বাংলা একাডেমি কী বোঝাতে চায়?

Send
শেরিফ আল সায়ার
প্রকাশিত : ১৬:২৯, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৭, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৮

শেরিফ আল সায়ারশুরু করি একটা ঘটনা দিয়ে। ২০১২ সালের নভেম্বরে ভারতের কট্টরপন্থী রাজনৈতিক নেতা বাল কে ঠাকরে মারা যান। তার মৃত্যুর খবরে পুরো মুম্বাই শহর অচল হয়ে পড়ে। দোকানপাট সব বন্ধ। নাগরিকরা পড়লেন মহাবিপাকে। তখন ২১ বছরের একজন নারী ফেসবুকে এই অচল হয়ে পড়ার সমালোচনা করে স্ট্যাটাস দিয়ে বসেন। এই স্ট্যাটাসের পরপরই তাকে গ্রেফতার করা হয়। শুধু যে তাকে গ্রেফতার করে বিষয়টা ক্ষান্ত হয়েছিল, তাও নয়। এই নারীর স্ট্যাটাসে প্রথম যিনি লাইক ও কমেন্ট করেছেন, তাকেও কারাগারে নেওয়া হয়। অভিযোগ ছিল ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’।  এই ঘটনাটা মনে পড়লো সম্প্রতি প্রকাশনী সংস্থা শ্রাবণকে বাংলা একাডেমির বইমেলায় দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করার পর।
সবকিছুর মধ্যে ধর্মকে টেনে আনা যেন একটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাচ্ছে আমাদের। যাইহোক, বাংলা ট্রিবিউনের সংবাদেই আছে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বলতে চেয়েছেন, ব-দ্বীপ প্রকাশনীকে বন্ধ করে দেওয়ার পর প্রকাশক রবিন আহসান প্ল্যাকার্ড নিয়ে এর প্রতিবাদ করেছিলেন। এটা নাকি বাংলা একাডেমির স্বার্থের পরিপন্থী! এজন্যই তাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এও বোঝাতে চেয়েছেন, যে বই ধর্মকে আঘাত করে, সেই বইয়ের পক্ষে কেন তারা কথা বলবে?
তার মানে প্রতিবাদের কারণেই তাকে খড়গ দিয়ে আটকে দেওয়া হলো? বই নিষিদ্ধ করা নতুন কিছু নয়। হুমায়ূন আজাদের ‘নারী’ বইটিও নিষিদ্ধ হয়েছিল, তসলিমা নাসরিনের বই ‘লজ্জা’ও নিষিদ্ধ হয়েছিল। তাতে কী? বিশ্বজুড়েও বই নিষিদ্ধ হওয়ার নজির আছে। কিন্তু রবিন আহসানরা কি বইয়ের ওপর থেকে ‘নিষেধাজ্ঞা’ উঠিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন? আমি যতটুকু জানি তারা বইয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেওয়ার জন্য প্রতিবাদ করেননি। রবিন আহসানরা সেদিন ব-দ্বীপ প্রকাশনীর প্রকাশককে গ্রেফতারের প্রতিবাদ করেছিলেন। একজন প্রকাশক গ্রেফতার হলে তাকে দড়ি বেঁধে কারাগারে নিয়ে যাওয়া কোনও সভ্য সমাজের দৃষ্টান্ত নয়। সেটার বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ হয়েছিল। এখন সেই কারণে রবিন আহসানের ওপর ক্ষোভ থাকতে পারে একাডেমির। তাহলে রবিন আহসানের প্রকাশনী শ্রাবণ কী দোষ করলো?

এই ঘটনার সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো, রবিন আহসানের প্রকাশনী যে নিষিদ্ধ হয়েছে, তা তাকে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়নি। তার কাছে কোনও ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়নি। তিনি যখন মেলায় অংশ নেওয়ার জন্য ফরম আনতে যান, তখনই জানতে পেরেছেন শ্রাবণ নিষিদ্ধ। একটি টিভি চ্যানেলে দেখলাম রবিন আহসান বলছেন, ৪০ দিন আগের সিদ্ধান্ত তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তার মানে মুখের কথায় ইচ্ছা হলো তো যেকোনও প্রকাশনী সংস্থাকে ‘নিষিদ্ধ’ করার অধিকার বাংলা একাডেমি রাখে! আমি বাংলা একাডেমির এই ফ্যাসিস্ট কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানাই।

এই ঘটনাটা সবার জন্যই ভয়ঙ্কর। এটা এক রবিন আহসানের জন্য কোনও বার্তা নয়। এটা বাংলাদেশের সব লেখক-প্রকাশকের জন্য ভয়ানক বার্তা। বাংলা একাডেমি বোঝাতে চাইলো—‘কোনও প্রতিবাদ করবা তো খবর আছে’।

এই ‘খবর আছে’ বার্তা পেয়েও অনেক প্রকাশক লেখক নিশ্চুপ ভূমিকায় আছেন। সরকারকে তুষ্ট করা শিল্পীসমাজ-লেখকসমাজ এ দেশের জন্মলগ্ন থেকেই ছিল। এখনও থাকবে, স্বাভাবিক। কিন্তু পিঠ বাঁচিয়ে বেশিদিন চলা যায় না। একদিন না একদিন ঠিকই নিজের পিঠে হানা পড়তে পারে।      

রবিন আহসান আমার কোনও বইয়ের প্রকাশক নন। আমার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে খুব যে পরিচয় আছে, তাও নয়। তবে আমি শত রবিন আহসানের জন্য শঙ্কিত। আমি লেখক হিসেবেও শঙ্কিত। কারণ এই উদাহরণ রাষ্ট্রের মৌলবাদীদের উৎসাহিত করলো। হেফাজতের এক হুমকিতে যদি প্রকাশনী বন্ধ হয়, প্রকাশক গ্রেফতার হয়, বই নিষিদ্ধ হয়,  এসবের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরেক প্রকাশনীকে নিষিদ্ধ করা হয়, তবে যে হুমকি দিলো, তার বিরুদ্ধে আপনি কী ব্যবস্থা নিলেন? গোড়ায় তো গলদ রেখেই দিলেন। বরং যত লেখক প্রকাশকের ওপর হামলা হয়েছে, তাদের বিষয়ে বাংলা একাডেমির কর্তাদের মুখ দিয়ে সহজে কোনও শব্দ বের হয়নি। এই বাংলা একাডেমির বইমেলার কাছে লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা হলো। তখন তাদের কী ভূমিকা ছিল? যখন আহমেদুর রশীদ টুটুলের ওপর হামলা হলো এবং ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হলো, তখন তাদের ভূমিকা কী ছিল? কোনও ভূমিকাই তারা রাখেনি। প্রগতির পক্ষে যাদের লড়াই তাদের পাশে বাংলা একাডেমিকে গত কয়েক বছরে দাঁড়াতে দেখিনি। কোনও ক্রাইসিস মোমেন্টে বাংলা একাডেমির কেউ কোনও কথা বলেনি। তারা আছেন, কে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে, কথা বলছে, সেসব নিয়ে।

বাংলা একাডেমিকে হওয়ার কথা ভলতেয়ারের সেই বাণীর মতো। ভলতেয়ার বলেছিলেন, তোমার সঙ্গে আমি একমত নই। কিন্তু তুমি যেন তোমার এই বক্তব্য দিয়ে যেতে পারো, সে জন্য আমি প্রাণও দিয়ে দেব।
বাংলা একাডেমি যেন রিভার্স-ভলতেয়ার যুক্তির মতো হয়ে গেল। আমি জানি তুমি যা বলবে, সেটা আমার জন্য হয় বিপজ্জনক কিংবা ভালোও হতে পারে। তাই তুমি আমার বিরুদ্ধে যা বলবে, আমি আমার বাকস্বাধীনতা রক্ষা করে তোমাকে থামিয়ে দেব।

এটা তো জানা কথা—রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো বাংলা একাডেমি। যেই বাংলা একাডেমি সোচ্চার হওয়ার কথা মৌলবাদের  বিরুদ্ধে, সেই বাংলা একাডেমিই আচরণ করছে মৌলবাদীদের মতো। মুক্তমত যাদের স্লোগান হওয়ার কথা, তারাই যেন বলছে, কিসের মুক্তমত?

মহাপরিচালক কারও কথায় এসব সিদ্ধান্ত নেন নাকি যেচে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেন, সেটা আমরা বুঝব কী করে? তবে বাস্তবতা হলো এমন সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছেন। এতে লাভ হলো নাকি ক্ষতি হলো? লাভ হলো বাংলা একাডেমি যে ধর্মীয় ইস্যুতে ‘সাবধানী’ সেটা প্রচার পেলো। আর ক্ষতি হলো—বাংলা একাডেমির মেরুদণ্ড যে ‘বাঁকা’ সেটা প্রমাণিত হলো। রাষ্ট্রের যেই একাডেমি সোজা হয়ে অন্যকে বুক উঁচিয়ে কথা বলতে বলবে, সেই একাডেমি ইশারায় বলে দিলো, ‘প্রতিবাদ করা যাবে না। কথা কম বলো এবং যা বলবে সাবধানে বলো’। আরেকটি বিষয় হলো, রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন ব্যক্তির জন্য পুরো একাডেমিকে তুলোধুনো করা হচ্ছে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে যে মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় করা হচ্ছে, তাতে একাডেমির অন্য যারা সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের খারাপ লাগছে না? অবশ্যই লাগছে। কিন্তু তাদেরও তো নিশ্চয়ই সেটা বলার অধিকার নেই। এছাড়া বিশ্বব্যাপী এ বিষয়টা তো প্রচার পাচ্ছে। বাংলা একাডেমি ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি কি ক্ষুণ্ন হচ্ছে না?

বাংলা একাডেমি গত দুই বছর ধরেই বাকস্বাধীনতায় হাত দিচ্ছে। ২০১৫ সালে রোদেলার ওপর খড়গ, ২০১৬ সালের মেলায় ব-দ্বীপ প্রকাশনীর ওপর খড়গ এবং একই বছর শেষ করলো শ্রাবণ প্রকাশনীকে দিয়ে। এই বাকস্বাধীনতা হরনের মধ্যে দিয়ে ব্যবসায়ীকভাবেও তো শ্রাবণ প্রকাশনী ক্ষতিগ্রস্ত হলো। এটা ডিসেম্বরের শেষ সময়। বইমেলাকে সামনে রেখে অনেক লেখক নিশ্চয় তাকে পাণ্ডুলিপি দিয়েছেন। অনেক পাণ্ডুলিপির নিশ্চয় প্রুফ দেখা হয়ে গেছে, প্রচ্ছদ রেডি হয়ে গেছে। অনেক বই নিশ্চয়ই প্রেসেও চলে গেছে। সারাবছর বই বিক্রিতে মন্দা থাকলেও প্রকাশকদের বই বিক্রির বড় সুযোগ হলো বইমেলা। সেই মেলার মাত্র ১ মাস আগে জানতে পারলো সে নিষিদ্ধ। এখন এই আর্থিক ক্ষতির দায়ভার কি বাংলা একাডেমি নেবে?

যত লেখালেখি হোক, যত প্রতিবাদ আর আন্দোলন হোক; বাংলা একাডেমি তাদের অবস্থান থেকে সরবে কিনা, সেটাই এখন বড় এক প্রশ্ন। বিষয়টা হলো, রবিন আহসান কেন প্রতিবাদ করলো? এবার ঠেলা সামলাও। আর সবাইকে বলে দিলো, ‘ভবিষ্যতে প্রতিবাদ করার আগে ভেবে দেখবা’। তার মানে এই দেশে আর কোনও কিছুর বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করা যাবে না। কারও বিরুদ্ধে যুক্তিসঙ্গত কিছু বলা যাবে না। ন্যায্য দাবি’র স্লোগান লিখে প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ানো যাবে না।

কিন্তু আমাদের লেখক-কবি-সাহিত্যিক কিংবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা তো কখনও এসবে দমেননি। শারীরিক-মানসিক আঘাতের পরও তারা লড়াই করেছেন। হুমায়ূন আজাদ দমেননি, শামসুর রহমান দমেননি। এমনকি তসলিমা নাসরিনকে দেশছাড়া করেও তাকে দমানো যায়নি। লেখক লিখবেনই, তিনি কথা বলবেনই। নাগরিক তাদের পক্ষ নেবে কিংবা বিপক্ষ নেবে। যুক্তি দিয়ে যুক্তির লড়াই হবে। সেখানে কেউ কেউ তলোয়ার-চাপাতির ভয় দেখাবে আর রাষ্ট্রীয় কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে উল্টো লেখক-প্রকাশককে সাবধানী হতে বলবেন, এটা কোন বাকস্বাধীনতার দৃষ্টান্ত?  

শেষ করতে চাই, লারনেড হ্যান্ড-এর বিখ্যাত এক ভাষণের কয়েকটি লাইন দিয়ে। লারনেড হ্যান্ড ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন নামকরা ফেডারেল কোর্টের বিচারপতি। অত্যন্ত জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হতে পারেননি। তিনি ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটি ভাষণ দেন। বিখ্যাত হয় সে ভাষণ। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা বাস করে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। যখন সেই স্বাধীনতা মরে যায়, তখন কোনও সংবিধান, কোনও আইন, কোনও আদালত সেটাকে রক্ষা করতে পারে না’। 

অতএব মানুষের মনে নিশ্চয়ই এখনও বাকস্বাধীনতা মরে যায়নি। কিন্তু অফিশিয়াল সেন্সরশিপ, আন-অফিশিয়াল সেন্সরশিপ এবং সেল্ফ সেন্সরশিপ যেহারে বেড়ে চলেছে তাতে মানুষের চিন্তার জগৎ ছোট হয়ে আসছে। বাকস্বাধীনতাকে অনেকটা মুরগির খোয়াড়ের মতো করে ফেলা হচ্ছে। যেখানে মুরগি থাকবে, চলা ফেরা করতে পারবে কিন্তু তাকে থাকতে হবে বেড়ার মধ্যেই। আমাদের তেমনই এক বেড়ায় বন্দি করে ফেলা হচ্ছে। আমরা যেন ভুলতেই বসেছি কেন বাক-স্বাধীনতা অন্য সব অধিকারের মতই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা তো আশা করতেই পারি, এই বেড়াটা খোদ বাংলা একাডেমিই ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে।   

লেখক: ইনচার্জ, গবেষণা বিভাগ, বাংলা ট্রিবিউন

.

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ