X
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২
১৬ আষাঢ় ১৪২৯

করোনা নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্সের বিকল্প নেই

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২১, ১৩:৩১

সালেক উদ্দিন
দেশে করোনার এখন কোন ঢেউ চলছে?  দ্বিতীয় ঢেউ, তৃতীয় ঢেউ নাকি চূড়ান্ত ঢেউ– বলা মুশকিল। তবে যেদিন এই লেখাটি লিখছি সেদিন দেশব্যাপী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৮৫৪ জন। এটা সরকারি হিসাব এবং এই দিনে মৃত্যুবরণ করেছেন রেকর্ড ৭৪ জন। এর একদিন আগে সংক্রমিত হয়েছিলেন ৭ হাজার ৬২৬ জন।

এর আগে করোনায় একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬৪ জন। দিনটি ছিল ৩০ জুন ২০২০। আর এখন ৮ এপ্রিল  মারা গেছেন ৭৪ জন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সব রেকর্ড ভেঙে নতুন  রেকর্ড গড়ার বিষয়টি সময়ের ব্যাপার মাত্র। তথ্যগুলো বলে দিচ্ছে আমাদের এখন চরম দুঃসময় চলছে।

এ বছর মার্চের আগ পর্যন্ত দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১০ এর নিচে। করোনাকে হারিয়ে দিয়েছি এই ভেবে তখন ব্যক্তি থেকে শুরু করে সরকার সবাই আমরা মোটামুটি আশ্বস্তের দিন গুণতে থাকি। জনসমাগমের অনুষ্ঠান করতে থাকি। ধারাবাহিকভাবে খুলে দেওয়া হতে থাকে অফিস-আদালত, সুপার মার্কেট, বাস-ট্রেন ইত্যাদি। বাসে ট্রাকে টেম্পুতে গাদাগাদি করে চলাচল আগের মতোই স্বাভাবিক হয়ে উঠলো, কাঁচাবাজারে ঠাসাঠাসিতে আপত্তি করার কেউ রইলো না। চলতে থাকল দিনে-রাতে তরুণ-যুবকদের আড্ডা। বড়রাও কম কিসে? চলতে থাকল সভা-সমাবেশে জনসমাগম, বিয়ে, বৌ-ভাতের মতো পারিবারিক অনুষ্ঠানমালার ‘ধুম- ধারাক্কা’।

সামাজিক দূরত্ব, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বিষয় আমরা আর পাত্তা দিলাম না। এমনকি বাসে গাদাগাদি করে চলাচল প্রতিনিয়ত ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করে নিলাম। বাজারে ঠাসাঠাসি কোনও ব্যাপারই মনে করলাম না। স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি খোলার দাবিতে মিছিল হলো, সড়ক অবরোধ করা হলো। ধানমণ্ডি সহ ঢাকার বিভিন্ন স্কুল পাড়ায় কোচিং পাড়ানোর ধুম পড়ে গেলো যা এখনও  চলছে বলেই ধারণা করছি। আর বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে করোনার সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সংখ্যা।

করোনাকালীন পুরো সময়টাতেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা তো বন্ধই করলো না। তারা  প্রচার শুরু করলো- ‘মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের করোনা হয় না’, ‘মাস্ক পরা ইসলাম সিদ্ধ নয়’।  আমি যে এলাকায় বসবাস করি এবং যে জামে মসজিদ নামাজ আদায় করতাম সেখানকার মসজিদ কমিটি মাস্ক বিষয়ক সরকারি বিধি-নিষেধ টাঙিয়ে রাখলেও খতিব সাহেব  জুম্মার নামাজের খুতবায় এসবের তোয়াক্কা না করে উপরের কথাগুলো বহুবার বলেছেন। মুফতি সাহেব নিজেও মাস্ক পরেন না এবং তার অনুসারীদের একটা বৃহৎ অংশকে মাস্ক না পরার জন্য অনুপ্রাণিত করেন। এতে এই মসজিদে মাস্ক না পরা মুসল্লিদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কাতারে দাঁড়ানো আর সম্ভব হচ্ছে না। এটা যে গোড়ামি আর এক ধরনের‌ অজ্ঞতা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখান থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। প্রয়োজন প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ।

যাহোক শুধু এ কারণে নয়– দেশে একটি সময়ে করোনার সংক্রমণ কমার কারণেই আমাদের ছেলেমেয়েরা, যুবক যুবতীরা, গৃহকর্তা গৃহবধূরা, অফিস-আদালতের মানুষরা, রাজনীতিবিদরা সর্বোপরি সরকারের নীতিনির্ধারকরা যে ঢিলেঢালা ভাবে জীবন চলাচল করছেন। এ কারণেই জাতি আজ চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। বন্ধ হয়নি জন্মদিন বৌভাত বিয়ের মতো শত শত লোকের সমাগম হওয়া পারিবারিক অনুষ্ঠান। থামেনি ধর্মসভা, থামেনি রাজনৈতিক সভা, থামেনি মিছিল, থামেনি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে জনসমাগম। আর তারই ফলে ধেয়ে আসছে করোনা, ধেয়ে আসছে মৃত্যু। বর্তমানে দৈনিক করোনায় সংক্রমণের সংখ্যা সাত/ আট হাজারের ঘরে এবং  মৃত্যু ৮০’র কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

অথচ আজ থেকে দেড় দু’মাস আগেও করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল সর্বনিম্ন এবং দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচজনে নেমে এসেছিল। আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম। ভেবেছিলাম করোনা আমাদের আর কিছুই করতে পারবে না।

এরপর আমরা ঢিলা-ঢালা অবস্থায় চলে এলাম। সামাজিক উদ্যোগ তো ছিলই না। প্রশাসনিক উদ্যোগও ছিল শিথিল। অতএব বলতেই হবে করোনাভাইরাস জনিত কারণে দেশ ও জাতি সর্বোপরি মানুষ যে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে তার জন্যেই আমরা কেউই দায় এড়াতে পারি না।

সম্ভবত এসব কারণেই ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। এই নির্দেশনা সম্পর্কে একটি কথাও বলবো না। কারণ, গেল বছর সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তা এর চেয়ে কোনও অংশেই কম ছিল না। করোনার সংক্রমণ যেন না বাড়ে, এদেশে  করোনা যেন মহামারি রূপ ধারণ করতে পারে– সে জন্য গেল বছর ৬৬ দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল সরকার। প্রণোদনা দিয়েছিল, অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল, মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছিল, জনসমাগম বন্ধ ঘোষণা করেছিল, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার নির্দেশনা দিয়েছিল, এমনকি উপাসনালয়ে মাস্ক পরিধান করে  তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে নামাজ ও অন্যান্য উপাসনার নির্দেশনা বাধ্যতামূলক করেছিল ইত্যাদি। সরকারি নির্দেশনা যদি পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পালন করা হতো তবে আজকের এই সংকট সামনে আসতো না।

এর জন্য দায়ী কে? সাধারণ মানুষ তো অবশ্যই। প্রশাসন? সরকারি নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালনের জন্য প্রশাসনের যা যা পদক্ষেপ যে যেভাবে নেওয়া উচিত ছিল তারা কি তা নিয়েছিলেন?  মানুষকে শুধুমাত্র মাস্ক সরবরাহ করে টিভির পর্দায় আসাই প্রশাসনের কাজ নয়। এই মাস্ক যদি মানুষ ব্যবহার না করে, সামাজিক দূরত্ব যদি মানুষ না মেনে চলে, জনসমাবেশ সহ ক্ষতিকারক দিকগুলো মানুষ যদি অমান্য করে, তবে সরকারের কাজ কি শুধু শুভবুদ্ধি দেওয়া? নাকি জাতির বৃহত্তর স্বার্থের জন্য কঠোর থেকে কঠোরতম অবস্থান গ্রহণ করা!

যে কথাটি না বললেই নয় তা হলো গেলো বছরে করোনাকালীন দুর্যোগের সময়ে করোনা থেকে রক্ষার জন্য প্রদত্ত নিয়মকানুনগুলো মেনে চলার জন্য প্রশাসনের পদক্ষেপ যুগোপযোগী ছিল না। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর হতে পারেনি। যার কারণে সমাজের সাধারণ মানুষগুলো সচেতন হয়নি। আর যার জন্য আজকে এই মহা বিপর্যয়ের মুখোমুখি পড়েছি আমরা।

জনসচেতনতার জন্য গেলো বছরের উদ্যোগের অভাব ছিল না। তারপরেও কেন সচেতনতা এলো না– সেটা ভেবে দেখার সময় এসেছে। আসলে সচেতনতা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ এ দুটির পাশাপাশি ব্যবহার না হলে ভালো কোনও ফলাফল আসে না।

বহু বহু গুণ শক্তি নিয়ে ফিরে আসা করোনার মহা ছোবল থেকে বাঁচাতে হলে সম্প্রতি সরকার প্রদত্ত ১৮ দফা কর্মসূচি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। কে কী বলল তা ভেবে দেখার সময় এখন নেই। বন্ধ করতে হবে জনসমাগম হয় এমন সমস্ত পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। চলমান বইমেলা, আসন্ন বৈশাখী মেলা, মঙ্গল যাত্রা থেকে শুরু করে সকল অনুষ্ঠান। এই দুঃসময়ের জন্য এসব অনুষ্ঠান বন্ধ রাখলে আমরা যারা  ভাবছি বাঙালির জাত চলে যাবে-তারা অন্ধের জগতে বাস করছি।

করোনার মরণ ছোবলের হাত থেকে আমরা বাঁচতে চাই। আর এর জন্য দেশের সরকারকে যত রকম কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয় তারা তা নেবে বলে আশা করছি। শুধু তাই নয় অজ্ঞতা অন্ধত্বের কারণে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ ব্যাপারে কেউ বিরুদ্ধাচরণ করলে তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। শুধু লকডাউন নয়, প্রয়োজনে কারফিউ, জেল- জরিমানার নিয়ম প্রবর্তন করতে হবে। জনসাধারণ এবং সমাজ সচেতন মানুষরা অবশ্যই এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানাবে বলেই মানুষ বিশ্বাস করে। 

লেখক: কথাসাহিত্যিক

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পিস্তল হাতে ভাইরালের ৬ মাস পর বায়েজিদ গ্রেফতার
পিস্তল হাতে ভাইরালের ৬ মাস পর বায়েজিদ গ্রেফতার
শিক্ষক হত্যা ও লাঞ্ছনার ঘটনার প্রতিবাদ বাউবি শিক্ষক সমিতির
শিক্ষক হত্যা ও লাঞ্ছনার ঘটনার প্রতিবাদ বাউবি শিক্ষক সমিতির
রাষ্ট্রপতির কাছে অস্ট্রিয়া ও লিবিয়ার নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র পেশ
রাষ্ট্রপতির কাছে অস্ট্রিয়া ও লিবিয়ার নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র পেশ
নড়াইলে শিক্ষক হেনস্থা: বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট
নড়াইলে শিক্ষক হেনস্থা: বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ