X
শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৩
১৩ মাঘ ১৪২৯

টার্গেট ছাত্র রাজনীতি না ছাত্রলীগ?

প্রভাষ আমিন
১৮ আগস্ট ২০২২, ১৭:৩০আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২২, ১৭:৩০

আগস্ট বাংলাদেশের শোকের মাস। ৭৫-এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার মর্মান্তিক স্মৃতি জাতি স্মরণ করে গভীর শোক, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়। আওয়ামী লীগ এবং এর বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন মাসব্যাপী নানা কর্মসূচিতে জাতীয় শোক দিবস পালন করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কোনও দলের নন, জাতির পিতা। তাই আগস্ট এলেই শোক আর ভাবগম্ভীর পরিবেশ বিরাজ করে গোটা দেশেই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন ছাত্রলীগের নানা অপকাণ্ডে এবার বারবার বিঘ্নিত হয়েছে শোকের আবহ ও ভাবগাম্ভীর্য। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ আগস্ট মাস শুরুই করেছে ধর্মঘট, অবরোধ, ভাঙচুর দিয়ে। ১ ও ২ আগস্ট ছাত্রলীগের ৩৫ ঘণ্টার অবরোধে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও ক্লাস হয়নি, স্থগিত হয়েছে ১১টি পরীক্ষা। অবরোধের প্রথম দিনেই ৪টি হলের ৪০টি কক্ষ ভাঙচুর করেছে ছাত্রলীগের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। তাদের বিক্ষোভের কারণ ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা। এক বছর মেয়াদি কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়েছে তিন বছর পর। ৩৭৬ জনের বিশাল কমিটি করেও সন্তুষ্ট করা যায়নি সবাইকে। কমিটিতে অছাত্র, বিবাহিত, খুনের মামলার আসামি, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের পদ দিয়ে নিয়মিত ছাত্রদের বঞ্চিত করার প্রতিবাদেই এই অবরোধ বিক্ষোভ।

শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরীর ‘ধমকে’ অবরোধ থামলেও পদবঞ্চিতদের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। কিন্তু আগস্টের প্রথম দিনেই অবরোধ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগে ক্ষোভ প্রকাশের এই স্টাইল আবার ক্ষুব্ধ করেছে দেশের সাধারণ মানুষকে। আমি খালি ভাবছি ১ ও ২ আগস্ট ছাত্রলীগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ যা করেছে, তা যদি ছাত্রদল বা অন্য কেউ করতো, কী হতো এতদিনে?

নৈতিক স্খলন ও চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে শোভন-রাব্বানীকে অব্যাহতি দেওয়ার পর ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান আল নাহিয়ান জয় ও লেখক ভট্টাচার্য। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে কমিটি ও পদ বাণিজ্যের অভিযোগ করছেন দলের নেতারাই। জয়-লেখকের নিজেদের মেয়াদ ফুরিয়েছে আরও বছর দুয়েক আগেই। কিন্তু এখনও তারা উদারহস্তে কমিটি ও পদ বিলিয়ে যাচ্ছেন। সমস্যা হলো যেখানেই কমিটি হচ্ছে, সেখানেই জ্বলছে বিক্ষোভের আগুন, আসছে বাণিজ্যের অভিযোগ। ১ ও ২ আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যা হয়েছে তার আরও নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বরগুনায় এবং সেটা ১৫ আগস্টেই। ছাত্রলীগের দুইপক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পুলিশের ব্যাপক পিটুনি খেয়েছে। যারা আগস্ট মাসে, অন্তত ১৫ আগস্টেও নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ দমন করে রাখতে পারেন না, তারা আর যাই হোক; বঙ্গবন্ধুপ্রেমী হতে পারেন না।

ছাত্রলীগ বর্তমানে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন হলেও শেখ মুজিবুর রহমান কিন্তু ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আওয়ামী লীগেরও একবছর আগে। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর গণআন্দোলনসহ বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল ও সাহসী। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের লড়াই শুরু করেছিলেন শেখ হাসিনা। সেই লড়াইয়ে তাঁর মূলশক্তি ছিল ছাত্রলীগ। কিন্তু গত একযুগে ছাত্রলীগ তার গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে ভুলিয়ে দিয়ে পরিণত হয়েছে আওয়ামী লীগ ও সরকারের দায়ে। ছাত্রলীগের একেকটি অপকর্মে শেখ হাসিনার অনেক অর্জন বিসর্জনে যায়। বিরক্ত হয়ে শেখ হাসিনা একবার নিজেকে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রীর অবস্থান থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। বিরক্ত হওয়ারই কথা।

গত ১২ বছরে হেন কোনও অপরাধ নেই, যা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে আসেনি। গুগলে ছাত্রলীগ লিখে সার্চ দিলে খালি অপকর্মের ফিরিস্তিই আসে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কমিটি বাণিজ্য, খুন, ধর্ষণ, হল দখল, ক্যাম্পাস দখল, সাধারণ ছাত্রদের হয়রানি, এমনকি হত্যার অভিযোগও রয়েছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে পুরান ঢাকায় বিশ্বজিৎ আর বুয়েটে আবরার হত্যার ঘটনা ম্লান করে দিয়েছে ছাত্রলীগের অতীতের সব অর্জনকে।

এই আবরার হত্যাকাণ্ড ইস্যুতেই এই আগস্টে ছাত্রলীগ আবার আলোচনায়। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করে বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এই ঘটনার পর দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব গণআবেগের বিস্ফোরণ ঘটে। ছাত্র রাজনীতি তথা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রকাশ ঘটে। বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং জনআবেগের প্রতি সম্মান দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে। সে নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল রয়েছে। গত ১৩ আগস্ট বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতৃবৃন্দ জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আলোচনা ও দোয়ার আয়োজন করে। কিন্তু বুয়েটের ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’দের আপত্তির মুখে তাদের ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে হয়। বুয়েটের সাবেক ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই আলোচনা ও দোয়ার আয়োজন করেছিল। কিন্তু ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’রা যে ভঙ্গিতে বুয়েটেরই সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, যে স্টাইলে জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা পণ্ড করে দিলেন; তা ছিল আপত্তিকর।

প্রথমত, এটি কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। দ্বিতীয়ত, বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে কোনও অনুষ্ঠান আয়োজন করলে বর্তমান শিক্ষার্থীদের উচিত তাদের স্বাগত জানানো। কিন্তু ব্যানারে ‘ছাত্রলীগের সাবেক নেতৃবৃন্দ’ কথাটি লেখার ‘অপরাধে’ বর্তমান সাধারণ শিক্ষার্থীরা তা পণ্ড করে দিলেন। স্লোগান উঠেছে ‘খুনি ছাত্রলীগের ঠিকানা, বুয়েট ক্যাম্পাসে হবে না’। খুব ভালো কথা। খুনিদের ঠিকানা বুয়েট কেন কোনও ক্যাম্পাসেই হওয়া উচিত নয়। আবরার হত্যার ঘটনায় বুয়েট ছাত্রলীগের ২০ জনের ফাঁসি ও ৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তির দায়ে পুরো সংগঠনকে দেওয়া যৌক্তিক নয়। ছাত্রলীগ নানা অপকর্ম করে সাধারণ মানুষের মন এমন বিষিয়ে রেখেছে, বুয়েটে আক্রান্ত হলেও তারা সাধারণ মানুষের সমর্থন বা সহানুভূতি পায়নি। ছাত্রলীগের অভিযোগ, ছাত্র রাজনীতির অনুপস্থিতির সুযোগে বুয়েটে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। কেউ কেউ বলছেন, ছাত্রদল এবং শিবির সেখানে রাজনীতি করছে। তেমন অভিযোগ করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। কিন্তু সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের আলোচনার খবরে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’রা যেভাবে দ্রুতগতির সঙ্গে সংগঠিত হয়েছে, প্রতিবাদ করেছে, মিডিয়া অর্গানাইজ করেছে; তাতে তাদের পুরোপুরি সাধারণ শিক্ষার্থী মনে হয়নি। তাদের স্লোগান শুনে বোঝা যায়নি, তাদের টার্গেট ছাত্র রাজনীতি না ছাত্রলীগ। বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের ঠাঁই হবে কী হবে না, সেটা নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই। কিন্তু বুয়েটের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পাসে দীর্ঘসময় ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকাটা অস্বাভাবিক, অস্বস্তিকর।

এটা মানতেই হবে বুয়েটে বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরাই পড়ার সুযোগ পায়। সেই মেধাবী প্রজন্ম বেড়ে উঠছে, ছাত্র রাজনীতির ছোঁয়া ছাড়া, এটা দেশের ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলকর নয়। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা শেষ করে শুধু বড় বড় ইঞ্জিনিয়ার হবেন না, দেশের নেতৃত্বও দেবেন। আর নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ছাত্র রাজনীতির চর্চাটা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির বর্তমান যে বেহাল দশা, তাতে শুধু বুয়েট নয়, সারা বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দিলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু মাথাব্যথার সমাধান কখনও মাথা কেটে ফেলা নয়। মাথার অসুখটা সারাতে হবে। আমাদের লড়াইটা হতে হবে, ছাত্র রাজনীতির অসুখের বিরুদ্ধে, ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে নয়। আবরার হত্যার পর জনআবেগে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সময় এসেছে তা পুনর্বিবেচনা করার।

‘ছাত্র রাজনীতি খারাপ’ এটাই যদি বিবেচনা হয়, তাহলে শুধু বুয়েট কেন, দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হোক। আর যদি নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, একজন ছাত্রকে পড়াশোনার পাশাপাশি দেশপ্রেমিক ও নেতৃত্বের গুণাবলি নিয়ে বেড়ে ওঠা উচিত, তাহলে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি করার অধিকার দেওয়া হোক। বুয়েট কোনও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত। বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বারবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার, সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে; তাতে তাদের এখন উচিত পরিচ্ছন্ন ছাত্র রাজনীতি নিশ্চিতের আন্দোলন করা। ছাত্র রাজনীতি চালু হওয়ার পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা যদি আবরারের খুনের সঙ্গে জড়িতদের সংগঠনকে সমর্থন না করে, এমনিতেই বুয়েটে ছাত্রলীগের ঠাঁই হবে না; সেটার জন্য স্লোগান দিতে হবে না, সিনিয়রদের অপমান করে ক্যাম্পাস থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে না। ছাত্রলীগ যে অগণতান্ত্রিকভাবে দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দখলদারিত্ব কায়েম করে রেখেছে, একইভাবে তাদেরও বুয়েটে প্রতিহত করার চেষ্টা হয়েছে। হতে পারে সেটা ছাত্রলীগের পুঞ্জীভূত অপরাধের দায়। কিন্তু দুটি স্টাইলই অগণতান্ত্রিক, অগ্রহণযোগ্য।

আজ বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে সচেতনতায় ছাত্রলীগকে রুখে দিচ্ছে, ছাত্র রাজনীতি ঠেকিয়ে রাখছে; সেই সচেতনতাটা আগে দেখালে তো ছাত্রলীগ এমন দানব হয়ে উঠতো না, আবরারকেও প্রাণ দিতে হতো না।

আমরা চাই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সব ছাত্র সংগঠন অবাধে তাদের রাজনৈতিক তৎপরতা চালাবে, দেশে ফিরে আসবে সুস্থ ছাত্র রাজনীতির চর্চা। কোথাও ছাত্রলীগ দখল করে রাখবে, কোথাও ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ থাকবে, এটা কাম্য নয়। কোনও সংগঠনই যেন কোথাও নিষিদ্ধ না থাকে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
চট্টগ্রামকে হারিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে সাকিবের বরিশাল
চট্টগ্রামকে হারিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে সাকিবের বরিশাল
বাবা হওয়ার পরদিন মাদ্রাসাশিক্ষকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
বাবা হওয়ার পরদিন মাদ্রাসাশিক্ষকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব প্রস্তুতি: অবকাঠামোর উন্নয়ন
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব প্রস্তুতি: অবকাঠামোর উন্নয়ন
১০৭ ধরে চলছে হাডুডু খেলার আয়োজন, গ্রামজুড়ে উৎসব
১০৭ ধরে চলছে হাডুডু খেলার আয়োজন, গ্রামজুড়ে উৎসব
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ