কোনও এক সকালে ঘুম থেকে উঠে একটি সমাজ আবিষ্কার করে না যে তার কিশোরেরা ‘কিশোর গ্যাং’-এর সদস্য হয়ে গেছে। এর পেছনে থাকে দীর্ঘ সময়ের অদৃশ্য জমাট বাঁধা অনেক গল্প; স্কুল থেকে হারিয়ে যাওয়া, মাঠ হারিয়ে যাওয়া, পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া, মাদক সহজলভ্য হয়ে ওঠা, সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হওয়া এবং সবচেয়ে বড় কথা, একজন কিশোরের বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ পৃথিবীটি ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসা।আমরা এখন সেই বাস্তবতার মুখোমুখি।
কুমিল্লায় সম্প্রতি কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে এক রাতে ১৮ থানার পুলিশ ৬২৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও তাদের মধ্যে ছিল। কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কিশোর গ্যাং নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কিন্তু এই উদ্বেগের সঙ্গে আমাদের আরেকটি প্রশ্নও করতে হবে-আমরা কিশোর গ্যাং শব্দটি আবিষ্কার করলাম কীভাবে, আর কীভাবে সেটিকে আমাদের সমাজের একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতায় পরিণত হতে দিলাম?
অপরাধে জড়িত কিশোরদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অপরাধের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এসব নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। কিন্তু কিশোর অপরাধের দৃশ্যমান অংশটুকু দেখেই যদি আমরা পুরো সমস্যার সমাধান খুঁজতে যাই, তাহলে হয়তো আমরা কেবল লক্ষণটির চিকিৎসা করবো, কারণটি নয়।
আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকানো দরকার। করোনার সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। একটি বিশাল প্রজন্ম হঠাৎ করেই স্কুলের শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক, সহপাঠী, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং নিয়মিত সামাজিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। ইউনিসেফের হিসাবে, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ শিশুর শিক্ষা কোভিড-১৯-এর কারণে ব্যাহত হয়েছিল। দূরশিক্ষার সুযোগও সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
কিন্তু স্কুল যখন খুললো, আমরা কি সবাইকে খুঁজে পেয়েছিলাম? যে শিশুটি আর স্কুলে ফিরলো না, যে কিশোরটি পড়াশোনায় কয়েক বছর পিছিয়ে গেল, যে পরিবার অর্থনৈতিক সংকটে সন্তানকে কাজে পাঠালো, যে কিশোর দীর্ঘ সময় ঘরে বসে বা রাস্তায় কাটাল-তাদের প্রত্যেককে কি আমরা শনাক্ত করেছিলাম? তাদের ফিরিয়ে আনতে কি স্থানীয় পর্যায়ে কোনও সমন্বিত কর্মসূচি ছিল? তাদের জন্য মানসিক সহায়তা, সামাজিক পুনঃএকীভূতকরণ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি কিংবা বিকল্প শিক্ষার কী ব্যবস্থা করা হয়েছিল?
স্কুল খুলে দেওয়া আর একটি হারিয়ে যাওয়া শিশুকে আবার শিক্ষার জগতে ফিরিয়ে আনা এক কথা নয়। সম্ভবত এখানেই আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারিয়েছি। মহামারির সময় যে কিশোরেরা শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশ থেকে ছিটকে পড়েছিল, তাদের একটি অংশ আজ আমাদের সামনে অন্য পরিচয়ে হাজির হয়েছে। তাদের সবাই অপরাধী নয়, তাদের সবাই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত নয়। কিন্তু তাদের একটি অংশের জন্য যদি আমরা নিরাপদ সামাজিক পরিসর তৈরি করতে না পারি, তাহলে অপরাধী চক্রের জন্য সেই শূন্যস্থান দখল করা সহজ হয়।
এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদকের ভয়াবহতা।বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে মাদক পাচারের আন্তঃসীমান্ত প্রবাহ ঠেকানো একটি কঠিন বাস্তবতা। সীমান্তে পাহারা বাড়ানো প্রয়োজন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান প্রয়োজন, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েও যদি মাদক প্রবেশ বন্ধ করা না যায়, তাহলে আমাদের পুরো মাদক সরবরাহব্যবস্থা, এর সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক ও অপরাধী নেটওয়ার্ক এবং মাদকের চাহিদা; এসবকে কি আমরা একই গুরুত্ব দিয়ে দেখছি? একজন কিশোর কেন মাদকের কাছে যাচ্ছে, সেটিও জানতে হবে। শুধু তাকে ধরে ফেললে মাদক ব্যবসা বন্ধ হয় না। একজন কিশোরকে শাস্তি দিলে মাদক কারবারির নেটওয়ার্কও ভেঙে পড়ে না।
আরেকটি বিষয় আমরা খুব সহজেই ভুলে যাই-একটি কিশোরের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগে তার সামনে কী ছিল? আমাদের শহরগুলো ক্রমশ বড় হচ্ছে। রাস্তা হচ্ছে, ভবন হচ্ছে, বিপণিবিতান হচ্ছে, আবাসিক এলাকা হচ্ছে। কিন্তু একটি শিশুর জন্য খেলার মাঠ কোথায়? একটি কিশোরের জন্য পাঠাগার, কমিউনিটি সেন্টার, খেলাধুলার জায়গা কিংবা সাংস্কৃতিক চর্চার স্থান কোথায়?
আমরা কি আমাদের নগর পরিকল্পনায় শিশু-কিশোরদের জায়গা রাখি? যে বয়সে একটি ছেলে বা মেয়ে ফুটবল খেলবে, ক্রিকেট খেলবে, বিতর্ক করবে, গান শিখবে, নাটক করবে, বই পড়বে, ছবি আঁকবে কিংবা কোনও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অন্য মানুষের জন্য কাজ করবে-সেই বয়সে তার সামনে আমরা কতগুলো সুস্থ বিকল্প তৈরি করেছি?
কিছু পুরোনো সাংস্কৃতিক সংগঠন এখনও টিকে আছে, কিছু মাঠ এখনও আছে, কিছু মানুষ এখনও শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু এগুলো কি যথেষ্ট? নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন করে কতগুলো সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও সামাজিক পরিসর আমরা তৈরি করেছি?
মনে হয়, উন্নয়ন বলতে আমরা অনেক সময় শুধু ইট-পাথরের দৃশ্যমান কাঠামো বুঝি। অথচ একটি শিশুর জন্য মাঠ, একটি কিশোরের জন্য পাঠাগার, একটি গ্রাম বা মহল্লার জন্য সাংস্কৃতিক কেন্দ্র-এসবও উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রাষ্ট্রের নীতিতেও তরুণদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিনোদন ও সামাজিক অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নীতি কাগজে থাকলেই তো একটি কিশোরের জীবন বদলায় না। প্রয়োজন বাস্তবায়ন, স্থানীয় পর্যায়ের বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা।
তাই কিশোর অপরাধ মোকাবিলায় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। পুলিশি অভিযান থাকবে, অপরাধের তদন্ত হবে, আইনের প্রয়োগ হবে। কিন্তু তার পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশু শনাক্ত করা, তাদের পুনরায় শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা, কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা, খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, মাদক প্রতিরোধ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিবারকে সহায়তা করার সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এখানে পরিবারও গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান কার সঙ্গে মেশে, কোথায় যায়, কী নিয়ে ভাবছে-এসব জানার জন্য শুধু শাসন নয়, সম্পর্ক প্রয়োজন। একজন কিশোরকে শুনতে হবে। তার সঙ্গে কথা বলতে হবে। তার একাকিত্ব, হতাশা, আকাঙ্ক্ষা ও বন্ধুত্বের জগতটিকে বুঝতে হবে। তবে পরিবারকে একা দায়ী করেও আমরা দায়িত্ব শেষ করতে পারি না। রাষ্ট্র যদি মাঠ না রাখে, বিদ্যালয়ে কাউন্সেলিং না থাকে, পাড়া মহল্লায় সাংস্কৃতিক পরিসর না থাকে এবং মাদক সহজে পৌঁছে যায়, তাহলে শুধু অভিভাবককে দায়ী করা সমস্যার সমাধান নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা যেন সব কিশোরকে ‘কিশোর গ্যাং’ হিসেবে দেখতে শুরু না করি। একটি কিশোর অপরাধ করতে পারে, কিন্তু সে নিজে অপরাধের সমার্থক নয়। ভুল করলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে; একই সঙ্গে তাকে ফিরে আসার পথও দেখাতে হবে। শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে শাস্তির পাশাপাশি সংশোধন, পুনর্বাসন ও পুনঃএকীভূতকরণের সুযোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের আইনেও তার স্বীকৃতি রয়েছে। কারণ কারাগার দিয়ে আমরা একটি কিশোরকে সাময়িকভাবে সমাজ থেকে সরিয়ে রাখতে পারি; কিন্তু তার ভেতরের শূন্যতা, ক্ষোভ, বিচ্ছিন্নতা বা অপরাধে টেনে নেওয়া সামাজিক পরিবেশকে সরাতে পারি না।
আমাদের সন্তানসম এই কিশোরদের সব দোষ দিয়ে আমরা নিজেদের দায় এড়াতে পারি না।একজন কিশোর যখন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, কোথাও না কোথাও পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ, রাষ্ট্র ও আমাদের নগরব্যবস্থারও একটি ব্যর্থতার গল্প সেখানে থাকে। সেই দায় কার কতটুকু-তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু দায় যে শুধু কিশোরের নয়, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তাই এখন শুধু প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়-কিশোর গ্যাংকে কীভাবে দমন করবো? প্রশ্নটি আরও বড় হওয়া দরকার, আমরা কেমন সমাজ তৈরি করছি, যেখানে একজন কিশোর অপরাধের অন্ধকারের বদলে নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে? আমরা যদি চাই কিশোরেরা অপরাধীদের অনুসরণ না করুক, তাহলে তাদের অনুসরণ করার মতো অন্য মানুষ, অন্য স্বপ্ন এবং অন্য পৃথিবীও আমাদের তৈরি করতে হবে।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।