X
সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২
২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

খেলা নাকি দেশ নিয়ে ছেলেখেলা?

রুমিন ফারহানা
২৯ আগস্ট ২০২২, ২০:৩২আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২২, ২০:৩৫

স্লোগানটি ছিল আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের। তিনি বলেছিলেন ‘খেলা হবে’। কেউ যখন কথা বলে তখন মুখে যা বলে তার চেয়ে শতগুণ বেশি বলে বডি ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে। তার আসল বক্তব্য বা বক্তব্যের মর্মার্থ বুঝতে হলে পড়তে হবে তার শরীরের ভাষা। তাই ‘খেলা হবে’ কথাটি তিনি যখন রাজনীতির মাঠে ছেড়েছিলেন তখন আমাদের আর বুঝতে বাকি থাকেনি তিনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন। মজা হলো এই খেলার বল গড়িয়ে গেলো পশ্চিমবঙ্গেও।

পশ্চিমবঙ্গের বিগত বিধানসভা নির্বাচনটিতে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের স্লোগানে পরিণত হয়েছিল ‘খেলা হবে’। তারপর শেষমেশ এটি আবার ফিরে এলো বাংলাদেশে। সর্বশেষ ১৭ আগস্ট রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনে এক বিক্ষোভ সমাবেশে জনাব ওবায়দুল কাদের বলেন– ‘খেলা হবে। আন্দোলনে হবে, রাজপথে হবে, নির্বাচনে হবে। মোকাবিলা হবে, মোকাবিলা হবে। প্রস্তুত হও। খেলা হবে’। ক্ষমতাসীন দলের খেলা শুরু হয়ে গেছে।

জনাব কাদের ছোট্ট একটু ভুল বলেছেন। বলেছেন– ‘খেলা হবে’। খেলা তো হচ্ছে গত ১৩ বছর যাবতই। খেলা দেখাচ্ছে তার দল আওয়ামী লীগ। এই খেলা দেখাতে গিয়ে ২০১৪ সালে ফাঁকা মাঠে গোল দিলেন, ২০১৮ সালে করলেন মধ্যরাতে নির্বাচন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ইভিএম দিয়ে ‘খেলবেন’ বলে ধারণা করছে অনেকেই। জনগণের সাথে এই ছিনিমিনি খেলায় এতদিন তারা গুটি হিসাবে সামনে এনেছেন ‘উন্নয়নের বয়ান’।

বাংলাদেশে চালু করেছেন ‘উন্নয়নের গণতন্ত্র’ নামের এক নতুন ধারার গণতন্ত্র। অবশ্য জবাবদিহিহীনতা, গোষ্ঠীতন্ত্র কায়েম, মানবাধিকার হরণ, তথ্য গোপন আর বীভৎস লুটপাটের ফলে উন্নয়নের মহাসড়কে যাত্রার যে গল্প এতদিন শুনে এসেছিলাম তা থমকে গেছে অনেকটাই। এখন চলছে বিদ্যুৎ রেশনিং, রিজার্ভ সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি সহ নানামুখী আর্থিক সংকট।

এই নানান সংকটের মধ্যে মানুষের জীবনকে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত করেছে গত কয়েক মাস থেকে ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। বিশেষ করে সময়টি এমন যে মানুষ এখনও করোনার অভিঘাত পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর মধ্যেই শুরু হয়েছে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলসহ সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য কমানোর দাবিতে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ, দেশের সর্ববৃহৎ দল, বিএনপি দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সেই কর্মসূচির অংশ হিসাবে বিএনপি বিভিন্ন জেলায় উপজেলায় সমাবেশ এবং বিক্ষোভ মিছিল আয়োজন করেছে। দেশের সংবিধান এবং আইনি চৌহদ্দির মধ্যে থেকেই চলছে এসব কর্মসূচি।

বিএনপি’র কর্মসূচি এমন এক সময় ডাকা হয়েছে যখন দফায় দফায় প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে বলা হচ্ছে বিরোধী দলের কর্মসূচিতে কোনও বাধা না দেওয়ার জন্য। এমনকি গত ২৪ জুলাই ২০২২ তিনি বলেছেন– ‘যদি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাও করতে আসে আসুক। আমি তো বলে দিয়েছি তারা (বিএনপি) যদি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাও করতে আসে, পুলিশ যেন বাধা না দেয়। আসুক না হেঁটে হেঁটে যতদূর আসতে পারে। কোনও আপত্তি নেই। আমি বসাবো, চা খাওয়াবো। কথা বলতে চাইলে শুনবো। কারণ আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি।’ এখানেই শেষ নয়। এরপর ১৪ আগস্ট ২০২২ প্রধানমন্ত্রী আবার বলেন, ‘আমি আজকেও নির্দেশ দিয়েছি, তারা আন্দোলন করতে চায় করুক। খবরদার কাউকে যেন এরেস্ট করা না হয়। প্রধানমন্ত্রীর অফিস ঘেরাও করবে, আমি বলেছি, হ্যাঁ আসতে দাও। আমি বলে দিয়েছি খবরদার, কাউকে যেন গ্রেফতার করা না হয়। কোনও ডিস্টার্ব করা না হয়। তারা আন্দোলন করতে চায় করুক, অসুবিধা কী?’

প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস এবারই প্রথম নয়। এর আগেও ২০১৮ এর নির্বাচনের আগে একই ধরনের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে দেওয়া হয়েছিল। তখনও যেমন সে আশ্বাসের প্রতিফলন পাওয়া যায়নি, এখনও তাই। বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির প্রায় প্রতিটিতে হয় বাধা দিয়েছে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা নয়তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই জায়গায় পাল্টা সভা ডেকে জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা।   

এর আগেও নানা সময় বিএনপি কিংবা অন্য কারও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং ক্যাডাররা মাঠে থেকেছে। কেন তারা মাঠে আছেন, সেই কারণের ব্যাখ্যায় প্রকাশ্যভাবে বলেছেন তারা বিএনপি’র নাশকতা ঠেকাতে মাঠে আছেন। বলাবাহুল্য বহু ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের হামলায় বিএনপি’র বহু সমাবেশ মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়েছে। অবশ্য হামলা করে বিএনপি কর্মীদের হতাহত করার পর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যথারীতি বলা হয়, এসব ঘটনা বিএনপি’র অন্তর্কোন্দলের ফলে হয়েছে।

২৮ আগস্ট, ২০২২ একটি জাতীয় পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিএনপির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে আওয়ামী লীগের অবস্থান হচ্ছে– বিএনপির আন্দোলন মোকাবিলায় রাজপথে সতর্ক অবস্থানে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংযত ও সহনশীল থাকার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তবে আন্দোলন-সংগ্রামের নামে সহিংসতার চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিকভাবে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশনাও রয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতারা রাজপথ দখলে রাখার ব্যাপারেও দলের কর্মীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন।

বিএনপি কোনোদিন আন্দোলনের নামে নাশকতা করেনি। একারণে অনেক সময়ই বিএনপিকে শুনতে হয়েছে– ‘তারা আন্দোলন করতে পারে না, বিএনপি’র আন্দোলন নাকি লুঙ্গি পরেই সামাল দেওয়া যায়’। বলা হয়েছে– ‘আওয়ামী লীগের মতো দানবীয় শক্তির মোকাবিলা করার জন্য যে ভয়াবহ অরাজকতা করা প্রয়োজন বিএনপি তা করার মতো রাজনৈতিক দল না’। কিন্তু আলোচনার খাতিরে ধরে নেওয়া যাক বিএনপি’র আন্দোলনে নাশকতা হয়। একটা দেশে যখন কোনও রাজনৈতিক দল আন্দোলনের নামে নাশকতা করবে তখন সেটাকে ঠেকানোর জন্য রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনী আছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব তাদের।  

তবে সেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে কী করে পুলিশ তার নজির আছে ভুরি ভুরি। এ দেশের পুলিশ বাহিনী স্রেফ সরকার এবং সরকারি দলের এক আজ্ঞাবহ বাহিনীতে পরিণত হয়েছে, এটা জানে সবাই। না হলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার দুই দিন পার না হতেই কী করে ভোলায় পুলিশের গুলিতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় বিএনপির দু’জন একনিষ্ঠ কর্মী? আহত হয় অনেকে?

এই বাস্তবতা মাথায় রাখার পরও বলতে চাই কারও বিরুদ্ধে যদি নাশকতার কোনও অভিযোগ থাকে তাহলে সেটা দেখভাল করা, নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা  আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। আওয়ামী লীগকে কেন মাঠে থাকতে হবে নাশকতা ঠেকানোর নামে। আওয়ামী লীগকে কেন ‘খেলা হবে’ বলে চরম উসকানি এবং হুমকি দিতে হবে?

এর কারণ অনুসন্ধানের আগে দেখি সরকারি দলের ‘খেলা হবে’ নির্দেশনার ফল কী দাঁড়িয়েছে। ২২ আগস্ট থেকে সারাদেশের জেলা উপজেলা পর্যায়ে জ্বালানি তেল এবং অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিএনপির বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৫০টির বেশি স্থানে হামলা করা হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৩০০ জন নেতাকর্মী। গ্রেফতার করা হয়েছে দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে। ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে অন্তত ২০টি স্থানে। এসব ঘটনায় মামলা করা হয়েছে ১৫টির বেশি, আসামি করা হয়েছে প্রায় দুই হাজার নেতাকর্মীকে। 

আরেকটি নির্বাচন সামনে আসছে। সরকার জানে আওয়ামী লীগের অন্যায়ভাবে, অবৈধভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার পথে প্রধান বাধা বিএনপি। তাই আগের দুই নির্বাচনের আগে যখনই বিএনপি মানুষের সাথে জনসংযোগের মাধ্যমে সমাবেশ, মিছিল সহ নানা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে গেছে, তখনই তাদের ওপর প্রচণ্ড নিপীড়ন চাপিয়ে দেওয়া হতো। আগের দুইবার মাঠে আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা থাকলেও বিএনপিকে দমানোর জন্য প্রধানত ব্যবহৃত হয়েছিল আইন-শৃংখলা বাহিনী। রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সময় ভয়ঙ্কর হামলার শিকার হয়ে শুধু হতাহত হয়েছিলেন তাই নয়, বিএনপির অনেক নেতাকর্মী শিকার হয়েছিলেন গুম এবং বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের। আর লক্ষ লক্ষ কর্মীর বিরুদ্ধে মামলার হয়রানি তো ছিলই। 

তবে এবারকার পরিস্থিতি ভিন্ন। র‍্যাব এবং এর কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে কয়েক মাস আগে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার স্বয়ং বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে তার উদ্বেগের কথা জানিয়ে গেছেন। এদিকে দেশের আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিদেশি বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতেরা আগামী নির্বাচনটি সুষ্ঠু করার ব্যাপারে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ তৈরি করতে শুরু করেছেন। 

সব মিলিয়ে নির্বাচন নিয়ে সরকার বেশ চাপের মধ্যে আছে। এমন পরিস্থিতিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কী করছে না করছে সেটা খুব কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকবে। ফলে এবার আগের মতো তাদেরকে ব্যবহার করে যা খুশি তাই করতে পারার সম্ভাবনা বেশ কম। এ কারণেই এবার আওয়ামী লীগ, এর অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠন আগের চেয়েও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে এতদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পালন করে আসা দায়িত্বও যখন তাদের নিতে হচ্ছে। তারাই এখন হামলা করে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি ভন্ডুল করবে। 

পশ্চিমবঙ্গে যে অর্থে ‘খেলা হবে’ কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে সেটিকে পলিটিক্যাল রেটোরিক বলাই যায়। মাঠ পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কিছু দ্বন্দ্ব সংঘাত থাকলেও ভারতের কেন্দ্র এবং আর সব রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়। তাই সেখানে ‘খেলা হবে’র মানে রাজনীতি এবং ভোটের মাঠে সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু যে দেশে ন্যূনতম সুষ্ঠু একটি নির্বাচনের ধারেকাছেও নেই পরিস্থিতি, সেখানে ‘খেলা হবে’ মানে যে সুস্থ, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচি বোঝায় না, এটা বুঝতে রাজনৈতিক পন্ডিত হবার দরকার নেই।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ।

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
‘৭ ডিসেম্বর কক্সবাজার জনসমুদ্রে পরিণত হবে’
কক্সবাজারে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা‘৭ ডিসেম্বর কক্সবাজার জনসমুদ্রে পরিণত হবে’
বিএনপির গণসমাবেশ: ব্যস্ততা বেড়েছে পল্টন থানায়
বিএনপির গণসমাবেশ: ব্যস্ততা বেড়েছে পল্টন থানায়
ব্রাজিলের বিপক্ষে ‘অঘটন’ চান সনও
ব্রাজিলের বিপক্ষে ‘অঘটন’ চান সনও
ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে: ডেপুটি স্পিকার
ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে: ডেপুটি স্পিকার
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ