X
মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
২৪ মাঘ ১৪২৯

ইরানকে বদলাতেই হবে

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯:১০আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯:১০

ইরানে দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা বিক্ষোভের মুখে বহুল আলোচিত-সমালোচিত, দেশটির নাগরিকদের কাছে দানব বলে পরিচিত ‘নীতি পুলিশ’ বিলুপ্ত করেছে কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে আলোচিত হিজাব আইন পরিবর্তনের আভাসও দেওয়া হয়েছে। দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ জাফর মনতাজেরিকে উদ্ধৃত করে ইরানের সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ জানিয়েছে, ‘ইরানে নারীদের মাথা ও চুল ঢেকে রাখার যে আইন প্রচলিত রয়েছে, তা পরিবর্তনের জন্য যৌথভাবে কাজ করছে বিচার বিভাগ ও পার্লামেন্ট।’ এর মধ্য দিয়ে বিক্ষোভের মুখে হিজাব আইন নিয়ে আন্দোলনে পিছু হটার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিলো ইরান। তবে এই আইনে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন আনা হতে পারে, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানা যায়নি।

গত সেপ্টেম্বরে ২২ বছরের কুর্দি নারী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ একপর্যায়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।

যেটাই হোক, নীতি পুলিশ বিলুপ্ত হয়েছে এবং হিজাব আইনে পরিবর্তন আসছে, এটুকু সত্য। কিন্তু শুধু এটুকুর জন্য তো ইরানের এত মানুষ জীবন দেয়নি। খোদ ইরান সরকার বাধ্য হয়েছে স্বীকার করতে যে এই হিজাববিরোধী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি ও অত্যাচারে খুন হয়েছে দুই শতাধিক মানুষ। ইরানের মানুষ রাস্তায় নেমেছে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে। আর সেই প্রতিবাদীদের ওপর ইরানের পুলিশ ও সেনারা নির্মম দমন-পীড়ন চালিয়েও থামাতে না পেরে এখন হিজাব আইন পরিবর্তন আর নীতি পুলিশ বিলুপ্ত করে আন্দোলনের আগুন নেভাতে চাইছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন বলেছে, ‘ইরানে যা চলছে, তা পুরোপুরি মানবাধিকার সংকট।’

মনে আছে নিশ্চয়ই, এ বছর সেপ্টেম্বরের গোড়ায় হিজাব ঠিকমতো না পরায় রাজধানী তেহরানের রাস্তায় ২২ বছরের তরুণী মাহশা আমিনিকে রাস্তায় পরিবারের সদস্যদের সামনে থেকেই ছিনিয়ে নেয় এই নীতি পুলিশ। পিটিয়ে তাকে থানাতেই মেরে ফেলা হয়। এরপর থেকেই বিক্ষোভ শুরু হয় দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে। আর সেই সঙ্গে শুরু হয় পুলিশ ও সেনার নিপীড়ন। বিক্ষোভকারীদের শুধু খুন নয়, আটককৃত নারী বিক্ষোভকারীদের জেলের ভেতর যৌন নির্যাতনের অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে বহুবার।

কিন্তু মানুষ দমে যায়নি। নারীদের পাশাপাশি পুরুষ এবং একপর্যায়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নেমে আসে রাজপথে। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশটি ৮০টি শহরে। ইরান সরকার ২০০ জনের খুনের কথা বললেও নরওয়েভিত্তিক ইরান মানবাধিকার সংগঠন বলছে, মারা গেছে ৩২৬ জন, যাদের মধ্যে রয়েছে ৪৩ জন শিশু। এই আন্দোলন শুধু হিজাববিরোধী বললে ভুল বলা হবে। শোষণ-বঞ্ছনার শিকার মানুষের জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রকাশ করছে মানুষ। চরম দুর্নীতিতে নিমজ্জিত সরকার ও তার নিবর্তনমূলক নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মিলিত জাতীয় প্রতিবাদ এই আন্দোলন।

ইরানিরা শান্তিতে নেই বহু বছর। যারা রেজা শাহ পাহলবির সরকারকে হটিয়ে খামেনিকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল, তারাই হতাশ এখন। খামেনি মানুষের বিপ্লবী বিজয়কে ছিনতাই করে কায়েম করেছে এক চরম গোড়া, অন্ধ ও ধর্মান্ধ শাসন ব্যবস্থা। মানুষের জন্য আছে শুধু দারিদ্র্য ও নিপীড়ন। তাই দেশটির মানুষ বহুকাল ধরে হতাশাজনক সময় পার করছেন। তথাকথিত ধর্মীয় রাজনৈতিক অভিজাতদের ব্যাপক দুর্নীতি এমন এক অবস্থা সৃষ্টি করেছে যে এখন সেখানে ৫০ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি। ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব ইরানের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ করে রেখেছে বহু বছর ধরে।

এর আগে ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালেও ইরানে আন্দোলন হয়েছে। প্রতিবারই নিষ্ঠুর নিপীড়ন করে আন্দোলন দমানো হয়েছে। এবারও সেই কৌশলই অবলম্বন করেছিল বর্তমান ইরান সরকার। ইরানে সরকারবিরোধী কথা বললেই মৃত্যুদণ্ড, এমন বিধানও আছে। এরপরও বিক্ষোভ দমানো যায়নি। এ অবস্থায় কার্যত দুভাগ হয়ে যায় শাসকগোষ্ঠী। একপক্ষ নির্মম নিষ্ঠুরভাবে আন্দোলন দমানোয় উৎসাহ দেখালেও আরেকটি অংশ বারবার বলার চেষ্টা করেছে যে শাসন ব্যবস্থায় মৌলিক সমস্যা রয়েছে বলেই এত মানুষ একসঙ্গে এত শহরে নেমে এসেছে। এদের একজন হলেন প্রধান ধর্মীয় নেতা আলি খামেনির বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ক বিশেষ দূত মোস্তফা রোস্তামি। সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও মনে করেন, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। ইরান সরকার বর্তমান বিক্ষোভকে বিদেশি মদতপুষ্ট বললেও দেশটি অন্যতম ধর্মীয় নেতা মোহাম্মদ আলি আয়াজি মনে করেন, মূল সমস্যা শাসন ব্যবস্থায়।

এতেই বোঝা যায়, ইরানের নেতা আলি খামেনির ঘরেই বিভাজন স্পষ্ট হয়েছে। খামেনির কাছের লোকেরাই বলতে শুরু করেছেন যে মানুষকে কথা বলার স্বাধীনতা দিতে হবে, রাজনৈতিক দর্শনের পরিবর্তন আনতে হবে। হত্যা করে, নিপীড়ন করে, মতপ্রকাশকে স্তব্ধ করে কিছু আর করা যাবে না।

কতটা ক্ষোভ জমা হলে, বিক্ষোভকারী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যায় বিশ্বকাপ ফুটবলে যাওয়া ইরানি টিম! বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে জাতীয় সংগীতে গলা মেলাননি ইরানের ফুটবলাররা। ক্যামেরায় দেখা গেছে, স্টেডিয়ামে হাজির অনেক সমর্থকও জাতীয় সংগীতের সময় চুপ ছিলেন।

তাই এখনই সব কথা বলার সময় আসেনি। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সমাজের সর্বস্তরে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হয়েছেন নারীরাই। ইসলামি বিপ্লবের পরপরই ইরানের নারীদের জন্য হিজাব ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। এছাড়া ভ্রমণ, বাইরে কাজ করা এবং সাত বছরের বেশি বয়সী শিশুর হেফাজতের অধিকারও হারান তারা। এবারের আন্দোলনের আসল কথা ছিল সাম্যের আহ্বান এবং ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান। বিক্ষোভকারীদের প্রধান স্লোগান– ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ থেকে বুঝতে বাকি থাকে না যে ইরানকে বদলাতেই হবে।

লেখক: সাংবাদিক  

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
প্রশাসন ক্যাডারে একীভূত হওয়ার প্রবণতা
প্রশাসন ক্যাডারে একীভূত হওয়ার প্রবণতা
ভিন্ন সাজের স্টল-প্যাভিলিয়নে ক্রেতা-দর্শনার্থীর ভিড়
ভিন্ন সাজের স্টল-প্যাভিলিয়নে ক্রেতা-দর্শনার্থীর ভিড়
কংগ্রেসের ‘ভারতজোড়ো’র প্রসঙ্গ মির্জা ফখরুলের কণ্ঠে
কংগ্রেসের ‘ভারতজোড়ো’র প্রসঙ্গ মির্জা ফখরুলের কণ্ঠে
মুগ্ধতা ছড়ানো বোলিংয়ে মুগ্ধর ৫ উইকেট
মুগ্ধতা ছড়ানো বোলিংয়ে মুগ্ধর ৫ উইকেট
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ