এআইয়ের দৌড়, বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত 

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০

যন্ত্র বানায় যারা, তাদের ভেতর থেকেই এখন গতি কমানোর কথা শোনা যাচ্ছে। শুনতে অদ্ভুত লাগে। যে দৌড়ে সবার আগে থাকাটাই একমাত্র লক্ষ্য, সেখানে থামার ডাক আসছে সেই ঘর থেকেই। আহ্বানটা যখন অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদির মুখ থেকে আসে, তখন সেটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁর আশঙ্কা স্পষ্ট।

এআই এজেন্টের ঝাঁক একবার হাতের বাইরে বেরিয়ে গেলে এক বছরের মধ্যেই তারা শক্তিশালী বটনেট দাঁড় করাতে পারে, ইন্টারনেটের বড় অংশ দখলে নিতে পারে, আর ক্ষতির অঙ্ক গিয়ে ঠেকতে পারে শত শত কোটি ডলারে। গত গ্রীষ্মে একটি জনপ্রিয় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে শত শত এআই এজেন্টের অনধিকার ঢুকে পড়ার ঘটনা তিনি দেখিয়েছেন প্রথম বাস্তব উদাহরণ হিসেবে। আর সবচেয়ে লক্ষণীয় ব্যাপার হলো—সাধারণত যাঁরা এক বিষয়ে কখনও একমত হন না, সেই স্যাম অল্টম্যান আর ইলন মাস্ক, দুজনেই এবার তাঁর সুরে গলা মিলিয়েছেন।

তবে এই একমত হওয়াকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখারও কারণ নেই। সমালোচকেরা বলছেন, কোম্পানিগুলোর উদ্দেশ্য পুরোপুরি নিঃস্বার্থ নয়। বড় কোনও সাইবার দুর্ঘটনা ঘটলে আইনি ও আর্থিক দায় কার ঘাড়ে পড়বে, সেই হিসাবও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে। উল্টো দিক থেকে আরেক দল বলছেন—এই পরিকল্পনা ঝুঁকি কমাতে যথেষ্ট নয়। দুইপক্ষের সমালোচনার জায়গা আলাদা, কিন্তু একটি বিষয়ে তারা একমত—নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। নিরাপত্তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোম্পানির নিজের হাতে ছেড়ে দেওয়া চলে না। কথাটা আমাদের জন্য আরও জরুরি, কারণ আমরা এআই বানানোর দৌড়ে নেই, আমরা কেবল ব্যবহারকারী।

আমরা এআই বানাচ্ছি না বলে এই ঝুঁকি থেকে নিরাপদ থাকবো, এমনটা ভাবার কারণ নেই। এআইয়ের ব্যবহার আমাদের দেশেও দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই ব্যবহারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তার প্রস্তুতি কতটা এগিয়েছে, সেটিই প্রশ্ন। ব্যাংকিং খাতের দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যায়। নীতিমালা না থাকলেও এআইয়ের ব্যবহার থেমে নেই। কাজ দ্রুত শেষ করতে গিয়ে অনেক কর্মী গ্রাহকের তথ্য, ঋণ প্রস্তাবের খসড়া কিংবা নিরীক্ষা প্রতিবেদনের অংশ বিদেশি সার্ভারে থাকা চ্যাটবটে দিচ্ছেন। এতে কাজ সহজ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তথ্য কোথায় যাচ্ছে, কে তা ব্যবহার করছে কিংবা পরে কোথায় সংরক্ষিত থাকছে, অনেক ক্ষেত্রেই এসব প্রশ্নের উত্তর কর্মীর নিজের কাছেও নেই। এআই ব্যবহারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি এখানেই।

২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে আট কোটি ডলার চুরির ঘটনা আমাদের স্মৃতিতে এখনও টাটকা। সেদিন আমরা শিখেছিলাম, একটা দুর্বল জায়গা গোটা ব্যবস্থাকে কীভাবে খুলে দিতে পারে। আজ সেই দুর্বল জায়গা খুঁজে বের করা এআইয়ের জন্য অনেক সহজ। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নকল কণ্ঠ আর নকল চেহারা। ঘরে বসে অ্যাকাউন্ট খোলা আর মোবাইলে টাকা পাঠানোর ওপর নির্ভরতা যত বেড়েছে, কারও গলা বা মুখ নকল করার খরচ তত কমেছে। কিন্তু প্রতারণা ঠেকানোর পদ্ধতিগুলো এখনও মূলত পুরোনো ধরনের জালিয়াতি ধরার জন্য তৈরি। অতীতে যা দেখা গেছে, সেটাই সে খোঁজে। নতুন মুখ নিয়ে আসা জালিয়াতি এই জালে ধরা পড়ে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য বসে নেই। ডিসেম্বরের মধ্যে ব্যাংকিং খাতে এআই নীতিমালা চালুর কথা তারা বলেছে। নিজস্ব মডেল তৈরির কথাও ভাবছে। পদক্ষেপটি কিছুটা দেরিতে হলেও জরুরি। নীতিমালা করলেই কাজ শেষ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, ব্যাংকগুলো সেটি বাস্তবে কতটা মানবে। সেটি ব্যাংকের প্রতিটি স্তরে কতটা মানা হচ্ছে, সেটিই হবে আসল পরীক্ষা।

ব্যাংকিং খাতের এই ঝুঁকির বাইরে এখন আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে আসছে। আর তা হলো কাজের বাজার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর।

উন্নত দেশগুলোতে এআই অনেক মাঝারি মানের কাজ বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশে সেই কাজগুলোর অনেকগুলোই আবার আমাদের আয়ের উৎস। ডেটা এন্ট্রি, কাস্টমার সাপোর্ট, কনটেন্ট যাচাই, সহজ অনুবাদ ও গ্রাফিক ডিজাইনের মতো কাজ করে লাখো মানুষ দেশি-বিদেশি বাজারে আয় করছেন। এতদিন কম মজুরির কর্মীই ছিল আমাদের বড় সুবিধা। এখন সেই জায়গাতেই এআই চাপ তৈরি করছে। যে কাজ করতে একজন মানুষকে কয়েক ঘণ্টা দিতে হয়, একটি এআই টুল সেটি অনেক কম সময়ে করে দিতে পারে। ফলে শুধু সস্তা শ্রমের ওপর ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। এআইয়ের দৌড় থামবে কিনা, সেটা আমাদের হাতে নেই। কিন্তু সেই দৌড়ে পিছিয়ে না পড়ার প্রস্তুতিটা এখনই নেওয়া যায়।

ঝুঁকিটা ব্যাংক বা চাকরির বাজারেই থেমে থাকবে না। ভাষা ও তথ্যের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে। জমির কাগজ, স্বাস্থ্যের তথ্য, শিক্ষার্থীর ফলাফল, সবই ডিজিটাল হচ্ছে, অথচ ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষার কাঠামো আধাখেঁচড়া। বাংলা ভাষার উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার প্রায় নেই বললেই চলে। তাই বাংলায় কাজ করা মডেল তৈরি হচ্ছে বাইরের কোম্পানির হাতে। আর ভাষা ও তথ্য যখন বাইরের হাতে, তখন গুজব আর বানানো ভিডিওর ঝুঁকিও কম নয়। নির্বাচন, ধর্মীয় স্পর্শকাতরতা আর সামাজিক মাধ্যমের গতি মিলিয়ে বাংলাদেশ এই ক্ষতির জন্য খুবই উপযুক্ত মাটি। প্রযুক্তিবিদেরা মানবজাতির বিলুপ্তির যে দূরের আশঙ্কার কথা বলেন, তার অনেক আগেই আমাদের সামনে আসবে মানুষে মানুষে আস্থা হারানো।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা উঠছে শিক্ষাকে ঘিরে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকদের সরাসরি বলেছেন, তাঁদের ব্যাচের প্রায় সবাই গবেষণা প্রতিবেদনে এআইয়ের সাহায্য নিয়েছেন, মাঠের তথ্য এআই দিয়ে বিশ্লেষণ করিয়েছেন, আর নকল ধরার পরীক্ষার কথা শুনে শেষ মুহূর্তে লেখা নিজেদের মতো সাজিয়ে জমা দিয়েছেন। এখানে নকলের চেয়েও বড় সমস্যা হলো শেখার প্রক্রিয়াটা দুর্বল হয়ে যাওয়া।

বিদেশের গবেষণায় দেখা গেছে, এআই দিয়ে লেখাদের মস্তিষ্কের সক্রিয়তা তুলনামূলক কম থাকে, লেখায় একই চিন্তা ঘুরেফিরে আসে। এআই আবার কখনও এমন বই বা গবেষণাপত্রের নাম বানিয়ে দেয়, বাস্তবে যার অস্তিত্বই নেই। তাহলে এআই বাদ দিতে বলবো? না, সেটা অবাস্তব দাবি। শিক্ষকেরাই বলছেন, এআই ছাড়া চলবে না, দরকার শুধু সঠিক ব্যবহারটা জানা।

এআই কত দ্রুত এগোবে, তা আমরা ঠিক করতে পারবো না। কিন্তু এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের কতটা প্রস্তুত করবো, সেটি আমাদের হাতেই। ব্যাংকে কোনও তথ্য বাইরে দেওয়া যাবে না, তা স্পষ্ট করতে হবে। এআইয়ের কারণে কোনও কাজ কমে গেলে কর্মীকে সরিয়ে দেওয়ার আগে তাকে নতুন কাজ শেখানোর সুযোগ দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়েও এআই নিষিদ্ধ করার বদলে কোথায় এটি ব্যবহার করা যাবে, আর কোথায় শিক্ষার্থীকে নিজের চিন্তা ও বিশ্লেষণ দিয়েই কাজ করতে হবে, সেই সীমা ঠিক করা জরুরি। প্রযুক্তি থেমে থাকবে না। তাই ভয় পেয়ে পিছিয়ে থাকা নয়, বুঝে ব্যবহার করাই এখন বাংলাদেশের জন্য বড় কাজ।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও বিশ্লেষক

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
চীনে টেক্সটাইল কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৮
চীনে টেক্সটাইল কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৮
সচিবালয়ের সামনে ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মী ও পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া
সচিবালয়ের সামনে ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মী ও পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া
‘জেলার ২’-এ বিদ্যার দাপুটে আগমন, ‘কান্থা’ লুকে মুগ্ধ ভক্তরা
‘জেলার ২’-এ বিদ্যার দাপুটে আগমন, ‘কান্থা’ লুকে মুগ্ধ ভক্তরা
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শতাধিক শিক্ষকের বিষয়ে হাইকোর্টের রুল
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শতাধিক শিক্ষকের বিষয়ে হাইকোর্টের রুল
সর্বশেষসর্বাধিক