জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক শেষে গত ২০ সেপ্টেম্বর বিকালে কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সংবিধান সংশোধন নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শেষ করা সম্ভব হবে বলে তারা মনে করেন। তিনি জানান, এরইমধ্যে কমিটি প্রতিবেদন তৈরির কাজ শুরু করেছে। কমিটি পর্যায়ক্রমে জুলাই সনদ প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, সাবেক বিচারক, আইনজীবী, সংবিধানবিশেষজ্ঞ, জুলাই যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলবে বলেও জানান কমিটির প্রধান।
প্রশ্ন উঠতে পারে, মাত্র দুটি বৈঠক করেই কমিটি কী করে প্রতিবেদন তৈরির কাজ শুরু করলো এবং কীভাবে তারা ডিসেম্বরের মধ্যে কাজটি শেষ করতে চায়? উত্তর সম্ভবত এই যে, বিএনপি সংবিধানের কোথায় কী পরিবর্তন করতে চায়, সেই সিদ্ধান্ত তারা আরও আগেই নিয়েছে। তাদের ৩১ দফা এবং নির্বাচনি ইশতেহারে তার সুনির্দিষ্ট কিছু ঘোষণা যেমন আছে, তেমনি জুলাই সনদে উল্লিখিত সংবিধান সংশোধনসম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে কোনগুলোর ব্যাপারে বিএনপি একমত এবং কোনগুলোর ব্যাপারে তাদের দ্বিমত বা নোট অব ডিসেন্ট আছে; সেটিও তারা জানিয়েছে।
সুতরাং ৩১ দফা, নির্বাচনি ইশতেহার এবং জুলাই সনদে তাদের অবস্থানের আলোকে খুব সহজেই সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত প্রস্তাব তথা বিল প্রস্তুত করা সম্ভব। যদিও এই ইস্যুতে তাদের সঙ্গে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, সেটি সম্ভবত ঘুচবে না। বরং সংবিধান সংশোধন ইস্যুতে সরকারি দলের সঙ্গে বিরোধী দলের দূরত্ব যে বাড়বে, তার ইঙ্গিত এরইমধ্যে পাওয়া গেছে। ৮ দফা দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য যে লংমার্চ কর্মসূচি পালন করছে, সেই ৮ দফা এক দফা তথা সরকার পতনের দফায় পরিণত হতে পারে; এমন হুঁশিয়ারিও এসেছে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের তরফে। আর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হেলিকপ্টারে পালাবেন নাকি ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন; সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সেইসঙ্গে এনসিপির আরেক প্রভাবশালী নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ স্লোগান দিয়েছেন, ‘তারেক রহমান কবে যাবে’।
সরকার গঠনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় এসে বিরোধী দল যে সরকার পতনের ডাক দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, সেই বিরোধের সূত্রপাত মূলত সংবিধান ইস্যুতেই। বিরোধী দলের দাবি ছিল, গণভোটের রায়ের আলোকে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের দিনেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ। কিন্তু বিদ্যমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো বিধান না থাকায় শুধু গণভোটের রায়ের আলোকে এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দিয়েছে সরকারি দল। বিরোধের সূচনা সেখানেই। এরপর মানবাধিকার ও গুম কমিশন আইনও বিরোধী দলের প্রস্তাব অনুযায়ী পাস করা হয়নি বলেও উভয়ের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে।
এর বাইরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট, প্রশাসনে দলীয়করণ, মাঠ পর্যায়ে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে সরকারি দলের সঙ্গে বিরোধীদের দূরত্ব বেড়েছে; যেটি সংবিধান সংশোধন ইস্যুতে আরও প্রকট হবে বলেই মনে হয়। কেননা, যখনই সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিল সংসদে উত্থাপন করা হবে, সেখানে অনেক কিছুই বিরোধী দলের পছন্দে হবে না। আবার বিরোধী দল জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কারের দাবিতে অনড় থাকলেও যেহেতু সংসদে বিএনপির দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, ফলে বিরোধীদের প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যাবে। সেই বাস্তবতায় হয়তো দেখা যাবে যে, সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন থেকে পাস হয়ে যাওয়ার পরে বিরোধী দল আরও কঠোর কর্মসূচির দিকে যেতে পারে। যদিও সেই আন্দোলন সরকার কীভাবে মোকাবিলা করবে, সেটি এখনই বলা কঠিন। কেননা কিছু মৌলিক বিষয়ে সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের যে সমঝোতা বা ঐকমত্য আছে; সেটি ওপেন সিক্রেট।
প্রসঙ্গত, সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত এই কমিটিতে বিরোধী দলের কাছে নাম চেয়েছিল সংসদ। কিন্তু তারা কারো নাম দেয়নি। একই ঘটনা ঘটেছিল ২০১০ সালে যখন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং তখন তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপির কাছে নাম চাইলেও তারা কারো নাম দেয়নি। বরং সংবিধান সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছে। ২০২৬ সালে এসেও সেই একই ঘটনা ঘটছে। পার্থক্য শুধু এই যে, তখন বিএনপি ছিল বিরোধী দলে। এখন সরকারি দলে। আর তখন সরকারি দলে ছিল আওয়ামী লীগ। এখন বিরোধী দলে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট।
বাস্তবতা হলো, সংবিধানের মৌলিক অনেক জায়গায় পরিবর্তনের যে দাবি বছরের পর বছর ধরে জনপরিসরে, বিশেষ করে একাডেমিক দুনিয়ায় ছিল, সেই আলোকে বিএনপি তথা সরকারি দলকে এমন একটি বিল আনতে হবে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অনুভূতির প্রতিফলন থাকবে। সেইসাথে সংশোধনীগুলো সময়যোপযোগী এবং যৌক্তিকও হতে হবে। অতীতে যতবার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে, সেখানে দেশ ও মানুষের চেয়ে দলীয় স্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে। এবারের সংসদও সেই একই পথে হাঁটবে না; এই প্রত্যাশা জনমনে রয়েছে।
গত ৪ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকের দিন কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ এবং আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, জনপ্রত্যাশা, জুলাই সনদ এবং বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে সংবিধান সংশোধন করা হবে।
জুলাই সনদ ও নির্বাচনি ইশতেহার লিখিত ডকুমেন্ট এবং এগুলো জনগণের জন্য উন্মুক্ত হলেও জনপ্রত্যাশার বিষয়টি বিতর্কিত। কেননা এ পর্যন্ত যে ১৭ বার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে, তার প্রতিবারই এই ‘জনপ্রত্যাশা’র দোহাই দেয়া হলেও অধিকাংশ সংশোধনীর ক্ষেত্রে ব্যক্তি এবং ক্ষমতাসীন দলের অভিপ্রায়ই প্রাধান্য পেয়েছে। সুতরাং এবারও সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি তথা সরকারি দল যে জনপ্রত্যাশার কথা বলছে, সেখানে শেষ পর্যন্ত জনপ্রত্যাশার নামে তারা ব্যক্তি ও দলের সুবিধাকে প্রাধান্য দেবে কি না; সেই প্রশ্নটি জনমনে আছে।
বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকের পরে একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে বলা হয়, সংবিধানে প্রথমবারের মতো সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের বিষয়টি যুক্ত হতে যাচ্ছে। বিপরীতে বাদ যাবে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হওয়া শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি, তার ৭ মার্চের ভাষণ ও ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা। সরকারি আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে তার প্রতিকৃতি টানানোর বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়া হচ্ছে। সেইসঙ্গে সংবিধানে ফিরবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও জুলাই যোদ্ধাদের অবদানের সাংবিধানিক স্বীকৃতিও দেওয়া হবে। যদিও বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
স্মরণ করা যেতে পারে, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর প্রক্রিয়া চলাকালীন ২০১১ সালের ২৭ মার্চ বিএনপির স্থায়ী কমিটির তৎকালীন সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ যদি সংবিধানে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে তারা ক্ষমতায় এসে এটি বাতিল করে দেবেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি যে ইশতেহার ঘোষণা করেছে, সেখানে সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য ৩৫টি প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। সেখানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন; তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল; উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি; প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছর করা; সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন; বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ; ন্যায়পাল নিয়োগ; ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন; আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বচ্ছতা আনার মতো বিষয় রয়েছে।
পরিশেষে, সংবিধান সংশোধন নাকি সংস্কার; এই তর্ক নিয়ে সংসদে হট্টগোল হলেও এবং বিএনপি সংবিধান সংস্কার শব্দটি বলতে না চাইলেও তাদের নির্বাচিন ইশতেহারে সংবিধান প্রসঙ্গে যে ৩৫টি প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার করা হয়েছে, সেটির শিরোনামই হচ্ছে ‘সাংবিধানিক সংস্কার’। সুতরাং সংস্কার নাকি সংশোধন এবং শব্দের মারপ্যাঁচে সরকারি ও বিরোধী দলের দূরত্ব কতখানি বাড়বে, তার চেয়ে বরং সংবিধানে কোথায় কী পরিবর্তন প্রয়োজন এবং বিএনপি আসলে কোথায় কী পরিবর্তন করতে চায় এবং তাতে দেশের কী লাভ হবে; সেটিই আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।