ক্লাস সিক্সে পড়ি

Send
আরিফ আর হোসেন
প্রকাশিত : ১২:৩৬, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:০৪, নভেম্বর ২৪, ২০১৬

আরিফ আর হোসেনআমার বাসার সামনে একটা ছোট খেলার মাঠ ছিল। একদিন পোদ্দারি করে ভাবলাম মাঠের উন্নয়ন নিয়ে আশেপাশের বিল্ডিংয়ে চিঠি দেব। আমার স্কুলবন্ধু সজীবের খুব ভালো ছবি আঁকার হাত ছিল। ওকে দিয়ে একটা A4সাইজের কাগজে পোস্টার বানাতে বসলাম। ‘আমাদের খেলার মাঠ...সইবে না কোনও আঘাত’ টাইপ হেডিং দিয়ে বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা (রাতে মাঠে টিউবলাইটের ব্যবস্থা করা চাই, মাঠে ময়লা ফেললে চলবে না, ড্রেনের ওপর ঢাকনা চাই) ইত্যাদি পয়েন্ট নিয়ে চিত্রসহ একটা চমৎকার পোস্টার বানিয়ে ফেললাম।
পোস্টারের শেষের দিকে, বন্ধু সুন্দর করে ফাঁসির দড়ির ছবি এঁকে পাশে লিখে দিল ‘রাজাকারের ফাঁসি চাই’।
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘এটা কেন লিখলি এখানে?’ ও বললো, ‘তারা আমার আব্বার খুনি’।
‘ওহ মাই গড... আঙ্কেল না বেঁচে আছে? গতকালকেই তো দেখলাম তোকে রিকশা দিয়ে স্কুলে নামিয়ে দিতে’।
‘হুম, তো? যুদ্ধের সময় খুন করতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি... তাই বলে খুনিকে খুনি ডাকব না?...তোর আব্বাকে জিজ্ঞেস কর, তারও খুনি এই রাজাকারেরা’।
পরের দিন বাসার কাছে, ফার্মগেটের হলিক্রসের উল্টা দিকের দোকান থেকে ১০০ টা ফটোকপি করলাম এই কাগজ।
দোকানদার ট্যারা চোখে তাকিয়ে আছে। একসময় জিজ্ঞেস করেই ফেললো, ‘রাজাকাররা তোমার কী ক্ষতি করছে?’
আমি ফটোকপিগুলো নিতে নিতে বললাম, ‘ওরা আমার আব্বার খুনি।’
দোকানদার বেচারা আর হিসাব মেলাতে পারে না, এই হাফপ্যান্ট পরা ছেলে বলে কী! এর আব্বা সেই সময় মারা গিয়ে থাকলে এই পিচ্চি এদ্দিন পরে জন্ম নিল কেমনে?
নাকি, সেই সময়েই জন্ম তার, আসলে হে বাওইন্না। ...হিসাব তো মেলে না।

কথা না বাড়িয়ে আমি জোরে জোরে হেঁটে বাসায় ঢোকার আগেই আশেপাশের বিল্ডিংয়ের সব বাসার দরজার নিচ দিয়ে পোস্টার ঢুকিয়ে দিলাম।
বিলি করার পরেও বেশ কিছু পোস্টার বেঁচে গিয়েছিল। সেগুলো ৫ তলার ছাদে ওঠে ২ হাত ছুড়ে উড়িয়ে দিয়েছিলাম।
...সেই ২৫ বছর আগের একটা চাওয়ার একটা বড় রেজাল্ট কাল এসেছে! খুব পাওয়ারফুল এক রাজাকারের ফাঁসি হয়ে গেলো। শুনি বাঁচার জন্য কোটি টাকা খরচ করতেও পিছপা হননি তিনি। অন্যরা তো লুকিয়ে ছিলেন...কিন্তু এ তো টিকেছিলেন টাকার জোরে।
কাল তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো।
কারও মৃত্যু নিয়ে উল্লাস করতে শেখায়নি আমার পরিবার। কিন্তু সে যে আমার আব্বার খুনি! আব্বার ভাগ্য ভালো দেখে বেঁচে গেছে তো কী হয়েছে? তাই বলে, খুনি তো আর বাঁচতে পারে না।
আজ যদি পারতাম, রায়ের কপি ফটোকপি করে বাড়িতে বাড়িতে বিলি করতাম, আর বেঁচে যাওয়া কপিগুলো, ছাদে উঠে উড়িয়ে দিতাম।
আজ যে, এক প্রজন্মের ফাদার্স-ডে।

 

লেখক: কো-ফাউন্ডার, আমরাই বাংলাদেশ

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ