X
শনিবার, ২৫ জুন ২০২২
১১ আষাঢ় ১৪২৯

গরিবের প্রতি দৃষ্টি থাকুক বাজেটে

আপডেট : ২২ মে ২০২২, ২০:২৩
করোনাকালীন নানা অর্থনৈতিক ও উৎপাদনগত সংকট এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অন্য সময়ের তুলনায় এখন বেশি। সরকারের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও বাংলাদেশেও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম দিনে দিনে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আসন্ন জাতীয় বাজেটের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো দেশ। সাধারণত বাজেটের পর স্বাভাবিক নিয়মে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। এবারের বাজেটের পর যেন বাজেটের অজুহাত দিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়িয়ে না দেন তা নিশ্চিত করতে সরকারের এখনই পরিকল্পনা করা দরকার। এবারের বাজেটে যদি সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ওপর ভর্তুকি দেওয়া যায়, বিশেষ করে চিনি, পেঁয়াজ-রসুন, বিভিন্ন ধরনের মসলা, চাল-ডাল, তেল প্রভৃতিতে তাহলে অন্তত উচ্চমূল্যে ক্রয় করার হাত থেকে সাধারণ মানুষ রক্ষা পাবে।

নিম্নবিত্ত মানুষ এসি গাড়ি অথবা বাড়ি চায় না, গৃহবধূর প্রসাধনী সামগ্রী না হলেও চলে। তারা চায় মোটা কাপড় এবং তিন বেলা পেট ভরে খাওয়ার মতো মাছ-ভাতের নিশ্চয়তা। কিন্তু বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের দাম যেভাবে ক্রমশ বাড়ছে, তাতে এই সামান্য প্রথম চাওয়া পূরণ করতে বাড়ির কর্তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে নজর দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে– বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেশি রাখা। যদিও এরইমধ্যে সরকার শিক্ষার প্রসারে বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। যার ফলাফল আমরা পাচ্ছি। আগের তুলনায় বেশি পরিমাণ শিক্ষার্থী স্কুলে গমন করছে। শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেওয়ার কারণে এখন আর পিতামাতারা বাল্যবিয়ে দিতে আগ্রহী নন। এ সুযোগে বহু মেয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা যায়, তাহলে এই হার অবশ্যই বাড়বে। এই বাজেটে সে ধরনের কোনও ভর্তুকি রাখার ব্যবস্থা করা যায় কিনা সেটি ভেবে দেখা যেতে পারে।

করোনা-উত্তর সবচেয়ে বেশি জরুরি শিক্ষার উপকরণে (কলম, খাতা, কাগজ প্রভৃতি) ভর্তুকি দেওয়া, যাতে সহজে কৃষক ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা এগুলো কিনতে পারে। করোনাকালে যেসব শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে তারা যেন টাকার অভাবে আবারও বিদ্যালয়ে ফিরতে হিমশিম না খায় তার দিকে নজর দেওয়া। করোনাকালে বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানরা পড়ালেখা করতো। ওই বিদ্যালয়গুলো যেন এখন আবারও চালু করা যায় তার জন্য বাজেটে সরকারের কাছে অনুদান চাই। গবেষণা সবসময় অবহেলিত খাত। বাংলাদেশের বর্তমান টেকসই উন্নয়নকে ধরে রাখতে গবেষণার কোনও বিকল্প নেই। তাই বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ গবেষকদের জন্য পর্যাপ্ত অনুদান নিশ্চিত করার দাবি জানাই।

কৃষকদের চাওয়া সামান্য। তারা চান তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলানো ফসলের ন্যায্যমূল্য। আগামী বছর যেন আবার ফসল ফলাতে পারেন এমন পুঁজির সংস্থান। বলে রাখা ভালো, আমাদের দেশে বিভিন্ন শিল্প-কারখানা স্থাপিত হলেও কৃষিকাজকে এখনও অবহেলা করার সুযোগ আসেনি। তাই এই বাজেটে কৃষকের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ থাক, এমনটি সবার প্রত্যাশা। আর কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্য পান, এই জন্য সরকারি উদ্যোগে বেশি করে ফসল সংগ্রহের বরাদ্দ রাখা হোক। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী যে খাদ্য সংকট শুরু হতে যাচ্ছে তার প্রভাব যাতে বাংলাদেশে না পড়ে তার জন্যও পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত করা প্রয়োজন। তাই এক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি বেশি করে কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ। এই বছরের বাজেটে প্রতি থানায় কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ রাখা হোক।

পাশাপাশি বিনা সুদে কৃষককে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা যেন থাকে। মধ্যযুগে ভারতের সুলতানি শাসক শেরশাহ যদি কৃষকদের কল্যাণে অনেক পদক্ষেপ নিতে পারেন, বিনা সুদে ঋণ, ফসল নষ্ট হলে ক্ষতিপূরণ দিতে পারেন, তাহলে আধুনিক যুগে আমরা কেন তা পারবো না। এই বাজেটে যেন সার ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ওষুধের (যেগুলো আমদানি করতে হয়) জন্য ভর্তুকি রাখা হয়। আর নিজেরা পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারলে বৈশ্বিক কোনও সংকট আমাদের চিন্তিত করবে না। পেঁয়াজ ও তেল নিয়ে যেসব রাজনীতি গত কয়েক বছর হয়েছে তার সমাধানে এই বছর বাজেটে বরাদ্দ রাখা দরকার। অর্থনৈতিক প্রণোদনার মাধ্যমে চাষিদের পেঁয়াজ ও সরিষা চাষে উৎসাহিত করলে আমাদের বিশ্বাস তেল ও পেঁয়াজে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে। একসময় বাংলার ঘরে ঘরে রান্নায় সরিষার তেল ব্যবহৃত হতো। বাংলার সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা দরকার। নিজেরা পেঁয়াজ ও সরিষা উৎপাদন করলে ভোজ্যতেল ও পেয়াঁজ আমদানিতে যে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে তা রক্ষা পাবে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রয়েছে মাছের খামার। সাধারণত এসব খামারে হোয়াইট গোল্ড খ্যাত চিংড়ি চাষ হয়। কিন্তু ইদানীং বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এসব অঞ্চলের কৃষকরা পর পর কয়েক বছর লাভের মুখ দেখতে পারেনি। পাশাপাশি অবৈধ মুনাফাখোর চিংড়ি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দাদন নেওয়ার কারণে তারা এখন পথে বসেছেন। তাই চিংড়ি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে খামারিদের জন্য সরকারি উদ্যোগে ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি চিংড়ি পোনা, মাছের খাবারসহ চাষাবাদের বিভিন্ন উপকরণ বিনামূল্যে অথবা স্বল্প মূল্যে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবেই পুনরায় এই শিল্প থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। তা না হলে এই শিল্পের ধ্বংস সময়ের ব্যাপার মাত্র।
উল্লেখ্য, বর্তমানে পোশাকশিল্পের পর চিংড়ি রফতানি করে এককভাবে কোনও খাত থেকে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়।

বাজেট হোক সাধারণ মানুষের জন্য, যারা সত্যিকার অর্থে বাজেট কী সেটা বোঝে না, যারা চায় দুবেলা দুমুঠো ভাতের নিশ্চয়তা। আর দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরার বাজেট হোক, যাতে মধ্যবিত্ত শহুরে মানুষের মাসিক বাজেট ফেল না করে। মধ্যবিত্ত গৃহিণীর হিসাব বাজারে গেলে যেন ওলটপালট না হয়ে যায়। বাঙালি সাধারণত উচ্চাভিলাষী জীবনযাপনে অভ্যস্ত নয়। চর্যাপদের যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত মাছ-ভাতে তারা খুশি। বাঙালি সর্বদা কুঁড়েঘরে মোটা কাপড়, মোটা ভাত আর এক টুকরো মাছে খুশি থেকেছে।

সরকারের বোঝা দরকার, সাধারণ মানুষ উন্নয়নের অর্থনীতি বোঝে না। তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামদরের উত্থান-পতন আর তাদের প্রতিদিনের আয়-রোজগার দিয়ে প্রয়োজনীয় সব নিত্যপণ্য ক্রয় করতে পারছে কিনা তার ভিত্তিতে দেশের উন্নয়নকে পরিমাপ করে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলেই তারা ধরে নেয় সরকার ভালো চলছে না, দেশের অর্থনীতি ভালো না। প্রতিদিনের বা মাসের আয় দিয়ে তাদের ব্যয় নির্বাহ করতে পারলেই তারা খুশি। তাই এই বছরের বাজেট ঘোষণার পর সাধারণ মানুষ যেন বাজার থেকে হাসিমুখে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ক্রয় করে ঘরে ফিরতে পারে, তার নিশ্চয়তাই সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। [email protected]
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
এখন ঢাকা থেকে ভোলায় গিয়ে নাশতা করাও সম্ভব: তৌসিফ মাহবুব
গৌরবের পদ্মা সেতুএখন ঢাকা থেকে ভোলায় গিয়ে নাশতা করাও সম্ভব: তৌসিফ মাহবুব
পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে ডিএমপির র‌্যালি
পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে ডিএমপির র‌্যালি
যেখানেই সেতু উদ্বোধন, সেখানেই দিলু ভান্ডারী
যেখানেই সেতু উদ্বোধন, সেখানেই দিলু ভান্ডারী
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ