ক, না। মাঝি বললো, স্যার তাহলে তো আপনার জীবনের ষোলো আনাই মিছে। এই গল্পটি আমার মনে পড়ছিল, অবসরপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রার আবদুর রব সরকারকে দেখে। সারাজীবন সরকারি চাকরি করেছেন। তার যেই পদ, তাতে টুপাইসের অঢেল ব্যবস্থা। জানি না তিনি সেই অঢেলে গা ভাসিয়েছিলেন কিনা, নাকি সৎভাবেই চাকরি করেছেন। যেভাবেই হো অর্থ তিনি ভালোই কামিয়েছেন। ঢাকা ও রাজশাহীতে একাধিক ফ্ল্যাট-বাড়ি করেছেন। ছেলেদের ব্যয়বহুল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়িয়েছেন। ছেলেদের গাড়ি কিনে দিয়েছেন। তিন ছেলের বড় দুইজন ভালো চাকরি করে। আদরের ছোট ছেলেও এ লেভেল শেষ করে বিদেশ যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। রব সরকার নিশ্চয়ই অবসরে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতেন, একজন সফল মানুষের জীবনে যা যা করা দরকার সবই তো করেছেন। হায়, এই ‘সফল’ জীবনের অধিকারী রব সরকার এখন লজ্জায় মুখ লুকানোর জায়গা পাচ্ছেন না। তার ছোট ছেলে, ফারদিন ইফতেখার দিহান এখন ধর্ষণ এবং হত্যা মামলার আসামি হয়ে কারাগারে। মিথ্যা বা ষড়যন্ত্র বলে পার পাওয়ারও কোনও সুযোগ নেই। মামলা খুব সহজ এবং দিহান নিজেই তা স্বীকারও করেছে।

কলাবাগানের ঘটনায়, ভিকটিম আনুশকা, অভিযুক্ত দিহান। দু’জন বন্ধু ছিল। দুজনের বয়সই কাছাকাছি-১৭ থেকে ২০। এই বয়সের সন্তানরা হলো পরিবার এবং দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু ভবিষ্যতের এই পরিণতি দেখলে আমরা শঙ্কিত হই। এই ঘটনায় আনুশকার জন্য, তার পরিবারের জন্য আমার গভীর সমবেদনা। কিন্তু আমি জানি, এই ঘটনায় দিহানের পরিবারের বেদনাটা আরো বেশি। সন্তান বেঁচে আছে, কিন্তু বাবা-মা ভাবছেন, এই সন্তান মরে গেলে আরো ভালো হতো। বেঁচে থাকা সন্তান নিয়ে যে গ্লানি, তা সন্তান মরে যাওয়ার বেদনার চেয়েও দুর্বহ।

কিন্তু এই বেদনা, এই গ্লানির দায় আর কারো নয়; আব্দুর রব সরকার, দিহানের মা সানজিদা সরকার, বড় দুই ভাই সুপ্ত এবং নিলয়েরই। বাবা-মা, ভাইয়েরা জানতেই পারলেন না তারা আদর দিয়ে, স্নেহ দিয়ে, প্রশ্রয় দিয়ে এক দানব বড় করছেন। বাসা খালি পেয়ে যে দানব তার বান্ধবীকে বিকৃত যৌনাচারে খুন করে ফেলেছে। হঠাৎ রাগের মাথায় এক থাপ্পরেও মানুষ মরে যেতে পারে। কিন্তু একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা পাশবিকতার চূড়ান্ত উদাহরণ। সেই পশুটি পেলে-পুষে বড় করেছে রব সরকারের পরিবারই। রব সরকার যদি সারাজীবন বাড়ি, গাড়ি, দামি স্কুলের পেছনে না ছুটে সন্তানদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারতেন, তাদের সময় দিতেন; তাহলে আজ তিনি সমাজে মাথা উঁচু করে চলতে পারতেন। দু’দিন আগে পুলিশের আইজি বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ছেলে বা মেয়ে কোথায় যায়, কী করে- সেই খোঁজ অভিভাবকদের রাখতে হবে।

সন্তানের ওপর অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণ জরুরি। বাবা-মায়েদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘সন্তান জন্ম দিয়েছেন, দায়-দায়িত্ব নিতে হবে। দায়িত্ব নিতে না পারলে সন্তান জন্ম দিয়েছেন কেন?’ বেনজীর আহমেদ হয়তো একটু কড়া পুলিশি ভাষায় বলেছেন। কিন্তু ভুল কিছু বলেননি কিছু। কোনও শিশুই কিন্তু নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসে না। বাবা-মায়ের আনন্দের ফসল একটি শিশু। আর প্রতিটি শিশুই পৃথিবীতে আসে নিষ্পাপ, নিষ্কলুষ দেবশিশু হিসেবে। তারপর বড়দের মানে আমাদের ভণ্ডামি, কুপমন্ডূকতা, হিংসা, লোভ, লালসা বদলে দেয় তাদের পৃথিবী।

আস্তে আস্তে সভ্যতার অন্ধকার দিকগুলো গ্রাস করে তাদেরও। সেই দেবশিশুদের আমরা চাইলে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন চমৎকার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, যারা দেশ-জাতি ও পরিবারের মাথা উঁচু করতে পারে। আবার দিহানের মতো একটা দানব চৌদ্দগোষ্ঠীর মাথা হেট করার জন্য যথেষ্ট।

আপনার অনেক টাকা হলো, অনেক ক্ষমতা হলো, অনেক নাম হলো; কিন্তু আপনার সন্তান বখে গেলো। নৌকার সেই ভদ্রলোকের মতো আপনার কিন্তু ষোলআনাই মিছে। সেই টাকা আপনার কাছে অর্থহীন হয়ে যাবে, ক্ষমতা পানসে মনে হবে, নাম ভুলে যেতে চাইবেন। সন্তানকে মানুষ করতে হবে, শুধু আপনার জন্য নয়– দেশের জন্য, জাতির জন্য। এই শিশুরাই তো একদিন দেশের নেতৃত্ব দেবে। তাদের যত ভালোভাবে গড়ে তুলতে পারবেন, ততই লাভ। কেউ জমিতে বিনিয়োগ করে, কেউ শেয়ারবাজারে। কিন্তু সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগ হলো আপনার সন্তান।

যে কোনও অপরাধীর শাস্তির জন্য দেশে আইন-আদালত আছে। কিন্তু কোনও কিশোর অপরাধকে দেখলে আমার প্রথম ভাবনা হয়, তার বাবা-মা কোথায়? তারা কী জানতো না, তার সন্তান অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। আমাদের ছেলেবেলায় তো অসময়ে রাস্তায় হাঁটতে দেখলেও প্রতিবেশী কোনও মুরুব্বি ধরে বাসায় পৌঁছে দিতেন। সেই

মুরুব্বি, সেই সমাজ এখন কোথায়? আমাদের শক্তি ছিল আমাদের যৌথ পরিবার ব্যবস্থা, পারিবারিক মূল্যবোধ। শিশুরা বেড়ে উঠবে মায়ের আদরে, বাবার শাসনে। চাচাতো, মামাতো, খালাতো, ফুপাতো ভাইবোনরা মিলে বেড়ে উঠবে। আনন্দে কানায় কানায় ভরে থাকবে তার শৈশব। কিন্তু সেই যৌথ পরিবারের ধারণাটা কি আলগা হয়ে যাচ্ছে? আমরা কি সব বিচ্ছিন্ন মানুষ হয়ে যাচ্ছি?

এখন ঢাকায় চলছে ফ্ল্যাট সংস্কৃতি। দিহানের পাশের ফ্ল্যাটের কেউ কিন্তু জানতেও পারেনি, তাদের ভবনেই ধর্ষণ এবং খুনের মতো একটা ভয়াবহ অপরাধ ঘটছে। এখন আমাদের সব পরিবার অণু-পরমাণুতে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। বাবা চাকরি করে, মা চাকরি করে। যার যার ক্যারিয়ার। কিন্তু সন্তান বেড়ে উঠছে অজান্তে, কখনও অনাদরে, অবহেলায়। আমরা সন্তানদের সময় দিতে পারি না বলে, তাদের অনেক অন্যায় আবদার মেনে নেই। নিজের অপরাধবোধ ঢাকতে নিজের অজান্তেই সন্তানকে বিপথে ঢেলে দিই। আর পরে সন্তানের কাছে কৈফিয়ত চাই, তোমার তো কোনও অভাব রাখিনি, তাহলে এমন হলো কেন? আমরা বুঝতেই চাই না, সন্তানের চাহিদা তো টাকা নয়, মমতা।

আমরা কি সবাই বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবো, সন্তানের প্রতি আমরা আমাদের সত্যিকারের দায়িত্ব পালন করেছি? প্রতিদিন কি আমরা সন্তানের সঙ্গে কথা বলেছি? সে কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, সে কীভাবে বেড়ে উঠছে, খোঁজ নিয়েছি? তার চাওয়া-পাওয়া নিয়ে ভেবেছি?

আমরা খালি আত্মতৃপ্তি খুঁজি, আমার সন্তানকে তো আমি ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়েছি, ভালো টিচারের কাছে পড়িয়েছি, ভালো পোশাক কিনে দিয়েছি, ভালো খাইয়েছি। তাহলে সন্তান কেন খারাপ রেজাল্ট করে, সে কেন ধর্ষক হয়, খুনি হয়, কেন মাদকাসক্ত হয়, এই প্রশ্নের উত্তর আর মেলাতে পারি না। আপনার নিষ্পাপ দেবশিশু কবে এমন ধর্ষক হয়ে উঠলো, আপনি জানতে পারলেন না কেন?

প্লিজ বাবা-মায়েরা, আপনারা সন্তানের জন্য বাঁচুন, সন্তানে আনন্দ খুঁজুন, সন্তানে বিনিয়োগ করুন। আপনারা হয়তো বলতে পারেন, অত বড় বড় কথা বলার আমি কে? সত্যি বাবা-মায়েদের অমন উপদেশ দেওয়ার মতো বুড়োও আমি নই। কিন্তু আমার একটি ছেলে আছে। আমি তার অবস্থান থেকে পৃথিবীটা দেখার চেষ্টা করি।

প্রসূনকে ভালোবাসি বলেই আমি সব শিশুকে ভালোবাসি। আমি চাই না, আমাদের কারো সন্তান ঐশীর মতো হন্তারক হোক, দিহানের মতো ধর্ষক হোক। ভালো থাকুক আমাদের সন্তানেরা। বেড়ে উঠুক মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে। তবে শুধু চাইলেই হবে না, সেই চাওয়াটা বাস্তবায়ন করতে সন্তানকে সময় দিতে হবে, মমতা দিতে হবে, মূল্যবোধ শেখাতে হবে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

 

/এসএসএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

অভিমানী মাশরাফি বিদায় বলার সুযোগ দিলেন না

অভিমানী মাশরাফি বিদায় বলার সুযোগ দিলেন না

অনুভূতিহীন আওয়ামী লীগ!

অনুভূতিহীন আওয়ামী লীগ!

বিশে বিষ ক্ষয়ে আসুক সম্ভাবনার একুশ

বিশে বিষ ক্ষয়ে আসুক সম্ভাবনার একুশ

বিএনপির শোকজ বিতর্ক এবং মান্নার বিপ্লব বিলাস

বিএনপির শোকজ বিতর্ক এবং মান্নার বিপ্লব বিলাস

স্বপ্ন, সাহস আর আত্মমর্যাদার সেতুবন্ধন

স্বপ্ন, সাহস আর আত্মমর্যাদার সেতুবন্ধন

রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ

রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ

সহিষ্ণুতার ইসলাম এবং আমাদের অতি স্পর্শকাতর অনুভূতি

সহিষ্ণুতার ইসলাম এবং আমাদের অতি স্পর্শকাতর অনুভূতি

নির্বাচনি ‘শিক্ষা বিনিময়’ চুক্তি!

নির্বাচনি ‘শিক্ষা বিনিময়’ চুক্তি!

‘আমারে মাইরেন না, আমি আর নিউজ করবো না’

‘আমারে মাইরেন না, আমি আর নিউজ করবো না’

‘মরা সাপ পেটানো’র সাংবাদিকতা!

‘মরা সাপ পেটানো’র সাংবাদিকতা!

‘ও আমার বাংলা মা তোর...’

‘ও আমার বাংলা মা তোর...’

‘যত দোষ, নারী ঘোষ’

‘যত দোষ, নারী ঘোষ’

সর্বশেষ

শহীদ মতিউরের স্মৃতিফলকে ছাত্রলীগের শ্রদ্ধা

শহীদ মতিউরের স্মৃতিফলকে ছাত্রলীগের শ্রদ্ধা

যোগ্যতাবিহীন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসর ভাতার উদ্যোগ

যোগ্যতাবিহীন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসর ভাতার উদ্যোগ

বাহারি ব্যাগ এনেছে ‘সারা’

বাহারি ব্যাগ এনেছে ‘সারা’

যুক্তরাজ্যে করোনায় আরও পাঁচ বাংলাদেশির মৃত্যু

যুক্তরাজ্যে করোনায় আরও পাঁচ বাংলাদেশির মৃত্যু

সিরিয়া ফেরত নব্য জেএমবির এক জঙ্গি গ্রেফতার

সিরিয়া ফেরত নব্য জেএমবির এক জঙ্গি গ্রেফতার

দীপন হত্যা মামলার রায় ১০ ফেব্রুয়ারি

দীপন হত্যা মামলার রায় ১০ ফেব্রুয়ারি

ভোজ্য তেলের দাম এখনও নির্ধারিত হয়নি

ভোজ্য তেলের দাম এখনও নির্ধারিত হয়নি

লিফটে অস্ট্রেলিয়ানরা থাকলে ঢুকতে পারতেন না অশ্বিনরা!

লিফটে অস্ট্রেলিয়ানরা থাকলে ঢুকতে পারতেন না অশ্বিনরা!

বিল পাস, পরীক্ষা ছাড়াই এইচএসসির ফল প্রকাশের বাধা কাটলো

বিল পাস, পরীক্ষা ছাড়াই এইচএসসির ফল প্রকাশের বাধা কাটলো

অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে রাশিয়ার প্রতি আহ্বান ন্যাটোর

অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে রাশিয়ার প্রতি আহ্বান ন্যাটোর

সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে হবে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা

সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে হবে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা

প্রেসিডেন্ট থেকে তারকা- সবাই তার ভক্ত

প্রেসিডেন্ট থেকে তারকা- সবাই তার ভক্ত

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.