সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা বন্ধ করতে হবে

Send
রোকেয়া লিটা
প্রকাশিত : ১৬:৪২, অক্টোবর ১৬, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৪, অক্টোবর ১৬, ২০১৬

রোকেয়া লিটাভারত শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রই নয়, দেশটির সঙ্গে রয়েছে আমাদের নাড়ির টানও। বর্তমানে ভিন্নভিন্ন দুটি দেশ হলেও, ভারতের একটি অংশের সঙ্গে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির অনেক মিল। শুনেছি কলকাতার লোকজন এখনও তাদের মুদ্রাকে টাকা বলেই জানেই। এরপরও সেটি আমাদের কাছে অন্য আর দশটি দেশের মতোই বিদেশ। অন্যান্য দেশে যেতে হলে যেমন পাসপোর্ট-ভিসা লাগে ভারতে যেতে হলেও তার সবকিছুই দরকার। প্রতিবেশী দেশ বলেই যে সীমানা পার হয়ে কেউ ভারতে যেতে পারবে, এমন কোনও স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি বাংলাদেশিদের। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে এমন সুবিধা আছে। পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই এসব দেশের নাগরিকরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে অবাধে যাওয়া-আসা করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ বা ভারতের মধ্যে এ রকম কোনও ব্যাপার নেই। অর্থাৎ ভারতে যেতে হলে পাসপোর্ট ভিসার দরকার হবেই। সেখানে যদি কেউ অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চোরাচালানি করে বেড়ায়, তবে তার শাস্তি তো হবেই।
প্রশ্ন উঠতে পারে, শুধু কি বাংলাদেশিরাই অবৈধভাবে সীমানা পার হয়ে ভারতে যাচ্ছে? না, ভারত থেকেও প্রচুর মানুষ অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক সংবাদে ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের (মাসুম) নির্বাহী পরিচালক কিরীটি রায় বলেন, 'বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণ পরস্পরের চাহিদা অনুযায়ী নানাভাবে যাতায়াত করে। আর এই যাতায়াতের কথা দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জানা। আর দু’দেশেরই যে মানুষগুলো অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে ধরা পড়ে কারাগারে আছেন তাদের বিষয়েও সরকার অবহিত'। অর্থাৎ শুধু বাংলাদেশিরা যে অবৈধভাবে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তা নয়; ভারতীয়রাও বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে এবং ধরাও পড়ছে।

দেশের সীমানা পাহারা দিতে গিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকানো আর তাদের গুলি করে হত্যা করা কি একই কথা? অবশ্যই না। এ ধরনের হত্যা নিঃসন্দেহে অপরাধ। বিএসএফ চাইলেই এর বিকল্প কিছু ব্যবহার করে অনুপ্রবেশকারীদের প্রতিহত করতে পারে। এ নিয়ে একাধিকবার বিজিবি-বিএসএফ-এর বৈঠক হয়েছে। তারা গুলি করে বাংলাদেশিদের হত্যা না করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। এরপরও বন্ধ হয়নি সীমান্ত হত্যা। আইন ও সালিশকেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ বছর জুন পর্যন্ত ছয় মাসে সীমান্তে ১৬ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এই সময়ে মধ্যে আহত হয়েছেন আরও ১৭ জন। অপহৃত হয়েছেন ১৮ জন বাংলাদেশি। বেসরকারি হিসাবে গতমাসেই লালমনিরহাট, ঝিনাইদহ ও কুড়িগ্রামসহ বাংলাদেশের সীমান্তে অন্তত ৮জন নিহতের খবর পাওয়া যায়।

সীমান্তে অনুপ্রবেশকারীদের জীবিত রেখেও কিভাবে ঠেকানো যায়, তার যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব আছে বিএসএফের? তা না হলে বিএসএফের এভাবে গুলি চালানোর কথা নয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে বিষয়টি যতটা না নিরাপত্তাজনিত, তার চেয়েও অনেক বেশি রাজনৈতিক। যেহেতু রাজনৈতিকভাবে এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, তাহলে তো অন্য উপায় খুঁজতেই হবে। আর এ জন্য বিজিবিও বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।

এটা কোনও যুদ্ধাবস্থা নয়, এরপরও প্রতি বছর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যে পরিমাণ বাংলাদেশি নিহত হচ্ছে, পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনও সীমান্তে এত নৃশংস হত্যা হয় বলে আমার জানা নেই। হতে পারে, বাংলাদেশের তুলনায় ভারত কয়েকগুণ বড় একটি দেশ। কিন্তু যে দেশ যত বড়, তার সীমানাও কিন্তু তত বড়। অতএব এত বড় সীমানা পাহারা দেওয়ার জন্যও অনেক লোক দরকার। সবদিক সামলেই ভারতকে ব্যবস্থা নিতে হবে। ভারতের একপাশে চীন অন্যদিকে পাকিস্তানের সীমান্ত। দুই সীমান্ত এলাকাই নানান সময় অস্থিরতা চলতে থাকে। বাংলাদেশের মতো একটি ছোট রাষ্ট্রের সঙ্গেও যদি তারা সুসম্পর্ক বজায় রাখতে না পারে, তবে তারা কার পাশে গিয়ে দাঁড়াবে? নিজেদের প্রয়োজনেই বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে ভারতকে। তাই বিএসএফ যখন বাংলাদেশি নাগরিকদের এভাবে গুলি করে মেরে ফেলে, তখন রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা প্রতিবাদ জানাব না?

দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের নীতিনির্ধারকরা তেমন কোনও প্রতিবাদ জানাতে পারছেন বলে সন্তষ্ট হতে পারছি না আমরা। শুধু যে বাংলাদেশের মানবাধিকারকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার, তা নয়। খোদ ভারতের মানবাধিকারকর্মী কিরিটি রায় বলছেন, 'বাংলাদেশ সরকার অন্যায় অবিচারগুলো মুখ বুঁজে মেনে নেয়'। কেননা, আমরা দেখতে পাচ্ছি সীমান্ত হত্যা থামছে না, শুধু বাড়ছেই। সবসময় যে সশস্ত্রভাবে প্রতিবাদ জানাতে হবে, বিষয়টি তেমনও নয়। অতীতে নেপালের সঙ্গেও ভারতের টানাপড়েন দেখেছি আমরা। নতুন সংবিধান প্রণয়নকে কেন্দ্র করে নেপালের ওপর অনানুষ্ঠানিক অবরোধ আরোপ ও দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের নাক গলানোর অভিযোগ তুলেছিল নেপাল। এর প্রতিবাদে নেপালে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেয় দেশটির ক্যাবল টিভির অপারেটররা। আবার কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তান-ভারত টানাপড়েনের ক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভারত থেকে পাকিস্তানি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চলে যেতে বলা হচ্ছে। আবার পাকিস্তানেও ভারতের টিভি চ্যানেলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা কি পারি না, অন্তত এ ধরনের কোনও প্রতিবাদ জানাতে? আমাদের প্রতিবাদের ভাষা হোক শান্তিপূর্ণ। তাই বলে চুপ করে বসে থাকব?

লেখক: সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 

লাইভ

টপ