X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

রোগের নাম গণপরিবহন

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৮:৩৭

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বিষয়টা হয়ে গেলো অনেকটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কথার  মতো– ‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে, শেষ হয়ে হইল না শেষ’। পড়ুয়াদের হাফ ভাড়ার দাবিটি শেষ পর্যন্ত মেনেছেন বেসরকারি বাস মালিকরা, কিন্তু সেটাও করেছেন তারা আধাআধি।  তারা বলেছেন, আজ (বুধবার) থেকে রাজধানীতে হাফ ভাড়া কার্যকর হচ্ছে। তবে বাসে ‘হাফ’ ভাড়া দেওয়া যাবে কেবল রাজধানীতে, ঢাকার বাইরে নয়। আছে আরও কিছু শর্ত। কেবল সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৮টার মধ্যে। সরকারি ছুটির দিন, সাপ্তাহিক ছুটির দিন, কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য ছুটির দিনে ‘হাফ’ ভাড়া দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নেতা খন্দকার এনায়েত উল্যাহ মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত শুধু ঢাকা মেট্রো এলাকার জন্য কার্যকর হবে, কোনোভাবে ঢাকার বাইরের জন্য কার্যকর হবে না।’

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি ঢাকার বাইরে কোনও শিক্ষার্থী নেই? বা ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীরা কেউ নয় দেশের। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেছে, তাদের আন্দোলন চলবে।

শিক্ষার্থীদের এবারের আন্দোলনটা হাফ ভাড়ার দাবিতে শুরু হলেও মূলত এটি সাড়ে তিন বছর আগের আন্দোলনেরই দ্বিতীয় ধাপ বলা যেতে পারে। সড়ক নৈরাজ্য, উচ্ছৃঙ্খলতা ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আবার আন্দোলনে নেমেছে। হাফ ভাড়ার পাশাপাশি সাড়ে তিন বছর আগের দাবিগুলো ফিরে এসেছে শিক্ষার্থীদের মুখে। এরমধ্যেই সড়কে বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটেছে। স্বাভাবিক যেসব দুর্ঘটনা ঘটে, এসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে গলা ধাক্কা দিয়ে চলন্ত গাড়ি থেকে যাত্রীদের ফেলে দেওয়া, নারী যাত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া।

কিছু পরিবহন শ্রমিক নেতা ফুলেফেঁপে বড়লোক হলেও বড় পদে আসীন হলেও সাধারণ পরিবহন শ্রমিকরা অতি দরিদ্র পরিবার থেকে আসা। তাদের সঙ্গে এখন সংঘর্ষ হচ্ছে সাধারণ পরিবারের শিক্ষার্থী সন্তানদের। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুটি অংশের এই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি অনেকের জন্যই উপভোগ্য বলেই হয়তো সমাধানের কোনও উদ্যম দেখা যায়নি সেভাবে। সাড়ে তিন বছর আগে শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। সংসদে পাস হওয়া ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনটিও পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের যৌথ চাপে।

শিক্ষার্থীরা যে দাবিগুলো নিয়ে আজ আন্দোলনে নেমেছে বা সাড়ে তিন বছর আগে নেমেছিল সেগুলো তাদের একার নয়। মানুষের কথাই বলছে তারা। পুরো পরিবহন ব্যবস্থা আজ উচ্ছৃঙ্খলতা, বিশৃঙ্খলা আর নৈরাজ্যের শিকার। একটা পরিবহন খাতকে এত বছরেও সিস্টেমে আনা গেলো না, অথচ আমরা কত এগিয়ে যাওয়ার গল্প বলছি প্রতিদিন। পেশাদারি মনোভাব নিয়ে পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তন না করে, খুব ঢিলেঢালা, জোড়াতালি দিয়ে প্রতিক্রিয়াধর্মী নানা সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভেঙে পড়েছে গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা।  ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস হয় সংসদে। সেই সংসদে মালিক ও শ্রমিক নেতারাও ছিলেন। অথচ বাইরে তারা এর বিরোধিতা করেছেন। আইনটি সংশোধনের দাবিতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা ধর্মঘট করে সারা দেশ কার্যত অচল করে দেন। পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ৩৪টি ধারা সংশোধনের প্রস্তাব আসে। এরমধ্যে ২৯টি ধারা আমলে নিয়ে সংশোধনের সুপারিশ করেছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। এভাবে নিরাপদ সড়কের উদ্যোগ আটকে যায় বারবার পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বাধার কারণে। এটি সরকারের দুর্বলতা এবং সেটিকে পুঁজি করে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছে গণপরিবহন মালিক ও একশ্রেণির শ্রমিক নেতা।

প্রতিদিন সড়কে মরছে মানুষ। অনেকেই বলছেন, এ যেন গণহত্যা চলছে সড়ক মহাসড়কে। সড়কে মৃত্যুস্রোত রোখা যাচ্ছে না কোনোভাবেই। গত সোমবার রাতে রামপুরা ব্রিজের কাছে অনাবিল পরিবহনের একটি বেপরোয়া বাসের চাপায় প্রাণ হারায় স্কুলছাত্র মইনুদ্দীন। রামপুরার একরামুন্নেছা স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাণিজ্য শাখা থেকে এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিল সে। পরদিনই এরকম আরও বেশ কয়েকটি মৃত্যুর খবর আসে। সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিটি পরিণতি চরম বিয়োগান্ত। দেশের সড়ক পরিবহন খাতের এই চেনা ছবিটা কে কীভাবে বদলাবে কে জানে।

শুধু কথা বা প্রতিশ্রুতি নয়। সড়কে দুর্ঘটনার হিড়িক ও অসহায় মৃত্যু ঠেকানোর উদ্যোগ চায় মানুষ। মহাসড়কে শৃঙ্খলা আনতে হাইওয়ে পুলিশ গঠন করা হয়েছে। কিন্তু থামছে না মৃত্যু, বন্ধ হচ্ছে না নৈরাজ্য। অবাক লাগে যে রাজধানীতে গাড়ির গতি ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার, সেই শহরেও বেপরোয়া গতির গাড়ির নিচে প্রাণ যায় মানুষের। নিরাপদ সড়কের দাবিটি বড় নজরে আসে না। কারণ, এখানে যাদের জীবন যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভিক্টিম দরিদ্র ও অতি সাধারণ পরিবারের।

আমাদের ঢাকা বা অন্য বড় শহর – সবখানেই উন্নয়ন কাজ হচ্ছে। তাই থমকে থাকে সারি সারি লরি, যাত্রীবাহী বাস ও অন্যান্য যানবাহন। এমনই ছবি প্রতিদিন। ফলে দিনভর নাকাল হতে হয় রাস্তা ব্যবহারকারীদের। যানজট নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ। সেটা মেনে নিয়েছে মানুষ, কিন্তু মৃত্যু ও নৈরাজ্য আর মানতে পারছে না। একটা বড় উদ্যোগ চায় তারা রাষ্ট্রের কাছে। গণপরিবহনের রোগটা জটিল থেকে জটিলতর হয়ে জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোগের একটা চিকিৎসা বড় প্রয়োজন।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

ধান কেটে ফেরার সময় পদ্মায় ট্রলার ডুবি, ২ শ্রমিক নিখোঁজ
ধান কেটে ফেরার সময় পদ্মায় ট্রলার ডুবি, ২ শ্রমিক নিখোঁজ
র‌্যাগিংয়ে জড়িত থাকায় যবিপ্রবির ৩ শিক্ষার্থীকে আজীবন বহিষ্কার
র‌্যাগিংয়ে জড়িত থাকায় যবিপ্রবির ৩ শিক্ষার্থীকে আজীবন বহিষ্কার
অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিজ: ঐক্যের প্রতিশ্রুতি
অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিজ: ঐক্যের প্রতিশ্রুতি
যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলো ২ জনের
যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলো ২ জনের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ