আন্ডার কন্সট্রাকশান—নির্মাণে বিনির্মাণ

Send
শবনম ফেরদৌসী
প্রকাশিত : ১৩:৫০, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১৪, নভেম্বর ২৪, ২০১৬


শবনম ফেরদৌসীপ্রিমিয়ার শো শেষে উপস্থিত নারীরা জানালো, ‍`রয়া’  যেন তার নিজের কথা বলছে। কেউ কেউ জানালো, সে নিজেই একজন ‌রয়া। অনেক উৎফুল্ল নারী চোখের দেখা পেলাম। এক কোণায় দাঁড়িয়ে নানা আলোচনা শুনলাম। আমার আর বলা হয়ে উঠলোনা, আমিই একাধারে রয়া , রয়ার মা ( যার কোন নাম নেই ) এবং ময়না, রয়ার গৃহকর্মী...
বলছিলাম ‘আন্ডার কন্সট্রাকশন’—এর উদ্বোধনী প্রদর্শনীর গল্প। যদিও তা ছিলো জানুয়ারির শেষ ভাগে। প্রায় আট মাস আগের ঘটনার বয়ান এটি। অনেক প্রিমিয়ার ‘শো’ তেই যাওয়ার পরে। ছবি দেখতে দেখতেই বুঝে যাই, শো শেষে কী কী মন্তব্য আসতে পারে। ‘আন্ডার কন্সট্রাকশান’-এর ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া কেমন যেন আন্ডার কন্সট্রাক্টেড হয়েই থাকলো। দ্বিধাবিভক্ত জাতিতে পরিণত হল দর্শক । মিশ্র অনুভূতি অনুভূত হলো।
ছবিটির কারিগরী নির্মাণ নিটোল আর ঝরঝরে। কিন্তু, কোথায় যেন সবার কিন্তু কিন্তু ভাব। শুধুমাত্র উপস্থিত ত্রিশ-ঊর্ধ্ব নারীরা ব্যতিক্রমী প্রজ্জ্বল। তারা মোটামুটি ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘রয়া’তে দ্রবীভূত। কারণ, তাদের বেশিরভাগই ছিল রয়ার বয়সী এবং অর্থনৈতিক ও রুচির শ্রেণিভেদে রয়ার শ্রেণিভুক্ত। প্রায় সবাই রয়ার মতোই শিল্পচর্চাকারী। রয়ার জগতের পরিচিত বাসিন্দা। ফলে, রয়াকে ধরতে বুঝতে সমস্যা হয় না তাদের। শুধু আমিই খানিক দূরে দাঁড়িয়ে ভাবি, তিন নারী চরিত্রের তিন সত্ত্বার বিরাজমানতা নিয়ে। এই স্টার সিনেপ্লেক্সের বাইরে, এই ঝলমলে ঢাকাকে ছাড়িয়ে যে বৃহৎ অংশ দেশময় বিরাজ করছে, সেই অংশের নারীরা কে কোনজন এই তিনজনের মাঝে?
ছবিটির নির্মাণ নিয়ে আমার খুব বেশি কিছু বলার নেই। যথেষ্ট পরিমাণ পরিমিতিবোধ সম্পন্ন এবং পরিমার্জিত একটি ছবি। মেহেরজানের পরে নির্মাতা হিসাবে রুবায়েতের যে উত্তরণ, তা খুবই আনন্দঘন একটি ব্যাপার নির্মাতাদের জন্যে। নির্মাতা হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি। আমার মনে হয়েছে, হ্যাঁ সম্ভব। এদেশে কাহিনীচিত্র করা আবারও সম্ভব। এই বোধটি আমার মধ্যে ফেরত দেওয়ার জন্য রুবায়েতকে ধন্যবাদ। কারণ, বিগত বছরগুলোতে হাতে গোনা দু’একটি কাহিনীচিত্র ছাড়া চলচ্চিত্রের ভাষা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর বেশিরভাগ কাজে। এফডিসি’র ছবিকে এক্ষেত্রে গণনার আওতায় আনছি না। আমি বলছি ব্যক্তিগত, স্বাধীন ও দেশি–বিদেশি অনুদানপ্রাপ্ত ছবির ব্যাপারে। রুবায়েতের ছবিতে ফিল্ম ল্যাঙ্গুয়েজ ধরবার চেষ্টা আছে। আছে রূপকের ব্যবহার। বিশেষ করে ম্যাজিক রিয়ালিজমে রয়ার অনুপ্রবেশ এবং রিয়ালিটির সঙ্গে সংঘর্ষ একটি আবহ সৃষ্টি করে। শব্দের নান্দনিক ব্যাবহার ও পরিমিতি বোধ গোটা ছবিটিকে একই সূত্রে গেঁথে রাখতে সমর্থ হয়েছে। মানব জীবনের যাবতীয় Noise যে ঢাকা শহরের Noisy Ambience এর সমার্থক তা বুঝতে খুব বেগ পেতে হয় না। একাধারে তা শিল্পের দ্যোতনা উদ্রেক করে। সব মিলিয়ে ছবিটির চলচ্চিত্র হয়ে উঠবার প্রক্রিয়া আছে।

এ ছবির আলোচানায় আমি দুটি জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকবো। এক, কাহিনীর বয়ান দুই, এ ছবি যে তর্ক-বিতর্কের জন্ম দিয়েছে তার ব্যাখ্যা অন্বেষণ।

প্রথমে আসা যাক রেফারেন্স প্রসঙ্গে। এ ছবির মূল ভিত্তি বা রেফারেন্স হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের ‌‍‌‘রক্তকরবী’‌‌ মঞ্চ নাটক। কেন রুবায়েত এর আশ্রয় নিয়েছে সে কথা সে বলেছে নানাভাবে। ছবিতে ‌‌কেন্দ্রীয় চরিত্র রয়া সে ব্যাখ্যা পরিষ্কার করেছে তার ডায়লগে। রুবায়েতও রবীন্দ্রনাথের মতোই রূপকাশ্রয়ী হয়েছেন তার কাহিনীর বয়ানে। কিন্তু, যক্ষপুরী হিসেবে ঢাকার যে বিনির্মাণ সেইখানে ফুলবাড়িয়া ইস্যু, নারী নির্যাতন, রানা প্লাজা—এতকিছুর সন্নিবেশ না ঘটালে কি চলতো না? শুধু ‘রক্তকরবী’ আর নির্মানাধীন এই নব্য আরবান শহরে থাকতে পারলে ছবিটি যেন নিঃশ্বাস নিতে পারতো। রেফারেন্সের ভারে ভারাক্রান্ত হতে হতো না।

আমি তর্ক-বিতর্কের আলোচনায় যাবার আগে একটা বিষয় স্পর্শ করে যেতে চাই যা এ ছবির  একটি অসম্পূর্ণ প্রশ্ন। আমার কাছে একমাত্র দুর্বলতা। আর তা হলো গিয়ে, রয়া ও তার বন্ধু ইমতিয়াজের সম্পর্কের পরিণতি। আদৌ কি কোনও পরিণতি দেখা গেল? সম্পর্কটা কি তারা ওভাবেই রেখে দিল? নাকি ইমতিয়াজ পালিয়ে গেল? কিংবা, রয়া কি ইমতিয়াজকে প্রত্যাখান করলো? নির্মাতার কাছে হয়তো বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু, ইমতিয়াজ অধ্যায় পরবর্তীতে দ্বিধাগ্রস্ত রয়ার যে পরিবর্তন তা কিন্তু এই অনুমান করায় যে তাদের সম্পর্কটি আর মধুর স্মৃতিতে নেই। কেননা, আর্দ্র রয়া ক্রমশঃ অনার্দ্র হয়ে ওঠে তার জীবন নিয়ে। শিল্পতেই সে তার অস্তিত্ব প্রোথিত করে। কোন সেই ক্যাটালিস্ট ফোর্স যা রয়াকে  নির্লিপ্ত করে দেয়? তাকে তার সিদ্ধান্তে অটল রাখতে সাহায্য করে। তার শেষ ডায়লগ হয়ে ওঠে, ’রাজা, এইবার সময় হল। আমার সমস্ত শক্তি নিয়ে তোমার সঙ্গে আমার লড়াই’ ...  কিন্তু, এমন কিছু আমরা ঘটতে দেখি না যা তাকে এতটা কঠোর করে ফেলে, এত শক্তি তৈরি হয়। তার শিল্পীসত্ত্বা যেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় সমাজের দিকে আক্রোশে, ‘তবে এই নাও তোমরা, এই নাও আমার জীবন।’

আমি এই জায়গায় ব্যাখ্যাটা একটু দিতে চাই। নারীর একটা ব্যাপার আছে, তা হয়তো কিছুটা আত্মঘাতী। নারী যখন প্রজ্ঞার একটা স্তরে পৌঁছে যায়, তখন সে তার সমকক্ষ পুরুষ ছাড়া অন্য পুরুষকে নিতে পারে না। এমন কি ভালোবাসতে পর্যন্ত পারে না। শরীরী সম্পর্ক তো দূরের কথা। নারী তার মানসিক বিন্যাস যার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে তাকেই সে গণ্য করে। আর যদি সে নারী হয় শিল্পী, তবে তো কথাই নেই। এ কারণেই হয়ত বেশিরভাগ শিল্পী নারী একা এবং পুরুষসঙ্গবিহীন থাকে। শিল্পী নারী বার বার শিল্পী পুরুষের প্রেমে পড়বে, এটাই চলতি নিয়ম। শিল্পী পুরুষ যে শিল্পী নারীর প্রেমে পড়ে না তা নয়। সেও পড়ে। কিন্তু, সে দিব্ব্যি জীবনযাপন করে যেতে পারে অ–শিল্পী নারীর সঙ্গে। কারণ, সেই নারী তার ঘর সামলায়, সন্তান উৎপাদন করে এবং শিল্পী পুরুষের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে উৎসর্গ করে। পুরুষের কাছে তখন শিল্পী নারী আর অ-শিল্পী নারী রবিবাবুর কুয়োর জল আর ঘটির জলের ব্যাপার–স্যাপার। অ-শিল্পী নারী তার জীবনের সাপোর্টিং রোল মাত্র। নারী কিন্তু এই দ্বি-মুখীতা করতে পারে না। আর পারে না বলেই হয়ত বাধ্য হয় শিল্পী পুরুষকে ভালোবেসে যেতে। যার ফলাফলে ‘লাবন্য’ একা থেকে যায়। তো রয়াদের ক্ষেত্রে সাধারণত যা হয়ে থাকে, প্রবল একটা আঘাতের ঘটনা ঘটে থাকে। ইমতিয়াজ বিষয়ে রয়ার কোনও অপরাধবোধ নাই থাকতেই পারে তার স্বামীর কাছে। কিন্তু, ইমতিয়াজ থেকে তার আঘাত পাওয়া থাকা চাই। নইলে কাহিনীর যোগসূত্র মেলে না। প্রাচ্যদেশীয় রয়ার বিদ্রোহী শিল্পী সত্ত্বায় রূপান্তরিত হতে হলে তার আঘাত প্রয়োজন। নারীর প্রচণ্ড হয়ে ওঠার নেপথ্যে থাকে বৈরিতা ও প্রতারিত হওয়ার ইতিহাস। তবেই না সে চণ্ডীরূপ ধারণ করে।

আরও একটা বিষয় উল্লেখ করতে চাই। নারী–পুরুষ নির্বিশেষে বলেছে, এই ছবিটাই কোনও পুরুষ নির্মাতা করলে হয়ে উঠতো না। নির্মাতার লৈঙ্গিক পরিচয় তবে দর্শকের মনে ছাপ ফেলে এবং তা কাজেও প্রকাশ ঘটে। বিষয়টি নিয়ে রুবায়েতের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে । পুরুষ নির্মাতার চোখে নারীর মনস্তত্ত্ব—যা খুব কম পুরুষ নির্মাতা ধরতে পারে। ফলে, দিনের পর দিন যাবতীয় চলচ্চিত্রে নারী আনএক্সপ্লোরড থেকে যায় এবং নারী কিছু হাতে গোনা ইমেজে বন্দি হতে থাকে। আমাদের এক নারীবাদী বন্ধু বলে থাকে এইরকম, ‘নারী হয় মা, নয় বেশ্যা।’ এই দু’টি মৌলিক কাঠামোতে কাদা মাটি লাগিয়ে এক এক পুরুষ তাদের এক এক প্রতিমা গড়ে এবং ভাঙে। পৃথিবীর তাবত নারীকে একটি ক্ষুদ্র সত্ত্বায় রূপান্তরিত করে পুরুষ চোখ। একটু এদিক সেদিক হয় মাত্র। দিনশেষে যাহা লাউ, তাহাই কদু। নারী আসলে কী ভাবে, জীবনকে কিভাবে দেখে পুরুষ কি তা জানে? হয়তো জানে না, অথবা না জানবার ভান করে। রুবায়েত নারী হওয়ার সুবাদে সেই ভানটুকু করতে হয়নি। সে তার দেখা, তার চেনা তিন চারজন নারীর কথা অকপটে বলবার চেষ্টা করেছে শুধু।

এবার আসা যাক যাদের ঘিরে ‘আন্ডার কন্সট্রাকশান’-এর গল্পের স্তর বিন্যস্ত হয়েছে তাদের প্রসঙ্গে। জীবনভর বাংলা ছায়াছবিতে মায়ের যে মাতৃরূপ দেখে দেখে আমরা ক্লান্ত, অবসন্ন— মা মানেই চোখের জল ফেলা মোহান্ধ এক ভিখারিনী— সেক্ষেত্রে রয়ার মা (যার কোন নাম নেই) পুরুষের তৈরি করা সেই সাম্রাজ্যে এক নতুন ‘মা’ ইমেজের আত্মপ্রকাশ ঘটালেন। এ মা কিন্তু অধিকতর বাস্তবসম্মত। এ মা আমাদের খুব চেনা। সারাজীবন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে ছলোছলো চোখে আর গদগদে কণ্ঠে বলে থাকেন, আমার মা সেলাইয়ের কাজ করে আামাদের মানুষ করেছেন। তাই মা’র সেই ঋণ শোধ করতে রত্নগর্ভা, কীর্তিমতী বহু উপনামে আখ্যায়িত করা হয় সেলাই করা সেইসব মায়েদের। সেই মায়েরা ক্রেস্ট হাতে নেন, খুশি খুশি গলায় বক্তব্য রাখেন ছেলে–মেয়েরা খুশি হবে ভেবে। কিন্তু, মনে মনে কি বলেন তারা? এ ছবিতে কিন্তু রয়ার মা বলেন শক্ত শক্ত বেশ কিছু কথা। নারীর অন্তর্নিহিত ক্ষমতার কথা। এ হচ্ছে রয়ার মা, যার কোনও নাম দেননি পরিচালক। হয়তো ইচ্ছে করেই তা করেছেন। কারণ, এদেশের সত্যিকারের ক্ষমতাবান নারীদের আদতে জাতি চেনে না। একটা শ্রেণির হীরের আংটি পড়া, কিছু সুবিধাভোগী নারীদের ক্ষমতায়নের আইকন বানানোর কাজটি সম্পন্ন হয়ে গেছে অনেক আগেই। ফলে, রয়ার মায়েদের নাম না থাকাই স্বাভাবিক। কেননা, নামেরও তো একটা শ্রেণিভেদ আছে। ‘আন্ডার কন্সট্রাকশান’ সবচেয়ে বড় যে তথ্যটি দেয় তা হল, এদেশে নারীবাদ নির্মীয়মাণ ঢাকা শহরের মতই একটি নির্মাণাধীন ধারা। নতুন একটি ভবনের মতোই তা বহু স্তরবিশিষ্ট এবং বহু প্রলেপে অলঙ্কৃত হওয়ার ব্যাপারে অপেক্ষমাণ। তাতে আছে দ্বন্দ্ব ও ধোঁয়াশা। যেমন আছে এই শহরের শব্দদূষণ আর যানজট। একটা দলা পাকিয়ে আছে সব উপাদান এই নব্য যক্ষপুরীতে। কিন্তু তার একটা চলমান চেহারা আছে। ফলে, একটা আকার নিচ্ছে এখানকার নারীবাদ। নারীবাদ এ অঞ্চলে নতুন কোনও ধারণা নয়, ছিলো তা বহুকাল আগে থেকেই। বলা চলে, হাজার বছর আগে থেকেই। তার হয়তো যথাযথ ব্যাখ্যা করা হয়নি। ‘খনা’ তার যোগ্য উদাহারণ। খনার মতো বিচ্ছিন্ন নারীবাদী ছাড়াও একটা প্রছন্ন নারীবাদী চরিত্র আছে এ অঞ্চলের। যদিও পাশ্চাত্য সেই নার্ভটা ধরতে পারছে না। পারবে বলে মনেও হয় না। এর অঞ্চলে নারী তখনি সবচেয়ে ক্ষমতা লাভ করে যখন সে মা হওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। মাতৃত্ব নারীর স্ট্যাটাস বৃদ্ধি করে, একধরনের ভক্তির আসনে বসায়। পাশ্চাত্যে তো তিরিশ পেরোলেই নারী ডিপ্রেশনে চলে যায়। ডায়েট আর জিমের কসরতে জীবন অতিষ্ঠ করে ফেলে নারী। পেটে খানিক মেদ জমানো পাপ নয় আজও এ অঞ্চলে নারীদের। সেই বিচারে নারী পাশ্চাত্যের চেয়ে অনেকটাই মুক্ত এদেশে তার প্রচলিত ইমেজের বাইরে। কিন্তু, তারপরও নারীবাদ নিয়ে বিশদ বিভ্রান্তি আছে আমাদের। এবং এই বিভ্রান্তির সূচনা ঘটে গেছে শুরুতেই। ফলত নারী নিজেই বিভ্রান্ত তার অবস্থান নিয়ে। যে বিভ্রান্তিতে ভোগে স্বয়ং রয়া, নারীবাদী জীবন কাটানো অথচ বাইরে তার বিপরীত প্রকাশ করা রয়ার মা এবং গৃহকর্মী ময়না। পুরুষের সব নেতিবাচকতা মেনে নিয়ে এরা যে যার জীবন চালিযে যায়। কারণ, নারীর জীবনে পুরুষকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। পুরুষকে তো নারীর প্রয়োজন, যেমন প্রয়োজন পুরুষের। তাই রয়ার মা মননে, রয়া অনিচ্ছায়, ময়না স্বেচ্ছায় পুরুষের জন্যে একটা স্পেস তৈরি করে। কিন্তু, পুরুষ সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। দিনশেষে অপমানিত রয়ার মা তার একাকীত্বে সেই ফেলে যাওয়া স্বামীকেই কল্পনায় লালন করে। বাস্তবে থাকলে হয়তো করতো না। ময়না জানে তার স্বামী কি! প্রেমিক থেকে অত্যাচারী পুরুষে পরিণত হয়েছে তার স্বামী এবং তা জানবার পরও রয়ার প্রস্তাবিত সুন্দর জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করে সে স্বামীর ঘর করতেই থাকে। এবং নিজের একটা আলাদা পরিচয়ের অন্বেষণে বাচ্চা ভরা পেটে ফ্যাক্টরিতে ধাবমান ময়না যেন দেশের সমস্ত নারী শ্রমিকের প্রতিভূ হয়ে ওঠে। আমরা কতোটা জানি এই পায়ে হাঁটা গার্মেন্টস কর্মী, গৃহকর্মী, অফিসের আয়াদের আসল জীবনে টিকে থাকবার কথা। তাদের অন্তর্নিহিত ক্ষমতার উৎস সম্পর্কে আদৌ কি কোনও ধারণা আছে পুরুষের? হয়তো আছে। কিন্তু, পুরুষ নারীর এই অন্তর্গত শক্তিকে সেলিব্রেট করতে জানে না, পারে না। শঙ্কায় ভোগে অথবা ঈর্ষা করে। পুরুষের কাছে নারীর সেই মুখ বেশী প্রিয় যা বিষন্ন ও কান্নাময় । নারীর আনন্দোচ্ছ্বল মুখ পুরুষকে শঙ্কিত করে। এই বুঝি নারী জীবনকে উপভোগ করতে শুরু করে! তবে তো সে আর পুরুষের মুখাপেক্ষী থাকবে না। নারীর নির্লিপ্ত চেহারা পুরুষের তাই পছন্দ নয়। তাতে করে পুরুষের নির্লিপ্ত সত্ত্বা প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। নারী শুধু কাঁদবে, ভাঙবে আর আহাজারি করবে। তবেই না সে পুরুষের যোগ্য নারী হলো। রয়া এই তিনটির কোনটিই করেনি। তাই রয়া সবার (দর্শকের) অপছন্দের, এমনকি নারীর কাছেও। শক্তিময় মানুষকে লোকে ভয় পায়। নতজানু হবার ভয়।

এদিকে আধুনিক সময়ের নব্য নারীবাদের বোধে দীক্ষিত রয়া বিভ্রান্তির জালে বন্দি এক সত্ত্বা। প্রতিনিয়ত যার ভেতর চলে ঘাত-প্রতিঘাতের খেলা। একদিকে তার শিল্পী জীবন আর অন্যদিকে তার সমাজ–সংসার—এ দুইয়ের অবস্থানগত দ্বৈততায় সে উচ্চকণ্ঠী। তার সেই কণ্ঠ চেপে ধরে তারই আপাত প্রাচীনপন্থী মা। রয়া যে নিজের অর্থ নিজে সংকুলান করে না, স্বামীর টাকাই তার চলার উপায় এ কথা মা’ই তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই বিদ্রোহী রয়াই যখন সব ছাপিয়ে আবেগতাড়িত হয়, তখন তার জন্মদাত্রী বলে ওঠে , ‘আমার কাউকে দরকার নাই।’ আধুনিক রয়া যেন ধাক্কা খায়। সেই সঙ্গে ধাক্কা খায় দর্শক মন। আমার হিসেবে চিত্রনাট্যের সব চাইতে কঠিন ও সংবেদনশীল সিকোয়েন্স এই জায়গাটা। রয়ার মা যেন সমগ্র নারীর হয়ে কথাটা বলেন। এই সমাজকে বলা নারীর অভিমানী কণ্ঠ কি তা? নাকি শক্তির তেজ? যাকে এ অঞ্চলে বলা হয় ‘আদ্যাশক্তি’! দিনশেষে যে আদ্যাশক্তির বলে বলীয়ান হয়ে ওঠে রয়া ও ময়নারা।

লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ