বন্ধুর পাশে বসিয়া থাকা…

Send
শবনম ফেরদৌসী
প্রকাশিত : ১৩:৪২, আগস্ট ০৭, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১৩, নভেম্বর ২৪, ২০১৬

শবনম ফেরদৌসীপৃথিবীর কোনও সম্পর্কই হিসেবের বাইরে নয়। বন্ধু হচ্ছে সেই সম্পর্ক যা সব হিসেবের বাইরে। কিন্তু এই যে আপনি বন্ধু বলতেই ছেলেবেলার সঙ্গী বা স্কুলের সহপাঠীকে বুঝে নিচ্ছেন, এখানেই একটা মস্ত ভুল পাকিয়ে ফেলছেন। আদতে, জীবনের খুব নগণ্য সংখ্যক সহপাঠী আজীবনের বন্ধু হিসেবে টিকে থাকে। কারণ, বন্ধু’রও আছে শ্রেণি চরিত্র এবং শ্রেণি বিভাজন। এমনকী সময় বিভাজন পর্যন্ত। আজ যে বন্ধু আপনার সাথে শিস দিয়ে গান গায়, কাল তার কণ্ঠ থেকে শিস উধাও হয়ে যেতে পারে। কিংবা তার শিস দেওয়া আপনার কাছে নেহাৎ ছেলেমানুষী বোধ হতে পারে।
যার সঙ্গে আপনার দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় সংকট মোকাবেলার আলাপ, দিনে একটিবার সেই আলাপ না হলে পেটের ভাত হজম হয় না, সেই প্রাণপ্রিয় সখা বা সখীর সঙ্গে এই আপনিই রিলকের কবিতার সারৎসার নিয়ে আড্ডা ফাঁদতে পারেন না। এক্ষেত্রে আপনারা দু'জনেই মূক ও বধির।
আবার যে বন্ধুর সাথে ওং কার ওয়াই এবং ক্রিস্লওভস্কি’র ছবির মিল ও অমিল এর দ্বন্দ্ব খোঁজেন এবং আচানক তা আবিষ্কারের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন, ঠিক তাকেই আপনার জামদানি শাড়ির শৈল্পিক ইতিহাস বোঝাতে পারেন না। কারণ, সে শড়ী বিষয়টির Existence-এই বিশ্বাসী নয়।
আপনার এক বন্ধু আছে, যে শুধু আপনাকে দেয় আর দেয়। ভাত মুখে তুলে খাওয়ায়, নিয়ম করে আপনার জন্যে পছন্দের রান্না পাঠায়, আপনাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে দৌড়ায়। আর আপনি নিয়ম করে তাকে ফোনটা পর্যন্ত করেন না। একদিন অনেক বছর পেরিয়ে জানতে চাইলেন, তোকে তো আমি কিছুই দিলাম রে! সে নির্লিপ্ত বদনে বললো, এই যে তোকে ভালবাসতে (নর-নারীর ভালোবাসা নয়) দিলি! ওর দেওয়াতেই সুখ আর আপনার নিয়ে দেওয়াতে।

এবার বলুন তো, কী দিয়ে এই সম্পর্ক হিসেবের মধ্যে ফেলবেন? বন্ধু মানেই সমবয়সী নয়। যে কোনও বয়স আপনি ধরতে পারেন, ধারণ করতে পারেন।

আমার বড় খালু, ষাটোর্দ্ধ একজন সফেদ মানুষ ছিলেন আমার কৈশোরের পরম বন্ধু। স্কুলে থাকতে আমার পাঠ্য পড়া ছাড়া আর সব করতে মন চাইতো। অভিনয়, আবৃত্তি, পিটি-প্যারেড, উপস্থিত বক্তৃতা, গল্প লেখা! মেয়ে ঠিকমত পড়ে না বলে মা-বাবা এসব করতে দেয় না। পাশের বাসার বারান্দা থেকে আমার গোমড়া মুখ দেখে তিনি এসে বলতেন, আমি সাথে করে নিয়ে যাই! ফিরে এসে ও ঠিক পড়বে! আর আমি সেসব জায়গা বাজিমাৎ করে যখন ফিরতাম, রিক্সায় বসে খালুজান কিন্তু কিছু বলতেন না। ব্যাস, ওইটুকুই! আমি তাঁর সম্মান বাঁচাতে লেখাপড়ায়ও তুখোড় হয়ে উঠলাম। তাঁর তো আমার কাছ থেকে কোনও প্রাপ্তি ঘটলো না। নাকি ছিলো? ইতিহাসের অধ্যাপক খালু’র কাছে আমি রাজা শশাংকের দুর্বলতার কাহিনী যেমন শুনতাম, তেমনি শোনা হতো সম্রাট বাবর আর হূমায়ুনের জীবন বিনিময়ের গল্প। ওই এক ক্ষুদে শ্রোতা পাওয়াই কি তার অবসরপ্রাপ্ত জীবনের বন্ধু হয়ে উঠেছিলো? তবে আর বন্ধুর সংজ্ঞা কী করে সমবয়সী এবং অনাত্মীয় হয়! আসল কথা হল- মুহূর্ত ভাগ করাকরি নাকি অনুভুতি?

এই জায়গায় এসে আমি দ্বন্দ্বে পড়ে যাই। এতরকম বন্ধুত্বের বিশ্লেষণ পেরিয়ে আমি ধরবার চেষ্টা করি বন্ধুর প্রাণ ভোমরা আসলে কোথায় লুকিয়ে থাকে! যার জন্যে এত আহাজারি! এত মাতামাতি! এমনকী আস্ত একটা দিবস ও বের করে ফেলতে হয় মানুষকে।

এমন বন্ধুও তো আছে, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর দেখা নেই, কথা নেই।  কিন্তু, যেই দেখা, যেখানেই দেখা ওমনি একই জায়গা থেকে আলাপ শুরু। যেন এই গত সপ্তাহেও তুমুল আড্ডা হয়েছে! এর নাম কী দেবো তবে? এর সুত্র কোথায় গাঁথা?

আর আছে এখন ডিজিটাল বন্ধু, আর ছিলো এক পত্রমিতা, আমি বলি প্রাগৌতিহাসিক বন্ধু। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় পত্রমিতালীর বিজ্ঞাপন দেওয়া হত। আমাদের চারপাশে আছে এমন অনেক দম্পতি যারা এক কালে পত্রমিতা ছিলো। এ যুগে সেটাই ফেসবুক ফ্রেন্ড-এ পরিণত হয়েছে।

পত্রমিতা বহু আগের এক চর্চা। যাকে আমি কখনো দেখিনি, শুনিনি, জানিনি। নিজের মনে একা একা কথা বলার মতো এক বিচিত্র সম্পর্ক। অনেকটা যেন আয়না, Self reflection দেখা নিজের লেখায়, আরকজনের চিঠিতে।

আর ছিলো টেলিফোন বন্ধু। এখনও আছে আশা করি। অনেক বছর, মাস দু’জনে ফোনে কথা বলা হয়েছে হয়তো, কোনোদিন দেখা হয়নি। অথচ, দু'জনের এক শহরেই থাকা হয়। আকাশের গায়ে মেঘ দেখে তার চুলচেরা আলাপ ঘটে, কিন্তু কখনো ভুলেও ভুল করে দেখা হয় না।

কিন্তু, সে জানে আপনার যাবতীয় গভীর গোপন খবর। সে ছুঁতে পারে আপনার করোটির ভেতরকার মানুষটাকে। তবে কেন আড়ালে থাকা? তবে কি মানুষের আড়ালেও থাকে আরেক বন্ধু! তার শুধু একজন মাধ্যমের প্রয়োজন পড়ে মাত্র!

শেষ করা যাক আপনার ওই বন্ধুটির কথা দিয়ে।

আপনার ভীষণ ভালো না লাগা, কিংবা দুঃসময়, কাউকে বলা যায় না, কিংবা বলতে ইচ্ছেও করে না। বন্ধুটির সাথে অনেকদিন কথা নেই, দেখা নেই। কিন্তু, আপনি জানেন সে আছে। ফোন করেছেন কী করেন নি, গেলেন তার বাড়ি। দরজা খুলে বসলেন তার ইজি চেয়ারটায়, ঠিক যেমন বসেন। সে-ও চলে যায় আপনার জন্যে ঘন দুধের চা বানাতে। দু’কাপ নিয়ে ফেরে। দু’জনে চুমুক দেন, কথা বলেন কী না বলেন। ঝিরঝিরে হাওয়ায় ক্লান্ত আপনি ঘুমিয়ে যান তার ডিভানে। সে হয়ত তার জরুরি কাজে মনোযোগী। ঘুম ভেঙে চুপচাপ বসে থাকা হয় চিন্তাশূন্য মাথায়। সেই যে, বন্ধুর পাশে বসিয়া থাকা!

লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা

আরও পড়তে পারেন: বন্ধু তোর জন্য

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ