X
শুক্রবার, ০১ জুলাই ২০২২
১৭ আষাঢ় ১৪২৯

ছাত্র নাকি শিক্ষক: কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করবে?

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ১৫:৩৩
রেজানুর রহমান ছাত্রনেতা কর্তৃক মানসিক নিপীড়নের বলি হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। অর্থাৎ ছাত্রনেতা কর্তৃক মানসিক নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন তিনি। হতভাগ্য শিক্ষকের নাম ড. সেলিম হোসেন। তিনি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টির লালন শাহ হলের প্রভোস্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। হলে পছন্দের ব্যক্তিকে ডাইনিং ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য অনবরত অযৌক্তিক চাপ দিয়ে আসছিলেন প্রভাবশালী কয়েকজন ছাত্রনেতা। ড. সেলিম তাদের অন্যায়, অযৌক্তিক চাপকে মোটেই গুরুত্ব দিতে চাননি। ফলে ওই ছাত্রনেতারা তাকে মানসিক নিপীড়ন করতে থাকেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অসহায় শিক্ষক সেলিম হোসেন আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি এই ঘটনায় অভিযুক্ত সন্দেহে বিশ্ববিদ্যালয়টির কয়েকজন ছাত্রকে প্রাথমিকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। যারা ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নামধারী প্রভাবশালী ছাত্রনেতা। কুমিল্লার এই ঘটনার পর দেশের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে নিয়ে আবারও সমালোচনার ঝড় শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের করুণ ও ভয়াবহ চিত্রও ফুটে উঠেছে সবার সামনে। প্রশ্ন উঠেছে কে কাকে শাসন করবে?

সম্মানিত শিক্ষকমণ্ডলীই তো ছাত্রছাত্রীকে শাসন করার কথা। অথচ ঘটছে তার উল্টোটা। ছাত্রই শিক্ষককে শাসন করছে। তাও আবার কুৎসিত কদাকার ভাষায়। যে ভাষা সহ্য করতে না পেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে আত্মহত্যা করতে হলো। এটাকে কি আমরা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভাববো?

না। কুমিল্লার এই ঘটনাকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভাবার সুযোগ নেই। বাস্তবতা হলো, দেশের অধিকাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করছে প্রভাবশালী ছাত্রনেতারাই। তাদের কথায় প্রশাসন ওঠে, বসে। প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজ করতে গেলে প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদেরই হাতে রাখতে হয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ছাত্রনেতারাই প্রশাসনকে নেতৃত্ব দেয়। অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ অথবা ভিসির প্রিয়ভাজন ব্যক্তির তালিকায় প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের নামই থাকে বেশি। বাস্তবতা হলো– প্রভাবশালী এই ছাত্রনেতারা কখনোই ক্লাস ও পরীক্ষার ব্যাপারে সিরিয়াস হন না। তাদের প্রায় প্রতিদিনের রুটিন হলো প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের নেতানেত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা। কেন্দ্রে অর্থাৎ ঢাকায় যার যত কানেকশন স্থানীয় পর্যায়ে তার তত প্রভাব প্রতিপত্তি। চাঁদাবাজি, টেন্ডার বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও তারাই থাকে এগিয়ে। ক্লাস, পরীক্ষায় কৃতিত্ব না দেখালেও তাদের চলে। তবে ভোটের মাঠে, রাজনৈতিক মিছিলে অথবা প্রিয় নেতার আস্থাভাজন হওয়ার লড়াইয়ে তারা বেশ সক্রিয় থাকে। এ ক্ষেত্রে যে যত সিরিয়াস ও কিচৎকর্মা সে তত প্রভাবশালী ছাত্রনেতা হয়ে ওঠে। একজনের দেখাদেখি অন্যজনও প্রভাব দেখানোর সংগ্রাম শুরু করে। ফলে একই দলে অনেক উপদল তৈরি হয়। ফলে প্রশাসন চালাতে অনেক সম্মানিত অধ্যক্ষ ও ভাইস চ্যান্সেলর প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের শক্তির খুঁটি হিসেবে বেছে নেন। সামান্য কাজেও প্রভাবশালী কোনও ছাত্রনেতাকে কাছে ডাকেন। পরামর্শ নেন। এক টেবিলে বসে আহার করেন। প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়তো ঢাকায় কোনও মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। ফাইল নড়াতে হবে। তখনই প্রভাবশালী কোনও ছাত্রনেতা ভিসি অথবা অধ্যক্ষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে ভিসি অথবা অধ্যক্ষকে যেতে হলে অনেক প্রটোকল মানতে হয়। কিন্তু প্রভাবশালী ছাত্রনেতার কোনও প্রটোকল লাগে না। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তার ‘ভাই’ সম্পর্ক। সে কারণে সহজেই যেতে পারে ভাইয়ের কাছে। প্রতিষ্ঠানের ফাইলও সহজেই নড়ে। আর তখনই অনেক আস্থার জায়গা তৈরি করে ফেলেন প্রভাবশালী ছাত্রনেতারা।

এভাবেই তাদের অনেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রশাসনের অলিখিত হর্তাকর্তাও বনে যান। নিয়োগ থেকে শুরু করে সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রভাবশালী ছাত্রনেতারাই মূল ভূমিকা পালন করেন। ফলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেয়েই অনেক ছাত্র লেখাপড়ার প্রতি আন্তরিক না হয়ে প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের ব্যানারে ভিড়ে যান। মিছিল মিটিংয়ে পারফরম্যান্স দেখানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয় তার মধ্যে। অনেক ক্ষেত্রে দলীয় আদর্শ তার মধ্যে তেমন একটা প্রভাব ফেলে না। শুধু একটাই লক্ষ্য, যেকোনও মূল্যে প্রভাবশালী ছাত্রনেতা হতে হবে। এবং সেটা হতে পারলেই ক্লাসে উপস্থিত হতে হবে না। পরীক্ষা দিতে হবে না। বরং ক্লাসে, পরীক্ষা যারা নেয় তাদের পরীক্ষাই নেওয়া যাবে সুযোগ বুঝে। পাশাপাশি প্রভাব-প্রতিপত্তি ও বিত্তশালী হবার সুযোগ তো আছেই।

একটা ছোট ঘটনার কথা বলি। কয়েক মাস আগে একজন পরিচিত ব্যক্তি ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি একটি কলেজের অধ্যক্ষ। বদলি ঠেকাতে চান। মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন। প্রভাবশালী কোনও ছাত্রনেতার খোঁজ চাইলেন। আমি তাকে সহায়তা করতে পারিনি। তবে তিনি তার বদলি ঠেকিয়েছেন।

আমার সাংবাদিকতা জীবনের একটা বড় অংশ কেটেছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। দৈনিক ইত্তেফাকে শিক্ষা বিটে কাজ করেছি একটানা প্রায় ১৯ বছর। আমার বন্ধুদের তালিকায় ছাত্রনেতাদের নামই বেশি। তাদেরও প্রভাব ছিল। কিন্তু তারা কখনোই শিক্ষকদের অসম্মান করেননি, টেন্ডার বাণিজ্যে কখনোই যুক্ত ছিলেন না। চাঁদাবাজিকে তারা চরমভাবে ঘৃণা করতেন। নীতি, নৈতিকতা পরিপন্থী সব বিষয় তারা এড়িয়ে চলতেন। আজ কেন ছাত্রনেতাদের নামে অশোভন অভিযোগ উঠছে? ছাত্র কর্তৃক মানসিক নিপীড়নের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় একজন মেধাবী শিক্ষকের আত্মহত্যার ঘটনা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাবার সুযোগ নাই। পাশাপাশি একজন ছাত্রনেতার প্রভাব থাকবে কীসে? পড়াশোনা ও পরীক্ষায়? নাকি হুমকি, ধমকিতে? তাও আবার শিক্ষকের প্রতি মানসিক নিপীড়ন... এটি শুধু কুমিল্লা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একক চিত্র নয়, দেশের অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রভাবশালী ছাত্রনেতারা শিক্ষকদের এভাবেই অপমান করেই চলেছেন। ফলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের সেই মধুর ঐতিহ্য যেন ম্লান হতে বসেছে। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় হলি আর্টিজানে নিহতদের স্মরণ
শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় হলি আর্টিজানে নিহতদের স্মরণ
‘ইউক্রেনে যুদ্ধে রাশিয়াকে সহযোগিতার করছে না চীন’
‘ইউক্রেনে যুদ্ধে রাশিয়াকে সহযোগিতার করছে না চীন’
বিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি
বিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি
টিভিতে আজ
টিভিতে আজ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ