রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: বাংলাদেশ অনন্তকাল এই দায়িত্ব বহন করতে পারে না

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০

প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে হত্যা, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া এবং ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের মুখে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে বিভিন্ন সময়েও আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।

মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু এই সংকটের মূল কারণ বাংলাদেশে নয়; এর উৎপত্তি মিয়ানমারে। ফলে এর স্থায়ী ও টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই হতে হবে। সদ্য সমাপ্ত জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই। তিনি রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছেন। একইসঙ্গে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন এখন শুধু একটি মানবিক প্রত্যাশা নয়; এটি দেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাগত চাপ ক্রমেই বাড়ছে। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের নানা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে।

তবে প্রত্যাবাসন নিয়ে একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট থাকা জরুরি—প্রত্যাবাসন আর ঘরে ফেরা এক বিষয় নয়। কাউকে সীমান্ত পার করে মিয়ানমারে পাঠিয়ে দিলেই তাকে নিরাপদে ঘরে ফেরানো হয়েছে বলা যায় না। প্রকৃত প্রত্যাবাসনের অর্থ হলো— এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে একজন রোহিঙ্গা নিজের ইচ্ছায়, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে এবং মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে নিজের দেশে ফিরে যেতে পারেন, সেখানে বসবাস করতে পারেন— শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার সুযোগ পান এবং নিজের বাড়িঘর ও জমিজমার অধিকার ফিরে পাওয়ার বাস্তব সুযোগ থাকে।

এখানেই মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। শুধু প্রত্যাবাসনের জন্য তালিকা তৈরি, পরিচয় যাচাই কিংবা সীমান্ত পারাপারের প্রশাসনিক ব্যবস্থা করলেই সংকটের সমাধান হবে না। রোহিঙ্গারা ফিরে যাওয়ার পর তাদের আইনগত ও নাগরিক মর্যাদা কী হবে, তারা অবাধে চলাচল করতে পারবেন কি না, তাদের সন্তানদের শিক্ষা ও পরিবারের স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থাকবে কিনা, জীবিকা কীভাবে পুনর্গঠিত হবে এবং তাদের দখলে থাকা জমি ও সম্পত্তি কীভাবে ফিরিয়ে দেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্য উত্তর প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল, সেই পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন নিশ্চিত করা। কয়েক বছর পর যদি তারা আবারও নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন, তাহলে সেটি কোনও টেকসই প্রত্যাবাসন হবে না; বরং সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের প্রাক্কালে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনাতেও নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সেখানে নিরাপত্তা, বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, চলাচলের স্বাধীনতা, আইনগত মর্যাদা, জীবিকা এবং বাড়ি, জমি ও সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজেদের মতামতকে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অর্থবহভাবে বিবেচনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকাল ধরে রাখতে চায় না। একই সঙ্গে তাদের অনিরাপদ অবস্থায় মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতেও চায় না। বাংলাদেশ চায়-রোহিঙ্গারা তাদের নিজ দেশে ফিরে যাক, তবে এমন পরিবেশে যেখানে তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা, অধিকার ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা থাকবে।

বর্তমান বাস্তবতা ক্রমেই জটিল হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থীজীবন তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে। শিবিরগুলোতে মাদক, মানবপাচার, অপরাধী চক্র এবং বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ঝুঁকি রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থায়নের ঘাটতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও রাখাইন রাজ্যের অস্থিতিশীলতা প্রত্যাবাসনের পরিবেশকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

এই পরিস্থিতি শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, বাংলাদেশের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ। দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকট স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ, জননিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় মানবপাচার, মাদক ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

তাই রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু বাংলাদেশের একটি শরণার্থী সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি মিয়ানমারে সৃষ্ট একটি সংকট, যার প্রভাব এখন বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপরও পড়ছে।বাংলাদেশ যে দীর্ঘদিন ধরে এই সংকটের ভার বহন করছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ওপর নির্ভর করে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। জাতিসংঘ,আসিয়ান এবং প্রভাবশালী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোকে আরও সক্রিয় ও সমন্বিত ভূমিকা নিতে হবে। মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন, কিন্তু সেই সম্পৃক্ততার লক্ষ্য হতে হবে রাখাইন রাজ্যে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যেতে পারেন।

আসিয়ান-এর ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আঞ্চলিক কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি এবং রাখাইন রাজ্যে একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরিতে আসিয়ান আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোনো উদ্যোগের সাফল্য কেবল কতজন রোহিঙ্গাকে ফেরানো গেল, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়— বরং তারা ফিরে যাওয়ার পর কতটা নিরাপদ, স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারছেন, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড।

একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের ওপর থেকে দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমানোর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি। কিন্তু মানবিক সহায়তা যেন দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা হয়ে না দাঁড়ায়। বরং এই সহায়তার পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের অনুকূল রাজনৈতিক, নিরাপত্তাগত ও মানবিক পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।

বাংলাদেশেরও এখন তার কূটনৈতিক অবস্থান আরও সুসংহতভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সহায়তার প্রশ্ন হিসেবে নয়, একইসঙ্গে মিয়ানমারের জবাবদিহি, রোহিঙ্গাদের অধিকার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্বের প্রশ্ন হিসেবে সামনে আনতে হবে। বাংলাদেশ প্রায় এক দশক ধরে একটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ দায়িত্ব বহন করছে। এই দায়িত্ব অনির্দিষ্টকাল অব্যাহত রাখা কোনও বাস্তবসম্মত বা টেকসই সমাধান হতে পারে না।

তবে প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় থাকা রোহিঙ্গাদের বর্তমান মানবিক ও নিরাপত্তাগত প্রয়োজনও উপেক্ষা করা যাবে না। শিবিরে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নারী ও শিশুর সুরক্ষা, মানবপাচার প্রতিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও পর্যাপ্ত সহায়তা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে গেলে এর মূল্য দিতে হবে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী,উভয়কেই।

শেষ পর্যন্ত একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার-রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনির্দিষ্টকাল রেখে দেওয়া কোনও সমাধান নয়, আবার তাদের অনিরাপদভাবে মিয়ানমারে পাঠিয়ে দেওয়াও সমাধান নয়। সমাধান হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে রোহিঙ্গারা নিজেদের দেশ মিয়ানমারে নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং অধিকার নিশ্চিত করে ফিরে যেতে পারেন। তাদের শুধু সীমান্তের ওপারে পাঠানো নয়, তাদের নিজের ঘরে ফিরিয়ে দিতে হবে।

বাংলাদেশ প্রায় এক দশক ধরে মানবিকতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তার স্বীকৃতি হিসেবে এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব আরও দৃঢ়ভাবে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।

মিয়ানমারকে তার জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে হবে। আর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিশ্চিত করতে হবে-রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন যেন কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া না হয়ে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই ঘরে ফেরার বাস্তব সুযোগ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের অনন্তকাল আশ্রয় দিতে চায় না। বাংলাদেশ চায় তারা নিরাপদে নিজেদের দেশে ফিরে যাক। আর সেই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের নয়-প্রথমত মিয়ানমারের এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী

[email protected]

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পরিবার, সমাজ ও অনলাইনে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে: রাষ্ট্রপতি 
পরিবার, সমাজ ও অনলাইনে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে: রাষ্ট্রপতি 
২১ বছরেই প্রযোজনায়,  ‘হনুমান আংশ’র অনুপ্রিয়ার প্রশংসায় সঞ্জয় দত্ত
২১ বছরেই প্রযোজনায়,  ‘হনুমান আংশ’র অনুপ্রিয়ার প্রশংসায় সঞ্জয় দত্ত
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ-রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রা
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ-রুপা ও বৈদেশিক মুদ্রা
বিশ্ববাজারে কমলো জ্বালানি তেলের দাম
বিশ্ববাজারে কমলো জ্বালানি তেলের দাম
সর্বশেষ সর্বাধিক