X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

হৃদয় মণ্ডল কাণ্ড এবং এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২২, ১৯:২০

ড. প্রণব কুমার পান্ডে সাম্প্রতিক সময়ে নওগাঁ এবং মুন্সীগঞ্জ জেলার দুটি স্কুলে দুটি ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।  উভয় ঘটনাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে দুই জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছে। যেকোনও কারণেই হোক শিক্ষক দু’জনই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। আমি ব্যক্তিগতভাবে সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু তত্ত্বের মাধ্যমে মানুষকে ভাগ করতে চাই না। আর এই কারণেই বিষয়টি নিয়ে লেখার তাগিদ অনুভব করিনি। পরে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে এই ঘটনার পেছনের ঘটনাগুলো যেভাবে প্রকাশিত হয়েছে তাতে মনে হলো যে বিষয়টির ওপর দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

শিক্ষকদের কাজ হচ্ছে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় কোনও একটি বিষয় বোঝার জন্য একজন শিক্ষককে অনেক ধরনের বিষয়ের অবতারণা করতে হয়। সেই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে যদি কোনও শিক্ষার্থীর আপত্তি থাকে তবে শ্রেণিকক্ষের মধ্যে শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতেই পারে এবং এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এভাবেই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা এগিয়ে চলেছে। কিন্তু মুন্সীগঞ্জের হৃদয় মণ্ডলের ঘটনাকে গভীরভাবে অবলোকন করলে যে বিষয়টি বেরিয়ে আসে সেটি হচ্ছে শ্রেণিকক্ষের মধ্যে কথোপকথন সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল করার মাধ্যমে একজন শিক্ষককে ধর্ম অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এখন প্রথমে যে প্রশ্নটি সবার মধ্য আলোচিত হচ্ছে তা হলো শ্রেণিকক্ষের কথোপকথন কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলো? তাহলে কি এই ঘটনাটি পূর্ব পরিকল্পিত ছিল? এই কারণেই সেদিনের শ্রেণিকক্ষের সেই কথোপকথনকে কোনও একটি গোষ্ঠী রেকর্ড করে পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।

অতএব, যেকোনও কারণেই হোক বিষয়টি পূর্বপরিকল্পিত এবং শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে হেনস্তা করার জন্য করা হয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। পরে এই রেকর্ডিংকে কেন্দ্র করে স্কুলের বাসভবনে হৃদয় মণ্ডলকে সপরিবারে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে পুলিশকে ডাকা হয় এবং স্কুলের দফতরি বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করলে তাকে অবরুদ্ধ করা হয়।

এই মামলায় তাকে অবরুদ্ধ করার পরিপ্রেক্ষিতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছে। ঢাকায় প্রথিতযশা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা রাস্তায় মানববন্ধন করেছেন তার মুক্তির জন্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশের যারা মুক্তচিন্তা করেন এবং ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করেন তারা প্রত্যেকেই এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে কয়েকটি টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে যে রিপোর্ট প্রচার করা হয়েছে সেখানে দেখা হচ্ছে যে কয়েকজন শিক্ষার্থী বিজ্ঞান পাঠদানের সময় হৃদয় মণ্ডলকে বারবার ধর্ম সম্পর্কিত প্রশ্ন করছিল। যদিও হৃদয় মণ্ডলের তরফ থেকে বলা হয়েছে যে তিনি ধর্ম সম্পর্কে কোনও কথা সেখানে বলেননি। সেসব মিডিয়া রিপোর্টে এমনই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। যেহেতু বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে, অতএব প্রকৃত ঘটনা কি ঘটেছিল সেই সম্পর্কে কোনও ধরনের উপসংহারে পৌঁছানোর আমাদের উচিত হবে না।

একইভাবে নওগাঁর মহাদেবপুরের একটি স্কুলে একজন শিক্ষিকার বিরুদ্ধে একজন ছাত্রীকে বোরকা পরে আসার কারণে প্রহার করা হয়েছে মর্মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ ছড়িয়ে দিয়ে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করা হয়। যদিও পরবর্তীতে ওই স্কুলের এবং একই বর্ষের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন মিডিয়ার সামনে বলেছে যে ওই দিন শিক্ষিকা বোরকা পরার জন্য তাদের কিছুই বলেননি। বরং স্কুল ড্রেস পরে না আসার জন্য তাদের বকাবকি করা হয়েছে।  পরবর্তীতে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে যেটি জানা যায় তা হলো, একটি গোষ্ঠী সেই স্কুলের ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ধরনের অনিয়মকে ঢাকবার জন্য এবং সেই শিক্ষিকা যেন প্রধান শিক্ষিকা হতে না পারেন সেটি আটকাবার জন্য পরিকল্পনা মাফিক এ ঘটনাটি ঘটানো হয়েছিল।

ঘটনা দুটিকে যতই আমরা বিচ্ছিন্নভাবে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করি না কেন, এর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন সাধারণ মানুষের  মধ্যে উত্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে যারা শিক্ষকতা পেশায় থাকেন তাদের মধ্যে। প্রথম প্রশ্নটি হচ্ছে শিক্ষকরা পাঠদানের সময় কোনও বিষয় বোঝাবার জন্য যেসব কথাবার্তা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বলে থাকেন সে বিষয়গুলো যদি ভিন্নভাবে বাইরে প্রচার করার মাধ্যমে সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়, তাহলে শিক্ষকরা কতটা নিজেদের নিরাপদ মনে করবেন। আমরা জানি যে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবাধে কথা বলার সুযোগের কারণে যে যার মতো করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করছে। একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করছে দেশে অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি করার। ফলে এই বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত।

আমরা অনেকেই ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের বিরোধিতা করে আন্দোলন করেছি। অনেকেই মনে করছি যে ডিজিটাল সিকিউরিটি ডিজিটাল অ্যাক্টের মাধ্যমে সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নিরীহ মানুষদের যারা মানসিকভাবে নির্যাতন করছে আমরা অনেকেই তাদের বিরুদ্ধে কোনও কথা বলছি না।

যেসব নিরীহ নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে সম্মানহানি করা হচ্ছে তাদের কি অপরাধ ছিল? ফলে, এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রের এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাববার। আমি আগেও বলেছি যে হৃদয় মণ্ডলের  ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখবার কোনও অবকাশ নেই। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী সবসময় সক্রিয় রয়েছে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির জন্য। বিশেষ করে ২০২৩ সালের নির্বাচনকে টার্গেট করে এই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে। এখনই যদি এদের নিয়ন্ত্রণ করা না হয় তাহলে দেশে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। ফলে এসব অপকর্মে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা না গেলে এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা কমবে না।

নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যদি হৃদয় মণ্ডল কিংবা নওগাঁর শিক্ষিকা দোষী সাব্যস্ত হয় তবে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানে পরিষ্কারভাবে বলে রাখা ভালো যে আমি কোনও একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছি না। আমি শিক্ষিত সমাজের প্রতিনিধিত্ব করি বিধায় এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। যেহেতু শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড এবং শিক্ষকরা হচ্ছেন জাতির গঠনের কারিগর,  শিক্ষকদের যদি আমরা সম্মান না করতে পারি তাহলে দেশ কখনও উন্নত হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে যেভাবে হেনস্তা করা হয়েছে, তা সত্যিই নিন্দনীয়।  আমরা প্রায়ই দেখি একটি গোষ্ঠী শিক্ষকদের হেয় করার প্রয়াসে লিপ্ত। তারা কোনোভাবেই শিক্ষকতা পেশাকে সম্মান করে না। এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।  পাশাপাশি রাষ্ট্রকেও শক্ত অবস্থান নিতে হবে এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। এসব কাজে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে।

লেখক: অধ্যাপক, লোক-প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
এবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে আম পাঠালেন শেখ হাসিনা 
এবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে আম পাঠালেন শেখ হাসিনা 
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার ভুলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ১৪০০ হাঁসের মৃত্যু
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার ভুলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ১৪০০ হাঁসের মৃত্যু
বাইডেনের সহায়তা চাইলেন রাশিয়ায় আটক মার্কিন বাস্কেটবল তারকা
বাইডেনের সহায়তা চাইলেন রাশিয়ায় আটক মার্কিন বাস্কেটবল তারকা
‘খাদ্যশস্যের মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে’
‘খাদ্যশস্যের মূল্য স্থিতিশীল রয়েছে’
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ