পরিবর্তনের পক্ষে আমেরিকা

Send
শুভ কিবরিয়া
প্রকাশিত : ১৩:৩২, নভেম্বর ১০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:০০, নভেম্বর ১০, ২০১৬

Shuvo Kibriaসোয়া দুশো বছরের পুরুষতন্ত্রের সাম্রাজ্য ভেঙে আমেরিকা তার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট পাওয়ার পথে হাঁটেনি। ইতিহাস গড়তে পারেনি আমেরিকা। বরং ‘ন্যাস্টি ওয়েমেন ভোটে’- তারা পক্ষ নিয়েছে প্রকাশ্য টেলিভিশন বিতর্কে নারী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য করা উগ্রজাতীয়তাবাদী ঘরানার ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই। এবারের ভোট ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের। আমেরিকার মূলধারার সংবাদ মাধ্যম হিলারির পক্ষে দাঁড়ালেও বর্ণবাদী ঘরানারা সাদারা বেছে নিয়েছেন ট্রাম্পকেই। পুরুষরা পছন্দ করেছে ট্রাম্পকে। নারীদের ভোট কম পেলেও ট্রাম্প বয়সী সাদা চামড়ার আমেরিকানদের মন কেড়েছেন। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’- এই স্লোগান রক্ষণশীলদের মনে দাগ কেটেছে। তাই অভিবাসী কালো, বাদামি আর মিশ্র বর্ণের ভোটাররা হিলারিকে চাইলেও শ্বেত বর্ণের আমেরিকান নাগরিকরা চেয়েছেন ট্রাম্পকে।
সে কারণেই ৪৫তম মার্কিন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব তুলে দিল সেদেশের জনগণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপরেই। তারই হাত ধরে আট বছর পর রিপাবলিকান শিবির পেলো জয়ের মালা।
ট্রাম্প মার্কিন এস্টাবলিশমেন্টের মূলধারার লোক ছিলেন না। তার নির্বাচনি প্রচারে সেই দাবিই তিনি তুলেছিলেন। বলেছিলেন প্রথাগত রাজনীতিকদের বাইরে এসে তার হাতে দায়িত্ব তুলে দিলেই আসবে পরিবর্তন। জনগণের ভেতর নানান বিরোধিতা দেখা গেলেও মার্কিন ভোটারদের বড় অংশ ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পরিবর্তনের পক্ষেই রায় দিয়েছে। প্রথাগত রাজনীতি এক ধরনের ক্লান্তি এনেছিল মার্কিনিদের জীবনে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নানান শংকা। ইসলামের নামে সন্ত্রাসভীতি, অভিবাসনের নামে বহিরাগতদের চাপ মার্কিন জীবনে যে আশঙ্কা ও বিরক্তি এনেছে সেই নেতিবাচক মনোভাবকেই ক্যাম্পেইনের অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করেছেন বেপরোয়া ট্রাম্প। মার্কিন জনগণ তাতেই দেখেছে স্বস্তি।
০২.
এই নির্বাচন ও নির্বাচনি ফলাফলকে ঘিরে কতগুলো পর্যবেক্ষণ লক্ষণীয়।
এক. এই নির্বাচন এবং নির্বাচনি সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে মূলধারার মিডিয়ার বিশ্লেষণ এবং জরিপের সঙ্গে বাস্তবতা মেলেনি। আমেরিকার মূলধারার জনগোষ্ঠীর মনের ভাবনা করপোরেট ও মূলধারার মিডিয়া পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়নি।

দুই. নির্বাচন হাড্ডাহাড্ডি হয়েছে। নির্বাচনপূর্ব প্রচারণায় যেমন তার প্রভাব দেখা গেছে, ভোটের ফলাফলেও তার প্রমাণ মিলেছে।

তিন. সারা পৃথিবীতে এক ধরনের রক্ষণশীল, উগ্র জাতীয়তাবাদের জাগরণ হচ্ছে। মানুষ র‌্যাডিকালাইজেশনের পক্ষ নিচ্ছে। যুদ্ধ-বিগ্রহ-অনাচার মানুষকে অধিকতরভাবে অনুদার ও সন্ত্রস্ত করে তুলছে। মানুষ ধর্ম, জাতীয়তাবাদকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছে। আমেরিকার নির্বাচনেও সাদা বর্ণবাদী এবং গোঁড়া ধর্মবাদীরা ট্রাম্পের পক্ষে দাঁড়িয়েছে একত্রে।

চার. বাংলাদেশসহ এশিয়ার মিডিয়ার পক্ষপাত ছিল হিলারি ক্লিনটনের পক্ষে। এর বড় কারণ, বৃহৎ আমেরিকার যে অংশের সঙ্গে এই অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ সেই ওয়াশিংটন বা নিউইয়র্কের বাইরে বৃহত্তর আমেরিকার মনের খোঁজ আমরা পাইনি বা জানিনি।

পাঁচ. অভিবাসন ইস্যু খুবই স্পর্শকাতর হয়ে দাঁড়িয়েছে এবারের নির্বাচনে। যারা অভিবাসন সূত্রে আমেরিকার নাগরিক হয়েছেন তারা ক্রমশ আমেরিকান জনগোষ্ঠীর জনমিতিতে বড় অংশ হয়ে উঠছেন। উদার অভিবাসন নীতি সচল থাকলে, একসময় অভিবাসী আমেরিকানদের সংখ্যা মূল আমেরিকান নাগরিকদের ছাড়িয়ে যাবে। এই ভীতি মূল আমেরিকানদের রিপাবলিকান শিবিরের দিকে ব্যাপকতরভাবে ঠেলেছে।

ছয়. মার্কিন ভোটারদের বড় অংশ চেয়েছে পরিবর্তন। তারা দুই টার্মে ডেমোক্র্যাটদের দেখেছে। তাদের শাসনামলে অর্থনীতি মন্দা দশা থেকে ন্যূনতম স্বস্তিকর জায়গায় এলেও তাদের ভাগ্যের বড় কোনও পরিবর্তন হয়নি। ট্রাম্প এই পরিবর্তনের পক্ষে ডাক দিয়েছেন। ভালো খাদ্য, স্বাস্থ্য, জীবনের পক্ষে ট্রাম্পই পরিবর্তন আনতে পারবেন, হিলারি নন- এই বিশ্বাস ট্রাম্পের মধ্যে দেখেছেন মার্কিন ভোটাররা। তাই তারা বেছে নিয়েছেন ট্রাম্পকেই।

সাত. আমেরিকা বিশ্বের ওপর প্রভাব হারাচ্ছে বলে মনে করেছেন মার্কিন ভোটারদের বড় অংশ। আমেরিকার ব্যর্থতায় রাশিয়ার পুতিনের উদ্ভব হয়েছে বলেও অনেকের ধারণা। আমেরিকার ব্যর্থতায় ইউরোপের উত্থান ঘটেছে পৃথিবীর রাজনীতিতে। তাই ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাদের অপছন্দ। বারাক ওবামা প্রশাসনের অংশীজন হিলারিকে তাই তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন ব্যাপকতরভাবেই।

০৩.

আমেরিকার এই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রক্রিয়া দেখলে একটা কথা অনস্বীকার্য যে, সেখানে গণতান্ত্রিক সিস্টেম গড়ে ওঠেছে। এতো বৈরিতা ছিল নির্বাচনি মাঠে কিন্তু সুষ্ঠু নিরপেক্ষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদ্ধতিগত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সেখানে কোনও বাধা তৈরি করতে পারেনি। নির্বাচনি ক্যাম্পে ভয়ংকর বৈরিতা ছিল, ছিল চোখে পড়ার মতো বিদ্বেষ কিন্তু নির্বাচনের পরে তা আর চোখে পড়েনি। বরং পরাজিত প্রার্থী নির্বাচনি ফলাফল ঘোষণার সাথে সাথেই বিজয়ী প্রার্থিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বিজয়ী প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে জেতার পর প্রথম ভাষণেই হিলারি ক্লিনটনকে শুভেচ্ছা জানিয়ে জাতির জন্য তার অবদানকে স্বীকার করেছেন।

০৪.

এখন দেখার বিষয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসন কী রকম পরিবর্তন আনে? বলা বাহুল্য এই নির্বাচন মার্কিন জনগণকে দুই শিবিরেই বিভক্ত করেনি বরং বর্ণ-জাতীয়তা-ধর্ম-নাগরিকত্ব প্রশ্নে বিরাট বিভাজন তৈরি করেছে। এক দেশে আসলে দুই মতবাদের মানুষের নবজন্ম হয়েছে। এই বিভাজন আমেরিকার উন্নয়ন অগ্রগতিকে কিভাবে প্রভাবিত করে সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। নির্বাচনি প্রচারণায় যে পরিবর্তনের কথা ট্রাম্প জানিয়েছেন সেই পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে আপামর মার্কিন জীবনে তার প্রভাব কী পড়বে সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।

এই বিভাজনের বিপদ ট্রাম্পকেও ভাবিয়েছে। তাই নির্বাচনে বিজয়ের পর প্রথম তাৎক্ষণিক ভাষণে ট্রাম্প বলেছেন, এখন সময় বিভাজনের আঘাতটা নিরাময়ের। একত্র হওয়ার সময় এখন। রিপাবলিকান, ডেমোক্র্যাট, স্বতন্ত্র সবার এখন একত্র হয়ে একক জাতি হিসাবে দাঁড়াবার এটাই সময়। এই ভাষণে ট্রাম্প তার ভাষায় আমেরিকার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থনীতিতে দুই অংকের প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের ঘোষণাও দিয়েছেন ট্রাম্প। যে কোনও মূল্যে আমেরিকার স্বার্থই সর্বাগ্রে প্রতিষ্ঠার কথাও আছে তার এই বক্তব্যে।

০৫.

এখন প্রশ্ন হলো যে পরিবর্তনের পক্ষে মার্কিন জনগণ হাড্ডাহাড্ডি ভোটের লড়াই চালিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিজয়ী করলো সেই পরিবর্তন এলে প্রকৃতই কি বিশ্ববাসির সুখ বাড়বে? নাকি যুদ্ধ, ঘৃণা আর বিদ্বেষের সুর নতুন করে বেজে ওঠবে। অতীতে জর্জ বুশ জমানার পাপের খেসারত দিতে হচ্ছে গোটা পৃথিবীকে। মানুষ সেই অশান্তি, গৃহযুদ্ধ আর শরণার্থী হওয়ার জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে শান্তির স্বদেশ নির্মাণে পথ চলতে চাইছে। গত একদশকে একদিকে ইসলামোফোবিয়া আর অন্যদিকে  নিজের স্বার্থসুরক্ষার নীতিতে অটল থেকে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে ধ্বংস করেছে আমেরিকান স্টাবলিশমেন্ট। পৃথিবীর একটা বড় অংশজুড়েই গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপিত  করে নানা ঘরানার কর্তৃত্ববাদী শাসনকে উৎসাহিত করেছে মার্কিন কূটনীতি। লক্ষ লক্ষ মানুষকে গৃহচ্যুত করে শরণার্থী বানিয়েছে। মানুষকে মানুষ হিসাবে না দেখে স্বার্থসিদ্ধির মেশিন হিসাবে দেখেছে আমেরিকা। তার ফলশ্রুতিতে আমেরিকার স্বার্থ সুরক্ষিত হলেও বিশ্বব্যাপী বেড়েছে অশান্তি। মার্কিন এই নীতি সে দেশের অভ্যন্তরে নানান ঘাত-প্রতিঘাত তৈরি করেছে। তার ফলাফল ওঠে এসেছে এই নির্বাচনে। আরও অর্থোডক্স, আরও কট্টর নীতির সমর্থকরা সরব হয়েছে আমেরিকাজুড়ে। তারই ফলাফল ট্রাম্পের উত্থান। মার্কিনিদের এই পরিবর্তন আকাঙ্ক্ষা তাই ট্রাম্পকে বিজয়ী করলেও পৃথিবীবাসিকে কতটা নিরাপদ করবে দেখার বিষয় এখন সেটাই।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ