ছেলেটির করুণ আর্তি ‘আমি শুধু বাড়ি ফিরতে চাই’, কথাটা শুনে মনে হলো—ওর জায়গায় আমি, আপনি বা যে কেউ থাকতে পারতাম। কারণ আজ যে কারণে এই তরুণের স্থান হয়েছে মানসিক হাসপাতালে, কাল সেই মানসিক অসুস্থতা নিয়ে এখানে যে কেউ ভর্তি হতে পারেন।
মাদারীপুরের নির্মাণশ্রমিক সাব্বির পাবনা মানসিক হাসপাতালে তিন মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবস্থার উন্নতি হওয়ায় চিকিৎসকেরা তাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরদিনই তাকে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং আগের সেই ওয়ার্ডে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। সাব্বির জানান, তিনি বাড়ি ফিরতে চান, কিন্তু পরিবার তাকে ফিরিয়ে নিতে রাজি নয়। (ডেইলি স্টার০। কী কঠিন বাস্তবতা। মানসিক সমস্যার কারণে তাকে এই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। চিকিৎসা করার পরে তিনি সুস্থ হয়ে গেলেও পরিবার তাকে আর ফিরিয়ে নিতে চাইছে না। অথচ একদিন এই পরিবারের আয়-উপার্জনের দায়িত্ব ছিল তার হাতেই।
চিকিৎসকরা বলেন, ঠিকমতো ওষুধ, থেরাপি, যত্ন ও ভালোবাসা দিলে মানসিক রোগীকে সুস্থ করে আবার মূলধারায় ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে—রোগীর পরিবার, স্বজন এটা বিশ্বাস করেন না। তাই হাসপাতাল ছেড়ে দিলেও তারা আবার রোগীকে এখানে রেখে চলে যান। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে রেখে পালিয়েও যেতে দেখা যায়।
কেন কিছু রোগী বারবার মানসিক হাসপাতালে ফিরে আসেন? কারণ একজন মানসিক রোগীকে পরিবার মনে করে সামাজিক কলঙ্ক ও বোঝা। তাছাড়া আছে আর্থিক সংকট এবং রোগীর পরিচর্যার সমস্যা ও ভয়।
একদিন যে মানুষটি তাদের কাছে প্রিয় ছিল, এই অসুস্থতার পর সে হয়ে যায় পরিবারের ওপর চাপ। বেশির পরিবার ‘পাগল’ মানুষের দায়িত্ব এড়াতে চায়। এ জন্য সুস্থ হয়ে যাওয়া রোগীদেরও বারবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের স্টাফরা বলেছেন, ‘‘অনেক পরিবারই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে অনিচ্ছুক। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার পর কিছু পরিবার রোগীদের সরাসরি বহির্বিভাগে নিয়ে আসে। আগের চিকিৎসার নথি গোপন করে নতুন রোগী হিসেবে আবার নিবন্ধন করায়।’’
এখানে যারা ভর্তি আছেন, তারা অনেকেই সুস্থ হওয়ার পরও পরিবারে ফিরে যেতে পারেননি বা পরিবার তাদের ফিরিয়ে নেয়নি। অনেকের ভর্তির সময় দেওয়া ঠিকানাও ভুয়া। অবশ্য অনেক রোগী সুস্থ হয়ে পরিবারে ফিরেও গেছেন।
পাবনাসহ অন্যান্য মানসিক হাসপাতালে থাকা এই মানুষগুলো প্রায় সবাই বাড়ি ফিরে যেতে চান। অনেকেই বুঝতে পারেন, পরিবার তাদের ভুলে গেছে বা ইচ্ছে করে এড়িয়ে যাচ্ছে। তবে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি যাবেন, সে আশায় এখনও অনেকেই দিন গুনছেন।
যেকোনও বয়সে, যেকোনও মানুষের, মানসিক সমস্যার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকরা বলেন, সমস্যা দেখা দেওয়া মাত্রই চিকিৎসা শুরু করা দরকার। দেশে সামাজিক কুসংস্কার ও ‘পাগল’ ট্যাগ হওয়ার ভয় খুব বেশি। মানসিক রোগ নিয়ে আছে লজ্জা, ভয় ও ভুল ধারণা। অনেকেই মানসিক সমস্যাকে দুর্বলতা, আলস্য, জিনের আছড় ও জাদুটোনা হিসেবে দেখে।
ফলে কেউ যদি বুঝতেও পারেন যে তার মানসিক সমস্যা হচ্ছে, অথবা পরিবারও যদি ধারণা করতে পারে, তাও তারা মানসিক চিকিৎসার জন্য সাহায্য চাইতে ভয় পান। গ্রামের মানুষ বা নিম্ন-মধ্যবিত্তদের কাছে মানসিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়টি একেবারে অপরিচিত।
অর্থ খরচ করে তাদের পক্ষে নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়াও কঠিন। সরকারি হাসপাতালগুলোতেও মানসিক রোগের জন্য পর্যাপ্ত সেবা নেই। বাংলাদেশে মানসিক সমস্যা ও চিকিৎসা ব্যবধান প্রায় ৯২ শতাংশ, অর্থাৎ যাদের চিকিৎসা দরকার, তাদের বিরাট অংশ চিকিৎসা পান না।
আমাদের দেশে বহু মানুষ আছেন, যারা নিজেরাই নিজেদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে বুঝতে পারেন না। পরিবার, সমাজও তাদের ভুল বুঝে এবং একঘরে করে ফেলে। পরিবার ও সমাজ থেকে দূরত্ব তৈরি হওয়ার ফলে এই মানুষগুলো একসময় পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
শুধু বোঝা নয়, এই দেশে মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে চিড়িয়া বলেও মনে করে অনেকে। অথচ একবারও ভাবে না, এই চিড়িয়া বলে যাদের ভাবছি, সেই অসহায় মানুষগুলো আমাদেরই কারও সন্তান, মা-বাবা, ভাইবোন বা বন্ধু। কেন লেখায় বারবার ‘চিড়িয়া’ শব্দটি ব্যবহার করছি, কারণ পাবনা মানসিক হাসপাতালকে ‘চিড়িয়াখানা’ বা কোনও ‘বিনোদন’-এর জায়গা হিসেবে মনে করার সংবাদ অনেক আগেই মিডিয়ায় এসেছে।
‘সাধারণের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত হাসপাতালটিতে বিনোদনকেন্দ্রের মতো অবাধে ঢুকছেন দর্শনার্থীরা, স্পর্শকাতর রোগীদের উত্ত্যক্ত করে অপমানজনক ভিডিও ছাড়ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে, রোগীদের সঙ্গে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি, সিগারেট আদান-প্রদান আর রোগীদের উত্ত্যক্ত করার দৃশ্য (ঢাকা স্ট্রিম)।
রিপোর্টটিতে বলা হয়েছিল, চিড়িয়াখানার বন্দি প্রাণী দেখার মতো রোগীদের কক্ষের সামনের বারান্দাজুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন বয়সের দর্শনার্থী। কেউ রোগীদের উচ্চস্বরে ডাকছেন, টিটকারি করছেন, কেউবা ঘরে বন্দি রোগীদের সঙ্গে গল্প-আড্ডায় মেতেছেন।
উৎসুক দর্শনার্থীদের হাঁকডাকে বিভ্রান্ত হচ্ছেন কিছু রোগী। দর্শনার্থীদের পাশাপাশি এসেছেন ইউটিউবার, টিকটকার, কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও। রোগীদের গায়ে হাত দিয়ে, আপত্তিকর প্রশ্ন করে তৈরি করছেন ভিডিও। রোগীর সঙ্গে এই আচরণ করা বড় ধরনের অপরাধ বটে।
বাংলাদেশে তিন কোটিরও বেশি মানুষ কোনও না কোনও মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৮.৪ ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক ও ১৩ ভাগ শিশু-কিশোর মানসিক রোগে আক্রান্ত, যা মোট সংখ্যার হিসেবে প্রায় ৩ কোটি। (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) অথচ বাংলাদেশে বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করেন ‘মানসিক রোগ’ বলে কিছু নেই—যাদের মানসিক সমস্যার চিকিৎসা দরকার, এদের বাহ্যিকভাবে দেখে স্বাভাবিক মনে হলেও তারা কোনও না কোনও মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। এই ব্যাপক সংখ্যক মানুষের জন্য দরকার উন্নত ও সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা।
কিন্তু এই সেক্টরে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা খুবই অপ্রতুল। এর পাশাপাশি মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবার ও স্বজনের অজ্ঞতা, অর্থ সংকট, ভীতি, লোক লজ্জা ও বিভিন্ন কুসংস্কারের কারণে মানসিক রোগের বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা নিতে চান না বেশিরভাগ মানুষ। এর বদলে তাবিজ-কবজ, ও হাতুড়ে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। ফলে মানসিক রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে আরও জটিল আকার ধারণ করে।
আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে কোনও কোনও মানসিক রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ মানসিক রোগী সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে যান বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। দরকার যথাযথ ওষুধ, থেরাপি, হাসপাতালের চিকিৎসা।
এই দেশে শুধু নিরক্ষর বা পড়াশোনা কম জানা মানুষই নন, পড়াশোনা জানা মানুষও মানসিক সমস্যাকে রোগ মনে করেন না, বিশেষ গুরুত্বও দেন না এবং সঠিক চিকিৎসা করাতেও উদ্যোগী হন না। ফলে মানসিক সমস্যা ভেতরে ভেতরে আরও বাড়তে থাকে।
খুব বেশি মানসিক চাপ, ভয়, শোক-দুঃখ ও প্রতারিত হলে মানুষ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। অপরাধের বিস্তৃতি, অর্থনৈতিক টানাপড়েন, মাদক, সামাজিক অবস্থার চাপ, মানসিক কষ্ট, বংশগতি, অন্যান্য শরীরবৃত্তীয় ও মনোসামাজিক কারণে দিন দিন মানসিক রোগের প্রকোপ বাড়ছে।
এমনও হতে পারে, আমরা যারা এখন সুস্থ আছি, তাদেরও যেকোনও পরিস্থিতিতে মানসিক ভারসাম্য হারানোর আশঙ্কা আছে। দীর্ঘসময় ধরে সামাজিক অস্থিরতা থাকলে সমাজে যে কালেকটিভ ট্রমা তৈরি হয়, তাতে পুরো সমাজের মানসিক পরিবেশ বদলে যেতে বাধ্য। এই সমষ্টিগত মানসিক আঘাত হলো—এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে বড় ধরনের বিপর্যয়, বা অন্যায়-অবিচারের ফলে একটি জাতি বা সমাজ আঘাত পায়, ভয় পায় এবং দুর্বল হয়ে পড়ে। এটি কোনও ব্যক্তির একার সমস্যা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সব মানুষ একইসঙ্গে আতঙ্ক, ভয়, দুঃখ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। যেমনটা ঘটছে আমাদের ক্ষেত্রে।
আমরা যারা এখন সুস্থ আছি বলে ভাবছি, তারাই পরিবার ও সমাজের মানসিক রোগীটিকে এড়িয়ে চলি। পারলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার পর আর খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করি না।
অনেক মানুষ এইভাবেই ‘পাগল’ হিসেবেই বিবেচিত হয়ে এক কোনায় পড়ে থাকেন। জীবনের যেকোনও সময় মানুষ মানসিকভাবে অসুস্থ হতে পারেন। কাজেই একে এড়িয়ে না গিয়ে, গোপন না করে, চিকিৎসা করানো দরকার। তবে মানসিক ভারসাম্যহীনদের পাগল হিসেবে চিহ্নিত করে সহজে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যায়। তাই অনেক ক্ষেত্রে ভাইবোনেরা চিকিৎসার ক্ষেত্রে তেমন গা করেন না। একবার মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে রেখে আসতে পারলে, আর খোঁজ-খবর রাখেন না, ফিরিয়েও আনেন না।
মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ যে ভালোবাসাহীন, অভিভাবকহীন—এটা জানে বলেই চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো ও অন্যান্য মানুষ তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করার সাহস পায়। সবার উচিত এই মানুষগুলোর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া, মানসিক রোগ সম্পর্কে আমাদের স্টিগমা ও কুসংস্কার দূর করা, চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়ন করা ও বাজেট বরাদ্দ ও জনবল বাড়ানো। সময় মতো ভালো চিকিৎসা পেলে মানসিক হাসপাতালে থাকা মানুষটিও গৃহে ফিরে যেতে পারেন।
শাহানা হুদা রঞ্জনা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক