মুফতি হান্নান, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি, পাকিস্তান কানেকশন ও কিছু কথা

Send
দীপু সারোয়ার
প্রকাশিত : ১৩:১৯, মার্চ ২৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৫, জুন ০১, ২০১৭

দীপু সারোয়ারমুফতি আব্দুল হান্নান। যাদের হাত ধরে জঙ্গিবাদের বিস্তার এদেশে, তাদেরই একজন তিনি। শুরুতে পাকিস্তানভিত্তিক হরকাতুল মুজাহিদিনের সঙ্গে জড়িত থাকলেও পরে হরকাতুল জিহাদে যোগ দিয়ে সংগঠনটির শীর্ষ নেতা বনে যান। ১৯৯৯ সালের ১৮ জানুয়ারি কবি শামসুর রাহমানকে হত্যাচেষ্টার মধ্য দিয়ে জঙ্গি হামলা শুরু করে হরকাতুল জিহাদ। আর ২০০৫ সালের ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০টি জঙ্গি হামলা ও হামলা চেষ্টার অন্যতম হোতা হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান। এসব ঘটনায় ১০১ জন নিহত ও ৬০৯ জন গুরুতর আহত হন। এর মধ্যে সর্বশেষ হামলাটি মুফতি হান্নান গ্রেফতার হওয়ার পর সংঘটিত হয়। মুফতি হান্নান গ্রেফতার হন ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর। আর সর্বশেষ হামলাটি সংঘটিত হয় হান্নান গ্রেফতার হওয়ার প্রায় দু’ মাস পর ২ ডিসেম্বর। তার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দু’টিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
হান্নান ও তার সহযোগীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করেছে ৪ বার। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ কার্যালয়, দলটির সমাবেশ ও অনুষ্ঠানে আরও ৬ দফায় হামলা চালায় তারা। হামলার এই পরিসংখ্যান থেকে মনে করা যেতেই পারে যে, মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীদের প্রধান টার্গেট আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগে বাইরে আর যে রাজনৈতিক দলটি হান্নান ও তার সহযোগীদের টার্গেট হয়েছে সেটি হলো- কমিউনিস্ট পার্টি। কমিউনিস্ট পার্টির সমাবেশে একবার হামলা করেছে তারা। বিধর্মীয় সংস্কৃতি উল্লেখ করে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী ও বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানেও হামলা চালিয়েছে জঙ্গি হান্নানরা। তাদের টার্গেট হয়েছে দেশের প্রধান কবি প্রয়াত শামসুর রাহমানও। তবে তাদের হামলায় শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারাননি কবি। আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ও একবার হান্নান ও সহযোগীদের টার্গেট হয়েছে একবার। আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম মনে তারা। তাদের হাতে মাজার, পীরের মাহফিল ও পবিত্র আশুরার অনুষ্ঠান আক্রান্ত হয়েছে একবার করে। ভিন্নধর্ম ও ভিন্নমত বরদাস্ত করতে পারেন না হান্নান ও তার সহযোগীরা। আর তাই তাদের হামলা থেকে বাদ যায়নি গীর্জা। ধর্ম নিয়ে ভিন্নমত থাকায় স্বধর্মেরই একজনকে হত্যা করতে দ্বিধা করেননি তারা। 
সর্বশেষ তথ্য হচ্ছে, গত ৬ মার্চ একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার হাজিরার জন্য কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুফতি আব্দুল হান্নান ও তার সহযোগীসহ ১৯ আসামিকে ঢাকার আদালতে পাঠানো হয়। হাজিরা শেষে বিকেলে কারাগারে ফেরত যাওয়ার সময় টঙ্গীতে প্রিজনভ্যানটির ওপর হাতবোমা ছোড়া হয়। সেসময় হাতেনাতে ধরা পড়ে মাদ্রাসা ছাত্র মোস্তফা কামাল। পরে এ ঘটনায় আরও দু’জনকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। গ্রেফতারকৃতরা আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। কারাবন্দি হান্নানের সঙ্গে মুঠোফোনে তাদের যোগাযোগ থাকার কথাও বলেছেন তারা জবানবন্দিতে। 

মুফতি হান্নানের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়। গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা, বরিশালের শর্ষিনা মাদ্রাসা, ভারতের দেওবন্দে দারুল উলুম মাদ্রাসা, আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় ও পাকিস্তানের জামিয়া উলুম-উল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় পড়াশুনা করেছেন হান্নান। 

১৯৭৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর আফগানিস্তানে আগ্রাসন শুরু করে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। দেওবন্দের দারুল উলুমসহ ভারতের বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা ওই আগ্রাসনকে ইসলামের ওপর আঘাত হিসেবে চিত্রিত করে। এবং আফগানিস্তানে গিয়ে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেওয়াকে তারা ধর্মীয় কর্তব্য ‘জিহাদ’ বলেও ফতোয়া দেয়। আশির দশকের শুরুতেই পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তান যাওয়া শুরু করে ভারতের বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা। আফগান মুজাহিদদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধও করে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত। ভারতের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করতে যাওয়া যেসব বাংলাদেশি ছাত্র-শিক্ষক ‘আফগান জিহাদে’ আগ্রহী হয়ে ওঠেন, তাদেরই একজন হলেন মুফতি হান্নান।

১৯৮৭ সালে ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামি শিক্ষায় স্নাতকোত্তর পাস করেন। এরপর দেশে ফিরে ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানে যান এবং জামিয়া উলুম-উল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় ফিকাহশাস্ত্রে ভর্তি হন। ফিকাহশাস্ত্রের ওপর পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফেরেন ১৯৯৩ সালে। 

একে-৪৭ রাইফেল, রকেট প্রপেলার গান (আরপিজি-৭), স্নাইপার রাইফেলসহ আফগান যুদ্ধে ব্যবহার হওয়া বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ শেষে সোভিয়েত আগ্রাসনবিরোধী লড়াইয়ে এক বছরের মতো অংশ নেন মুফতি হান্নান। যুদ্ধে আহত হয়ে পাকিস্তানোর পেশোয়ারে কুয়েত আল হেলাল হাসপাতালে ১০ মাসের মতো চিকিৎসাও নিতে হয়েছে তাকে। 

জামিয়া উলুম-উল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় পড়াশুনার সময় জয়েশ-ই-মোহাম্মদ, হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী, আল কায়েদা, সিপাহি সাহাবা পাকিস্তান, হরকাতুল মুজাহিদিন, লস্কর-ই-তৈয়বা, হিযবুল মুজাহেদিন এর মতো সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে পরিচয় হয় হান্নানের। তবে হরকাতুল মুজাহিদিনের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা ফজলুর রহমান খলিলের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠতা হয় তার। 

মওলানা ফজলুর রহমান খলিল ১৯৮৫ সালে এই সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনকে কেন্দ্র করে বিদেশি যোদ্ধাদের এক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত রাখতে ১৯৮০ সালে হরকাতুল জিহাদ প্রতিষ্ঠা করেন পাকিস্তানের মওলানা এরশাদ আহমেদ। মওলানা খলিল এই সংগঠন থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর প্রতিশোধ হিসেবে হরকাতুল মুজাহিদিন প্রতিষ্ঠা করেন বলে ২০০৬ সালে হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ শাখার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মওলানা শেখ আব্দুস সালাম ‘দৈনিক সংবাদ’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন। হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ শাখার জন্ম ১৯৮৬ সালের জুন মাসে, আফগান রণাঙ্গনে। 

আশির দশকের মাঝামাঝি ও শেষ দিকে বাংলাদেশে সক্রিয় হয় হরকাতুল জিহাদ ও হরকাতুল মুজাহিদিন। হরকাতুল জিহাদের কার্যালয় ছিল খিলগাঁওয়ের তালতলায় আর হরকাতুল মুজাহিদিনের কার্যালয় ছিল টিকাটুলি। পরে শাহ আহমদ শফী, মহিউদ্দিন খানদের চাপে পড়ে ১৯৯৪ সালে দুই সংগঠন একীভূত হয়ে হরকাতুল জিহাদ নামে কর্মকাণ্ড শুরু করে। একীভূত হওয়ার পরও মুফতি হান্নান গোপনে হরকাতুল মুজাহিদিনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে থাকেন বলে আমাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন হরকাতুল জিহাদের আমির মওলনা শেখ আব্দুস সালাম। ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কয়েক দফায় দৈনিক সংবাদ ও একুশে টেলিভিশনে আব্দুস সালামের সাক্ষাৎকার নেই আমি। মওলানা সালামের দাবি অনুযায়ী ১৯৯৮ সালে মুফতি হান্নানকে হরকাতুল জিহাদ থেকে বহিঃষ্কার করা হয়। তবে তাকে বহিঃষ্কারের বিষয়টি গণমাধ্যমে জানানো হয়নি কেন তার কোনও সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। ওই সময় হরকাতুল জিহাদ নিষিদ্ধ ছিল না। ২০০৫ সালের ১৭ অক্টোবর সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করে সরকার। 

মুফতি হান্নানের জঙ্গি সম্পৃতার বিষয়টি ৪টি পর্বে ভাগ করা যেতে পারে। ধর্মীয় গোড়ামি যুক্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা মুফতি হান্নান প্রথম পর্বে গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা ও বরিশালের শর্ষিনা মাদ্রাসা পড়াশুনার সময় জঙ্গিবাদী আদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়ে। দ্বিতীয় পর্বে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ ও আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার সময় কথিত ধর্মীয় দায়িত্ব ‘জিহাদে’ উদ্বুদ্ধ হয় সে। তৃতীয় পর্বে পাকিস্তান যাত্রা, জামিয়া উলুম-উল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় পড়াশুনা করা এবং সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে কথিত ‘জিহাদ’র বাস্তব ভিত্তিক প্রয়োগ দেখেন। সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেওয়া আরব, আফ্রিকা, এশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগও পান তিনি এ পর্বেই। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স-আইএসআই নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে পরিচয় এবং বাংলাদেশে ফিরে ‘জিহাদ’ করার প্রস্তুতিও নেন তিনি এ পর্বেই। চতুর্থ পর্বে ‘জিহাদ’র ক্ষেত্র বাড়াতে তিনি দেশে ফেরেন এবং বাস্তবায়নে ওঠে পড়ে লাগেন। এবং চূড়ান্ত ‘জিহাদ’ শুরু করেন ১৯৯৯ সালের শুরুর দিকে। 

হান্নান ও তার সংগঠনের সামরিক অপারেশনের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, হান্নানের কথিত ‘জিহাদ’ আসলে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। আর এই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন, গোয়েন্দা সংস্থা এবং কতিপয় কথিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। হান্নান ও তার সংগঠনের সব সামরিক অপারেশনের পরিকল্পনা এসেছে মূলত পাকিস্তানভিত্তিক হরকাতুল মুজাহিদিন নেতা মওলানা ফজলুর রহমান খলিলের কাছ থেকে। মওলানা খলিল ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকবার বাংলাদেশ সফর করেন। দেশের বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসায় সভা-সমাবেশও করেন তিনি। বৈঠক করেন আলেম-ওলামাদের সাথে। আহমদিয়া সম্প্রদায়বিরোধী আন্দোলনেরও উস্কানিও দিয়ে যান ওইসব সফরে। বাংলাদেশকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণার দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে বলেন আলেম সমাজকে, আর্থিক সহযোগিতাও করেন। 

হান্নানের সংগঠনের একটি গঠনতন্ত্র ছাড়া আর কিছু নেই। দেশ পরিচালনার নীতি কী হবে,  দেশ যদি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হয় তাহলে অমুসলিম নাগরিকদের অবস্থান কী হবে, কূটনীতি কী হবে, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে- তার কোনও রুপরেখাই ছিল না সংগঠনটির। তবে গঠনতন্ত্রে যে কথা জোরের সঙ্গে বলা হয়েছে তা হলো- ‘জিহাদ’র বিস্তৃতি ঘটাতে ছড়িয়ে পড়তে হবে বিশ্বময়। 

হান্নান ও তার সংগঠন হরকাতুল জিহাদের সামরিক অপারেশন :

১৯৯৯...

১৯৯৯ সালের ১৮ জানুয়ারি কবি শামসুর রাহমানকে হত্যাচেষ্টার মধ্য দিয়ে হান্নান ও তার সহযোগীরা এদেশে জঙ্গি সন্ত্রাসের সূত্রপাত করে। 

একই বছরের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালিয়ে ১০ জনকে হত্যা করে হরকাতুল জিহাদ। 

একই বছরের ৮ অক্টোবর খুলনায় আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা হয় হান্নানে নির্দেশে। এতে নিহত হন ৮ জন। 

২০০০...

২০০০ সালের ১৩ জুলাই ফরিদপুরে এক পীরের মাহফিলে বোমা বিস্ফোরণের অন্যতম হোতাও ছিলেন হান্নান। এতে ১ জন নিহত ও ৭ জন আহত হন। 

২০০০ সালের ২২ জুলাই কোটালীপাড়ায় স্থানীয় কলেজ মাঠে প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশ করার কথা ছিল। ২০ জুলাই ওই সমাবেশের প্যান্ডেল তৈরির সময় ৭৬ কেজি ওজনের শক্তিশালী বোমা উদ্ধার হয়। সবার নজর এড়িয়ে ওই বোমা পুতে রাখেন হান্নান।

২০০১...

২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি পল্টনে কমিউনিস্ট পার্টির সমাবেশে বোমা হামলা হয় হান্নানের নির্দেশে। এতে ঘটনাস্থলেই ৪ জন এবং পরে একজন হাসপাতালে মারা যান। 

২০০১ সালের ৩০ মে খুলনায় শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনরা করেন হান্নান। কিন্তু ২৭ মে হান্নানের সহযোগিরা গ্রেফতার হয়ে যাওয়ায় ওই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। 

একই বছরের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হন। এই হামলারও নির্দেশ দেন হান্নান। 

একই বছরের ৩ জুন গোপালগঞ্জে বানিয়াচং গীর্জায় বোমা হামলা চালিয়ে ১০ জনকে হত্যা করে হান্নানের সহযোগীরা। 

ওই বছরের ১৬ জুন নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে বোমা বিস্ফোরণে ২০ জন নিহত হন। হান্নানের সহযোগীরাই এর সঙ্গে জড়িত বলে প্রমাণ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী।

একই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটে আরও একদফা শেখ হাসিনাকে বোমা মেরে হত্যার পরিকল্পনা করেন হান্নান। তবে অসতর্ক অবস্থায় নাড়াচাড়া করতে গিয়ে বোমার বিস্ফোরণে নিহত হয় ২ জঙ্গি।

২০০৩...

২০০৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যাওয়ার পথে অপহৃত হন হোমিও চিকিৎসক আব্দুল আজিজ। পরে হান্নানের নির্দেশে গাজীপুরের পোড়াবাড়ি এলাকায় হত্যা করা হয় তাকে। ২০০২ সালের মার্চে একটি কথিত প্রচারপত্রকে কেন্দ্র করে খুলনার ইমাম পরিষদ ডাক্তার আজিজকে মুরতাদ ঘোষণা করে। খুলনার বিভিন্ন থানায় মামলার পাশাপাশি ডাক্তার আজিজের বাসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হামলা করে ইমাম পরিষদ। এক পর্যায়ে প্রাণ বাচাতে সপরিবারে খুলনা থেকে পালিয়ে ঢাকার মিরপুর বসবাস করতে থাকেন তিনি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি তার। 

২০০৪...

২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা হয় মুফতি হান্নানের নির্দেশে। এতে ৩ জন নিহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান আনোয়ার চৌধুরী। 

একই বছরের ২১ জুন সুনামগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সমাবেশে বোমা হামলার হোতাও হান্নান। এতে ১ জন নিহত আর অর্ধশত আহত হন।  

ওই বছরের ৭ আগস্ট সিলেটে তৎকালীন মেয়র বদরুদ্দিন আহমেদ কামরানের ওপর গ্রেনেড হামলা হয় হান্নানের নির্দেশেই। এতে কামরান প্রাণে বেঁচে যান। তবে নিহত হন ১ জন।

ওই বছরেরই ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। ভয়াবহ এই হামলায় নিহত ২৪ জন। দেশি-বিদেশি জঙ্গিদের দিয়ে এই হামলাও পরিচালনা করেন হান্নান। 

একই বছরের ২৪ ডিসেম্বর সিলেটে আওয়ামী লীগ নেত্রী সৈয়দা জেবুন্নেছা হকেবর বাসায় হামলা চালায় হান্নানের সহযোগীরা। 

২০০৫...

পরের বছর ২৭ জানুয়ারি হান্নানের নির্দেশেই হবিগঞ্জে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াকে হত্যা করে জঙ্গিরা। এ ঘটনায় আরও ৪ জন নিহত হন। 

একই বছরের ২ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় স্থানীয় পৃথিমপাশা গ্রামে পবিত্র আশুরার অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালায় হান্নানের সহযোগীরা।  

ওই বছরের ১ অক্টোবর রাজধানীর বাড্ডা থেকে গ্রেফতার হন মুফতি হান্নান। 

একই বছরের ২ ডিসেম্বর সিলেটের টিলাগড়ে তৎকালীন মেয়র বদরউদ্দিন আহমেদ কামরানকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা হয়। তবে গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত না হওয়ায় হতাহতের কোনও ঘটনা ঘটেনি। পরে জানা যায়, কারাবন্দি হওয়ার আগের নির্দেশ অনুযায়ী হান্নানের সহযোগীরা কামরানকে হত্যার চেষ্টা হয়। 

লেখক: সাংবাদিক

ইমেইল: [email protected]

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 

লাইভ

টপ