X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা এনজিও’কে দেওয়া যৌক্তিক নয়

আপডেট : ২৮ জুন ২০২১, ১৮:০১

রুমিন ফারহানা করোনা বাড়ছে। ভয়ংকরভাবেই বাড়ছে। চুয়াডাঙ্গায় কিছু দিন আগেই শনাক্তের হার ছিল শতভাগ। সীমান্তবর্তী আরও কিছু জেলায় শনাক্ত ৭৫ থেকে প্রায় শতভাগ। গত সপ্তাহেও যেখানে ৪০টি জেলা অতি উচ্চ ঝুঁকিপ্রবণ, ১৫টি ঝুঁকিপ্রবণ আর বাকিগুলো সাধারণ ঝুঁকিতে ছিল, সেখানে এই সপ্তাহেই মোটামুটি সব জেলাতেই রেড অ্যালার্ট।

রবিবার একটা জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে দেখলাম, নড়াইলে ২০ জুন থেকে শুরু হওয়া সর্বাত্মক লকডাউন শেষে দেখা যাচ্ছে গত ৫ দিনই পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৩৪ থেকে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত ওঠানামা করছে; বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। দুই দফা লকডাউনের পরও দেখা যাচ্ছে সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী।

প্রশ্ন উঠতে পারে বাংলাদেশে লকডাউন বলে আদৌ কিছু আছে কিনা। বিধিনিষেধ, কঠোর বিধিনিষেধ, লকডাউন, সর্বাত্মক লকডাউন, কঠোর লকডাউন ইত্যাদি নানা বিশেষণে বিশেষায়িত হয়ে লকডাউনের চিত্র হলো সারা দেশে অফিস-আদালত, কলকারখানা, দোকান, মার্কেট, গণপরিবহন থেকে শুরু করে সবই খোলা, কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাদে।

করোনাকালীন যে ন্যূনতম বিধিনিষেধ অত্যাবশ্যক ছিল, সেটাও কাউকে তেমনভাবে মানতে দেখা যায়নি। এমন অবস্থায় সরকারের হাতে একটাই উপায় ছিল, তা হলো জনসাধারণকে টিকার আওতায় আনা।

এবারের বাজেট বক্তৃতায় দেখলাম অর্থমন্ত্রী ভারত থেকে তিন কোটি টিকা পাওয়ার ‘গল্প’ করছেন। অথচ ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে এই বছর শেষ হওয়ার আগে তারা কোনও রকম টিকা রফতানি করতে পারবে না। যদিও টিকার দাম আগেই চুকানো হয়ে গেছে। আর একজন অতিরিক্ত সচিব সিনোফার্ম টিকার দামের তথ্য জানিয়ে দেওয়ার পর সেই টিকা প্রাপ্তিও অনিশ্চিত হয়ে গেছে। অর্থমন্ত্রী কোভ্যাক্স থেকে ছয় কোটির বেশি টিকা পাওয়ার কথা বলেছেন। এই টিকা পাওয়াও এখন দারুণ অনিশ্চিত হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত কোভ্যাক্স থেকে মাত্র এক লক্ষ (ফাইজার) টিকা পাওয়া গেছে। অর্থমন্ত্রী স্বপ্ন দেখছেন মাসে ২৫ লক্ষ টিকা দেওয়ার, যেখানে টিকার কোনও উৎসই এখন পর্যন্ত ঠিক হয়নি। আর এই হিসাবেও ১৭ কোটি মানুষের ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ১৩ কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনতে সময় লাগবে ৮ বছরের বেশি। ওদিকে ভারতের পরিকল্পনা হচ্ছে দিনে ১ কোটি টিকা দেওয়া।

মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানানো থেকে শুরু করে টিকার অব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি গগনচুম্বী দুর্নীতি নিয়ে যখন মানুষ সমালোচনায় সোচ্চার তখন এর এক চমৎকার জবাব দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী– স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি নিয়ে কথা বলা নাকি ফ্যাশন।

এই ফ্যাশনের মধ্যে আছে করোনাকালে মাস্ক কেলেঙ্কারি, নকল করোনা সনদ, কেনাকাটায় মিঠু সিন্ডিকেটের দুর্নীতি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী আবজাল দম্পতির হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, টেকনিশিয়ানের নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে নিউরো সায়েন্স ও হাসপাতালের ২৫০ টাকার সুঁই ২৫ হাজার টাকায়, ৮০ টাকার ক্যানোলা ১৪০০ টাকায়, ৪০০ টাকার কাঁচি ১০,৫০০ টাকায় কেনা।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কষ্ট আমি বুঝি – করোনার কারণে সব ফোকাস তার ওপরে, আর তাই অন্যান্য সব মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি ছাপিয়ে তিনিই একা দৃশ্যমান। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতেই পারে এই রাষ্ট্রের আর সব মন্ত্রণালয় এই মুহূর্তে দুর্নীতিমুক্ত।

এরমধ্যেই সিদ্ধান্ত এসেছে সরকারি হাসপাতালকে ব্যবস্থাপনার জন্য এনজিও’র হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে। দুর্নীতি, সঙ্গে অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, অযোগ্যতা যদি না-ই থাকে তাহলে কেন দেশের সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা এনজিওর হাতে দেওয়ার চিন্তা সরকারের মাথায় আসছে? সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক চিঠিতে বলা হয়েছে, পাইলট প্রকল্প আকারে কিছু সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা এনজিওর কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সরকার।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব একটি জাতীয় দৈনিককে বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সেটি ভয়ংকর খারাপ সিদ্ধান্ত হবে। নন-গভর্নমেন্ট অরগানাইজেশন (এনজিও) সরকারি ব্যবস্থাপনার কী বুঝবে? তাছাড়া কয়টা এনজিও এ ধরনের সক্ষমতা রাখে। তিনি যুক্ত করেন, এটা সঠিক সিদ্ধান্ত হলে পৃথিবীর সব দেশে এনজিওগুলো সরকারি হাসপাতাল পরিচালনা করতো। তিনি বলেন, এটি মূলত আমলাতন্ত্রের একটি সুদূরপ্রসারী চিন্তা। প্রথমে তারা এনজিওর হাতে ব্যবস্থাপনা দেবে, এতে এনজিওগুলো চূড়ান্তভাবে অকৃতকার্য হবে। তারপর তারা সব হাসপাতালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কর্মকর্তা নিয়োগ করবে। ঠিক যেভাবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিষ্ঠান সিএমএসডি দখল করেছে।

সবকিছুতে মাত্রাতিরিক্ত আমলা নির্ভরতার কারণে ওনার এই বক্তব্যকে উড়িয়েও দেওয়া যায় না।

নিজেদের দুর্বলতা যথাযথভাবে এড্রেস না করে এবং সেগুলোকে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা না করে কিছু হাসপাতালকে এনজিওর হাতে তুলে দেওয়া কোনও সমাধান হতে পারে না। স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। এই মৌলিক অধিকারের ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা আদৌ কোনও এনজিওর আছে কিনা সেটা একটা প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত, এ ধরনের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সরকার স্বীকার করে নিচ্ছে একটা এনজিওর সক্ষমতা তাদের চেয়ে অনেক ভালো। অথচ অতীত অভিজ্ঞতা বলে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে যখন এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তখন সেবার মান বাড়া দূরেই থাকুক, বরং সেবা পেতে মানুষকে বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। এর মধ্যেই বাংলাদেশে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় ক্রমশ বেড়ে হয়েছে ৭২ শতাংশ। এনজিওর হাতে গেলে এই ব্যয় আরও বাড়বে। ফলে চাপে পড়বে মধ্যবিত্ত আর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে চলে যাবে স্বাস্থ্যসেবা।

তর্কের খাতিরে ধরে নিই সরকারের সিদ্ধান্ত সঠিক। তাহলে প্রশ্ন হলো- কোনও মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতা, অযোগ্যতা আর দুর্নীতির সমাধান কি সেই মন্ত্রণালয়ের সেবা এনজিওদের হাতে তুলে দেওয়া?

আরও প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের কোন মন্ত্রণালয়টি জনগণের প্রত্যাশা মতো চলছে বা কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছে? কোন মন্ত্রণালয়টিই বা দুর্নীতিমুক্ত?

করোনার কারণে ফোকাসে আছে বলে গত দেড় বছর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা বেশি হয়েছে। অথচ এই দেশের অনেক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে কেনাকাটার নামে লুটপাটের অনেক খবর মিডিয়ায় এসেছে। ব্যাংক থেকে শুরু করে শেয়ার বাজার নিয়ে অনেক খবর এসেছে আমাদের সামনে। ন্যূনতম সেবা পাওয়ার জন্য ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে অনেক।

অদক্ষতা-অযোগ্যতা আর দুর্নীতির কারণে জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে এনজিও'র হাতে তুলে দেওয়া কোনও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। যদি এমন হয় তাহলে এই দেশের ইতিহাসে জনগণ একদিন সাক্ষ্য দেবে এসবের বিরুদ্ধে।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

‘বিসিএস বিশ্ববিদ্যালয় খুলেন, প্রিলিমিনারি-ভাইভা বিভাগ চালু করেন’
‘বিসিএস বিশ্ববিদ্যালয় খুলেন, প্রিলিমিনারি-ভাইভা বিভাগ চালু করেন’
রাতে নামবে বৃষ্টি,  কমতে পারে তাপমাত্রা
রাতে নামবে বৃষ্টি,  কমতে পারে তাপমাত্রা
সুনামগঞ্জে স্রোতে ভেসে যাচ্ছে ঘরবাড়ি ও সড়ক
সুনামগঞ্জে স্রোতে ভেসে যাচ্ছে ঘরবাড়ি ও সড়ক
দেশে সব ধর্মের মানুষ ধর্মীয় অধিকার ভোগ করছে: আইনমন্ত্রী
দেশে সব ধর্মের মানুষ ধর্মীয় অধিকার ভোগ করছে: আইনমন্ত্রী
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ