রোহিঙ্গা-রক্তে মুনাফার গন্ধ

Send
বাধন অধিকারী
প্রকাশিত : ১৭:০১, ডিসেম্বর ১২, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:৩৮, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৬

বাধন অধিকারীমিয়ানমারের রাখাইন কিংবা আরাকান নামের রাজ্যটি এখন এক বীভৎস মৃত্যুপুরী। প্রচণ্ডতায় না হলেও, বৈশিষ্ট্যের সমিলের কারণে একে আপনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইহুদি নিধনে ব্যবহৃত গ্যাস চেম্বারের সঙ্গে তুলনা করতে পারবেন।মিয়ানমার সে দেশে শত শত বছর ধরে বসবাসরত রোহিঙ্গা নামের একটি জনগোষ্ঠীকে স্রেফ নির্মূল করার চেষ্টা করছে। প্রত্যক্ষ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে জারি রাখা হয়েছে ধারাবাহিক হত্যা আর ধর্ষণ-যৌন নিপীড়নের বাস্তবতা। সেখানে থাকার উপায় নাই, কেননা বাড়িঘরগুলো সব পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। খোলা আকাশও নিরাপদ নয়, কেননা হেলিকপ্টার থেকে নিত্য মর্টার সেল পড়ছে। তাই আকাশে তাকিয়ে খোদা তালাহকে ডাকার কোনও পথ নেই। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা সম্মিলিতভাবে  আরাকানে রোহিঙ্গা নিধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে। যখন তারা থেকে যেতে চায় নিজ বাসভূমে, তখন জ্বালিয়ে দেওয়া হয় ঘরবাড়ি। ধর্ষণ করা হয় নারীদের। শিশুদেরও রেহাই দেওয়া হয় না। আবার বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে চাইলেও শিকার হতে হচ্ছে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের আক্রমণের। এতো গ্যাসচেম্বারে পুড়িয়ে মারার মতোই! ‘গণতন্ত্রপন্থী’ নেত্রী সু চি’র নোবেল থেকে পশ্চিমা সাম্রাজ্য বাসনার তেজস্ক্রিয়া হচ্ছে যেন! শনাক্ত হচ্ছে অশান্তির উৎস!

জাতিসংঘ মিয়ানমার পরিস্থিতিকে এথনিক ক্লিনজিং কিংবা জাতিগত নির্মূল প্রক্রিয়া আখ্যা দিতে বাধ্য হয়েছে। তারপর থেকে এপর্যন্ত খোদ জাতিসংঘের হিসাবে মিয়ানমারের চলমান সংঘর্ষে এপর্যন্ত ৮৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে।  ওই বিশ্ব সংস্থর হিসেবে সাম্প্রতিক সংঘর্ষে সেখানে এ পর্যন্ত ৩০ হাজার মানুষ ঘর হারিয়েছেন। মার্কিন কংগ্রেস এবং এইচআরডব্লিউ-এর মতো তাদের দেশীয় এনজিওগুলোও মিয়ানমারের রাজনীতিতে সেনা হস্তক্ষেপ এবং রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিপীড়নের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। স্যাটেলাইট ইমেজে রোহিঙ্গা গ্রামের পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি আর বিপন্নতার চিত্র তুলে এনেছে তারা। অথচ বলপ্রয়োগের ন্যায্যতার অন্যায্য সূত্র প্রয়োগ করে মিয়ানমার ডাহা মিথ্যে বলছে। বলছে রাখাইন রাজ্যে যা চলছে, তা আদতে হামলাকারীদের খোঁজে 'ক্লিয়ারেন্স অপারেশন'। ‘পরিচয়ের রাজনীতি’র পরিচিত ডিসকোর্স ব্যবহার করছে তারা। ‘গড় পড়তায় মুসলমান মাত্রই সন্ত্রাসী’ ডিসকোর্সের আড়াল থেকে তারা বলছে, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ইসলামি চরমপন্থী অংশকে দমন করতেই অভিযান চালানো হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সু চি একধাপ এগিয়ে বলছেন, ‘মিয়ানমার নিয়ে  অতিরঞ্জন হচ্ছে’।


কোনও অতিরঞ্জন যে হচ্ছে না, তার প্রমাণ মেলে নাফ নদীর ওপার থেকে বাংলাদেশের সীমান্তের দিকে ধেয়ে আসা বিপন্ন মানবতার দিকে দৃষ্টি দিলে। এদের দূরে ঠেলতে পারে না বাংলাদেশের মানুষ। রাষ্ট্র্রীয়ভাবে বংলাদেশে রোহিঙ্গাদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মানুষ যখন নাফ নদীর ওপারে জীবন-মৃত্যুর সীমার মধ্যকার দূরত্ব কমতে দেখছে প্রতিদিন, তখনও তারা ভুলছে না রোহিঙ্গা মুসলমান পরিচয়ের আড়ালে ওরা আমাদেরই মতোন লাল রক্তের মানুষ। অভিবাসন কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বাংলা ট্রিবিউন সবার আগে পাঠককে জানিয়েছে, মিয়ানমারের এবারের দমন প্রক্রিয়ায়  ২১ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।

রোহিঙ্গারা তাদের বাস্তবতার কারণেই বাংলাদেশে বিভিন্ন অপরাধকর্মে জড়িয়ে যায়। আর রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নিজেদের বিপন্নতাও কম নয়। তাছাড়া, বৈধপথে রোহিঙ্গা প্রবেশের ব্যবস্থা করে দিলে মিয়ানমারের জাতিগত নির্মূল প্রক্রিয়াই ত্বরান্বিত হবে; খোদ জাতিসংঘ বিষয়টিকে এমন করে দেখছে। তাই বাংলাদেশের সরকার রোহিঙ্গা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। কিন্তু পাঠক ভেবে দেখুন তো একবার, রাষ্ট্রীয় অবস্থানে সামিল হয়ে বাংলাদেশের জনগণও যদি রোহিঙ্গাদের পথ আটকাতে চাইত, তাহলে কি রাখাইন রাজ্যের ঘর হারানো ২১ হাজার মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারত? ভাবতে গর্ববোধ করি, এই ভূখণ্ডের মানুষের যৌথ স্মৃতির ঐতিহাসিক ভাণ্ডারে সুমহান একাত্তর। একাত্তরের মুক্তির লড়াইয়ের দিনগুলোতে শরণার্থী জীবনের নিদারুণ যন্ত্রণাকে যাপিত জীবনের মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ করার পরম্পরাগত স্মৃতি রয়েছে আমাদের যৌথ অবচেতনায়।পাকিস্তানি হানাদারদের দমনপীড়নে মানবাত্মার বিপন্ন আর্তনাদ কিভাবে যশোর রোড থেকে কলকাতায় পথ হেঁটেছিল, মনে রেখেছে এই জনগোষ্ঠী। তাই রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের মানুষের মন পোড়ায়। কখনও মানবাত্মার আহ্বানে, কখনোবা আবার ধর্মীয় ঐক্যের নাম করে। আর বাংলাদেশের মানুষের এই মানবিক উদ্যোগের বিপরীতেই ওৎ পেতে বসে থাকে মুনাফাবাজ বাজার অর্থনীতির লালসা। রোহিঙ্গা রক্তে মুনাফার গন্ধ খোঁজে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য পরাশক্তিগুলো।

৮ অক্টোবরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম খবর দেয়, মিয়ানমারে ১৯৮৯ সালে জারিকৃত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউস তখন জানায়, গণতন্ত্রের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করায় নির্বাহী আদেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাদের ওপর থেকে আংশিক বাণিজ্য-নিষেধাজ্ঞা (১৯৮৯ সালে জারিকৃত বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা) প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের একদিন বাদে আরাকান রাজ্যে শুরু হয় হামলাকারীদের খোঁজে কথিত ক্লিয়ারেন্স অপারেশন। আর সেই অপারেশনের নামে চলমান জাতিসংঘ ঘোষিত এথনিক ক্লিনজিং (জাতিগত নির্মূল প্রক্রিয়া) আর মানবতাবিরোধী অপরাধকর্মের মধ্যেই আরেক ধাপে বাণিজ্য-নিষেধাজ্ঞা প্রত্যারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। জাতিসংঘের ‘এথনিক ক্লিনজিং’ ও দুই দফার মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সচিত্র তথ্যপমাণ সত্ত্বেও তারপরও মিয়ানমারে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি দেখতে পান বারাক ওবামা।

২ ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে উল্লেখ করে সেনাবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান সদস্যরা সংশ্লিষ্ট আছেন, এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা। নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনে জানায়, মিয়ানমারে নির্বিচারে রোহিঙ্গা নিধন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে থাকায় ওয়াশিংটন বেশ গোপনেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। বস্তুত  গত সেপ্টেম্বরে সু চি যখন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন, বারাক ওবামা তখন তাকে এই প্রতিশ্রুতি দেন। অবরোধ প্রত্যাহার শুরু হয় তারও আগে থেকে। মে মাসে মিয়ানমারের ১০টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, কাঠ এবং খনি কোম্পানির বিরুদ্ধে অবরোধ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

আসলে কথিত গণতান্ত্রিক সংস্কার কর্মসূচি কিংবা বেসামরিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর নয়, মিয়ানমারে নির্বাচনটাই হয়েছে সেখানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের স্বার্থে। dmWfbmfhujমিয়ানমারের বাজারে মার্কিন কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং ওবামার এশীয় পররাষ্ট্রনীতি ‘পিভট টু এশিয়া’ বাস্তবায়নের স্বার্থে।  বছরের পর বছর ধরে গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে যাকে তুলে ধরা হয়েছে, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে; সেই অং সান সু চি আদতে কোনোদিনই যথার্থ ‘গণতন্ত্রে’র প্রতিনিধি নন। মুসলিম বিদ্বেষী, জাত্যাভিমানী এই মানুষটি আদতে শান্তির দূত নয়, যুক্তরাষ্টের বাণিজ্যদূত। মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য-বাসনা পূরণেই দূতিয়ালি করেছেন সু চি। শাসন ব্যবস্থায় তাই সেনাকর্তৃত্বও অব্যাহত রয়েছে, আবার সু চিও রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা হয়ে আছেন। যারা প্রশ্ন করছেন, সু চি কিছু করছেন না কেন, তারা ভুল বুঝছেন। তিনি তো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি আর মিয়ানমারের সেনাকতৃর্ত্বের মধ্যকার হাইফেন।  কিছু করবেন কী করে!

২০০৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার এশিয়া নীতি ‘পিভট টু এশিয়া’র আলোকে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ নেন। সেবছরের মার্কিন-আসিয়ান সম্মেলনে মিয়ানমারের সেনাসমর্থিত প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের সঙ্গে বৈঠকে সুচির মুক্তির জন্য ব্যক্তিগতভাবে সুপারিশ করেন ওবামা। মিয়ানমারও তখন চীনের থেকে মুখ ফিরিয়ে তা পশ্চিমের দিকে ঘুরিয়ে  নেয়। ২০১১ মালে কথিত গণতান্ত্রিক সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে সেখানে গঠিত হয় আধা সামরিক সরকার। ওই বছরই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন মিয়ানমার সফর করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আশ্বাস দেন। ২২ বছর পর নেইপিদোতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতও নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১২ সালে প্রথম কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইয়াঙ্গুন সফর করেন ওবামা। ৪৭ বছরের মধ্যে প্রথম কোনও মিয়ানমার নেতা হিসেবে ২০১৩ সালে ওয়াশিংটন সফর করেন থেইন সেইন। ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বার মিয়ানমার সফর করেন ওবামা। এর এক বছরের মাথায় ২০১৫ সালের নভেম্বরে কথিত গণতান্ত্রিক সংস্কার কর্মসূচির আওতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রত্যক্ষ সামরিকতার আংশিক অবসান হয়। তবে যা শুরু হয়, তা আমার কাছে সামরিক ক্ষমতার রাজনৈতিক বৈধতা বলে প্রতিপন্ন হয়।

এনএলডির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরও যখন অগণতান্ত্রিক কায়দায় শাসন ক্ষমতায় সামরিক বাহিনী নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করে রাখতে সমর্থ হয়, তখন সেটা কেমন ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার’!  কথিত গণতন্ত্রের নেত্রী সু চি ক্ষমতার খানিকটা ভাগ নিয়ে সামরিকতার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করেছেন। মিয়ানমারে তাই সিভিল-সামরিক ডি-ফ্যাক্টো শাসনব্যবস্থা জারি হয়েছে। তা সত্ত্বেও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এনএলডি ক্ষমতায় আসায় ওয়াশিংটনে সু চিকে ওবামা উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। বস্তুত গণতন্ত্র-ফণতন্ত্র কিছু না, বাণিজ্য দূত সু চির মাধ্যমে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কর্তত্বের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করছেন ওবামা।  দূরবর্তী বাসনা ভূ-রাজনৈতিক, তথা সামরিক বলেই সম্ভবত মিয়ানমারের শাসন ক্ষমতায় স্পষ্টতর সামরিক কর্তৃত্ব অনেকটা নীরবে মেনে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

সহজ করে এক বাক্যে বললে ওবামার ‘পিভট টু এশিয়া’ আসলে এশিয়ায় শক্তিমান হয়ে ওঠা চীনকে কোনঠাসা করে মার্কিন বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নীতি। পূর্ব এশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে রুখতে তাদের অন্যতম মিত্র জাপান। পাশাপাশি উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে চীনবিরোধী ভারতকেও পাশে রাখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। ‘পিভট টু এশিয়া’ নীতি বাস্তবায়নে ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং দেশের অভ্যন্তরে থাকা বিপুল পরিমাণের প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে  স্ট্রাটেজিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মিয়ানমার। আন্দামান ও ভারত মহাসাগর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ানমারকে দরকার।

কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, মিয়ানমারে নজর রয়েছে আরও দুই পরাশক্তির। দীর্ঘদিন মিয়ানমারের সামরিক শাসনকে মদত দিয়ে সেখানে আগ্রাসী অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব জারি রাখা চীন এই ডি ফ্যাক্টো সরকারের সময়েও সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে চায়। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে চীন এবং মিয়ানমার দুটি হাসপাতাল নির্মাণে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। মিয়ানমারের শান রাজ্যে সেতু নির্মাণেও দেশ দুটি একমত হয়েছে। ওই সেতু নির্মাণ করা হলে চীন-ভারত-মিয়ানমারের অর্থনৈতিক অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে। অর্থনৈতিক  পরাশক্তি হয়ে ওঠা চীনের ঐতিহ্যগত উত্তরাধিকার হিসেবে সিল্ক রুট ফিরিয়ে আনার ওয়ান বেল্ট-ওয়ান রোড’ নীতি বাস্তবায়নের সঙ্গে সংযুক্ত ওই নীতি। আবার সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আঞ্চলিক কর্তত্ব প্রতিষ্ঠার বাসনা রয়েছে ভারতেরও। মোদির ‘নেইবার ফার্স্ট’ নীতির অধীনে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্টতাকে পাশ কাটিয়ে এককভাবে মিয়ানমারে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বাসনা রয়েছে দিল্লিরও। মিয়ানমার নিজেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ‘ওবামার এশীয় বাণিজ্যদূত’ সু চি’র নেতৃত্বে  পররাষ্ট্রবিষয়ক অবস্থান নিয়ে ভেল্কি দেখিয়ে চলেছে। চীনকে পাশ কাটিয়ে পশ্চিমের সঙ্গে মৈত্রী তৈরি করে ক্ষমতার ভাগ নিয়েছেন সু চি। তবে ক্ষমতায় এসেই চীনা নেতৃত্বের সঙ্গে সুসম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। রোহিঙ্গাবসতির মধ্য দিয়েই স্থাপিত হচ্ছে চীন-মিয়ানমার পাইপলাইন।  এ এলাকার সব ‘অবৈধ’ স্থাপনা উচ্ছেদ করার ঘোষণা দিয়েছে মিয়ানমার।

তাহলে রোহিঙ্গারা নিপীড়িত হলে চীন কেন কিছু বলবে? যে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারকে স্ট্যাটেজিক্যালি ব্যবহার করে পিভট টু এশিয়া নীতি বাস্তবায়ন করবে, তারাই বা রোগিঙ্গা দমন নিয়ে কঠোর হতে গিয়ে বাণিজ্যিক বাসনা ত্যাগ করবে কেন? ভারতের কী লাভ, বৃথা ঝামেলায় জড়িয়ে? সবার লোভ তো মিয়ানমারের বাজারে। মুনাফার গন্ধে। মালয়েশিয়ার সরকার প্রধান না হয় তার দুর্নীতি আড়াল করতে রোহিঙ্গা প্রশ্নে সরব হয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন! অন্যদের কী লাভ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কথা ভেবে? তাদের রক্তেও তাই মুনাফারই হিসাব করে যায় পরাশক্তিগুলো। লোভটাই সব। মানবাধিকার-গণতন্ত্রের জিকির ফালতু কথা।

এমনি করেই বিপন্ন মানবিকতাকে পুঁজি করে নিজ নিজ আখের গোছানোর প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছে ক্ষমতাশালীরা। সামরিক-বেসামমরিক আমলাতন্ত্রের আধুনিক জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার ছায়াতলে ব্যক্তি-ক্ষমতার দানবীয় করপোরেট পুঁজি মুনাফার বাসনাকে দিনকে দিন আরও বেশি করে রক্তলোলুপ করে চলেছে। পৃথিবীর ইতিহাসের সাপেক্ষে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্ম খুব বেশি দিনের নয়। ইউরোপে দুইশ বছরের মাত্র কিছু বেশি সময় আগে এই জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার বিকাশ। এর আগ পর্যন্ত অভিবাসন ছিল এক নিরন্তর প্রক্রিয়া। অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধ জীবন কিংবা অজানাকে জানার জন্য মানুষ নিরন্তর খুঁজে ফিরেছে শ্রেয়তর আবাস, শ্রেয়তর জীবন। মানুষের  সেই অবিরত চলার পথ রুদ্ধ করেই সীমান্ত আর কাঁটাতারে বিভক্ত করা হয়েছে বিশ্বজগতকে। ক্ষমতাশালীরা জাতিরাষ্ট্র নাম দিয়ে ভাগ করে নিয়েছে অবিভক্ত পৃথিবীর এক একটি অঞ্চল। মানুষকে বানিয়েছে নাগরিক আর ভোটার। কিন্তু হায়! মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা এমনকী সেই নাগরিক কিংবা ভোটারও নয়। এক রাষ্ট্র কেবলই তাদের তাড়াতে চায়, অন্য রাষ্ট্রেও আশ্রয় মেলতে চায় না। পৃথিবীর সব ভূখণ্ডের দখল জাতিরাষ্ট্রের হাতে। বেনাগরিক রোহিঙ্গারা তবে এবার কোথায় যাবে?

লেখক:  ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক ইন চার্জ, বাংলা ট্রিবিউন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ