X
বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট ২০২২
২ ভাদ্র ১৪২৯

পরীমণি’র মুক্তির আন্দোলন কি কেবলই ‘স্টান্টবাজি’?

ডা. জাহেদ উর রহমান
১১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:৩১আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:৩১

ডা. জাহেদ উর রহমান পরীমণি আলোচনায় থাকছেনই। জামিনে তার মুক্তিই বিরাট আলোচনার বিষয় হতে পারতো কিন্তু মেহেদি দিয়ে তার হাতে লেখা একটি মন্তব্য ছাপিয়ে গেছে আর সব আলোচনাকে। সেটা নিয়ে নানা বিশ্লেষণ শেষ পর্যন্ত এসে ঠেকেছে কারাগারে মেহেদি কীভাবে পাওয়া গেলো, সেই প্রশ্নে। 

বিভিন্ন মিডিয়ার ফেসবুক পাতায় পরীমণির জামিনে মুক্তির সংবাদের নিচে মানুষের মন্তব্য পড়েছি অনেকগুলো। চেয়েছিলাম মানুষের চিন্তার ধরন সম্পর্কে মোটাদাগে একটা ধারণা পেতে। একদিকে প্রত্যাশিতভাবেই অনেকে পরীমণির এই মুক্তিতে স্বস্তি এবং উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে বরাবরের মতো খুব বড় সংখ্যক মানুষ তাদের নারীবিদ্বেষ চেপে রাখতে পারেননি কিংবা স্বেচ্ছায় রাখেননি। পরীমণির বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেওয়া মানুষদের বক্তব্য প্রায় একই; আর্থসামাজিক শ্রেণি অনুযায়ী শব্দ এবং ভাষার কদর্যতার মাত্রা ভিন্ন ছিল।

পরীমণির গ্রেফতার হওয়া নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মানুষ যেমন সরব হয়েছেন, তেমনি কিছু মানুষ রাস্তায়ও নেমেছেন। দেখলাম জামিনের পর বহু মানুষ পরীমণির জেলে যাওয়া এবং তার অন্যায়ের শিকার হওয়ার সম্ভাবনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে তীব্র আক্রমণ করছেন। তারা একে স্টান্টবাজি বলছেন; অতি আলোচিত ঘটনাটির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে অনেকেই নাকি নিজেদেরকে আলোচনায় আনতে চেষ্টা করছেন। অনেকেই যখন পরীমণির অধিকারের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে, তারাই কেন আরও অনেকের পক্ষে দাঁড়াননি এসব প্রশ্নও এসেছে। পরীমণিকে প্রথম বার আদালতে আনার পর তার পক্ষে কাজ করার জন্য আইনজীবীদের হুড়োহুড়িতে রীতিমতো বিচারকার্য বন্ধ হয়ে যাওয়া দেখলে এই ‘স্টান্টবাজি-তত্ত্ব’ একেবারে ভুল বলে মনে নাও হতে পারে কারও কাছে। কিন্তু বিষয়টা এতটা সহজ নয়।

পরীমণির পক্ষে মানুষের দাঁড়ানোর বিপক্ষে যারা চরম সরব তাদের প্রধান বক্তব্য হচ্ছে দেশে অনেক বড় বড় সব সমস্যা বাদ দিয়ে সবাই পরীমণিকে নিয়েই কেন মেতে আছে? কেউ প্রশ্ন করছেন একজন ‘চরিত্রহীন’ সিনেমার নায়িকার এমন হওয়াটাই ঠিক আছে, তাই তাকে নিয়ে এত মাতামাতি আমাদের রুচিবোধকেও কি প্রশ্নবিদ্ধ করে না? 

দু’টো পাল্টা প্রশ্ন করা যাক। পরীমণির জেলে যাওয়া এবং তারপর যা যা হয়েছে ঘটেছে, সেটা কি আসলেই দেশের অনেক বড় সব সমস্যার তুলনায় তুচ্ছ কিছু? কিংবা পরীমণির ঘটনার প্রতিবাদ করা এই রাষ্ট্রের আপামর জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষা কিংবা একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তৈরির জন্য কি খুবই মূল্যহীন বিষয়?

আমাদের পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মে দুইটি কন্যাশিশু আছে। আমার ভাই-বোনের মেয়েরা খুব ছোট এখনও, কিন্তু আমি আমার দূরতম দুঃস্বপ্নেও ভাবি না বড় হয়ে তাদের জীবনটা পরীমণির মতো হোক। হ্যাঁ, পরীমণি যে জীবন-যাপন করেছেন কিংবা হয়তো ভবিষ্যতেও করে যাবেন, সেরকম জীবন আমি কোনোভাবেই গ্রহণ করি না, করেন না আমার মতো আরো অনেকেই। কিন্তু তারপরও আমার সবচেয়ে অপছন্দের মানুষ কিংবা বীভৎস কোনও অপরাধে অভিযুক্ত মানুষের প্রতি সরকার কিংবা আর কোনও শক্তিশালী ব্যক্তি/মহল কেমন আচরণ করছে, এবং সেক্ষেত্রে আমাদের আচরণ কী হবে সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

পরীমণি গ্রেফতার হওয়ার কিছুদিন আগে একজন ভদ্রলোকের বিরুদ্ধে তাকে একটি ক্লাবে ধর্ষণচেষ্টা এবং হত্যার অভিযোগ করেছিলেন। তখনও যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল তাদের ওপর অবিচার হচ্ছে মনে করে আমি কলাম লিখেছিলাম বাংলা ট্রিবিউনেই, ‘পরীমণি ‘ভাগ্যবান’, নাসির-অমি নয়’ শিরোনামে। একজন নারী এমন বীভৎস অভিযোগ করার পরও অভিযুক্তদের ‘পক্ষে’ আমি এমন লেখাটি লিখা নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবেও প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। 

পরীমণির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমি নাসির-অমির অধিকারের পক্ষে যে কারণে দাঁড়িয়েছিলাম, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি পরীমণির ওপরে যে অন্যায় হয়েছে সেটার বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিবাদ করাটাকেও একই কারণে জরুরি বলে মনে করি। 

সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ এবং অন্যান্য ভয়ঙ্কর অপরাধ মোকাবিলার জন্য যে এলিট ফোর্স র‌্যাব তৈরি করা হয়েছিল সেই ফোর্সকে ব্যবহার করে যেভাবে পরীমণিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, সেটা নিশ্চিতভাবেই ছিল ‘মশা মারতে কামান দাগা’র মতো ব্যাপার; তীব্র সমালোচনা হয়েছিল সেটার। এরপর তাকে কারাগারে নেওয়া, তুলনামূলকভাবে অনেক ক্ষুদ্র অভিযোগে অবিশ্বাস্যভাবে তিনবার রিমান্ডে নেওয়া (যার জন্য নিম্ন আদালতকে ভর্ৎসনা করেছে উচ্চ আদালত) নিম্ন আদালত তার জামিনের শুনানি অনেক দিন পরে করতে চাওয়া ইত্যাদি নানা কারণ অনেকের মধ্যে যৌক্তিকভাবেই এই প্রশ্ন তৈরি করেছে যে– পরীমণি অন্যায় আচরণের শিকার হচ্ছেন। 

এই সমাজে পরীমণিও খুব তুচ্ছ মানুষ নন, বরং যথেষ্ট প্রতিপত্তির অধিকারী। একজন যথেষ্ট ক্ষমতাবান মানুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণ এবং হত্যাচেষ্টার অভিযোগে পরীমণির একটি ফেসবুক লাইভ সেই মানুষটার বিরুদ্ধে বহু কিছু ঘটিয়ে দিতে পেরেছিল। এই প্রতিপত্তির অধিকারী পরীমণি এখন তার চাইতে আরও অনেক বেশি প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী কারও রোষানলে পড়েছেন, এটা বুঝতে পারা রকেট সায়েন্স নয়। 

পরীমণি শক্তিমান অবস্থানে থেকে যখন আরেকজনের প্রতি অন্যায় আচরণের কারণ হন কিংবা পরীমণি নিজেই তার চাইতে আরও শক্তিমান কারোর কবলে পড়ে হেনস্থার শিকার হন তখন কিন্তু মূলত সেই দুর্বলের নিপীড়িত হওয়ার গল্প আমাদের সামনে আসে। আমি জানি, এমন গল্প আমাদের বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ আছে। সমাজের একজন দুর্বল মানুষের যদি তার চাইতে শক্তিমান একজন মানুষের রোষানলের শিকার হন তবে সেই মানুষটার পক্ষে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। সমস্যা হচ্ছে প্রতিদিন দেশে ঘটে চলা এরকম অসংখ্য ঘটনা আমাদের সামনে আসে না। 

কিন্তু কোনও বিখ্যাত মানুষ কিংবা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও কখনও কখনও খুবই বীভৎস কিছু ঘটে তখন সেটা কখনও কখনও আমাদের সামনে আসে। তখন নাগরিক হিসাবে আমাদের আসলেই বড় দায়িত্ব হয়ে পড়ে সেই ক্ষেত্রে দুর্বল যেন শক্তিমান দ্বারা অন্যায় আচরণের শিকার না হন কোনোভাবে। 

হতেই পারে, অনেক সময় সরকার কিংবা আর কোনও শক্তিশালী ব্যক্তি বা মহলের কোনও অত্যাচারের শিকার হওয়া মানুষটিকে আমরা পছন্দ করি না কিংবা হয়তো ব্যক্তিগতভাবে ঘৃণাই করি। কিন্তু সেই মানুষটিও যেন ন্যায়বিচার পায়, সেই লড়াই থেকে আমরা সরে আসতে পারি না। ঠিক সেই কারণে ব্যক্তিগতভাবে কোনও সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, খুনির অপরাধের শিকার হলেও সেই মানুষটাকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হলে আনন্দে-স্বস্তিতে মিষ্টি বিতরণ করতে তো পারিই না, ব্যক্তিগতভাবেও অনন্দিত হতে পারি না আমরা। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসাবে বরং এমন চর্চার তীব্র প্রতিবাদ করা উচিত। নিজেদের অনুরাগ/বিরাগের বাইরে গিয়ে অবস্থান নেওয়ার চর্চাটা একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তৈরির লড়াইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ গুরুত্বের দিক থেকে আলাদা। চরিত্রগত কারণেই শাসন বিভাগ এবং আইন বিভাগের মধ্যে এক ধরনের ওভারল্যাপিং থাকে। আর সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে বাংলাদেশে আদতে কোনও কার্যকর আইন বিভাগ (সংসদ) নেই; সবকিছুই শাসন বিভাগের প্রধানের ইচ্ছাধীন। সুতরাং নাগরিকদের ন্যূনতম সাংবিধানিক এবং আইনি অধিকার যদি নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে বিচার বিভাগকে হতে হবে স্বাধীন, কার্যকর এবং দুর্নীতিমুক্ত। সেরকম একটি বিচার বিভাগই পারে সরকার বা শক্তিমান অন্য কারও নিপীড়ন থেকে জনগণকে রক্ষা করতে। এই দেশের নাগরিকরা জানেন আমাদের বিচাই ব্যবস্থা সেই কাঙ্ক্ষিত মানের তুলনায় কোথায় আছে।

একটা রাষ্ট্র স্বাধীন করা ভীষণ কঠিন কাজ। জাতি হিসাবে অন্তত আমরা সেটা জানি। কিন্তু একটা রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক, মানবিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলা আরও কঠিন, আরও দীর্ঘ সংগ্রামের ব্যাপার। এজন্য সবার আগে নাগরিকদের নিজেদের গণতান্ত্রিক চেতনা ধারণ করতে হবে। এটুকু বুঝলেই আমরা নিশ্চিতভাবেই বুঝবো পরীমণির ওপর অন্যায়ের প্রতিবাদ করাটা তুচ্ছ ব্যাপার না; দেশের বিচারবিভাগকে নিপীড়িতের ন্যায়বিচার পাওয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলার বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ। তার অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানো মানে আসলে দেশের সব মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো, সর্বোপরি নিজের পক্ষেই দাঁড়ানো।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ঢামেকে কারাবন্দী এক যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যু
ঢামেকে কারাবন্দী এক যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যু
যাত্রাবাড়ীতে বাসের ধাক্কায় রিকশা আরোহী নিহত
যাত্রাবাড়ীতে বাসের ধাক্কায় রিকশা আরোহী নিহত
জেএমবি’র ফান্ড গঠনে ছিনতাই করতে গিয়ে গুলি করে হত্যা: বিচার শুরু
জেএমবি’র ফান্ড গঠনে ছিনতাই করতে গিয়ে গুলি করে হত্যা: বিচার শুরু
অনুব্রত ও তার সহযোগীদের ১৭ কোটি রুপির ফিক্সড ডিপোজিট ফ্রিজ
অনুব্রত ও তার সহযোগীদের ১৭ কোটি রুপির ফিক্সড ডিপোজিট ফ্রিজ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ