সৈয়দ আশরাফ কি ভোটে হেরে যেতেন?

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১২:১৫, নভেম্বর ১২, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:১৭, নভেম্বর ১২, ২০১৬

আমীন আল রশীদআওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ওবায়দুল কাদের। এটিকে তিনি তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার বা অর্জন বলে আখ্যা দিয়েছেন। দলের নেতাকর্মীরাও তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত করেছেন।
পক্ষান্তরে প্রচারবিমুখ, সৎ ও নিপাট ভদ্রলোক বলে পরিচিত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এখন প্রেসিডিয়ামের সদস্য। প্রেসিডিয়াম হচ্ছে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় নীতিনির্ধারণী ফোরাম। কিন্তু তারপরও সৈয়দ আশরাফকে সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া বা কাউন্সিলরদের ভোট/মতামতের ভিত্তিতে তার পুনরায় সাধারণ সম্পাদক হতে না পারাও আলোচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে যখন আমরা বলি, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আগে দলের ভেতরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা জরুরি। তারও আগে জরুরি ব্যক্তিগত জীবনে প্রত্যেককে গণতান্ত্রিক মানসিকতা লালন।
যদি তাই হয় তাহলে এ প্রশ্ন তোলাও অন্যায় নয়, যদি আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক পদে ভোটা হত, তার ফলাফল কী হত? সৈয়দ আশরাফ কি হেরে যেতেন? এই প্রশ্ন শুনে কেউ পাল্টা প্রশ্ন করতে পারেন, কী করলে কী হত- তা দিয়ে রাজনীতি চলে না। তাছাড়া সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ওবায়দুল কাদেরের নাম প্রস্তাব করেছেন খোদ সৈয়দ আশরাফ নিজেই। সুতরাং কেন আর ভোটের প্রশ্ন?
প্রশ্নটা এ কারণে যে, আমরা বলছি রাজনৈতিক দলগুলোর কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে দলের ভেতরে গণতন্ত্র বিকশিত হয়। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় রাজিনৈতিক দল এবং প্রতিষ্ঠার পর থেকে যে দলটি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই-সংগ্রাম করছে, সেই দলটি তাদের সাধারণ সম্পাদক পদে কেন ভোটাভুটির আয়োজন করতে পারল না? কেন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ওবায়দুল কাদেরের নাম প্রস্তাবের সঙ্গে সঙ্গে কাউন্সিলররা হাততালি দিলেন এবং কেন কাউন্সিলরদের মধ্য থেকে এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বিকল্প কোনও প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করলেন না অথবা কেন তারা ভোটাভুটির দাবি তুললেন না? যদি প্রস্তাব আর মনোনয়নের মধ্য দিয়েই দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে যায়, তাহলে সেই দলের ভেতরে কতুটুক গণতন্ত্রের চর্চা আছে বলে আমরা বিশ্বাস করব?

দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম কি স্বেচ্ছায় ওবায়দুল কাদেরের নাম প্রস্তাব করেছেন নাকি এটি করতে তিনি বাধ্য হয়েছেন? যদি সৈয়দ আশরাফ স্বেচ্ছায় এই কাজটি করে থাকেন, তাহলে অবশ্যই বলতে হবে, তিনি মহান। আর যদি তিনি এটি করতে বাধ্য হন এবং বিতর্ক এড়াতে তাকে দিয়েই ওবায়দুল কাদেরের নাম প্রস্তাব করানো হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হবে, আমরা যে গণতন্ত্রের কথা বলি, দলের ভেতরে সুস্থ প্রতিযোগিতা আর নেতৃত্ব বাছাইয়ে যে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার কথা বলি, অন্য দলগুলোর ভেতরে তো বটেই- আওয়ামী লীগেও তার অনুপস্থিতি রয়েছে-যা কাম্য নয়।

কাউন্সিলের আগে থেকেই একটা গুঞ্জন ছিল যে, ওবায়দুল কাদেরই হচ্ছেন আওয়ামী লীগের পরবর্তী সাধারণ সম্পাদক। এতে নিশ্চয়ই দোষের কিছু নেই। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দলের প্রতি তার ত্যাগ অপরিসীম। দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলারও ভিকটিম তিনি। তাছাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার মতো সব যোগ্যতাই তার আছে। কিন্তু তিনিই যদি কাউন্সিলরদের মৌখিক মতামতের বাইরে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে তিনি নির্বাচিত হতেন, তাহলে সেটি কি আরও বেশি গণতান্ত্রিক হত না?

যদি ভোট হত এবং সেখান যদি সৈয়দ আশরাফ প্রার্থী হতেন, তাহলে তিনি জয়ী হতেন কী হেরে যেতেন, তা আমরা জানি না। তবে ভোট হলে কাউন্সিলররা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতেন। শুধু হাত তুলে সমর্থন জানানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটা শুভসূচনা হতে পারতো এবং আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের কাছ থেকে এটিই প্রত্যাশিত।

কিন্তু না। আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও শীর্ষ নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তারা একেবারেই স্বৈরতান্ত্রিক অথবা পরিবারতান্ত্রিক। কারণ প্রধান দুই দলের প্রধান যে দুটি পরিবার থেকেই হবেন- তা নিয়ে সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিমত না থাকলেও, অন্তত দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা অর্থাৎ সাধারণ সম্পাদক বা মহাসচিব কে হবেন- তা নির্ধারণেও সাধারণ নেতাকর্মীদের কোনও ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। তারা কাউন্সিলে যাবেন, প্রস্তাব শুনবেন এবং জাতীয় সংসদে বিল পাসের মতো ‘হ্যাঁ’ বলে সম্মতি জানাবেন। কোনও বিরোধিতা বা ভিন্নমতের সংস্কৃতি এখনও দলগুলোর ভেতরে গড়ে ওঠেনি। ফলে দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা কে হবেন- তা নির্ধারণের একমাত্র এখতিয়ার দলীয় প্রধানেরই।

লেখক: যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ