X
শনিবার, ২৫ জুন ২০২২
১১ আষাঢ় ১৪২৯

রবীন্দ্রনাথ কখনও কি শ্বশুরবাড়ি গিয়েছেন?

আপডেট : ১৬ মে ২০২২, ১৯:৪২

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে আমার পৈতৃক বাড়ি। সেই কারণে কারণে-অকারণে বহুবার কবির শ্বশুরালয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। নানা কাঠখড় পুড়িয়ে দক্ষিণডিহিতে মৃণালিনী মঞ্চে রবীন্দ্রমেলা উদ্বোধন হলে প্রথম অনুষ্ঠানেও থাকার সুযোগ হয়েছিল। ওই বছর খুলনা জেলার ফুলতলা থানার সব স্কুলের শিক্ষার্থীদের রবীন্দ্রমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে নিয়ে যাওয়া হয়। শিক্ষকরাও আমাদের নিয়ে যান। রঙচঙহীন পুরাতন দোতলা বাড়ি আর সদ্য প্রতিষ্ঠিত মৃণালিনী মঞ্চ আমাকে মুগ্ধ না করলেও রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম কবিগুরুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ করে। মনে প্রশ্ন জেগেছিল, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদধূলি পড়েছিল কি তার শ্বশুরালয়ে?

বর্তমান খুলনা জেলার ফুলতলা থানার দক্ষিণডিহি গ্রামে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরালয় অবস্থিত। ওই শ্বশুরালয়ে জন্মেছিলেন কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সেরেস্তার ১২ টাকা মাইনের কর্মচারী বেণীমাধব ও গৃহিণী মাতা দাক্ষায়ণীর প্রথম সন্তান ফুলি ওরফে ভবতারিণীই রবীন্দ্রনাথের মৃণালিনী। ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ৯ ডিসেম্বর কবি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ভবতারিণীর বিবাহ সম্পন্ন হয় কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে। বিয়ের পর কবির নামের সঙ্গে মিলিয়ে ভবতারিণীর নাম রাখা হয় মৃণালিনী। বিয়ের পর মৃণালিনী দেবী ও তার পরিবার স্থায়ীভাবে জোড়াসাঁকোতে বসবাস শুরু করলেও মৃণালিনী দেবীর শৈশব কেটেছে দক্ষিণডিহিতে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে মৃণালিনী দেবীর বিয়ের কথাবার্তা ও কনে দেখার ঐতিহাসিক সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণডিহিতে অবস্থিত মৃণালিনীর পৈতৃক বাড়ি। বিয়ের কথাবার্তা ও কনে দেখার জন্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তার আত্মীয়রা যশোর যাত্রা করেন বলে রবিজীবনী গ্রন্থে লেখা হয়েছে। রবিজীবনী গ্রন্থে ইন্দিরা দেবীর উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা হয়েছে, পূর্ব প্রথানুসারে রবিকাকার কনে খুঁজতে তাঁর বউঠাকুরাণীরা, তার মানে মা আর নতুন কাকিমা, জ্যোতি কাকা মশায় আর রবিকাকাকে সঙ্গে বেঁধে নিয়ে যশোর যাত্রা করলেন।...আমরা দুই ভাইবোনও সে যাত্রায় বাদ পড়িনি। (রবিজীবনী, আনন্দ, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ১৭৭)।

দক্ষিণডিহি তৎকালীন সময়ে যশোর জেলার অন্তর্গত একটি গ্রাম। তাই স্বাভাবিকভাবে ইন্দ্রিরা দেবীর উপর্যুক্ত বিবরণ পড়ে মনে হবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে কনে দেখতে দক্ষিণডিহিত যান।

কিন্তু বিপত্তি বেধেছে মৈত্রেয়ী দেবীর ভিন্ন বিবরণে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মৈত্রেয়ী দেবী দাবি করেছে যে রবীন্দ্রনাথ কখনও তার শ্বশুরালয়ে দক্ষিণডিহিতে যাননি। অবশ্যই আধুনিক গবেষক সমীর সেনগুপ্ত তাঁর রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়-স্বজন গ্রন্থে মৈত্রেয়ী দেবীর উপর্যুক্ত দাবি খণ্ডন করেছে। তিনি দক্ষিণডিহিতে রবীন্দ্রনাথ গিয়েছিলেন এমন মতের পক্ষেই যুক্তি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “মৈত্রেয়ী দেবী রবীন্দ্রনাথের কাছে শোনা বলে যে সাক্ষ্য উপস্থিত করেছেন তার সঙ্গে এই বর্ণনার (রবীন্দ্রনাথের পাত্রী দেখতে যারা গিয়েছিলেন তাদের বর্ণনার) কিছু অমিল দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে (মৈত্রেয়ী দেবীকে) বলেছিলেন, ‘আমার বিয়ের কোনও গল্প নেই। বৌঠানরা যখন বড় বেশি পীড়াপীড়ি শুরু করেন, আমি বললুম, তোমরা যা হয় করো, আমার কোনও মতামত নেই। তাঁরাই যশোরে গিয়েছিলেন, আমি যাইনি।’ কিন্তু ইন্দিরা দেবীর বর্ণনা অনুসারে, রবীন্দ্রনাথও যশোরে গিয়েছিলেন- তাঁর কথাই অধিকতর নির্ভরযোগ্য বলে মনে হয়।” ( সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ২০০৮, পৃ. ২১৩)।

সমীর গুপ্তের এই বক্তব্য অধিকতর গ্রহণযোগ্য এই কারণে যে রবীন্দ্রনাথের জন্য মেয়ে দেখতে যারা যশোরে গিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ইন্দিরা দেবীও ছিলেন। তৎকালীন সময়ে ফুলতলার দক্ষিণডিহি যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর এই যশোরের দক্ষিণডিহিতেই ইন্দিরা দেবীরা কবির জন্য পাত্রী দেখতে এসেছিলেন। ইন্দ্রিরা দেবীর বক্তব্য অনুসারে, এই পাত্রী দেখতে রবীন্দ্রনাথও যশোরে তথা দক্ষিণডিহিতে এসেছিলেন। রবীন্দ্র গবেষক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতে, ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে পূজার ছুটিতে জ্ঞানদানন্দিনী দেবী উৎসাহী হয়ে বাস্তুভিটা দেখার অজুহাতে যশোর জেলার নরেন্দ্রপুর গ্রামে যান, উদ্দেশ্য কাছাকাছি পিরালী পরিবারের মধ্য হতে বধূ সংগ্রহ। জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সঙ্গে কাদম্বরী দেবী, বালিকা ইন্দিরা, বালক সুরেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ চলিলেন পুরাতন ভিটা দেখতে। সেই সময়ে ফুলতল্লি (ফুলতলা) গ্রামের বেণীমাধব রায়চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণীকে তারা দেখেন, রবীন্দ্রনাথ দেখিয়াছিলেন কিনা জানি না। (রবীন্দ্রজীবনী, বিশ্বভারতী গ্রন্থ বিভাগ, কলিকাতা, ১৯০৭, পৃ. ১৯২)। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যে তাদের সঙ্গে ছিলেন সেই বিষয়টি এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। অর্থাৎ তিনি ভবতারিণীকে দেখেছিলেন কিনা সেই বিষয়ে সন্দেহ থাকতে পারে। কিন্তু তিনি যে দক্ষিণডিহিতে এসেছিলেন সেই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ইন্দিরা দেবীর বর্ণনাতেও এই বিষয়টি স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথের এই যশোর যাত্রা তথা দক্ষিণডিহিতে আগমনের বিষয়টি কলকাতায় ফিরে প্রিয়নাথ সেনকে যে পত্র লেখেন তাতেও উল্লেখ রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা মাঝে যশোর বেড়াতে গিয়েছিলাম। সম্প্রতি যশোর থেকে এসেছি...।” (চিঠিপত্র-৮, পত্র ১০, পৃ. ১০)। অথচ মৈত্রয়ী দেবী বলছেন রবীন্দ্রনাথ যশোরেই যাননি।

অনেক হয়তো বলতে পারেন যে তিনি যশোর গেলেও দক্ষিণডিহি যাননি। কিন্তু তার এই “আমরা” যশোর বেড়াতে গিয়েছিলাম এবং যশোর থেকে এসেছি বক্তব্যের “আমরা” শব্দটিই বলে দিচ্ছে যে তিনি দক্ষিণডিহি গিয়েছিলেন। তিনি জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর পুরো ভ্রমণের সময় তার সঙ্গে ছিলেন এবং একসঙ্গেই কলকাতায় ফিরেছেন বলেই “আমরা” শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আর জ্ঞানদানন্দিনী দেবী ও তার সফরসঙ্গীরা যেহেতু ওই সফরে দক্ষিণডিহি গিয়েছিলেন এমন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, তাই রবীন্দ্রনাথও যে দক্ষিণডিহি গিয়েছেন তাতে আর কোনও সন্দেহ থাকার কথা নয়। প্রশান্তকুমার পালের মতে, “যশোহরে অবশ্যই তিনি গিয়েছেন, কিন্তু মত দিয়েছিলেন বউঠাকুরাণীরা।” (রবিজীবনী, আনন্দ, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ১৭৮)। এই বক্তব্য থেকেও রবীন্দ্রনাথের দক্ষিণডিহি আগমনের বিষয়টি স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথ বহুবারই খুলনায় এসেছেন। তাই তাঁর দক্ষিণডিহিতে আসা অসম্ভব নয়।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে সমাবেশস্থলে জনস্রোত
রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে সমাবেশস্থলে জনস্রোত
এই সেতু দিয়ে নিজের গাড়ি নিয়ে বাড়ি যাবো: পিয়া জান্নাতুল
গৌরবের পদ্মা সেতুএই সেতু দিয়ে নিজের গাড়ি নিয়ে বাড়ি যাবো: পিয়া জান্নাতুল
পদ্মা সেতু: অসম্ভবকে সম্ভব করার রূপকথা
পদ্মা সেতু: অসম্ভবকে সম্ভব করার রূপকথা
টিভিতে আজ
টিভিতে আজ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ