X
বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

ক্রিকেট না জানি চলচ্চিত্রের মতো হয়ে যায়

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২২, ১৭:৪৩

রেজানুর রহমান প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কারণ, আমি ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ নই। তবে ক্রিকেট ভালোবাসি। দেশের ক্রিকেট হাসলে জীবনের সেরা আনন্দ পাই। ক্রিকেট হাসলেই দেশও হাসে। আমাদের দেশে ক্রিকেট এবং ক্রিকেটই একমাত্র খেলা, যার জয়ের জন্য দেশের সব মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করে। রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে যায়। এই তো কয়েক দিন আগেও আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের ক্রিকেট লড়াইয়ে দেশের মানুষের মধ্যে যে ভালোবাসা ও আকাঙ্ক্ষা দেখেছি তা সত্যি প্রেরণার। রাজধানীর একটি ক্লাবঘরে টিভি সেটের সামনে অসংখ্য মানুষ। বাংলাদেশ বনাম আফগানিস্তানের ক্রিকেট লড়াই দেখছিল সবাই। দেশ যেন জিতে যায় এই প্রত্যাশায় কী আকুল প্রার্থনা সবার। ক্লাবটি সরকারি দলের একটি অঙ্গসংগঠনের। সেখানে অবলীলায় সবার সঙ্গে বসে খেলা দেখছিলেন বিরোধী দলের কয়েকজন নেতাকর্মী। এর আগে হয়তো তারা এই ক্লাবঘরে ঢোকেননি। ঢোকার প্রয়োজনও মনে করেননি। হয়তো দ্বিধা, দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু ক্রিকেটের প্রতি অপার ভালোবাসাই সব দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়েছে। ব্যাটিং চলছিল বাংলাদেশ দলের। চার, আর ছয়ের মারের জন্য সবার কী যে আকুল প্রত্যাশা। এক রান করলেও তুমুল হাততালি দিচ্ছিল সবাই। সরকার ও বিরোধী দলকে এমন আনন্দ ও উচ্ছ্বাস নিয়ে একসঙ্গে হাততালি দিতে সাধারণত দেখা যায় না। কিন্তু আমাদের ক্রিকেট সেই পরিবেশটাই তৈরি করে। ক্রিকেট আমাদের দেশে এখন আর শুধু একটি খেলা নয়। ক্রিকেট দেশের মান-মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রাণ। বাংলাদেশের ক্রিকেটের অগ্রযাত্রায় সাকিবের অবদান অনেক। সেই সাকিবকে নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে সম্প্রতি। স্বয়ং বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেছেন, সাকিব আমাদের কথা শুনছেন না। কাজেই আমাদের কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এই যে ‘সাকিব আমাদের কথা শুনছেন না’- বোর্ড সভাপতির এই মন্তব্যের বিশ্লেষণটাই জরুরি। সাকিব আল হাসান ক্রিকেট বোর্ডের চুক্তিভুক্ত খেলোয়াড়। তাই বলে একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত সুবিধা-অসুবিধা গুরুত্ব পাবে না তা ভাবাও ঠিক নয়। কিন্তু ব্যক্তিগত সুবিধা-অসুবিধার কথা সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবেন এটাই তো নিয়ম, নাকি?

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাবে বাংলাদেশ। সাকিবকে দলে রেখে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরকারী সব খেলোয়াড়ের নাম প্রকাশ করা হলো। অথচ সাকিব আল হাসান দুবাইগামী ফ্লাইটে উঠে প্রচার মাধ্যমে বললেন, এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার মতো মানসিক ও শারীরিক অবস্থায় নেই তিনি। কাজেই দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যেতে পারবেন না।

ধরেই নিলাম সাকিব আল হাসান যা বলেছেন তা-ই সত্যি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার মতো মানসিক ও শারীরিক অবস্থায় নেই তিনি। মনের বাইরে জোর করাও ঠিক নয়। কিন্তু সাকিব তো বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের একজন নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়। তালিকায় তার নাম এলো। অর্থাৎ তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলতে যাচ্ছেন এটাই তো সত্যি। হঠাৎ সাকিব এটা কী করলেন! বিদেশ যাওয়ার জন্য প্লেনে ওঠার আগে প্রচার মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলতে যেতে চান না। সমস্যা, সংকট যেকোনও সময়ই তৈরি হতে পারে। আপনি যখন একটা চুক্তির মধ্যে থাকবেন তখন কোনও সমস্যা সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে উপস্থিত হয়ে নিয়ম মেনেই তা জানাবেন। এক্ষেত্রে সাকিব কি আদৌ নিয়ম মেনেছেন? নাকি সাকিবের জন্য কোনও নিয়মই নিয়ম নয়?

আবারও বলি, আমি ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ নই। ক্রিকেট ভালোবাসি বলেই কিছু কথা বলতে চাই। এর আগে বাংলা ট্রিবিউনেই একটি লেখায় আমাদের চলচ্চিত্রের অবস্থা তুলে ধরতে গিয়ে প্রশ্ন রেখেছিলাম কে কার কাছে যাবে? কে কী বলবে তার একটা সীমারেখা থাকা দরকার। আমাদের সিনেমার একটা উজ্জ্বল অতীত ছিল। রাজ্জাক-কবরী যুগের সিনেমায় যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন অভিনেতা-অভিনেত্রী তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন পরিচালক। সিনেমার ক্ষেত্রে পরিচালককে বলা হয় ক্যাপ্টেন অব দ্য শিপ। অর্থাৎ পরিচালকই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অতীতকালের সিনেমায় পরিচালকই গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকারাও তার বা তাদের পরবর্তী সিনেমার শুটিং শিডিউল ঠিক করার জন্য নিজে পরিচালকের বাসায় অথবা অফিসে হাজির হতেন অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি পাঠাতেন। অথচ এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিচালকরাই স্বয়ং ব্যস্ত শিল্পীদের বাসায় চলে যান। নায়ক-নায়িকার শিডিউল পাবার জন্য ড্রয়িংরুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন। অভিজ্ঞ মহলের মতে, যেদিন থেকে আমাদের চলচ্চিত্র পরিচালকেরা তথাকথিত শিল্পীদের বাসায় গিয়ে শিডিউল পাওয়ার জন্য ধরনা দিতে শুরু করলেন, সেদিন থেকেই মূলত আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পে ধস নামতে শুরু করে। তার মানে এই নয় যে পরিচালক শিল্পীদের বাসায় যেতে পারবেন না। অবশ্যই যাবেন। শিডিউল তৈরি করার জন্যও যেতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে চেইন অব কমান্ড নষ্ট হয় এমন কাজ করা উচিত নয়। পরিচালকের নির্দেশে, তার কারিশমায় একটি সিনেমা তৈরি হয়। সেখানে পরিচালকের কথা মতো, নির্দেশ মতো আন্তরিকভাবে অভিনয় করা শিল্পীর দায় এবং দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু যখন দেখা যায় নতুন একটি সিনেমায় শিডিউল পাওয়ার জন্য পরিচালক হয়তো ৬ মাস আগে নায়ক অথবা নায়িকার বাসায় গিয়ে অনেক বলে কয়ে, অনেক বুঝিয়ে শিডিউল বের করে নিয়ে এসেছেন, ৬ মাস পর ওই পরিচালক যখন শিল্পীর ওপর খবরদারি করতে শুরু করেন, এটা এভাবে নয় ওভাবে করো, অথবা শুটিং স্পটে দেরি করে আসার জন্য প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন, তখন অনেক নায়ক-নায়িকাই পরিচালককে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেন না। মন খারাপ করে ইচ্ছার বাইরে যেনতেনভাবে শুটিং করেন। ফলে কাজের কাজ শেষ পর্যন্ত কিছুই হয় না।

চলচ্চিত্রাঙ্গনের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে আমাদের ক্রিকেটাঙ্গনের পরিবেশের কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পাচ্ছি। বেশ কয়েক দিন ধরে পত্রপত্রিকায় শিরোনাম পড়ছিলাম- সাকিব আল হাসান দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাবেন কী যাবেন না তা নিয়ে বোর্ড প্রেসিডেন্ট তার সঙ্গে কথা বলবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তখনই মনে প্রশ্ন জেগেছে– কে কার কাছে যাবে? সাকিব দেশের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ক্রিকেট খেলোয়াড়। তাই বলে কি বোর্ড প্রেসিডেন্ট তার সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেবেন? নাকি সাকিব নিজে বোর্ড প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলবেন? কে কার কাছে যাবে? সাকিব যেহেতু চুক্তিভুক্ত খেলোয়াড়, কাজেই তারই উচিত বোর্ডের সঙ্গে কথা বলে ক্রিকেটের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া। অথচ সাকিব সেটা করেননি। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাংলাদেশ স্কোয়াডে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরও বোর্ডকে কিছু না জানিয়েই দেশের বাইরে গেছেন। বিষয়টি কতটা শোভন হয়েছে? এই প্রশ্নই এখন ক্রিকেট অঙ্গনে ভেসে বেড়াচ্ছে। পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে– কী এমন ঘটলো যে সাকিবের মতো একজন বিশ্বখ্যাত ক্রিকেট তারকা হঠাৎ অপেশাদারি আচরণ শুরু করেছেন? এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে? সাকিব কি কোনও কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত? এই প্রশ্নের একটা উত্তর খুঁজে পাওয়া গেছে। এটি ধারণাগত উত্তর। ধারণা করা হচ্ছে, এবার আইপিএল-এর নিলামে সাকিব আল হাসানের নাম না ওঠায় তিনি বোধকরি বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি। আইপিএল-এর নিলামের আগে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ অর্থাৎ বিপিএল-এর প্রতিটি খেলায় পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে, সাকিব ছিলেন দেশি-বিদেশি সব খেলোয়াড়দের চেয়েও উজ্জ্বল। আইপিএল-এর নিলাম হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ বনাম আফগানিস্তানের খেলায় পারফরম্যান্সের দিক থেকে একেবারে বিপরীতমুখী অবস্থান ছিল তার। বিপিএলে যতটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন, আফগানিস্তান বনাম বাংলাদেশ সিরিজে ততটাই অনুজ্জ্বল দেখা গেছে তাকে।

আইপিএলই যদি অস্থিরতার কারণ হয়ে থাকে তাহলে সাকিবের উচিত ছিল আফগানিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও আসন্ন শ্রীলংকা সিরিজে নিজ দেশের হয়ে শ্রেষ্ঠত্ব আরও বেশি করে প্রমাণ করা। এটা তিনি কেন করলেন না তার ভালো ব্যাখ্যা তিনিই দিতে পারবেন। কিন্তু সাকিবের সাম্প্রতিক ভাবনা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য মোটেই সুখকর নয়। মানসিক অস্থিরতা দূর করা, শারীরিক ফিটনেস জোরদার করার জন্য শুধু সাকিব কেন, দলের যে কেউ ছুটি নিতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তো প্রাতিষ্ঠানিক কিছু নিয়ম-কানুন মানতে হবে। সাকিব যদি সেটা না মানেন তাহলে ভবিষ্যতে উদাহরণ তুলে অন্য কেউ হয়তো মানতে চাইবেন না।

একটা কথা সত্য, কারও জন্যই কোনও কিছু থেমে থাকে না। সাকিব দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলতে যাচ্ছেন না বলে তো আর বাংলাদেশের ক্রিকেট থেমে থাকবে না। কিন্তু সবকিছুতেই একটা মানসিক প্রস্তুতির ব্যাপার থাকে। দলীয়ভাবে কোনও প্রতিযোগিতায় নামার আগে দলের প্রতিটি সদস্যই একজন আইডল খোঁজে। দলে কে কে আছে সেটা ভেবেও দলের ভেতর মানসিক শক্তি তৈরি হয়। সেখানে সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মোর্তজা, তামিম ইকবাল, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ এই নামগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অনেক প্রেরণার।

লেখাটি শেষ করি। তার আগে দুই ব্যক্তির কথোপকথন তুলে ধরছি। এক ব্যক্তি পাশের ব্যক্তিটিকে প্রশ্ন করলেন– এই যে আপনি ঠান্ডা মাথায় একটি সিদ্ধান্ত নিলেন, এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া শিখলেন কার কাছ থেকে? উত্তরে পাশের ব্যক্তিটি বললেন, যেখানে ঠকেছি সেখান থেকেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শিখেছি।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের উচিত সাকিব আল হাসানের বর্তমান আচরণ থেকে একটি শিক্ষা নেওয়া। বোর্ড কি খেলোয়াড়দের কথায় চলবে, নাকি বোর্ডের কথায় খেলোয়াড়রা চলবে? কে কার কাছে যাবে? কে কার কথায় চলবে? খেলাটি যেহেতু ক্রিকেট, দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক; কাজেই ব্যক্তিকে গুরুত্ব না দিয়ে সমষ্টিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। দেশের ক্রিকেটে বিকল্প মেধাবী খেলোয়াড় তৈরি করা এখন সময়ে দাবি। জয় হোক বাংলাদেশের ক্রিকেটের।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক: আনন্দ আলো।
 
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ভিজিএফের চালে পাথর, সুবিধাভোগীদের মাঝে ক্ষোভ
ভিজিএফের চালে পাথর, সুবিধাভোগীদের মাঝে ক্ষোভ
এডিট করা ছবি ভাইরালের হুমকি, যুবকের ৮ বছর জেল
এডিট করা ছবি ভাইরালের হুমকি, যুবকের ৮ বছর জেল
গরু ব্যবসায়ীদের ৩০ লাখ টাকা ও ১০টি গরু ডাকাতি
গরু ব্যবসায়ীদের ৩০ লাখ টাকা ও ১০টি গরু ডাকাতি
হাটে ছাগল আছে ক্রেতা নেই
হাটে ছাগল আছে ক্রেতা নেই
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ