ট্রেনের টিকিট নিয়ে হাহাকারের সমাধান কী

আমীন আল রশীদ
১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:০০ আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:০০

সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচিত সাবেক আমলা মাহবুব কবির মিলন সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি আবেদন জানিয়ে নিজের ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, তিনি মাত্র একমাসের দায়িত্ব পেলে ঢাকা-কক্সবাজার ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে রেলের টিকিট কালোবাজারি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেখাবেন। পদ, পদবি, আলাদা চেয়ার টেবিল কিছুই লাগবে না। বিনা পয়সায় সার্ভিস দেবেন। শুধু যাতায়াতের জন্য একটা গাড়ি দিতে হবে। আর লাগবে ক্ষমতা—যাতে ডিপার্টমেন্টের সবাই এই একমাসে তার আদেশ শুনতে বাধ্য থাকেন।

কীভাবে তিনি কাজটি করবেন? লিখেছেন, চুক্তিভিত্তিক কিছু অবসরপ্রাপ্ত টিকিট এক্সামিনার নেবেন। তাদের বাজেট লাগবে। তারা সফল হলে এক/দুই বছরের জন্য থেকে যাবে। সাথে এই একমাসের জন্য চাকরিরত এবং অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তা নেবেন। অবসরপ্রাপ্তরা কোনও বেতন ভাতা নেবেন না। কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট লাগবে। সাথে স্পেশাল পুলিশ প্রটেকশন। সফল হলে ম্যাজিস্ট্রেট ফিরে যাবে। শুধু পুলিশ নিয়ে টিকিট এক্সামিনার কাজ করবেন। এভাবে তিনি আরও কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন।

রেলের টিকিট নিয়ে হয়রানি ও ভোগান্তির অভিজ্ঞতা কমবেশি সকলেরই আছে, অর্থাৎ যারা ট্রেনে ভ্রমণ করেন। এই ভোগান্তি যে শুধু দুই ঈদ বা অন্য কোনো উৎসবের সময় তা নয়, বরং ঢাকা-কক্সবাজারসহ কয়েকটি রুটে এই ভোগান্তি সারা বছরের।

অনলাইনে শতভাগ টিকিট বিক্রি হবে এবং সাধারণ মানুষ সহজে টিকিট কাটতে পারবে—এই লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনলাইনে ট্রেনের টিকিট বিক্রি ও ব্যবস্থাপনার জন্য চুক্তি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহজ ডটকমের সঙ্গে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সহজ ডটকমের এই ব্যবস্থাপনায় ট্রেনের টিকিট পাওয়া মোটেও সহজ নয়। ট্রেনের টিকিট ছাড়া হয় যাত্রার ১০ দিন আগে। অথচ যেদিন টিকিট ছাড়া হয়, সেদিন টিকিট অনলাইনে টিকিট ছাড়ার ১০ মিনিটের মধ্যেই বিভিন্ন রুটের টিকিট শেষ হয়ে যায়। এই অভিযোগ বেশ পুরোনো যে, সহজের একটি বিরাট সিন্ডিকেট পুরো প্রক্রিয়াটিতে কারসাজি করে এবং কালোবাজারে বেশি দামে টিকিট বিক্রি করে। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অনেকে ধরাও পড়েছেন। কিন্তু ট্রেনের টিকিট পেতে ভোগান্তির অবসান হয়নি।

পরিবহন অডিট অধিদফতরের আইটি অডিটের বরাত দিয়ে সম্প্রতি একটি টেলিভিশনের খবরে বলা হয়, রেলের অনলাইন টিকিট সাধারণ যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার এক থেকে ৫ দিন আগেই তা ব্লক করার সুযোগ রয়েছে। আর সেই ই-টিকিটিং সিস্টেমের ড্যাশবোর্ডের নিয়ন্ত্রণ থাকে ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান সহজ ডটকমের কর্মীদের হাতে। চুক্তির শর্ত ভেঙে টিকিট অপারেশনে ভেন্ডর কর্মীদের সরাসরি যুক্ত রাখায় তৈরি হয়েছে কালোবাজারির সুযোগ। অর্থাৎ ই-টিকিটিং সিস্টেম চালু হলেও অতীতের কালোবাজারি বন্ধ হয়নি। বরং কালোবাজারির ধরন পাল্টে গেছে। বরং অনলাইনে টিকিট  কাটতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইনে সময় ব্যয় করেও ব্যর্থ হতে হচ্ছে।

 

এরকম বাস্তবতায় রেলওয়ের সঙ্গে সহজ ডটকমের টিকেট বিক্রির চুক্তি বাতিলের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেছিলেন একজন আইনজীবী। তার যুক্তি, রেলওয়ের টিকিট বিক্রির ওয়েবসাইটটি ভার্চুয়াল গেট খোলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই লাখ লাখ হিট দিয়ে ভরে যায় এবং জনপ্রিয় গন্তব্যস্থলে যাওয়া বেশিরভাগ ট্রেনের টিকিট তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রি হয়ে যায়, যার ফলে টিকিট মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে যায়। এতে অসংখ্য আগ্রহী যাত্রীর মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়। সম্পূর্ণ ই-টিকিট ব্যবস্থা আরোপের মাধ্যমে জনগণের চলাচলের ওপর অযথা শর্ত ও ভোগান্তি আরোপ করা হয়েছে—যা ব্যক্তিদের স্বাধীনভাবে চলাফেরার মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।

ট্রেনের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমও বলেছিলেন, অনলাইনে ২ মিনিটের মধ্যে টিকিট শেষ হয়ে যায়— এটা কোনো সিস্টেম হতে পারে না। এই সিস্টেম থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায়, সেই চিন্তা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, যার নামে ট্রেনের টিকিট কেনা হয়, তিনি ভ্রমণ না করে অন্য কেউ করার ফলে কালোবাজারিরা সুযোগ নিচ্ছে।

দেশের যেকোনো সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সেবা পেতে নাগরিকদের হয়রানির অভিযোগ বহু পুরোনো। যে কারণে অনেক সময়ই বলা হয়, সেবা খাতগুলো ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেওয়া হোক। তাতে জবাবদিহি বাড়বে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় তা বলে না—যার বড় উদাহরণ রেলের টিকিট। কেননা, বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলেও এখানে ভোগান্তি ও দুর্নীতি কিছুই কমেনি।

একটা বড় সমস্যা হলো, টিকিটের বিপরীতে চাহিদা থাকে কয়েকশো গুণ বেশি এবং একসঙ্গে লাখ লাখ মানুষ অনলাইন সিস্টেমে প্রবেশ করায় পুরো সিস্টেম অনেক সময় স্থবির হয়ে যায়। ফলে অনলাইন টিকিটিংয়ের এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ কাউন্টারে মানুষের যে ভিড়, সেই ভিড় বা চাপ তৈরি হয় অনলাইন সার্ভারে।

কখনো কখনো ইন্টারনেট সংযোগ বা সাইটের সমস্যা হতে পারে, যার কারণে বুকিং সম্পূর্ণ করা যায় না বা লেনদেন ব্যর্থ হতে পারে। যেমন- অনেক সময় পুরো নিয়ম-কানুন অনুসরণ করার পরেও সবশেষে টাকা পরিশোধের সময় সার্ভার ঝুলে যায় বা স্থবির হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে পুরে কষ্টটাই মাটিহ হয়ে যেতে পারে।

আধুনিক পৃথিবীতে মানুষ যখন ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তোলার দিকে হাঁটছে এবং ব্যস্ত জীবনে সময় ও কষ্ট কমাতে ঘরে বসেই নাগরিক জীবনের সব সেবা পেতে চায়— সরকারও রাষ্ট্রীয় সব সেবা অনলাইনে দেওয়ার মধ্য দিয়ে দুর্নীতি কমানো এবং সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায়—সেরকম বাস্তবতায় শত ভাগ অনলাইনে টিকিট কাটবেন এবং কোনো ধরনের হয়রানির মধ্যে তাদের যেতে হবে না, এটিই কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু ১০ দিন আগেও টিকিট কাটতে গিয়ে যদি যাত্রীরা দেখেন যে সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে—সেটিকে স্বাভাবিক মনে করার কোনো কারণ নেই। তাছাড়া যারা টিকিট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত, তাদের একটি অংশই যে কালোবাজারিতে যুক্ত, সেটি নানাভাবেই প্রমাণিত হয়েছে। ফলে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রশ্ন হলো, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কেন নিজেরাই টিকিট বিক্রির দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হলো যে, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হলো? তাদের কি জনবল সংকট? রেলের কি বাজেট কম? সরকারি বহু প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত জনবল আছে,এরকম কথাও শোনা যায়। রেলেরও যে মোট জনবল, তাদের সবাই কি ঠিকমতো নিজেদের কাজগুলো করছেন? ট্রেনের টিকিট নিয়ে এত অভিযোগের পরেও কি রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের ভেতরে বা অধিদফতরের ভেতরে প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম লোকবল দিয়ে ইন্টারনাল মনিটরিং সিস্টেম চালু করা গেছে?

প্রায় ২০ কোটি মানুষের দেশে যে পরিমাণ ট্রেন ও ট্রেনের বগি থাকা দরকার, সেখানে বিরাট ঘাটতি আছে। দেশের রেল ও নৌপথে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করার পেছনে সড়ক পরিবহন ব্যবসায়ীদের ভূমিকা আছে বলেও অভিযোগ আছে। সরকারও রেলের প্রতি কতটা যত্নবান, সেই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং, অনলাইন টিকিটিংয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি, কালোবাজারি ও হয়রানি বন্ধে সরকারকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। সব রুটে ট্রেন ও বগির সংখ্যা বাড়াতে হবে। ট্রেনের গতি বাড়িয়ে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্রুত যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। রেলপথ নির্বিঘ্ন রাখা এবং সময়মতো প্রতিটি ট্রেনে ছাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কেননা, শুধুমাত্র শত ভাগ টিকিট অনলাইনে বিক্রির মধ্য দিয়ে হয়রানি ও ভোগান্তি কমানো তথা ডিজিটাল করার চেষ্টা করা হলেও ট্রেনের পুরো সিস্টেম যদি অ্যানালগ থাকে— তাহলে যাত্রীরা এর সুবিধা পাবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
একেনবাবুর সঙ্গে কেরালা ভ্রমণ, ঘুরে দেখুন সিনেমার শুটিং স্পট
একেনবাবুর সঙ্গে কেরালা ভ্রমণ, ঘুরে দেখুন সিনেমার শুটিং স্পট
শাহজালাল বিমানবন্দরের এমন রূপ কেউ কখনও দেখেননি আগে 
শাহজালাল বিমানবন্দরের এমন রূপ কেউ কখনও দেখেননি আগে 
আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা: আপিল বিভাগে চূড়ান্ত শুনানিতে উঠছে
আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা: আপিল বিভাগে চূড়ান্ত শুনানিতে উঠছে
কক্সবাজারে নেই ডিএনএ ল্যাব, ১০ মরদেহ শনাক্তে দীর্ঘ অপেক্ষা
কক্সবাজারে নেই ডিএনএ ল্যাব, ১০ মরদেহ শনাক্তে দীর্ঘ অপেক্ষা
সর্বশেষ সর্বাধিক